প্রথম অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – উদ্গীথোপাসনা
1.1.1 ‘ওম্’ এই অক্ষরকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে; কারণ প্রথমে ‘ওম্’ শব্দ উচ্চারণ করিয়া পরে উদ্গীথ গান করা হয়। ইহার ব্যাখ্যা এই—
1.1.2 পৃথিবী এই চরাচর ভূতসমূহের রস, জল পৃথিবীর রস, ওষধিসমূহ জলের রস, পুরুষ ওষধিসমূহের রস, বাক্ পুরুষের রস, ঋগ্বেদ বাক্যের রস, সামবেদ ঋগ্বেদের রস এবং উদ্গীথ সামবেদের রস।
1.1.3 এই যে উদ্গীথ, ইহা রসসমূহের মধ্যে পরম রস, (ইহা) পরম বস্তু, পরম ধাম এবং (পৃথিব্যাদি রসসমূহের মধ্যে ইহার স্থান) অষ্টম।
1.1..4 ঋক্ কি, সাম কি, উদ্গীথ কি (এখন) ইহাই জিজ্ঞাস্য বিষয়।
1.1.5 বাক্যই ঋক্, প্রাণই সাম, ‘ওম্’ এই অক্ষরই উদ্গীথ। যাহা বাক্ ও প্রাণ, (অথবা) ঋক্ ও সাম— তাহাই মিথুন।
1.1.6 এই মিথুন (বাক্ ও প্রাণ) ‘ওম্’ এই অক্ষরে সম্মিলিত হয়। যখনই মিথুন সম্মিলিত হয়, তখনই তাহারা পরস্পরের কামনা পূর্ণ করে।
1.1.7 যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া ওঙ্কারকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করেন, তিনি কাম্যবস্তুসমূহ লাভ করেন।
1.1.8 সেই অক্ষর (ওম্) অনুমতি-জ্ঞাপক। যখনই কোন বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হয়, তখনই বলা হয় “ওম্’। এই যে অনুজ্ঞা অক্ষর, ইহাই শ্রেয়োলাভের হেতু। যিনি ইহাকে এই প্রকার জানিয়া এই অক্ষরকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করেন, তিনি সমুদয় কামনা পূর্ণ করিয়া থাকেন।
1.1.9 সেই অক্ষর দ্বারাই এই ত্রয়ী বিদ্যা (বেদত্রয়বিহিত যজ্ঞ) প্রবর্তিত হয়। ‘ওম্’ উচ্চারণ করিয়াই শ্রবণ করান হয়; ‘ওম্’ উচ্চারণ করিয়াই মন্ত্রপাঠ করা হয় এবং ‘ওম্’ উচ্চারণ করিয়াই উদ্গান করা হয়। এই সকলই এই অক্ষরের পূজার জন্য; এই সকলই ইহার মহিমা ও রসদ্বারা সম্পাদিত হইয়া থাকে।
1.1.10 যাঁহারা ইহা জানেন, এবং যাঁহারা ইহা জানেন না— ইঁহারা উভয়েই এই অক্ষর দ্বারাই কর্ম সম্পন্ন করিয়া থাকেন। কিন্তু বিদ্যা ও অবিদ্যা বিভিন্ন। বিদ্যাযুক্ত, শ্রদ্ধাযুক্ত ও উপনিষদ্যুক্ত হইয়া যাহা সম্পন্ন করা হয়, তাহাই অধিকতর ফলপ্রদ হয়। ইহাই এই অক্ষরের ব্যাখ্যা।
দ্বিতীয় খণ্ড – দেবগণের উদ্গীথোপাসনা
1.2.1 প্রজাপতির সন্তান দেবতা ও অসুর— এই উভয় দল পরস্পর যুদ্ধ করিয়াছিল। ‘আমরা উদ্গীথ দ্বারা অসুরদিগকে পরাভব করিব’— এই ভাবিয়া দেবগণ উদ্গীথ গ্রহণ করিলেন।
1.2.2 দেবগণ নাসিকাস্থ প্রাণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন, কিন্তু অসুরগণ এই প্রাণকে পাপদ্বারা বিদ্ধ করিল। এইজন্য লোকে ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা সুগন্ধি ও দুর্গন্ধি উভয়ই আঘ্রাণ করিয়া থাকে; কারণ ইহা পাপবিদ্ধ হইয়াছিল।
1.2.3 তারপর দেবগণ বাগিন্দ্রিয়কে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন, কিন্তু অসুরগণ তাহাকে পাপদ্বারা বিদ্ধ করিল। এই জন্য লোকে বাগিন্দ্রিয় দ্বারা সত্য ও অসত্য উভয়ই বলিয়া থাকে, কারণ ইহা পাপবিদ্ধ হইয়াছিল।
1.2.4 তারপর দেবগণ চক্ষুকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন, কিন্তু অসুরগণ ইহাকে পাপদ্বারা বিদ্ধ করিল। এই জন্য লোকে চক্ষু দ্বারা দর্শনীয় ও অদর্শনীয় উভয়ই দর্শন করে; কারণ ইহা পাপবিদ্ধ হইয়াছিল।
1.2.5 তারপর দেবগণ কর্ণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন, কিন্তু অসুরগণ ইহাকে পাপদ্বারা বিদ্ধ করিল। এই জন্য লোকে কর্ণদ্বারা প্রিয় ও অপ্রিয় উভয়ই শ্রবণ করে; কারণ ইহা পাপবিদ্ধ হইয়াছিল।
1.2.6 তারপর দেবগণ মনকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন, কিন্তু অসুরগণ ইহাকে পাপ দ্বারা বিদ্ধ করিল। এই জন্য লোকে মন দ্বারা সাধু ও অসাধু উভয় বিষয়ই চিন্তা করিয়া থাকে; কারণ ইহা পাপবিদ্ধ হইয়াছিল।
1.2.7 তারপর যাহা এই মুখ্যপ্রাণ, দেবগণ তাহাকেই উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন। কিন্তু লোষ্ট্ৰাদি যেমন কঠিন প্রস্তরকে আঘাত করিতে গিয়া নিজেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তেমনি অসুরগণ মুখ্যপ্রাণকে বিদ্ধ করিতে গিয়া আপনারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল
1.2.8 কঠিন প্রস্তরকে আঘাত করিতে যাইয়া যেমন লোষ্ট্রাদি বিনষ্ট হয়, তেমনি যে ব্যক্তি ঐ প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির পাপ কামনা করে এবং তাঁহাকে হিংসা করে, সেও বিনাশপ্রাপ্ত হয়; কারণ সেই ব্যক্তি দুর্ভেদ্য পাষাণস্বরূপ।
1.2.9 এই মুখ্য প্রাণদ্বারা সুরভি বা দুর্গন্ধি কিছুই জানা যায় না; কারণ এই প্রাণ অপাপবিদ্ধ। এই প্রাণদ্বারা যাহা ভোজন করা হয়, যাহা পান করা হয়, তাহাতে অপরাপর প্রাণ (ঘ্রাণাদি) প্রতিপালিত হইয়া থাকে। মরণকালে যখন লোকে এই মুখ্য প্রাণকে লাভ করিতে পারে না, তখন সে দেহ হইতে উৎক্রমণ করে। এই জন্যই মৃত্যুকালে লোকে মুখব্যাদান করে।
1.2.10 অঙ্গিরা ঋষি এই মুখ্যপ্রাণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন; এই জন্য এই প্রাণকেই অঙ্গিরা বলিয়া মনে করা হয়, যেহেতু ইহা অঙ্গসমূহের রস। (অর্থান্তর— অঙ্গিরা ঋষি এই মুখ্যপ্রাণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন। এই প্রাণই অঙ্গিরা অর্থাৎ অঙ্গসমূহের রস; এই জন্য উপাসক ঋষিকেও অঙ্গিরা বলা হয়)।
1.2.11 সেই জন্য বৃহস্পতি এই মুখ্যপ্রাণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন। এই হেতু এই প্রাণকে বৃহস্পতি বলা হয়; কারণ বাক্ই বৃহতী এবং এই প্রাণ তাঁহার পতি। (অর্থান্তর— এই জন্য এই ঋষিকে বৃহস্পতি বলা হয়; কারণ বাক্ই বৃহতী এবং ঋষি এই বাক্যের পতি)।
1.2.12 সেই জন্য আয়াস্য ঋষি এই মুখ্য প্রাণকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিয়াছিলেন। এই কারণে এই প্রাণকে আয়াস্য বলা হয়, কারণ ইহা আস্য অর্থাৎ মুখ হেতু নির্গত হয়। (অর্থান্তর— এই জন্য ঋষিকে আয়াস্য বলা হয়; কারণ তাঁহার উপাস্য প্রাণ আস্য হইতে নির্গত হয়)।
1.2.13 সেই জন্য দভের পুত্র ঋষি বক সেই প্রাণকে জানিয়াছিলেন। তিনি নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিগণের উদ্গাতা হইয়াছিলেন এবং তাঁহাদিগের জন্য কাম্যবস্তু লাভের আকাঙ্ক্ষায় উান করিয়াছিলেন।
1.2.14 যিনি মুখ্যপ্রাণকে এই প্রকার জানিয়া অক্ষরকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করেন, তিনি উদ্গান করিয়া কাম্যবস্তু লাভ করেন। ইহাই আধ্যাত্মিক অর্থাৎ দেহ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা।
তৃতীয় খণ্ড – উদ্গীথের অধিদৈবোপাসনা
1.3.1 তারপর অধিদৈবত দৃষ্টিতে (উদ্গীথের উপাসনা ব্যাখ্যাত হইতেছে)— ঐ যে সূর্য উত্তাপ দিতেছেন উহাকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে। ঐ সূর্য উদিত হইয়া জীবগণের জন্য উদ্গান করিয়া থাকেন এবং অন্ধকারের ভয় (বা অন্ধকার ও ভয়কে) বিনাশ করিতে সমর্থ হন।
1.3.2 এই প্রাণ এবং ঐ সূর্য উভয়ই সমান; ইহাও উষ্ণ এবং উহাও উষ্ণ; ইহাকে স্বর বলে এবং উহাকে স্বর ও প্রত্যাস্বর বলে। এই জন্য এই প্রাণকে এবং সূর্যকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে।
1.3.3 তারপর ব্যানকেই উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে। যাহা প্রাণন কার্য করে, তাহাই প্রাণ; যাহা অপানন কার্য করে, তাহাই অপান; যাহা প্রাণ ও অপানের সন্ধি, তাহাই ব্যান। যাহা ব্যান তাহাই বাক্; সেইজন্য বাক্য উচ্চারণ করিবার সময় লোকে প্রাণন ও অপানন কার্য বন্ধ রাখে।
1.3.4 যাহা বাক্ তাহাই ঋক্; এইজন্য ঋক্ উচ্চারণ করিবার সময়ে প্রাণন ও অপানন কার্য স্থগিত থাকে। যাহা ঋক্, তাহাই সাম; এইজন্য সামগান করিবার সময় প্রাণন ও অপানন কার্য স্থগিত থাকে। যাহা সাম তাহাই উদ্গীথ; এইজন্য উদ্গান করিবার সময়ে প্রাণন ও অপানন কার্য বন্ধ থাকে।
1.3.5 এইজন্য অগ্নিমন্থন, লক্ষ্যসীমায় ধাবন, দৃঢ়ধনু অবনমন ইত্যাদি অন্য শক্তিসাধ্য কার্য করিবার সময় প্রাণ ও অপানের কার্য বন্ধ থাকে। এইজন্য ব্যানকেই উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে।
1.3.6 তারপর উদ্গীথের অক্ষরসমূহকে (অর্থাৎ উৎ, গী ও থ— এই তিনটি অক্ষরকে) উপাসনা করিবে। উদ্গীথের ব্যাখ্যা এই— প্রাণই ‘উৎ’, কারণ প্রাণদ্বারাই সকলের উত্থান হয়; বাক্ই ‘গীঃ’, কারণ বাক্যকেই ‘গীঃ” বলা হয়। অন্নই ‘থ’, কারণ এ সমস্ত অন্নেই প্রতিষ্ঠিত।
1.3.7 দ্যৌ−ই ‘উৎ’, অন্তরীক্ষই ‘গী’ এবং পৃথিবীই ‘থ’। আদিত্যই ‘উৎ’, বায়ুই ‘গী’, অগ্নিই ‘থ’। সামবেদই ‘উৎ’, যজুর্বেদই ‘গী’, ঋগ্বেদই ‘থ’। বাক্যের যে দুগ্ধ, সেই দুগ্ধকে বাক্ স্বয়ং উপাসকের জন্য দোহন করেন। যিনি এই প্রকার জানিয়া উদ্গীথের অক্ষরসমূহের উপাসনা করেন, তিনি অন্নবান ও অন্নভোক্তা হন।
1.3.8 অনন্তর কাম্যবস্তুলাভ (বিষয়ে এই উপদেশ)—উপসরণকে অর্থাৎ ধ্যান দ্বারা প্রাপ্তব্য বিষয়কে উপাসনা করিবে। যে সামদ্বারা স্তুতি করা হইবে, সেই সামকে ধ্যান করিবে।
1.3.9 এই সাম যে ঋকের অন্তর্গত সেই ঋক্কে, যে ঋষি ইহার দ্রষ্টা সেই ঋষিকে এবং যে দেবতার স্তব করিতে হইবে সেই দেবতাকে ধ্যান করিবে।
1.3.10 যে ছন্দদ্বারা স্তব করিবে সেই ছন্দকে এবং যে তোমদ্বারা স্তব করিবে সেই তোমকে ধ্যান করিবে।
1.3.11 যে দিকে স্তব করিবে (কিংবা যে দিকে মুখ ফিরাইয়া স্তব করিবে), সেই দিকের ধ্যান করিবে।
1.3.12 সর্বশেষে আত্মবিষয়ে চিন্তা করিয়া, কাম্যবস্তুর ধ্যান করিয়া (উচ্চারণাদি বিষয়ে), প্রমাদরহিত হইয়া স্তুতি করিবে। তাহা হইলে যে ব্যক্তি যে কামনা লইয়া স্তব করিবে, তাহার সেই কামনা শীঘ্র পূর্ণ হইবে।
চতুর্থ খণ্ড – দেবগণের ওঙ্কারোপাসনা
1.4.1 ‘ওম্’ এই অক্ষরকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে। ‘ওম’, উচ্চারণ করিয়াই উদ্গান করা হয়। ইহার ব্যাখ্যা এই—।
1.4.2 দেবদগণ মৃত্যুভয়ে ত্রয়ী বিদ্যাতে প্রবেশ করিয়াছিলেন (অর্থাৎ মৃত্যুভয় অতিক্রম করিবার জন্য দেবগণ বেদবিহিত কর্মে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন)। তাঁহারা ছন্দদ্বারা (মন্ত্রদ্বারা) নিজেদের আচ্ছাদন করিয়াছিলেন। তাঁহারা এই সকল মন্ত্র দ্বারা নিজেদের ‘আচ্ছাদন’ করিয়াছিলেন; এই জন্য মন্ত্রসমূহের নাম ছন্দ।
1.4.3 কিন্তু জলে যেমন মাছকে দেখা যায়, তেমনি মৃত্যুও ঋক্, সাম ও যজুতে দেবগণকে দেখিতে পাইল। দেবগণ ইহা জানিতে পারিয়া ঋক্, সাম ও যজুঃ হইতে বাহির হইয়া স্বরে (‘ওম্’ এই অক্ষরে) প্রবেশ করিলেন অর্থাৎ দেবগণ যাগযজ্ঞ পরিত্যাগ করিয়া ওঙ্কারের ধ্যানে লগ্ন হইলেন।
1.4.4 যখন ঋক্ পাঠ করা হয় তখন উচ্চৈঃস্বরে ‘ওম্’ উচ্চারণ করা হয়। সাম এবং যজুঃ পাঠ করার সনয়ও এই প্রকার করা হয়। এই যে ‘ওম্’ অক্ষর, ইহাই স্বর; এই অক্ষর অমৃত অভয়। দেবগণ ইহাতে প্রবেশ করিয়া অর্থাৎ ওঙ্কারের ধ্যান করিয়া অমৃত ও অভয় হইয়াছিলেন।
1.4.5 যিনি ইহা জানিয়া ‘ওম্’ অক্ষরের স্তুতি করেন, তিনি ‘ওম্’ অক্ষর-রূপ অমৃত অভয় স্বরে প্রবেশ করেন। দেবগণ ইহাতে প্রবেশ করিয়া যেমন অমৃত হইয়াছিলেন, তেমনি তিনিও অমৃত হন।
পঞ্চম খণ্ড – উদ্গীথরূপে আদিত্য ও প্রাণের উপাসনা
1.5.1 যাহা উদ্গীথ, তাহাই প্রণব; আর যাহা প্রণব, তাহাই উদ্গীথ। এই আদিত্যই উদ্গীথ এবং ইনিই প্রণব— কারণ আদিত্য ‘ওম্’ উচ্চারণপূর্বক ভ্রমণ করেন।
1.5.2 ঋষি কৌষীতকি পুত্রকে বলিয়াছিলেন— আমি আদিত্যকে স্তুতি করিয়াছিলাম, সেইজন্য তুমি আমার একপুত্র হইয়াছ। তুমি রশ্মিসমূহের ধ্যান কর, তোমার বহুপুত্র হইবে। [কিংবা, যদি তুমি ইচ্ছা কর যে, ‘আমার বহুপুত্র হউক’— তাহা হইলে তুমি ইহার রশ্মিসমূহের ধ্যান কর]। ইহাই দেবতাবিষয়ক ব্যাখ্যা।
1.5.3 ইহার পর দেহসংক্রান্ত উপাসনার উপদেশ— এই যে মুখ্যপ্ৰাণ, ইহাকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে, কারণ ইহা ‘ওম্’ উচ্চারণ করিতে করিতে বিচরণ করে।
1.5.4 কৌষীতকি ঋষি নিজের পুত্রকে বলিয়াছিলেন— আমি (একমাত্র) এই প্রাণের উপাসনা করিয়াছিলাম, সেইজন্য তুমি আমার একমাত্র পুত্র হইয়াছ। ‘আমার বহু পুত্র হউক’— ইহা যদি তুমি ইচ্ছা কর, তুমি প্রাণসমূহকে বহুগুণসম্পন্ন রূপে উপাসনা কর।
1.5.5 যাহা উদ্গীথ তাহাই প্রণব, এবং যাহা প্রণব তাহাই উদ্গীথ। (যদি এই প্রকার জ্ঞান হয়) তাহা হইলে হোতার কর্মে ত্রুটি থাকিলেও তাহা সংশোধিত হয়।
ষষ্ঠ খণ্ড – আদিত্যমণ্ডলবাসী হিরন্ময় পুরুষ
1.6.1 এই পৃথিবীই ঋক্, অগ্নিই সাম। সেই সাম (অর্থাৎ অগ্নি) ঋকে (অর্থাৎ পৃথিবীতে) অধিষ্ঠিত। এইজন্য গীত হইয়া থাকে যে সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এই পৃথিবীই ‘সা’ (অর্থাৎ সাম শব্দের ‘সা’ অক্ষর); অগ্নি ‘অম’ (অর্থাৎ সাম শব্দের ‘অম’ অংশ)। এইরূপে (‘সা’ এবং ‘অম’—এই দুইয়ের সন্ধিতে) সাম হইয়াছে।
1.6.2 অন্তরিক্ষই ঋক্, বায়ুই সাম। সেই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এই জন্য গান করা হয় যে, সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। অন্তরিক্ষই ‘সা’ এবং বায়ুই ‘অম’। এইরূপে সাম হইল।
1.6.3 দ্যুলোকই ঋক্, আদিত্যই সাম। সেই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এইজন্য গান করা হয় যে, সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। দ্যৌ-ই ‘সা’ এবং আদিত্যই ‘অম, ‘ এইরূপে সাম হইয়াছে।
1.6.4 নক্ষত্রসমূহই ঋক্, চন্দ্র সাম। সেই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এইজন্য গান করা হয় যে, সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। তারকারাজিই ‘সা’, চন্দ্রই ‘অম’। এইরূপে সাম হইয়াছে।
1.6.5 তাহার পর সূর্যের এই যে শুক্ল আভা ইহাই ঋক; আর যাহা নীল, গভীর কৃষ্ণ আভা, তাহাই সাম। এই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এইজন্যই গান করা হয় যে সাম ঋকে অধিষ্ঠিত।
1.6.6 তাহার পর সূর্যের এই যে শুক্ল আভা, তাহাই (সাম শব্দের) ‘সা’; আর যাহা নীল, গভীর কৃষ্ণ আভা, তাহাই (সাম শব্দের) ‘অম’; এইরূপে সাম হইল। আর সূর্যের অভ্যন্তরে এই যে পুরুষকে দেখা যায় যিনি হিরণ্যময়, হিরণ্যশ্মশ্রু, হিরণ্যকেশ, যাঁহার নখাগ্র হইতে সকল অঙ্গই সুবর্ণময়—
1.6.7 বানরপুচ্ছের নিম্নভাগের ন্যায় আরক্তিম পদ্মের মত তাঁহার দুইটি চক্ষু। তাঁহার নাম ‘উৎ’, কারণ তিনি, সকল পাপ হইতে উত্থিত হইয়াছেন। যিনি ইহা জানেন, তিনিও সব পাপ হইতে উত্তীর্ণ হন।
1.6.8 ঋক্ ও সাম সেই দেবতার গায়কদ্বয় (বা দুই স্তুতি বা পর্বদ্বয়); এই জন্যই তিনি উদ্গীথ এবং এইজন্যই গায়কের নাম উদ্গাতা; ঐ আদিত্যের ঊর্ধ্বতন যে সব লোক আছে, তিনি সেই সকল লোকের ঈশ্বর এবং দেবগণের কাম্যবস্তুরও ঈশ্বর।
সপ্তম খণ্ড – চাক্ষুষ পুরুষ ও আদিত্যপুরুষের একতা
1.7.1 অনন্তর অধ্যাত্ম (অর্থাৎ দেহবিষয়ক) ব্যাখ্যা— বাক্ই ঋক, প্রাণই সাম। এই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত; এইজন্য গীত হইয়া থাকে যে, ‘সাম ঋকে অধিষ্ঠিত’। বাক্ই ‘সা’ এবং প্রাণই ‘অম’; এইরূপে ‘সাম’ হইল।
1.7.2 চক্ষুই ঋক্, আত্মাই (অর্থাৎ চক্ষুতে প্রতিবিম্বিত দেহই) সাম। এই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এইজন্য গান করা হয় সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। চক্ষুই ‘সা’ এবং আত্মাই ‘অম’; এইরূপে সাম হইল।
1.7.3 কর্ণই ঋক্, মনই সাম। এই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এই জন্যই গান করা হইয়া থাকে যে, সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। কর্ণই ‘সা’, মনই ‘অম’; এইরূপে সাম হইল।
1.7.4 তাহার পর চক্ষুর যে শুক্ল আভা, তাহাই ঋক্; আর ইহার যে নীল, গভীর কৃষ্ণ আভা, তাহাই সাম। এই সাম ঋকে অধিষ্ঠিত। এইজন্য গান করা হয় যে, ‘সাম ঋকে অধিষ্ঠিত’। এই যে চক্ষুর শুক্ল আভা ইহাই ‘সা’, আর যে নীল গভীর কৃষ্ণ আভা, ইহাই ‘অম’। এইরূপে সাম হইল।
1.7.5 চক্ষুর অভ্যন্তরে যে পুরুষ দেখা যায় তিনিই ঋক্, তিনিই সাম, তিনিই উক্থ (সামের অংশবিশেষ), তিনিই ব্রহ্ম (মন্ত্ৰ, বেদ)। আদিত্যপুরুষের যে রূপ, এই পুরুষেরও সেই রূপ। আদিত্যপুরুষের যাহা গেষ্ণ। (গায়ক বা গান বা পৰ্বদ্বয়), এই চাক্ষুষ পুরুষেরও তাহাই গেষ্ণ। আদিত্যপুরুষের যে নাম (উৎ), চাক্ষুষ পুরুষেরও সেই নাম।
1.7.6 আধ্যাত্মিক আত্মা হইতে অধস্তন যে সকল লোক আছে, চাক্ষুষ পুরুষ সেই সমুদয় লোকের ঈশ্বর এবং মনুষ্যদিগের কামনারও ঈশ্বর। সুতরাং যাহারা বীণা- সংযোগে গান করে, তাহারা ইহারই গান করে এবং এই জন্য তাহারা ধনবান হইয়া থাকে।
1.7.7-9 যে ব্যক্তি ইঁহাকে এইরূপ জানিয়া সামগান করেন (আদিত্য-পুরুষ ও চাক্ষুষ পুরুষ এই) উভয়কেই (লক্ষ করিয়া) তাঁহার সামগান করা হয়। আদিত্য-পুরুষ অপেক্ষা যে সকল উর্ধ্বতন লোক আছে, আদিত্যপুরুষ দ্বারা তিনি সেই সব লাভ করেন এবং দেবগণের কাম্যবস্তুসমূহ লাভ করিয়া থাকেন। আর চাক্ষুষ পুরুষ অপেক্ষা যে সকল অধস্তন লোক আছে, চাক্ষুষ পুরুষ দ্বারা তিনি সেই সকল লোক এবং মনুষ্যদিগের কাম্যবস্তুও লাভ করেন। সেই জন্য এই প্রকার জ্ঞান- সম্পন্ন উদ্গাতা বলিবেন— ‘তোমার কোন্ কাম্য বস্তু লাভের জন্য গান করিব?’ যিনি এই প্রকার জানিয়া সামগান করেন, তিনি গানের দ্বারা কাম্যবস্তু লাভ করিতে সমর্থ হন।
অষ্টম খণ্ড – আদি কারণের অন্বেষণ
1.8.1 (প্রাচীন কালে) শালাবত্য শিলক, দাল্ল্ভ্য চৈকিতায়ন ও প্রবাহণ জৈবলি— এই তিনজন উদ্গীথবিদ্যায় কুশল ছিলেন। তাঁহারা বলিলেন—আমরা উদ্গীথ-বিদ্যায় পারদর্শী হইয়াছি; আপনাদের যদি অনুমতি হয়, তবে আমরা উদ্গীথ বিষয়ে আলোচনা করি।.”
1.8.2 ‘তাহাই হউক’—এই বলিয়া তাঁহারা একস্থানে উপবেশন করিলেন। প্রবাহণ জৈবলি বলিলেন—’আপনারাই আগে এবিষয়ে বলুন; আমি ব্রাহ্মদ্বয়ের বিচার শুনিব।
1.8.3 শালাবত্য শিলক দাল্ল্ভ্য চৈকিতায়নকে বলিলেন—’যদি অনুমতি হয়, আমি তোমাকে প্রশ্ন করি।’ দাল্ভ্য বলিলেন ‘প্রশ্ন কর’
1.8.4 শিলক জিজ্ঞাসা করিলেন—’সামের গতি (প্রতিষ্ঠা) কি?” দাভ্য বলিলেন—’স্বর’। শিলক’স্বরের গতি কি?’ দাল্ভ্য—’প্রাণ’। শিলক—’প্রাণের গতি কি?’ দাল্ভ্য—’অন্ন’। শিলক’অন্নের গতি কি?’ দাল্ল্ভ্য—’জল’।
1.8.5 শিলক ‘জলের গতি কি?” দাল্ভ্য—’সেই লোক (স্বর্গলোক)। ‘ শিলক ‘সেই লোকের গতি কি?’ দাল্ল্ভ্য— ‘স্বর্গলোককে অতিক্রম করিও না। আমরা সামকে স্বর্গলোকে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া জানি; এই সাম স্বর্গরূপে স্তুত হয়।’
1.8.6 শালাবত্য শিলক চৈকিতায়ন দাল্ভ্যকে বলিলেন— হে দাল্ভ্য, তোমার সাম প্রতিষ্ঠাবিহীন। এখন যদি কেহ বলে (তোমার কথা সত্য না হয় তবে)——তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে’, তবে তোমার মস্তক নিশ্চয়ই খসিয়া পড়িবে।
1.8.7 দাল্ভ্য বলিলেন—’যদি অনুমতি হয়, আমি আপনার নিকট হইতে ইহা জানিয়া লই।’ শালাবত্য বলিলেন—’জান’। দালভ্য’সেই লোকের (অর্থাৎ স্বর্গলোকের) প্রতিষ্ঠা কি?’ শিলক—’এই পৃথিবীলোক’। দালভ্য—’এই পৃথিবীলোকের প্রতিষ্ঠা কি?’ শিলক—(সামের প্রতিষ্ঠার জন্য) ‘পৃথিবীলোককে অতিক্রম করিবে না। আমরা এই সামকে এই পৃথিবীলোকেই প্রতিষ্ঠিত করি। প্রতিষ্ঠারূপেই এই সাম স্তবনীয়।
1.8.8 প্রবাহণ জৈবলি শালাবত্যকে বলিলেন, ‘হে শালাবত্য, তোমার সাম অনন্ত নয়। এখন কেহ যদি বলে—(তোমার কথা সত্য না হইলে) তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে, তাহা হইলে নিশ্চয় তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে।’ শালাবত্য বলিলেন—’আমি আপনার নিকট ইহা জানিতে চাই।’ তিনি বলিলেন—‘জানিয়া লও।’
নবম খণ্ড – আকাশ বা অনন্ত
1.9.1 শালাবত্য জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘এই লোকের অর্থাৎ এই পৃথিবীর কি গতি?” প্রবাহণ বলিলেন ‘আকাশ’। (কারণ) এই নিখিল ভূতবর্গ আকাশ হইতেই উৎপন্ন হয় এবং আকাশেই বিলীন হয়। সুতরাং আকাশ এই সমুদয় হইতে শ্রেষ্ঠ। আকাশই পরমা গতি।
1.9.2 এই আকাশই উদ্গীথ এবং শ্রেষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠ। ইহা অনন্ত। যিনি এই প্রকার জানিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্গীথকে উপাসনা করেন, তাঁহার সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন লাভ হয় এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ লোকসমূহ জয় করেন।
1.9.3 শুনকের পুত্র অতিধন্বা উদরশাণ্ডিল্যকে উদ্গীথ-বিষয়ে উপদেশ দিয়া বলিয়াছিলেন— যে পর্যন্ত তোমার বংশের লোকেরা এই উদ্গীথবিদ্যা জানিবে, তত দিন এই পৃথিবীতে তাহাদের জীবন সাধারণ লোকের জীবন অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর হইবে।
1.9.4 (যেমন ইহলোকে) তেমনি পরলোকেও তাঁহার শ্রেষ্ঠ ফল লাভ হইবে। যিনি এইরূপ জানিয়া ইঁহার (উদ্গীথের) উপাসনা করেন, তাঁহার ইহলোকে সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ জীবন এবং পরলোকেও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হয়।
দশম খণ্ড – উযস্তি চাক্রায়ণের আখ্যায়িকা (১)
1.10.1 কুরুদেশ শিলাবৃষ্টিতে বিনষ্ট হইলে চক্রের পুত্র উষস্তি দেশভ্রমণে সমর্থা (অথবা অপ্রাপ্তযৌবনা) পত্নীর সহিত অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ইভ্য-গ্রামে বাস করিতেছিলেন।
1.10.2 একজন ইভ্য মাষকলায় খাইতেছে, ইহা দেখিয়া উষস্তি তাহার নিকট (মাষকলায়) ভিক্ষা করিলেন। ইভ্য বলিল ’আমার ভোজনপাত্রে যে উচ্ছিষ্ট মাষকলায় রহিয়াছে, তাহা ছাড়া আর কিছু নাই।‘
1.10.3 উষস্তি বলিলেন— ‘ইহারই কিছু অংশ আমাকে দাও।’ ইভ্য তাঁহাকে তাহা দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘এই পানীয় কি দিব?’ উষস্তি বলিলেন—’তাহা হইলে আমার উচ্ছিষ্ট পান করা হইবে।’
1.10.4 ইভ্য বলিল—’এই সব মাষকলায় কি উচ্ছিষ্ট নহে?’ উষস্তি বলিলেন, ‘ইহা না খাইলে আমি বাঁচিতাম না, কিন্তু জলপান আমার ইচ্ছাধীন।’
1.10.5 উষস্তি মাষকলায় খাইয়া অবশিষ্টাংশ স্ত্রীর জন্য লইয়া আসিলেন। কিন্তু সত্রী পূর্বেই উত্তম ভিক্ষা পাইয়াছিলেন। তাই তিনি সেই মাষকলায় নিয়া রাখিয়া দিলেন।
1.10.6 পরের দিন প্রাতে উঠিয়া উষস্তি স্ত্রীকে বলিলেন—’হায়! যদি কিছু অনু পাইতাম (তাহা হইলে তাহা খাইয়া রাজসমীপে যাইতে পারিতাম), কিছু অর্থলাভ হইত। ঐ রাজা যজ্ঞ করিবেন; ঋত্বিকগণের সব কাজ করিবার জন্য তিনি আমাকে বরণ করিতে পারিতেন।‘
1.10.7 স্ত্রী তাঁহাকে বলিলেন—’হে পতি, এই তো সেই মাষকলায় রহিয়াছে।’ তখন তিনি তাহা খাইয়া সেই প্রারব্ধ যজ্ঞে গমন করিলেন।
1.10.8 তিনি যজ্ঞস্থলে গিয়া স্তোত্রপাঠক উদ্গাতাগণের নিকটে বসিলেন। তারপর প্রস্তোতাকে বলিলেন—
1.10.9 হে প্রস্তোতা, যে দেবতা প্রস্তাবের অনুগমন করেন তাঁহাকে না জানিয়া যদি প্রস্তাব পাঠ কর, তবে তোমার মাথা খসিয়া পড়িবে।
1.10.10 এই রকমে তিনি উদ্গাতাকে বলিলেন— হে উদ্গাতা, যে দেবতা উদ্গীথের অনুগমন করেন, সেই দেবতাকে না জানিয়া যদি উদ্গান কর, তাহা হইলে তোমার মাথা খসিয়া পড়িবে।
1.10.11 তারপর তিনি প্রতিহারাঠককেও বলিলেন— ‘হে প্রতিহারপাঠক, যে দেবতা প্রতিহারের অনুগমন করেন, তাঁহাকে না জানিয়া যদি প্রতিহার পাঠ কর, তবে তোমার মাথা খসিয়া পড়িবে।’ তখন তাহারা নিজের নিজের কাজ বন্ধ করিয়া নীরব হইয়া রহিল।
একাদশ খণ্ড – উষন্তি চাক্রায়ণের আখ্যায়িকা (২)
1.11.1 তখন যজমান তাঁহাকে বলিলেন—’আমি আপনার পরিচয় জানিতে ইচ্ছুক।’ উষস্তি বলিলেন—’আমি চক্রের পুত্র উষস্তি’।
1.11.2 যজমান বলিলেন—’এই সমস্ত ঋত্বিক-কর্মের জন্য আমি সর্বত্র আপনার অন্বেষণ করিয়াছিলাম। আপনার সন্ধান না পাইয়া আমি অপর সকল লোককে বরণ করিয়াছি।
1.11.3 ‘আপনিই আমার সকল ঋত্বিক-কার্যের ভার গ্রহণ করুন।’ উষস্তি বলিলেন—’তাহাই হউক। এখন ইহারাই আমার অনুমতিতে স্তুতিগান করুক। আপনি ইহাদিগকে যে পরিমাণ অর্থ দিবেন, আমাকেও তাহাই দিবেন।’ যজমান বলিলেন— ‘তাহাই হইবে।’
1.11.4 তারপর প্রস্তোতা উষস্তির নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল—আপনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘হে প্রস্তাবপাঠক, যে দেবতা প্রস্তাবের অনুগমন করেন তাঁহাকে না জানিয়া যদি প্রস্তাব পাঠ কর, তাহা হইলে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে।’ আপনি বলুন— তিনি কোন্ দেবতা?
1.11.5 উষস্তি বলিলেন—প্রাণই সেই দেবতা; কারণ এই সর্বভূত প্রাণেই বিলীন হয় এবং প্রাণ হইতেই উৎপন্ন হয়। সেই প্রাণদেবতাই প্রস্তাবের অনুগমন করেন। ইহাকে না জানিয়া যদি তুমি প্রস্তাব পাঠ করিতে, তাহা হইলে আমার ঐ কথায় তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত। [কিংবা আমি ঐ প্রকার বলিবার পরও যদি তুমি প্রস্তাব পাঠ করিতে, তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত]।
1.11.6 অনন্তর উদ্গাতা তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল—আপনি আমাকে বলিয়াছিলেন ‘হে উদ্গাতা, যে দেবতা উদ্গীথের অনুগমন করেন, তাঁহাকে না জানিয়া যদি উদ্গান কর, তাহা হইলে তোমার মাথা খসিয়া পড়িবে।’ আপনি বলুন, তিনি কোন্ দেবতা?
1.11.7 উষস্তি বলিলেন—’আদিত্যই সেই দেবতা। সূর্য ঊর্ধ্বে উঠিলে এই চরাচর সর্বভূত তাঁহার স্তব করিয়া থাকে। সেই দেবতাই উদ্গীথের অনুগমন করেন। তাঁহাকে না জানিয়া যদি তুমি উদ্গীথ গান করিতে, আমার ঐ বাক্যানুসারে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত। [কিংবা আমি ঐ বাক্য বলিবার পরও যদি তুমি উদ্গান করিতে, তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত]।
1.11.8 অনন্তর প্রতিহর্তা তাহার নিকট যাইয়া বলিলেন—আপনি আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘হে প্ৰতিহতা, যে দেবতা প্রতিহারের অনুগমন করে, সেই দেবতাকে না জানিয়া তুমি যদি প্রতিহার কর্ম কর, তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে।’ তিনি কোন্ দেবতা?
1.11.9 উষস্তি বলিলেন—অন্নই সেই দেবতা। চরাচর সমস্ত জীব অন্ন আহরণ করিয়াই জীবিত থাকে। সেই দেবতাই প্রতিহারের অনুগমন করেন। তুমি যদি তাঁহাকে না জানিয়া প্রতিহার-কর্ম করিতে, আমার ঐ বাক্যানুসারে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত।
দ্বাদশ খণ্ড
1.12.1 এখন কুকুরবিষয়ক উদ্গীথ বলা হইতেছে। এক সময়ে দল্ভপুত্ৰ বক অথবা গ্লাব মৈত্রেয় বেদপাঠের জন্য (নির্জন স্থানে) গিয়াছিলেন।
1.12.2 তাঁহার নিকট এক সাদা রঙের কুকুর উপস্থিত হইল। আরও কতকগুলি কুকুর তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, “আমরা যাহাতে খাদ্য পাই সেইজন্য সামগান করুন; আমরা ক্ষুধার্ত।‘
1.12.3 শ্বেত কুকুর তাহাদিগকে বলিল, ‘তোমরা প্রাতে এইখানেই আমার নিকট আসিও।’ দাল্ল্ভ্য বক অর্থাৎ মৈত্রেয় গ্লাব তাহাদিগের জন্য সেখানেই অপেক্ষা করিয়া রহিল।
1.12.4 বহিষ্পবমান স্তোত্রদ্বারা স্তুতি করিবার সময়ে উদ্গাতারা যেমন পরস্পর সংলগ্ন হইয়া চলিতে থাকে, এই কুকুরেরাও সেইরকম করিতে লাগিল। তাহার পরে বসিয়া তাহারা ‘হিং’ এই শব্দ উচ্চারণ করিল।
1.12.5 (হিংকারটি হইল)—’ওম্’—ভোজন করিব; ‘ওম্’—পান করিব। ‘ওম্’— দেব বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা অন্ন আহরণ করুণ। হে অন্নপতি সূর্য, এই স্থানে অন্ন আহরণ কর, অন্ন আহরণ কর—’ওম্’।
ত্রয়োদশ খণ্ড
1.13.1 এই পৃথিবীতে ‘হাউ’কার, বায়ু ‘হাই’কার, চন্দ্রমা ‘অথ’কার, আত্মা ‘ইহ’কার এবং অগ্নি ‘ঈ’কার।
1.13.2 আদিত্যই ‘উ’কার নিহব (আহ্বান) ‘এ’কার বিশ্বদেবই ‘ঔহোয়ি’কার, প্রজাপতিই হিংকার, প্রাণই স্বর, অন্নই ‘যা’ অক্ষর এবং বাক্ই বিরাট্।
1.13.3 (পূর্বে ‘হাউ’কার, ‘হাই’কার, ‘অথ’কার, ‘ইহ’কার, ‘ঈ’কার, ‘উ’কার, ‘এ’কার, ‘ওঁহোই’কার, হিংকার, স্বর, যা ও বাক্—এই বারটি স্তোভের কথা বলা হইয়াছে)। হুংকার ত্রয়োদশ স্তোভ; ইহা অনির্বচনীয় এবং সর্বত্র গতিশীল বলিয়া দুর্বোধ্য
1.13.4 বাক্যের যে দুগ্ধ, সেই দুগ্ধ বাক্ স্বয়ং উপাসকের জন্য দোহন করেন। [কিংবা যে সাধক বাক্যকে দোহন করিতে পারেন, বাক্য স্বয়ং সেই সাধকের জন্য নিজের দুগ্ধ দোহন করেন]। যিনি স্তোভ অক্ষরসমূহের এই উপনিষদ্ (গুহ্য অর্থ জানেন, তিনি অন্নবান ও অনুভোক্তা হন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – ‘সাম’ শব্দের অর্থ
2.1.1 সমস্ত সামের (অর্থাৎ সর্বাবয়ববিশিষ্ট সামের) উপাসনাই সাধু। যাহা সাধু, তাহাকেই ‘সাম’ বলা হয়, আর যাহা অসাধু তাহাকেই ‘অসাম’ বলা হয়।
2.1.2 এই জন্যই বলা হয়—’সামভাবে তাহার নিকটে গিয়াছে’ যাহার অর্থ ‘সাধুভাবে তাহার নিকটে গিয়াছে’। আবার ইহাও বলা হয় ‘অসামভাবে তাহার নিকটে গিয়াছে’ অর্থাৎ ‘অসাধুভাবে তাহার নিকটে গিয়াছে”।
2.1.3 যখন কোন সাধু (মঙ্গলময়) ঘটনা ঘটে, তখন বলা হয় যে, ‘ইহা আমাদের পক্ষে সাম’ অর্থাৎ ‘ইহা আমাদের পক্ষে সাধু’। আবার যখন অসাধু (অমঙ্গলকর) ঘটনা ঘটে, তখন বলা হয় ‘ইহা আমাদের পক্ষে অসাম’ অথবা ‘ইহা আমাদের পক্ষে অসাধু’।
2.1.4 যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া ‘সামই সাধু’ এইভাবে উপাসনা করিবেন বিবিধ সদ্গুণ শীঘ্রই তাঁহার অনুবর্তী হইয়া ভোগ্য হইবে।
দ্বিতীয় খণ্ড – পৃথিব্যাদি পঞ্চলোকের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.2.1 (পৃথিব্যাদি) লোকদৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করিবে—পৃথিবীই হিঙ্কার, অগ্নিই প্রস্তাব, অন্তরিক্ষই উদ্গীথ, আদিত্যই প্রতিহার, দ্যুলোকই নিধন। ইহাই (পৃথিবী হইতে আরম্ভ করিয়া) ঊর্ধ্বদৃষ্টিতে (সামোপাসনা)।
2.2.2 তাহার পর ঊর্ধ্বলোক হইতে আরম্ভ করিয়া নিম্নদৃষ্টিতে (সামোপাসনা)— দ্যুলোকই হিঙ্কার; আদিত্যই প্রস্তাব, অন্তরিক্ষই উদ্গীথ, অগ্নিই প্রতিহার এবং পৃথিবীই নিধন।
2.2.3 যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া লোকদৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন, ঊর্ধ্ব হইতে আরম্ভ করিয়া নিম্ন পর্যন্ত এবং নিম্ন হইতে আরম্ভ করিয়া ঊর্ধ্ব পর্যন্ত সমুদয় লোক তাঁহার ভোগ্যরূপে উপস্থিত হয়।
তৃতীয় খণ্ড – বৃষ্টি প্রভৃতি পঞ্চভৌতিক ক্রিয়ার সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.3.1 বৃষ্টিবিষয়ে চিন্তা করিয়া পাঁচ প্রকার সামের উপাসনা করিবে—বৃষ্টির পূর্বে যে বাতাস প্রবাহিত হয় তাহা হিঙ্কার, যে মেঘ জন্মায় তাহা প্রস্তাব, যে বৃষ্টি পড়ে তাহা উদ্গীথ, যে বিদ্যুৎ প্রকাশ পায় ও মেঘ গর্জন করে তাহাই প্রতিহার।
2.3.2 বৃষ্টিপাতের সমাপ্তিই নিধন। যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া বৃষ্টি- দৃষ্টিতে পাঁচ প্রকার সামের উপাসনা করেন, তাঁহার জন্য মেঘ বর্ষণ করে এবং তিনি (অপরের জন্যও) বর্ষণ করাইতে পারেন।
চতুর্থ খণ্ড – জলের পঞ্চবিধ আকারের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.4.1 সর্বপ্রকার জল বিষয়ে চিন্তা করিয়া পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করিবে— মেঘ যে ঘনীভূত (বা ইতস্তত বিস্তৃত) হয় তাহাই হিঙ্কার; যে বৃষ্টি বর্ষিত হয় তাহাই প্রস্তাব; পূর্বপ্রবাহিনী নদীসমূহই উদ্গীথ; পশ্চিমে প্রবাহিত নদীসমূহ প্রতিহার; সমুদ্রই নিধন।
2.4.2 যিনি ইহাকে এই প্রকার জানিয়া জলদৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন, তিনি জলমগ্ন হইয়া মরেন না এবং তিনি জলসম্পদশালী হন।
পঞ্চম খণ্ড – পঞ্চ ঋতুর সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.5.1 ঋতুসমূহ চিন্তা করিয়া এইরূপে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করিবে—বসন্ত হিঙ্কার, গ্রীষ্মই প্রস্তাব, বর্ষাই উদ্গীথ, শরৎই প্রতিহার এবং হেমন্তই নিধন।
2.5.2 যিনি এই প্রকার জানিয়া ঋতুসমূহে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন, ঋতুসমূহ তাঁহার ভোগ্যরূপে উপস্থিত হয় এবং তিনি ঋতু অনুযায়ী ভোগ্য পাইয়া থাকেন।
ষষ্ঠ খণ্ড – পঞ্চবিধ পশুর সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.6.1 পশুসমূহে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করিবে—ছাগই হিঙ্কার, মেষই প্রস্তাব, গোসমূহ উদ্গীথ, অশ্ব প্রতিহার এবং পুরুষই নিধন।
2.6.2 যিনি এই প্রকার জানিয়া পশুসমূহে পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন, পশুসমূহ তাঁহার ভোগ্যবস্তু হয় এবং তিনি বহু পশুর অধিকারী হন।
সপ্তম খণ্ড – প্রাণাদি পঞ্চেন্দ্রিয়ের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.7.1 প্রাণসমূহে পরোবরীয় (শ্রেষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠ) সামের উপাসনা করিবে— প্রাণই হিঙ্কার, বাক্ প্রস্তাব, চক্ষু উদ্গীথ, শ্রোত্র প্রতিহার এবং মনই নিধন। এই সবই পরোবরীয়।
2.7.2 যিনি ইহাকে এইরকম জানিয়া প্রাণসমূহে পরোবরীয় পঞ্চবিধ সামের উপাসনা করেন, উৎকৃষ্ট হইতে উৎকৃষ্টতর বস্তু তাঁহার ভোগ্য হয় এবং তিনি উত্তরোত্তর শ্রেষ্ঠ লোকসমূহ জয় করেন। পঞ্চবিধ সাম উপাসনা-প্রসঙ্গের এইখানেই ইতি।
অষ্টম খণ্ড – বাক্যের সপ্তবিভাগের সহিত সপ্তবিধ সামের একতা কল্পনা
2.8.1 এখন সপ্তবিধ সামের উপাসনার বিষয় বলা হইতেছে। বাক্যে সাত প্রকার সামের উপাসনা করিবে—বাক্যের যেখানে ‘হুম্’ এই অক্ষর, তাহা হিঙ্কার, যাহা ‘প্র’ তাহা প্রস্তাব, যাহা ‘আ’ তাহাই আদি।
2.8.2 যাহা ‘উৎ’ তাহা উদ্গীথ, যাহা ‘প্রতি’ তাহা প্রতিহার, যাহা ‘উপ’ তাহাই উপদ্রব এবং যাহা ‘নি’ তাহাই নিধন।
2.8.3 যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া বাক্যে সপ্তবিধ সামের উপাসনা করেন, তিনি অন্নবান ও অন্নভোজী হন। বাক্যের যাহা দুগ্ধ, বাক্ স্বয়ং তাহা তাঁহার জন্য দোহন করেন।
নবম খণ্ড – আদিত্যের সপ্ত রূপের সহিত সপ্তবিধ সামের একতা কল্পনা
2.9.1 ইহার পর ঐ আদিত্যকে সপ্তবিধ সামরূপে উপাসনা করিবে। সর্বদাই ‘সমান’, এইজন্য আদিত; সাম। (সকলেই মনে করে, আদিত্য) ‘আমার অভিমুখে’, এইজন্য আদিত্য সকলের পক্ষে সমান; সেইহেতু আদিত্য সাম।
2.9.2 এই চরাচর সর্বভূত সেই আদিত্যের অনুগত এইরূপ জানিবে। উদয়ের পূর্বে ইহার যে রূপ তাহাই হিঙ্কার। সকল পশু সেই রূপের অনুগত। সেই জন্য তাহারা ‘হিং’ এই শব্দ করিয়া থাকে। এই সামের যে ‘হিঙ্কার’ নামক অংশ, তাহারা সেই অংশের ভাগী।
2.9.3 সূর্য প্রথম উদিত হইলে ইহার যে রূপ, সেই রূপই ‘প্রস্তাব’। মানুষ সেই রূপের অনুগত; এইজন্য তাহার স্তুতি ও প্রশংসা কামনা করিয়া থাকে। এই সামের যে ‘প্রস্তাব’ নামক অংশ তাহারা সেই অংশের ভাগী।
2.9.4 ‘সঙ্গব’-বেলায় আদিত্যের যে রূপ তাহাই ‘আদি’; পক্ষিগণ ইহারই অনুগত। এইজন্য তাহারা আকাশে নিজেদের দেহ লইয়া নিরালম্বভাবে উড্ডীয়মান হয়। এই সামের যে ‘আদি’ অংশ, তাহারা সেই অংশের ভাগী।
2.9.5 তাহার পর ঠিক মধ্যাহ্নসময়ের যে সূর্য তাহাই ‘উদ্গীথ’। দেবগণ আদিত্যের এই অংশের অনুগত। এইজন্য প্রজাপতির সন্তানদিগের মধ্যে ইঁহারাই সর্বশ্রেষ্ঠ। ইঁহারা সামের ‘উদ্গীথ’ অংশের অধিকারী।
2.9.6 মধ্যাহ্নের পরে ও অপরাহ্নের পূর্বে আদিত্যের যে রূপ, তাহাই ‘প্রতিহার’। গর্ভস্থ ভ্রূণ আদিত্যের এই রূপের অনুগত। এই জন্যই ইহারা জরায়ুতে ধৃত থাকে এবং পড়িয়া যায় না। ইহারা সামের ‘প্রতিহার’ অংশের অধিকারী।
2.9.7 তারপর অপরাহ্নের পরে, কিন্তু অস্ত যাওয়ার পূর্বে, আদিত্যের যে রূপ তাহাই ‘উপদ্রব’। অরণ্যবাসী পশুগণ আদিত্যের এই রূপের অনুগত। এই জন্য তাহারা মানুষ দেখিলে দ্রুতবেগে জঙ্গলে কিংবা গর্তে প্রবেশ করে। ইহারা সামের ‘উপদ্রব’ অংশের অধিকারী।
2.9.8 আর ঠিক অস্তগমনের সময় আদিত্যের যে রূপ, তাহাই নিধন। পিতৃপুরুষগণ আদিত্যের এই রূপের অনুগত। এই জন্য এই সময়ে তাঁহাদিগকে (কিংবা তাঁহাদের জন্য পিণ্ডসমূহকে) কুশের উপর রাখা হয়। এইরূপে আদিত্যকে সপ্তবিধ সামরূপে উপাসনা করা হয়।
দশম খণ্ড – সপ্তবিধ সামের অক্ষরসংখ্যা চিন্তনদ্বারা আদিত্যজয়
2.10.1 ইহার পর ‘আত্মসম্মিত’ এবং মৃত্যুঞ্জয়ী সাতরকম সামের উপাসনা করিবে। ‘হিঙ্কার’ শব্দটিতে তিনটি অক্ষর এবং ‘প্রস্তাব’ শব্দটিও তিন অক্ষরের; সুতরাং ইহারা সমান।
2.10.2 ‘আদি’ শব্দের দুইটি অক্ষর, ‘প্রতিহার’ শব্দের চারিটি অক্ষর। ‘প্রতিহার’ শব্দ হইতে একটি অক্ষর লইয়া ‘আদি’ শব্দে যোগ করিলে উভয়ে সমান হয়।
2.10.3 ‘উদ্গীথ’ এই শব্দটির তিন অক্ষর; ‘উপদ্রব’ এই শব্দটির চারি অক্ষর। তিন অক্ষরে তিন অক্ষরে ইহারা সমান। (এখন) একটি অক্ষর (অর্থাৎ ‘উপদ্রব’ শব্দের ‘ব’ অক্ষর) থাকে। অপর তিনটি অক্ষর লইলে ইহারা সমান।
2.10.4 ‘নিধন’ পদেও তিন অক্ষর, সুতরাং ইহাও (অন্য পদসমূহের) সমান। এই সমুদয় সামে বাইশটি অক্ষর।
2.10.5 এই পৃথিবী লোক হইতে আরম্ভ করিয়া (লোকসমূহের সংখ্যা গণনা করিলে) আদিত্য একবিংশতি সংখ্যক হয়। দ্বাবিংশ অক্ষরের জ্ঞান দ্বারা আদিত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ লোক জয় করা যায়। সেই লোকই সুখময় এবং শোকরহিত।
2.10.6 যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া ‘আত্মসম্মিত’ এবং মৃত্যু-অতিক্রমকারী সপ্তবিধ সামের উপাসনা করেন, তিনি আদিত্যকে জয় করেন এবং আদিত্য অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ লোককে জয় করিয়া থাকেন।
একাদশ খণ্ড – মন আদি পঞ্চেন্দ্রিয়ের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.11.1 মনই হিংকার, বাক্ই প্রস্তাব, চক্ষুই উদ্গীথ, শ্রোত্রই প্রতিহার, প্রাণই নিধন। এই ‘গায়ত্র’ নামক সাম প্রাণে প্রতিষ্ঠিত।
2.11.2 ‘এই গায়ত্র সাম প্রাণে প্রতিষ্ঠিত’—যিনি এইরূপ জানেন তিনি প্রাণযুক্ত ও পূর্ণায়ু হন এবং উজ্জ্বল জীবন তিনি লাভ করেন। সন্তান ও পশু লাভ করিয়া মহান হন; কীর্তিতেও তিনি হন শ্রেষ্ঠ। মহামনা হইবেন ইহাই তাঁহার ব্রত।
দ্বাদশ খণ্ড – যজ্ঞাঙ্গের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা
2.12.1 (আগুন জ্বালিবার জন্য) কাষ্ঠে কাষ্ঠে যে ঘর্ষণ করা হয়, তাহাই হিঙ্কার; যে ধূম জন্মায় তাহাই প্রস্তাব; অগ্নি যে জ্বলে তাহাই উদ্গীথ; অঙ্গার উৎপন্ন হয় তাহাই প্রতিহার; অগ্নি নিস্তেজ হইয়া থাকাই নিধন; অগ্নি যে নির্বাপিত হয় তাহাও নিধন। এই রথন্তর সাম অগ্নিতে প্রতিষ্ঠিত।
2.12.2 এই রথন্তর সাম অগ্নিতে প্রতিষ্ঠিত— যিনি এইরূপ জানেন, তিনি বেদ-জ্ঞান জনিত তেজ লাভ করেন; অন্নভোক্তা হন; তিনি পূর্ণায়ু হন এবং তাঁহার জীবন সমুজ্জ্বল হয়। সন্তান ও পশু লাভ করিয়া তিনি মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও মহান হন। অগ্নির দিকে মুখ করিয়া ভোজন করিবেন না এবং থুথু ফেলিবেন না— ইহাই তাঁহার ব্ৰত।
ত্রয়োদশ খণ্ড – মিথুনে বামদেবা সামোপাসনা
2.13.1 (পুরুষ) স্ত্রীকে যে আহ্বান করে তাহা হিংকার, (বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা) তাহাকে যে সন্তুষ্ট করে তাহা প্রস্তাব, স্ত্রীর সঙ্গে শয্যায় শয়ন করা উদ্গীথ, স্ত্রীর অভিমুখ হইয়া শয়ন করা প্রতিহার, মিথুনভাবে যে কালক্ষেপণ করে তাহা নিধন এবং তাহার সমাপ্তিও নিধন। এই বামদেব্য নামক সাম মিথুনে প্রতিষ্ঠিত।
2.13.2 বামদেব্য সামকে যে মিথুনে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া জানে সে মিথুনভাবেই থাকে অর্থাৎ কখনও বিরহ ভোগ করে না; প্রতিবার মিলনেই তাহার সন্তান জন্মে। সে পূর্ণায়ু হয়, তাহার জীবন সমুজ্জ্বল হয়। সন্তান ও পশু সম্পদে সে মহীয়ান হয়, কীর্তিতেও মহান হয়। কোন স্ত্রীকেই পরিত্যাগ করিবে না— ইহাই তাহার ব্রত।
চতুর্দশ খণ্ড – আদিত্যের পঞ্চবিধ অবস্থানের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা-কল্পনা
2.14.1 উদীয়মান সূর্য হিঙ্কার; উদিত সূর্য প্রস্তাব; মধ্যন্দিন (মধ্যাহ্নকালীন) সূর্য উদ্গীথ; অপরাহ্নকালীন সূর্য প্রতিহার, অস্তকালীন সূর্য নিধন। এই ‘বৃহৎ” নামক সাম আদিত্যে প্রতিষ্ঠিত।
2.14.2 ‘বৃহৎ’ নামক সাম আদিত্যে প্রতিষ্ঠিত— ইহা যিনি জানেন, তিনি তেজস্বী ও অনুভোক্তা হন, পূর্ণায়ু হন, দীর্ঘ (বা উজ্জ্বল) জীবন ধারণ করেন, প্রজা ও পশুলাভ করিয়া মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও মহান হন। তাপদাতা সূর্যের নিন্দা করিবেন না— ইহাই তাঁহার ব্রত।
পঞ্চদশ খণ্ড – মেঘোৎপত্তি প্রভৃতি পঞ্চ প্রাকৃতিক ক্রিয়ার সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা (বৈরূপ সাম)
2.15.1 লঘু মেঘ যে ঘনীভূত হয়, তাহাই হিংকার; জলবর্ষী মেঘ উৎপন্ন হয়, তাহাই প্রস্তাব; বৃষ্টি যে বর্ষিত হয়, তাহাই উদ্গীথ; বিদ্যুৎ প্রকাশিত হয় এবং মেঘ গর্জন করে তাহাই প্রতিহার; ইহার যে নিবৃত্তি তাহাই নিধন। ‘বৈরূপ’ নামক এই সাম মেঘে প্রতিষ্ঠিত।
2.15.2 ‘বৈরূপ’ নামক সাম মেঘে প্রতিষ্ঠিত— যিনি এইরূপ জানেন, তিনি নানা বিচিত্র এবং সুন্দর পশু লাভ করেন; পূর্ণায়ু ও উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবনেরও তিনি অধিকারী। প্রজা ও পশুলাভ করিয়া তিনি মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও মহান হন। বর্ষণকারী মেঘকে কখনও নিন্দা করিবেন না— ইহাই তাঁহার ব্রত।
ষোড়শ খণ্ড – পঞ্চ ঋতুর সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা (বৈরাজ সাম)
2.16.1 বসন্তই হিঙ্কার, গ্রীষ্মই প্রস্তাব, বর্ষাই উদ্গীথ, শরৎই প্রতিহার, হেমন্তই নিধন। ‘বৈরাজ’ নামক এই সাম ঋতুসমূহে প্রতিষ্ঠিত।
2.16.2 ‘বৈরাজ’ নামক সাম ঋতুসমূহে প্রতিষ্ঠিত যিনি এইরূপ জানেন, তিনি প্রজা, পশু ও বেদজ্ঞানজনিত তেজ লাভ করেন এবং পূর্ণায়ু এবং উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবন পান। তিনি প্রজা ও পশুলাভ করিয়া মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও মহান হন। ঋতুসমূহকে নিন্দা করিবেন না— ইহাই তাঁহার ব্রত।
সপ্তদশ খণ্ড – পৃথিব্যাদি লোকের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা (শশ্বরী সাম)
2.17.1 পৃথিবীই হিংকার, অন্তরিক্ষই প্রস্তাব, দ্যুলোকই উদ্গীথ, দিকসমূহই প্রতিহার এবং সমুদ্রই নিধন। ‘শক্বরী’ নামক সামসমূহ পৃথিব্যাদি বিভিন্ন লোকে প্রতিষ্ঠিত।
2.17.2 ‘শক্করী’ নামক এই সব সাম লোকসমূহে প্রতিষ্ঠিত— যিনি ইহা জানেন তিনি শ্রেষ্ঠ লোকে গমন করেন, পূর্ণায়ু পান। উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবন লাভ করেন, প্রজা ও পশুসমূহ লাভ করিয়া মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও হন মহান। লোকসমূহকে নিন্দা করিবেন না— ইহাই তাঁহার ব্রত।
অষ্টাদশ খণ্ড – অজাদি পশুর সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা-কল্পনা (রেবতী সাম)
2.18.1 ছাগসমূহ হিঙ্কার, মেষসমূহ প্রস্তাব, গোসমূহ উদ্গীথ, অশ্বগণ প্রতিহার, মানুষই নিধন। রেবতী নামক এই সকল সাম পশুতে প্রতিষ্ঠিত।
2.18.2 ‘রেবতী’ নামে সাম যে পশুসমূহে প্রতিষ্ঠিত যিনি তাহা জানেন, তিনি পশুধন, পূর্ণায়ু এবং উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবন লাভ করেন। প্রজা ও পশু লাভ করিয়া তিনি কীর্তিতেও মহান হন। তাঁহার ব্রত এই যে পশুসমূহকে নিন্দা করিবেন না।
ঊনবিংশ খণ্ড – লোমাদি দেহাঙ্গের সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা (যজ্ঞাযজ্ঞীয় সাম)
2.19.1 লোমই হিঙ্কার, ত্বকই প্রস্তাব, মাংসই উদ্গীথ, অস্থিই প্রতিহার, মজ্জাই নিধন। ‘যজ্ঞাযজ্ঞীয়’ নামক এই সাম দেহের অঙ্গসমূহে প্রতিষ্ঠিত।
2.19.2 যিনি জানেন যে, যজ্ঞাযজ্ঞীয় নামক সাম দেহের অঙ্গসমূহে প্রতিষ্ঠিত তিনি দৃঢ়াঙ্গ হন, তাঁহার অঙ্গ বিকল হয় না, তিনি পূর্ণায়ু হন, উজ্জ্বল জীবন লাভ করেন, প্রজা ও পশু লাভ করিয়া কীর্তিতেও মহান হন। তাঁহার ব্রত হইল যে, তিনি এক বৎসর কাল মাংসাদি খাইবেন না বা একেবারেই মাংস আহার করিবেন না।
বিংশ খণ্ড – অগ্ন্যাদি দেবতার সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা (রাজন্ সাম)
2.20.1 অগ্নিই হিঙ্কার, বায়ু প্রস্তাব, আদিত্য উদ্গীথ, নক্ষত্রসমূহ প্রতিহার, চন্দ্রমা নিধন। ‘রাজন্’ নামে এই সাম দেবতাসমূহে প্রতিষ্ঠিত।
2.20.2 ‘রাজন’ নামে সাম দেবতাসমূহে প্রতিষ্ঠিত যিনি তাহা জানেন তিনি এই সব দেবতার সহিত সালোক্য, সার্ফিতা (সমান অধিকার) বা সাযুজ্য লাভ করেন। তিনি পূর্ণায়ু ও উজ্জ্বল জীবনের অধিকারী হন, প্রজা ও পশু লাভ করিয়া মহীয়ান হন এবং কীর্তিতেও হন মহান। ব্রাহ্মণগণকে নিন্দা করিবেন না, তাঁহার ইহাই ব্রত।
একবিংশ খণ্ড – পঞ্চবিধ বস্তুর সহিত পঞ্চবিধ সামের একতা কল্পনা এবং সমস্ত বস্তুর সহিত আত্মার ঐক্যধ্যান
2.21.1 ত্রয়ী বিদ্যাই হিংকার; এই তিন লোকই (পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও দ্যৌ) প্রস্তাব; অগ্নি, বায়ু ও আদিত্য উদ্গীথ; নক্ষত্রসমূহ, পক্ষিগণ ও কিরণসমূহ প্রতিহার, সর্প, গন্ধর্ব ও পিতৃগণ—নিধন। এই সাম সর্ববস্তুতে প্রতিষ্ঠিত ।
2.21.2 এই সাম সর্ববস্তুতে প্রতিষ্ঠিত, যিনি ইহা জানেন তিনি সর্বেশ্বর হন।
2.21.3 এই বিষয়ে শ্লোক আছে— এই যে পাঁচ প্রকার (সাম) যাহাদের প্রত্যেকের আবার তিনটি তিনটি করিয়া বিভাগ (সর্বসাকুল্যে পনেরটি), ইহাদের অপেক্ষা মহৎ বা ইহাদের অতিরিক্ত আর কিছুই নাই।
2.21.4 যিনি এই সর্বাত্মক সামকে জানেন তিনি সর্বজ্ঞ হন; সকল দিক হইতে তাঁহার জন্য উপহার আসে। তাঁহার ব্রত হইল—’আমিই সর্বাত্মক’ এইভাবে উপাসনা করিবেন।
দ্বাবিংশ খণ্ড – সামের বিবিধ স্বরের ধ্যান ও সাধনা
2.22.1 সামের ‘বিনর্দি’ স্বর পশুগণের পক্ষে হিতকর এবং এই স্বর অগ্নিদেবতার, আমি এই স্বর প্রার্থনা করি। অনিরুক্ত-স্বর-যুক্ত উদ্গীথ প্রজাপতি দেবতার, নিরুক্ত স্বর সোমদেবতার, মৃদু শ্লক্ষ স্বর বায়ুদেবতার, প্রবল শুক্ষ স্বর ইন্দ্রদেবতার, ক্রৌঞ্চ স্বর বৃহস্পতির আর অপধ্বান্ত স্বর বরুণদেবতার। এই সমুদয় স্বরের সেবা করিবে, কেবল ‘বারুণ’ অর্থাৎ অপধ্বান্ত স্বর বর্জন করিবে।
2.22.2 ‘দেবগণের জন্য অমৃতত্ব লাভ করিব’, এই ভাবে গান করিবে। ‘পিতৃপুরুষগণের জন্য স্বধা (পিণ্ডাদি), মনুষ্যগণের জন্য আশা, পশুগণের জন্য তৃণ জল, যজমানের জন্য স্বর্গলোক, নিজের জন্য অন্ন― (এই সমুদয়) গান করিয়া লাভ করি এই রকম মনে মনে চিন্তা করিয়া অপ্রমত্তভাবে স্তব করিবে।
2.22.3 সকল স্বরবর্ণ ইন্দ্রের দেহাবয়বস্বরূপ; উষ্মবর্ণগুলি প্রজাপতির দেহাবয়বস্বরূপ; সমস্ত স্পর্শবর্ণ মৃত্যুর দেহাবয়বস্বরূপ। যদি কেহ উদ্গাতাকে স্বরের উচ্চারণ বিষয়ে নিন্দা করে, তবে উদ্গাতা তাহাকে বলিবেন— আমি (স্বরবর্ণ উচ্চারণ করিয়া গান করিবার সময়) ইন্দ্রের শরণাপন্ন হইয়াছিলাম। তিনি তোমাকে এ বিষয়ে উত্তর দিবেন।
2.22.4 যদি উষ্মবর্ণের উচ্চারণ বিষয়ে কেহ নিন্দা করে, তিনি তাহাকে বলিবেন (উষ্মবর্ণ উচ্চারণ করিয়া গান করিবার সময়ে)—’আমি প্রজাপতির শরণ লইয়াছি, তিনি তোমাকে চূর্ণ করিবেন।’ যদি স্পর্শবর্ণ উচ্চারণ বিষয়ে কেহ নিন্দা করে, তিনি বলিবেন— (স্পর্শবর্ণ উচ্চারণ করিয়া গান করিবার সময়) ‘আমি মৃত্যুর শরণ লইয়াছি, তিনি তোমাকে ভস্ম করিবেন।’
2.22.5 সমুদয় স্বরকে ‘ঘোষ’ নামক স্বরের ন্যায় সবলে উচ্চারণ করিবে। (আর এই সময়ে চিন্তা করিবে) ‘আমি ইন্দ্রে বল বিধান করি।’ সমুদয় উষ্মবর্ণকে অগ্রস্ত, অনিরস্ত ও বিবৃত করিয়া উচ্চারণ করিবে। (আর এই সময়ে চিন্তা করিবে) ‘আমি প্রজাপতির নিকট আত্মসমর্পণ করি।’ সমুদয় স্পর্ণবর্ণকে ধীরে ধীরে এবং অন্য বর্ণ হইতে পৃথক করিয়া উচ্চারণ করিবে। (আর এই সময়ে চিন্তা করিবে) ‘আমি মৃত্যু হইতে নিজেকে রক্ষা করি।’
ত্রয়োবিংশ খণ্ড – ধর্মস্কন্ধ ও প্রজাপতির তপস্যা
2.23.1 ধর্মের স্কন্ধ (বিভাগ) তিনটি : প্রথম—যজ্ঞ, অধ্যয়ন ও দান; দ্বিতীয় তপস্যা; তৃতীয়—যাবজ্জীবন গুরুগৃহে দেহক্ষয়পূর্বক, গুরুকুলবাসী হইয়া ব্রহ্মচর্য পালন। ইহারা সকলেই পুণ্যলোক পান; কিন্তু ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তি অমৃতত্ব লাভ করেন।
2.23.2 প্রজাপতি লোকসমূহের ধ্যান করিলেন। ধ্যানের ফলে জগৎসমূহ হইতে বেদবিদ্যা নিঃসৃত হইল। তিনি বেদবিদ্যার ধ্যান করিলেন। ধ্যানের ফলে সেই বেদবিদ্যা হইতে ভূঃ, ভুবঃ ও স্বঃ— এই তিনটি অক্ষর নিঃসৃত হইল।
2.23.3 প্রজাপতি এই অক্ষরসমূহের ধ্যান করিলেন। ধ্যান করায় অক্ষরসমূহ হইতে ওঙ্কার নিঃসৃত হইল। যেমন পর্ণনাল (পাতার শিরা) দ্বারা পাতা ব্যাপ্ত (পাতার অংশগুলি গ্রথিত বা যুক্ত) থাকে, তেমনি ওঙ্কার দ্বারা সমস্ত কিছু ব্যাপ্ত রহিয়াছে। ওঙ্কারই এই সব, ওঙ্কারই এই সব।
চতুৰ্বিংশ খণ্ড – প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সায়ংকালীন সবনত্রয়
2.24.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—ব্রহ্মবাদিগণ বলেন, ‘প্রাতঃসবন বসুগণের; মধ্যাহ্নকালীন সবন রুদ্রগণের; তৃতীয় (সায়ংকালীন) সবন আদিত্যগণ ও বিশ্বদেবগণের’। তবে যজমানের লোক কোথায়? যিনি ইহা জানেন না, তিনি কি প্রকারে যজ্ঞ করিবেন? যিনি জানেন, তিনিই পারেন।
2.24.3-4 (৩য় ও ৪র্থ মন্ত্র)— প্রাতঃকালের মন্ত্রপাঠ করিবার পূর্বে গার্হপত্য নামে অগ্নির পিছনে উত্তরমুখ হইয়া বসিয়া বসুগণের বিষয়ে সামগান করিবে। হে অগ্নি, পৃথিবীলোক লাভ করিবার দ্বার খোল; আমরা রাজ্যলাভ করিবার জন্য তোমাকে দেখি।
2.24.5-6 (৫ম ও ৬ষ্ঠ মন্ত্র)— অনন্তর (এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া) আহুতি প্রদান করিবে—’পৃথিবী ও অন্যান্য লোক-নিবাসী অগ্নিকে নমস্কার; যজমান আমাকে (শ্রেষ্ঠ) লোক লাভ করাও। আমি যজমানের লভ্য লোকে যাইব। আমি (যজমান) আয়ুক্ষয় হইলে এইখানে বাস করিব।’ (ইহার পর) ‘স্বাহা” (উচ্চারণ করিয়া হোম করিবে)। তারপর ‘অর্গল দূর কর’—এই বলিয়া যজমান উত্থান করেন। বসুগণ তাঁহাকে প্রাতঃসবনের ফল দান করেন।
2.24.7-8 মধ্যাহ্ন সবন আরম্ভ করিবার পূর্বে যজমান দক্ষিণাগ্নির পিছনে উত্তরমুখী হইয়া বসিয়া অগ্নিদেবকে সম্বোধন করিয়া বলিবেন—’স্বর্গলোকের দ্বার খোল; আমরা সাম্রাজ্য লাভ করিবার জন্য তোমাকে দেখি। হে অগ্নি, পৃথিবীলোকের দ্বার খুলিয়া দাও। আমরা রাজ্য লাভ করিবার জন্য তোমাকে দেখি।’
2.24.9-10 (৯ম ও ১০ম মন্ত্র)— তারপর যজমান এই বলিয়া আহুতি দেয়— ‘অন্তরিক্ষবাসী, লোকবাসী বায়ুকে নমস্কার; আমাকে (যজমানকে) লোক লাভ করাও। আমি যজমানের লভ্য লোকে যাই। (যজমান) আমি আয়ুক্ষয়ান্তে এইখানে বাস করিব।’ এই বলিয়া ‘স্বাহা” উচ্চারণ করিয়া হোম করিবে। অতঃপর ‘লোকদ্বারের অর্গল দূর কর’ এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া যজমান গাত্রোত্থান করেন। রুদ্রগণ সেই যজমানকে মাধ্যন্দিন সবনের ফল অন্তরিক্ষ-লোক দান করেন।
2.24.11-13 (১১-১৩ মন্ত্র) তৃতীয় সবন আরম্ভ করিবার পূর্বে যজমান আহবনীয় অগ্নির পিছনে উত্তরমুখ হইয়া বসিয়া আদিত্য ও বিশ্বেদেব সম্বন্ধে সামগান করেন। প্রথমে তিনি আদিত্যগণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হে অগ্নি, পৃথিবী-লোক লাভ করিবার দ্বার খোল। আমরা স্বারাজ্য লাভ করিবার জন্য তোমাকে দেখি।’ বিশ্বদেবকে সম্বোধন করিয়া বলা হয়, ‘স্বর্গলোক লাভ করিবার দ্বার খোল; আমরা সাম্রাজ্যলাভের জন্য তোমাকে দেখি।’
2.24.14-15 (১৪ ও ১৫ মন্ত্র)— ইহার পর এই বলিয়া হোম করা হয়—’দ্যুলোকবাসী ও লোকবাসী আদিত্যগণ ও বিশ্বদেবকে নমস্কার। আমার (যজমানের) এই লোক লাভ হউক। এই আমি যজমানের লোকে গমন করি। আয়ুক্ষয় হইবার পর আমি (যজমান) এই কালে বাস করিব।’ তাহার পর ‘স্বাহা” উচ্চারণপূর্বক হোম করিয়া ‘অর্গল দূর কর’—এই বলিয়া যজমান গাত্রোত্থান করেন।
2.24.16 আদিত্য ও বিশ্বেদেবগণ তাঁহাকে তৃতীয় সবনের ফল দান করেন। যিনি ইহা জানেন তিনি যজ্ঞের প্রকৃত তত্ত্ব জানেন।
তৃতীয় অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – মধুবিদ্যা—আদিত্যাদিতে মধ্বাদি কল্পনা (১)
3.1.1 ঐ আদিত্য দেবগণের মধু; দ্যুলোক তাহার অবলম্বন বক্রাকার বংশ-খণ্ড; অন্তরিক্ষই মধুচক্র; কিরণসমূহই (মৌমাছির) শাবক।
3.1.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—তাহার পূর্বদিকের কিরণসমূহই পূর্বদিকের মধুনাড়ী, ঋমন্ত্রই মধুকর; ঋগ্বেদই পুষ্প; যজ্ঞগ্নিতে নিক্ষিপ্ত জলীয় পদার্থই অমৃত (পুষ্পের মধু); ঋমন্ত্রসমূহ ঋগ্বেদকে উত্তপ্ত করিয়াছিল। সেই উত্তপ্ত ঋগ্বেদ হইতে যশ, তেজ, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য, বীর্য এবং অনুরূপ রস উৎপন্ন হইয়াছিল।
3.1.4 ঐসব রস ক্ষরিত হইয়া আদিত্যের দিকে গিয়া আশ্রয় নিল। এইজন্যই আদিত্যের বর্ণ লোহিত।
দ্বিতীয় খণ্ড – মধুবিদ্যা—আদিত্যাদিতে মধ্বাদি কল্পনা (২)
3.2.1 আর সূর্যের দক্ষিণ দিকের রশ্মিসমূহ ইহার দক্ষিণ মধুনাড়ী; যজুর্মন্ত্র- গুলি ইহার মধুকর; যজুর্বেদই ইহার পুষ্প; সেইসব (যজ্ঞীয়) জলই (পুষ্পের) অমৃত।
3.2.2 সেই যজুর্মন্ত্রগুলি যজুর্বেদকে উত্তপ্ত করিয়াছিল। উত্তপ্ত যজুর্বেদ হইতে যশ, তেজ, ইন্দ্ৰিয়—সামর্থ্য, বীর্য ও অনুরূপ রস উৎপন্ন হইয়াছিল।
3.2.3 সেই সব (যশ আদি) রস ক্ষরিত হইল। তাহা আদিত্যের অভিমুখে গিয়া আশ্রয় নিল। ইহাতেই আদিত্যের এই শুক্ল রূপ
তৃতীয় খণ্ড – মধুবিদ্যা—আদিত্যাদিতে মধ্বাদি কল্পনা (৩)
3.3.1 আর এই আদিত্যের পশ্চিমদিকের রশ্মিসমূহই ইহার পশ্চিম মধুনাড়ী, সাম মন্ত্রসমূহই মধুকর; সামবেদই পুষ্প; সেই সব যজ্ঞীয় জল পুষ্পের মধু ।
3.3.2 সেই সামমন্ত্রগুলি সামবেদকে উত্তপ্ত করিয়াছিল; উত্তপ্ত সামবেদ হইতে যশ, তেজ, ইন্দ্ৰিয়-সামর্থ্য, বীর্য ও অনুরূপ রস উৎপন্ন হইয়াছিল।
3.3.3 সেই সমস্ত (যশ আদি) রস ক্ষরিত হইল; তাহার পর তাহা আদিত্যের অভিমুখে গিয়ে আশ্রয় নিল। ইহাতেই আদিত্যের কৃষ্ণবর্ণ রূপ।
চতুর্থ খণ্ড – মধুবিদ্যা—আদিত্যাদিতে মধ্বাদি কল্পনা (৪)
3.4.1 তাহার পর আদিত্যের উত্তরদিকের যে রশ্মিসমূহ, তাহারাই ইহার উত্তর মধুনাড়ী; অথর্বাঙ্গিরস মন্ত্রসমূহই মধুকর; ইতিহাস ও পুরাণই পুষ্প; সেই যজ্ঞীয় জলই পুষ্পের অমৃত ।
3.4.2 সেই অথর্বাঙ্গিরস মন্ত্রসমূহ ইতিহাস-পুরাণকে উত্তপ্ত করিয়াছিল। অভিতপ্ত সেই ইতিহাস-পুরাণ হইতে যশ, তেজ, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য, বীর্য ও অনুরূপ রস উৎপন্ন হইয়াছিল।
3.4.3 যশ আদি রস ক্ষরিত হইল। তাহার পর তাহা আদিত্যের অভিমুখে গিয়া আশ্রয় নিল। আদিত্যের যে গভীর কৃষ্ণরূপ, তাহা ইহাই।
পঞ্চম খণ্ড – মধুবিদ্যা—আদিত্যাদিতে মধ্বাদি কল্পনা (৫)
3.5.1 তাহার পর আদিত্যের ঊর্ধ্বদিকের যে সকল রশ্মি, সেই সবই ইহার ঊর্ধ্ব মধুনাড়ী; গুহ্য উপদেশসমূহ মধুকর; ব্রহ্মই (অর্থাৎ প্রণবই) পুষ্প; সেই যজ্ঞীয় জলই (পুষ্পের) অমৃত ।
3.5.2 সেই গুহ্য উপদেশসমূহ এই প্রণবকে উত্তপ্ত করিয়াছিল। সেই উত্তপ্ত প্রণব হইতে যশ, তেজ, ইন্দ্রিয়-সামর্থ্য ও অনুরূপ রস উৎপন্ন হইল।
3.5.3 যশ আদি রস ক্ষরিত হইল এবং তাহা আদিত্যের অভিমুখে আশ্রয় নিল। আদিত্যের মধ্যে যাহা স্পন্দিত হইতেছে বলিয়া মনে হয়, তাহা ইহাই।
3.5.4 সূর্যের সেই লোহিতাদি রূপসমূহ রসেরও রস (অর্থাৎ সারবস্তুরও সার)। কারণ বেদসমুদয়ই রস (সারবস্তু) আর সেই সব রূপ তাহাদেরও রস। লোহিতাদি রূপ অমৃতেরও অমৃত, কারণ বেদসমূহই অমৃত, আর এইসব রূপ বেদসমূহেরও অমৃত।
ষষ্ঠ খণ্ড – মধুবিদ্যা—প্রথমামৃত বসুগণের ভোগ্য
3.6.1 সেই যে প্রথম অমৃত অর্থাৎ সূর্যের লোহিত রূপ বসুগণ অগ্নির মুখ দিয়া তাহা উপভোগ করেন। কিন্তু বস্তুত দেবগণ ভোজনও করেন না, পানও করেন না; এই অমৃত দেখিয়াই তাঁহারা তৃপ্ত হন।
3.6.2 সেই দেবগণ (সূর্যের) এই লোহিত রূপে প্রবেশ করেন এবং সেই রূপ হইতেই উত্থিত হন ।
3.6.3 যে ব্যক্তি এই অমৃতকে এইরূপ জানেন, তিনি বসুগণেরই একজন হন এবং অগ্নিপ্রমুখ হইয়া এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্তি লাভ করেন। তিনি এই রূপেই প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতেই উত্থিত হন।
3.6.4 যতকাল সূর্য পূর্বদিতে উদিত হইবে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যাইবে, ততকাল সেই ব্যক্তি বসুদিগের মত আধিপত্য ও স্বারাজ্য লাভ করিবেন।
সপ্তম খণ্ড – মধুবিদ্যা—দ্বিতীয়ামৃত রুদ্রদেবগণের ভোগ্য
3.7.1 আর আদিত্যের যে দ্বিতীয় অমৃত অর্থাৎ শুরুরূপ তাহা রুদ্রগণ ইন্দ্রের মুখ দিয়া উপভোগ করেন। কিন্তু বস্তুত দেবগণ আহারও করেন না, পানও করেন না; এই অমৃত দেখিয়াই তাঁহারা তৃপ্ত হন।
3.7.2 দেবগণ সূর্যের এই শুরুরূপে প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতে উত্থিত হন।
3.7.3 যিনি এই অমৃতকে এইরকম জানেন, তিনি রুদ্রগণের একজন হন এবং ইন্দ্ৰপ্ৰমুখ হইয়া এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন। তিনি এই রূপেই প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতে বাহির হন ।
3.7.4 যতকাল সূর্য পূর্বদিকে উদিত হইবেন এবং পশ্চিমদিকে অস্ত যাইবেন, তাহার দ্বিগুণ কাল দক্ষিণদিকে উদিত হইবেন ও উত্তরে অস্ত যাইবেন। সেই বিদ্বান ব্যক্তি ততদিন (অর্থাৎ সেই দ্বিগুণ পরিমিত কাল) রুদ্রগণের মত আধিপত্য এবং স্বারাজ্য লাভ করিবেন।
অষ্টম খণ্ড – মধুবিদ্যা—তৃতীয়ামৃত আদিত্য দেবগণের ভোগ্য
3.8.1 আর সূর্যের যে তৃতীয় অমৃত অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণরূপ, আদিত্যগণ বরুণপ্রমুখ হইয়া তাহা উপভোগ করেন; (কিন্তু বস্তুত) দেবতারা ভোজনও করেন না পানও করেন না, তাঁহারা এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন।
3.8.2 আদিত্যগণ এই রূপেই প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতেই বাহির হন। ২১৪. স য এতদেবমমৃতং বেদাদিত্যানামেবৈকো ভূত্বা বরুণেনৈব মুখেনৈত ।
3.8.3 যিনি এই অমৃতকে এই রকম জানেন, তিনি আদিত্যগণের একজন হন এবং বরুণপ্রমুখ হইয়া এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন। তিনি এই রূপে প্রবেশ করেন এবং এই রূপে হইতেই বাহির হন।
3.8.4 যতকাল আদিত্য দক্ষিণদিকে উদিত হইবেন এবং উত্তর দিকে অস্ত যাইবেন তাহার দ্বিগুণকাল পশ্চিমদিকে উদিত হইবেন ও পূর্বদিকে অস্ত যাইবেন। সেই বিদ্বান ব্যক্তি ততদিন (অর্থাৎ সেই দ্বিগুণ পরিমিতকাল) আদিত্যগণের মতই আধিপত্য ও স্বারাজ্য লাভ করিবেন।
নবম খণ্ড – মধুবিদ্যা—চতুর্থামৃত মরুৎদেবগণের ভোগ্য
3.9.1 আর সূর্যের যে চতুর্থ অমৃত (অর্থাৎ অতিকৃষ্ণ রূপ), তাহা মরুৎগণ সোমপ্রমুখ হইয়া উপভোগ করেন। (কিন্তু বস্তুত) দেবতারা ভোজনও করেন না, পানও করেন না; তাঁহারা ইহা দেখিয়াই তৃপ্ত হন।
3.9.2 মরুগণ এই চতুর্থ রূপে প্রবেশ করিয়া এই রূপ হইতেই বাহির হন।
3.9.3 যিনি এই রকম জানেন তিনি মরুৎগণের একজন হন এবং সোমপ্রমুখ হইয়া এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন। তিনি এই রূপের মধ্যে প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতে বাহির হন।
3.9.4 যে পরিমাণ কাল সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হইবেন ও পূর্বদিকে অস্ত যাইবেন, তাহার দ্বিগুণ কাল উত্তরদিকে উদিত হইবেন ও দক্ষিণদিকে অস্ত যাইবেন। ততকাল সেই বিদ্বান ব্যক্তি মরুৎগণের মত আধিপত্য ও স্বারাজ্য লাভ করিবেন।
দশম খণ্ড – মধুবিদ্যা—পঞ্চমামৃত সাধ্যদেবগণের ভোগ্য
3.10.1 আর সূর্যের যে পঞ্চম অমৃত (অর্থাৎ মধ্যবর্তী চঞ্চল রূপ), সাধ্যগণ ব্রহ্মের মুখ দিয়া তাহা উপভোগ করেন। তবে দেবতারা ভোজনও করেন না, পান করেন না। তাহারা এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন।
3.10.2 তাঁহারা (সাধ্যগণ) এই পঞ্চম রূপে প্রবেশ করেন এবং এই রূপে হইতে বাহির হন।
3.10.3 যিনি এই অমৃতকে এই রকম বলিয়া জানেন, তিনি সাধ্যগণের একজন হন এবং ব্রহ্মপ্রমুখ হইয়া এই অমৃত দেখিয়াই তৃপ্ত হন। তিনি এই রূপে প্রবেশ করেন এবং এই রূপ হইতে বাহির হন।
3.10.4 যতকাল সূর্য উত্তর দিকে উদিত হইবেন এবং দক্ষিণ দিকে অস্ত যাইবেন, তাহারা দ্বিগুণকাল ঊর্ধ্বদিকে উদিত হইবেন এবং অধোদিকে অস্ত যাইবেন। ততকাল অর্থাৎ এই দ্বিগুণ পরিমিতকাল সেই বিদ্বান ব্যক্তি সাধ্যগণের মতই আধিপত্য ও স্বারাজ্য পাইবেন।
একাদশ খণ্ড – মধুবিদ্যার উপসংহার
3.11.1 তাহারা পর যখন সূর্য ঊর্ধ্বদিকে উদিত হইবেন তখন আর উদিতও হইবেন না বা অস্তও যাইবেন না; একাকীই মধ্যস্থলে থাকিবেন। এবিষয়ে এই শ্লোক আছে—
3.11.2 সেই ব্রহ্মলোকে উদয়াস্ত নাই। সূর্য সেখানে অস্তও যান নাই, কখন উদিতও হন নাই। হে দেবগণ, এই সত্যের দ্বারা আমি যেন ব্রহ্মলাভে বঞ্চিত না হই অর্থাৎ এই সত্যের বলে আমি যেন ব্রহ্মলাভ করিতে পারি (কিংবা আমার কথা যদি সত্য না হয়, আমি যেন ব্রহ্মলাভে বঞ্চিত হই)।
3.11.3 যিনি এই ব্রহ্মোপনিষদকে এই রকম ভাবে জানেন, তাঁহার পক্ষে সূর্য উদতিও হন না, অস্তও যান না; তাঁহার কাছে সর্বদাই দিন।
3.11.4 সর্বপ্রথমে ব্রহ্মা প্রজাপতিকে এই মধুবিজ্ঞান বলিয়াছিলেন; তারপর প্রজাপতি মনুকে, মনু নিজের সন্তানদের এবং পিতা বরুণ জ্যেষ্ঠপুত্র উদ্দালক আরুণিকে এই ব্ৰহ্মবিদ্যা বলিয়াছিলেন।
3.11.5 এই ব্রহ্মবিদ্যা পিতা জ্যেষ্ঠপুত্রকে উপদেশ দিবেন অথবা গুরু প্রিয় শিষ্যকে বলিবেন।
3.11.6 অন্য কাহাকেও এই বিদ্যা বলিবে না; যদি ইঁহাকে (অর্থাৎ গুরুকে) কেহ সমুদ্রবেষ্টিত ধনপূর্ণ পৃথিবীও দান করে তাহা হইলেও নয়। কারণ এই বিদ্যা সমস্ত কিছু হইতেই শ্রেষ্ঠ।
দ্বাদশ খণ্ড – গায়ত্রী-অবলম্বনে ব্ৰহ্মচিন্তা
3.12.1 এই সকল বস্তু ও প্রাণী জগৎ যাহা কিছু আছে সেই সবই গায়ত্ৰী। বাক্যই গায়ত্রী; কারণ বাক্যই সকল বস্তু ও প্রাণীকে গান (অর্থাৎ বর্ণনা) করিয়া থাকে এবং ইহাদের ত্রাণ করে।
3.12.2 এই যে গায়ত্রী তাহাই এই পৃথিবী অর্থাৎ সেই গায়েত্রীই এই পৃথিবী। কারণ সর্বভূতই এই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত; কেহই ইহাকে অতিক্রম করিতে পারে না।
3.12.3 যাহা সেই পৃথিবী, পুরুষে তাহাই শরীর (অর্থাৎ পৃথিবীই এই পুরুষাশ্রিত শরীর); করণ এই শরীরে প্রাণসমূহ প্রতিষ্ঠিত এবং ইহারা কেহই শরীরকে অতিক্রম করিতে পারে না।
3.12.4 যাহা এই পুরুষাশ্রিত শরীর তাহাই পুরুষের অভ্যন্তরস্থ হৃদয়; কারণ প্রাণসমূহ এই শরীরে প্রতিষ্ঠিত; ইহারা কেহই এই হৃদয়কে অতিক্রম করে না।
3.12.5 এই গায়ত্রীর চারিটি চরণ এবং ইহা ছয় প্রকার; ঋমন্ত্রেও ইহা উক্ত হইয়াছে।
3.12.6 ইহার মহিমা এই প্রকার; পুরুষ ইহা অপেক্ষাও (অর্থাৎ এই মহিমা অপেক্ষাও) শ্রেষ্ঠ। সর্বভূত ইহার এক পাদ; অবশিষ্ট তিন পাদ স্বর্গে অমৃতরূপে প্রতিষ্ঠিত।
3.12.7 এই যে ব্রহ্ম, ইনিই পুরুষদেহের বাহিরের দিকে অবস্থিত আকাশ।
3.12.8 পুরুষের দেহের বাহিরে স্থিত আকাশও যাহা, দেহের অভ্যন্তরে স্থিত আকাশও তাহাই।
3.12.9 পুরুষের অভ্যন্তরে যে আকাশ, তহার হৃদয়েও সেই আকাশ। এই হৃদয়স্থ আকাশ পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয়। ইহা যিনি জানেন তিনি পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় সম্পদ লাভ করেন।
ত্রয়োদশ খণ্ড – পঞ্চপ্রাণ ও পঞ্চদ্বারপাল—অন্তর্জ্যোতি ও বহির্জোতির একতা
3.13.1 এই হৃদয়ে দেবতাদিগের (ইন্দ্রিয়গণের) পাঁচটি দ্বার আছে। হৃদয়ের যে পূর্বদ্বার, তাহাই প্রাণ, তাহাই চক্ষু, তাহাই আদিত্য। ইহাকে তেজ ও অন্নের আদিরূপে উপাসনা করিবে। যিনি ইহা জানেন, তিনি তেজস্বী ও অন্নভোক্তা হন।
3.13.2 আর হৃদয়ের যে দক্ষিণ দ্বার, তাহাই ব্যান, তাহাই কৰ্ণ, তাহাই চন্দ্ৰ। ইহাকে শ্রী ও যশরূপে উপাসনা করিবে। যিনি ইহা জানেন, তিনি শ্রীমান্ ও যশস্বী হন।
3.13.3 তাহার পর হৃদয়ের যে পশ্চিম দ্বার তাহাই অপান, তাহাই বাক্ এবং তাহাই অগ্নি। ইহাকে ব্রহ্মবর্চস এবং অনাদ্যরূপে উপাসনা করিবে। যিনি ইহা জানেন, তিনি ব্রহ্মতেজযুক্ত ও অন্নান্দ হন।
3.13.4 এই হৃদয়ের যে উত্তরদ্বার তাহা সমান নামক বায়ু, তাহা মন, তাহা পর্জন্য (বরুণদেব)। ইহাকে কীর্তি ও কান্তিরূপে উপাসনা করিবে। যিনি ইহা জানেন, তিনি কীর্তিমান ও কান্তিমান হন।
3.13.5 হৃদয়ের যে উর্ধ্বদিকের দ্বার তাহাই উদান, তাহাই বায়ু, তাহাই আকাশ। ইহাকে ওজ (বল) ও মহত্ত্বরূপে উপাসনা করিবে। যিনি এই প্রকার জানেন তিনি ওজস্বী ও মহত্ত্বযুক্ত হন।
3.13.6 এই পঞ্চ ব্রহ্মপুরুষ স্বর্গলোকের দ্বারপাল। যিনি স্বর্গলোকের দ্বারপাল রূপী এই পঞ্চ পুরুষকে জানেন তাঁহার কুলে বীর পুত্র জন্মলাভ করে। যিনি স্বর্গের দ্বারপাল পঞ্চ ব্রহ্মপুরুষকে এই ভাবে জানেন, তিনি স্বর্গলোক লাভ করেন।
3.13.7-8 তাহার পর, এই দ্যুলোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, বিশ্বের উপর, সমস্ত কিছুর উপর, সর্বোত্তম লোকে, উত্তমলোকে যে জ্যোতি দীপ্তি পাইতেছে— সেই জ্যোতি এবং এই পুরুষের অভ্যন্তরে যে জ্যোতি— এই উভয় জ্যোতি একই জ্যোতি। এ বিষয়ে চাক্ষুষ প্রমাণ এই — হস্ত দ্বারা শরীরকে স্পর্শ করিলে শরীরের উষ্ণতা জানা যায়। এ বিষয়ে শ্রুতিপ্রমাণ (অর্থাৎ শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রমাণ) এই—কান দুইটি ঢাকিয়া রাখিলে রথধ্বনির মত শব্দ, ঋষভধ্বনির মত ধ্বনি এবং জ্বলন্ত অগ্নির শব্দের মত শব্দ শোনা যায়। ইহাকে দৃষ্ট ও শ্রুতরূপে উপাসনা করিবে। যিনি এই প্রকার জানেন, তিনি দর্শনীয় এবং লোকপ্রসিদ্ধ হন।
চতুর্দশ খণ্ড – শাণ্ডিল্য-বিদ্যা
3.14.1 এই সবকিছুই ব্রহ্ম, কারণ সমস্ত কিছু তাঁহা হইতেই উৎপন্ন হয়, তাঁহাতেই লীন হয় এবং তাঁহাতেই জীবিত থাকে। এইভাবে শান্ত হইয়া উপাসনা করিবে। মানুষমাত্রেই সঙ্কল্পযুক্ত; এই পৃথিবীতে মানুষের যেমন সঙ্কল্প, অধ্যবসায় বা কর্ম হইবে, এই পৃথিবী বা দেহ ছাড়িয়া যাইবার পরও সেই রকমই হয়। (সুতরাং) এইভাবে ভাবিত হইয়া উপাসনা করিবে।
3.14.2 যিনি মনোময়, প্রাণই যাঁহার শরীর, যিনি জ্যোতিঃস্বরূপ ও সত্য- সংকল্প, যিনি আকাশের ন্যায় (সর্বব্যাপী, অখণ্ড ও রূপাদিবিহীন), যিনি সর্বকর্মা, সর্বকাম, সর্বগন্ধ ও সর্বরস, যিনি সমস্ত কিছুতে পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছেন, যিনি বাগিন্দ্রিয়রহিত ও অনপেক্ষ ।
3.14.3 হৃদয়ের অভ্যন্তরে আমার এই আত্মা ব্রীহি অপেক্ষা সূক্ষ্ম, ইনি যব, সর্ষপ, শ্যামাক, এমন কি শ্যামাক তণ্ডুল অপেক্ষাও সূক্ষ্ম। হৃদয়ের অভ্যন্তরে আমার আত্মা পৃথিবী অপেক্ষা মহান, অন্তরিক্ষ অপেক্ষা মহান, এই সমুদয় লোক অপেক্ষাও মহান।
3.14.4 যিনি সর্বকর্মা, সর্বকাম, সর্বগন্ধ, সর্বরস, যিনি সবকিছু পরিব্যাপ্ত করিয়া রহিয়াছেন, যিনি বাক্রহিত, তিনিই আমার আত্মা এবং আমার হৃদয়ের অভ্যন্তরে ইনিই ব্রহ্ম। ইহলোক (বা এই দেহ। হইতে যাইয়া তাঁহাকেই পাইব। যাঁহার এই রকম স্থির বিশ্বাস আছে, তাহার কোন সংশয় নাই) [অর্থান্তর—যিনি মনে করেন, ‘আমি মৃত্যুর পর ব্রহ্মলাভ করিব’, এ বিষয়ে যাঁহার কোন সন্দেহ নাই তিনি ব্ৰহ্মলাভ করিবেন]। শাণ্ডিল্য (ইহাই বলিয়াছেন), শাণ্ডিল্য (ইহাই বলিয়াছেন)।
পঞ্চদশ খণ্ড – পুত্রের মঙ্গলকামনায় বিরাটকোশের চিন্তা
3.15.1 এই যে কোশ—অন্তরিক্ষ ইহার উদয়, ভূমি ইহার নিম্নভাগ, ইহা কখন জীর্ণ হয় না। দিসমূহ ইহার পার্শ্ব (বা কোণ), অন্তরিক্ষ ইহার উপরের দিকের মুখ। এই কোশ এক ধনভাণ্ডার, এই বিশ্বভুবন ইহাতে অবস্থিত।
3.15.2 এই কোশের পূর্বদিকে ‘জুহূ’, দক্ষিণদিক ‘সহমানা’, পশ্চিমদিক ‘রাজ্ঞী’ এবং উত্তরদিক ‘সম্ভুতা’। বায়ু ইহাদের বৎস। যিনি বায়ুকে দিকসমূহের বৎস বলিয়া জানেন, তাঁহাকে পুত্রবিয়োগের জন্য রোদন করিতে হয় না। আমি বায়ুকে দিকসমূহের বৎস বলিয়া জানি, আমাকে যেন পুত্রবিয়োগের জন্য রোদন করিতে না হয়।
3.15.3 আমি অমুকের, অমুকের, অমুকের সহিত (এই স্থলে তিনবার পুত্রের নাম করিতে হইবে) অবিনশ্বর কোশের শরণ নিতেছি। অমুকের, অমুকের, অমুকের সহিত প্রাণের শরণ নিতেছি। অমুকের, অমুকের, অমুকের সহিত লোকের শরণ নিতেছি। অমুকের, অমুকের, অমুকের সহিত ভুবর্লোকের শরণ নিতেছি। অমুকের, অমুকের, অমুকের সহিত স্বর্গলোকের শরণ নিতেছি।
3.15.4 আমি যে বলিয়াছি ‘প্রাণের শরণ নিতেছি’ (তাহা এইজন্য যে) সমস্ত জীবজগৎ— যাহা কিছু আছে— সে সবই প্রাণ। সেইজন্য তাহারই আশ্রয় লইয়াছি।
3.15.5 তাহার পর যে বলিয়াছি ‘ভূলোকের শরণ লই’—তাহা এই অর্থে বলিয়াছি যে, আমি ভূলোকের, অন্তরিক্ষের এবং দ্যুলোকের শরণ নিতেছি।
3.15.6 তাহার পর যে বলিয়াছি ‘ভুবর্লোকের শরণ লই’—তাহাতে ইহাই (অৰ্থাৎ তাহা এই অর্থে) বলিয়াছি যে, ‘অগ্নির, বায়ুর এবং আদিত্যের শরণ নিলাম।
3.15.7 তাহার পর যে বলিয়াছি ‘স্বর্গলোকের শরণাপন্ন হই’—তাহাতে ইহাই (অর্থাৎ তাহা এই অর্থে) বলিয়াছি যে, ‘ঋগ্বেদের, যজুর্বেদের এবং সামবেদের শরণ লইতেছি’।
ষোড়শ খণ্ড – নিজ জীবনের দীর্ঘত্ব—কামনায় পুরুষযজ্ঞ
3.16.1 পুরুষই যজ্ঞ। তাহার (জীবনের প্রথম) চব্বিশ বৎসর প্রাত সবনস্থানীয়; কারণ গায়ত্রীর চব্বিশটি অক্ষর এবং প্রাতঃসবনে গায়ত্রীছন্দের মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়। বসুগণ এই যজ্ঞের প্রাতঃসবনের অনুগত প্রাণসমূহই এই বসু, কারণ ইহারাই এই সমুদয় চরাচর ভূতবর্গকে বাস করিয়া থাকে।
3.16.2 এই বয়সে (অর্থাৎ প্রথম চব্বিশ বৎসরের মধ্যে) যদি কোন ব্যাধি তাহাকে যন্ত্রণা দেয়, তবে সে বলিবে—’হে প্ৰাণসমূহ হে বসুগণ, আমার এই প্রাতঃসবনকে (অর্থাৎ জীবনের প্রথম অংশকে) মাধ্যন্দিন সবন পর্যন্ত (অর্থাৎ মধ্যজীবন পর্যন্ত) বিস্তৃত করিয়া দাও। যজ্ঞরূপী আমি যেন প্রাণরূপী বসুগণের মধ্যে বিলুপ্ত না হই। ইহা বলিলে সে সেই ব্যাধি হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চয়ই নীরোগ হয়।
3.16.3 তাহার পর যে চুয়াল্লিশটি বৎসর, তাহা মাধ্যন্দিন সবনের মত। কারণ ত্রিষ্টুভ্ছন্দে চুয়াল্লিশটি অক্ষর আছে এবং মাধ্যন্দিন সবনে ত্রিষ্টুভ্ছন্দের মন্ত্র উচ্চারিত হয়। রুদ্রগণ এই মাধ্যন্দিন সবনের অনুগত। প্রাণসমূহই রুদ্র, কারণ প্রাণসমূহই সমস্তকে (জগৎকে) রোদন করাইয়া থাকে।
3.16.4 যদি মধ্য বয়সে (ব্যাধি বা অপর) কিছু তাহাকে সন্তাপ দেয়, সে বলিবে— ‘হে প্ৰাণসমূহ, হে রুদ্রগণ, এই মাধ্যন্দিন সবনকে (অর্থাৎ আমার এই মধ্যজীবনকে) তৃতীয় সবন পর্যন্ত (অর্থাৎ শেষ জীবন পর্যন্ত) বিস্তৃত কর। যজ্ঞরূপী আমি যেন প্রাণরূপী রুদ্রগণের মধ্যে বিলুপ্ত না হই (অর্থাৎ মধ্যজীবনে আমার যেন মৃত্যু না হয়)। ইহা বলিলে সে ব্যাধি হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চয়ই নীরোগ হয়।
3.16.5 তাহার পর যে আটচল্লিশ বৎসর তাহাই তৃতীয় সবনের তুল্য; কারণ জগতীছন্দে আটচল্লিশটি অক্ষর আছে এবং তৃতীয় সবনে জগতীছন্দের মন্ত্র উচ্চারিত হয়। আদিত্যগণ এই তৃতীয় সবনের অনুগত। প্রাণসমূহই আদিত্য, কারণ ইহারাই শব্দ ইত্যাদির বিষয়কে ‘আদান’ অর্থাৎ গ্রহণ করিয়া থাকে।
3.16.6 এই বয়সে তাহাকে যদি (ব্যাধি বা অন্য) কিছু সন্তপ্ত করে, সে এই মন্ত্র বলিবে—’হে প্ৰাণসমূহ, হে আদিত্যগণ, আমার জীবনরূপী তৃতীয় সবনকে পূর্ণায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত কর। যজ্ঞরূপী আমি যেন প্রাণরূপী আদিত্যগণের মধ্যে বিলুপ্ত না হই তাহা হইলে সে ব্যাধি ইত্যাদি হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চয়ই নীরোগ হইবে।
3.16.7 ইতরার পুত্র মহিদাস এই তত্ত্ব জানিয়া বলিয়াছিলেন—’তুমি কেন আমাকে এইভাবে সন্তপ্ত করিতেছ? আমি ত ইহাতে মরিব না।’ তিনি ১১৬ বৎসর জীবনধারণ করিয়াছিলেন। যিনি ইহা জানেন তিনি ১১৬ বৎসর বাঁচেন।
সপ্তদশ খণ্ড – পুরুষযজ্ঞ—দেবকীনন্দন কৃষ্ণ
3.17.1 পুরুষ যে ভোজন করিতে ইচ্ছা করে, পান করিতে ইচ্ছা করে এবং আনন্দ উপভোগ হইতে বিরত থাকে—এই সবই (জীবনযজ্ঞের দীক্ষা)
3.17.2 তাহার পর পুরুষ যে ভোজন করে, পান করে এবং সুখ অনুভব করে, তাহা উপসদসমূহের তুল্য।
3.17.3 তাহার পর পুরুষ যে হাসে, খায় এবং মিথুনভাবে আচরণ করে, তাহা স্তুত ও শস্ত্র নামে যজ্ঞাংশের তুল্য।
3.17.4 তাহার পর তপস্যা, দান, সরলতা, অহিংসা এবং সত্যবাদিকা পুরুষরূপী যজ্ঞের দক্ষিণা।
3.17.5 সেইজন্য (উভয়ের বিষয়েই) লোকে বলে সন্তান প্রসব করিবে বা সোম অভিষব করিবে, সন্তান উৎপন্ন করিয়াছে বা সোম অভিষব করিয়াছে। আবার (উভয়ের বিষয়েই বলা যাইতে পারে)— ইহাই এর উৎপত্তি। সেই পুরুষের মৃত্যুই ‘অবভূত্থ’ (অর্থাৎ যজ্ঞসমাপ্তির পরা স্নান)।
3.17.6 ঘোর আঙ্গিরস ঋষি দেবকীনন্দন কৃষ্ণকে এই তত্ত্ব উপদেশ দিয়াছিলেন। (ইহা শুনিয়া) কৃষ্ণ (সর্ববিষয়ে) নিঃস্পৃহ হইয়াছিলেন। (ঘোর আঙ্গিরস বলিয়াছিলেন) মৃত্যুকালে মানুষ এই তিন মন্ত্র উচ্চারণ করিবে— তুমি অক্ষয়, তুমি অচ্যুত, তুমি প্রাণসংশিত। এ বিষয়ে এই দুইটি ঋক্ আছে—
3.17.7 যে জ্যোতি দ্যুলোকে (কিংবা পরব্রহ্মে) দীপ্তি পাইতেছে, (ব্ৰহ্মবিদ্গণ) জগতের বীজরূপী এবং দিবালোকের মত সর্বব্যাপী, পুরাতন ও জগৎকারণ সেই পরমজ্যোতি দেখেন। অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের অতীত যে শ্রেষ্ঠ জ্যোতি, তাহাকে নিজের হৃদয়ে নিহিত শ্রেষ্ঠ জ্যোতিরূপে দেখিয়া আমরা দেবগনের মধ্যে দ্যুতিমান পরমেশ্বর সর্বোঙম জ্যোতিকেই লাভ করিয়াছি।
অষ্টাদশ খণ্ড – মন, আকাশ প্রভৃতিতে ব্ৰহ্মদৃষ্টি
3.18.1 ‘মনই ব্রহ্ম’ এইরূপ উপাসনা করিবে—ইহাই দেহসংক্রান্ত (অধ্যাত্ম) উপাসনা। এইবার দেবতাসংক্রান্ত (অধিদৈবত) উপাসনা বলা হইতেছে—’আকাশই ব্রহ্ম’। অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত উভয় উপাসনাই বলা হইল।
3.18.2 এই ব্রহ্ম চতুষ্পাদ—বাগিন্দ্রিয় একপাদ, প্রাণ (অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয়) একপাদ, চক্ষু একপাদ এবং কর্ণ একপাদ। ইহাই অধ্যাত্ম উপাসনা। এইবার অধিদৈবত উপাসনা বলা হইতেছে—অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং দিসমূহ প্রত্যেকে একপাদ। অধ্যাত্ম ও অধিদৈবত—উভয় উপাসনাই বলা হইল।
3.18.3 বাক্ ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ। বাপ সেই চরণ অগ্নিরূপ জ্যোতিতে দীপ্তি পায় এবং তাপ দেয়। যিনি ইহা জানেন তিনি কীর্তি, যশ ও বেদজ্ঞানের তেজে দীপ্তি পান এবং তাপ দেন।
3.18.4 প্রাণই (অর্থাৎ ঘ্রাণেন্দ্রিয়ই) ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ। প্রাণরূপী সেই পাদ বায়ুরূপ জ্যোতিতে দীপ্তি পায় এবং তাপ দেয়। যিনি ইহা জানেন তিনি কীর্তি, যশ ও ব্রহ্মতেজে দীপ্তি পান এবং তাপ দেন।
3.18.5 চক্ষুই ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ। চক্ষুরূপ সেই পাদ আদিত্যরূপ জ্যোতিতে দীপ্তি পায় এবং তাপ দেয়। যিনি ইহা জানেন, তিনি কীর্তি, যশ ও ব্রহ্মতেজে তেজস্বী হন এবং তাপ দেন।
3.18.6 কর্ণই ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ। কর্ণরূপ এই পাদ দিপ জ্যোতিতে দীপ্তি পায় ও তাপ দেয়। যিনি ইহা জানেন তিনি কীর্তি, যশ ও ব্রহ্মতেজে তেজস্বী হন এবং তাপ দেন।
ঊনবিংশ খণ্ড – আদিত্যে ব্ৰহ্মদৃষ্টি
3.19.1 আদিত্যই ব্ৰহ্ম— ইহাই উপদেশ। ইহার বিস্তৃত ব্যাখ্যা এই—এই (জগৎ) পূর্বে অসৎ বা নামরূপহীন ছিল। তাহা সৎ (অর্থাৎ সূক্ষ্ম সত্তাবান্) এবং ডিম্বরূপে পরিণত হইল। এক বৎসরকাল স্পন্দনহীন অবস্থায় থাকিয়া সেই ডিম্ব বিভক্ত হইল। ডিম্বের একভাগ রজতময়, অপরভাগ সুবর্ণময় হইল।
3.19.2 সেই রজতময় অংশ এই পৃথিবী, সুবর্ণময় অংশ দ্যুলোক, জরায়ু হইল পর্বতসমূহ, উল্ব (অর্থাৎ সূক্ষ্মগর্ভ—বেষ্টন) মেঘ ও তুষার, ধমনী নদীসমূহ আর বস্তি- প্রদেশের জলই হইল সমুদ্র।
3.19.3 তারপর উৎপন্ন হইল এই সূর্য। তিনি উৎপন্ন হইলে ‘উলু উলু ধ্বনি উঠিল এবং সমুদয় ভূত ও কাম্যবস্তু উৎপন্ন হইল। এই জন্য সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় উলুধ্বনি এবং সকল জীব ও কাম্যবস্তু উত্থিত হয়।
3.19.4 যিনি সূর্যদেবকে এইরকম জানিয়া তাঁহাকেই ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, সরল মঙ্গলধ্বনি যাইয়া তাঁহাকে সুখ দেয়।
চতুর্থ অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ ও রৈব্বের আখ্যায়িতা (১)
4.1.1 জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ শ্রদ্ধা সহকারে বহু দান করিতেন। (অতিথিদিগকে ভোজন করাইবার জন্য) তিনি বহু অন্ন পাক করাইতেন। ‘সকলে আমার অন্ন ভোজন করিবে’— এই উদ্দেশ্যে তিনি সর্বত্র পান্থশালা নির্মাণ করাইয়াছিলেন।
4.1.2 এক রাত্রিতে একদল হাঁস উড়িয়া যাইতেছিল। একটি হাঁস অগ্রগামী আর একটি হাঁসকে বলিল— ভল্লাক্ষ, ভল্লাক্ষ, জানশ্রুতি পৌত্রায়ণের জ্যোতি আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত রহিয়াছে; ইহা স্পর্শ করিও না; ইহা যেন তোমাকে দগ্ধ না করে।
4.1.3 দ্বিতীয় হংস বলিল— ‘এই ব্যক্তি এমন কে যে ইহার বিষয় এইরূপ বলিতেছ? এ যেন শকটবান্ রৈক্ব! প্রথম হংস জিজ্ঞাসা করিল— ‘তুমি যে শকটবান্ রৈক্কের কথা বলিতেছ, সে কে?’
4.1.4 দ্বিতীয় হাঁস বলিল— ‘কৃত নামক পাশা জয় করিলে যেমন কম অঙ্কের পাশাগুলিও তাহার মধ্যে আসিয়া যায় অর্থাৎ তাহার অধীন হয়, তেমনি এই সমস্তই— লোকে যাহা কিছু কাজ করে সবই—সেই রৈক্টের অধীন হয়। রৈক্ব যাহা জানেন যে ব্যক্তি তাহা জানে, আমি তাহার সম্বন্ধেও ইহাই বলি (অর্থাৎ রৈত্বের মত জ্ঞানী ব্যক্তির বিষয়েও আমি একই কথা বলি)।‘
4.1.5-6 জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ উহা শুনিতে পাইলেন। প্রাতে শয্যা হইতে উঠিয়া তিনি দ্বারপালকে বলিলেন— বৎস শোন, দুইট হাঁসের মধ্যে কথা হইতেছিল; এক হাঁস বলিল, ‘তাঁহার বিষয় এমনভাবে বলিতেছে সে যেন শকটবান্ রৈক্ব!’ অপর হাঁস জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি যে শকটবান্ রৈক্বের কথা বলিলে, সে কে?’ প্রথম হাঁস তাহার উত্তরে বলিল, ‘কৃত নামে পাশা জয় করিলে যেমন নিম্নাঙ্ক পাশাগুলিও তাহার অধীন হয়, তেমনি এসমস্তই লোকে যাহা কিছু সৎ কর্ম করে সেই সবই— রৈক্কের আয়ত্ত হয়। রৈকের মত যিনি জ্ঞানী তাঁহার বিষয়েও এই কথাই বলি।
4.1.7 (রৈকের অনুসন্ধান করিবার জন্য জানশ্রুতি সেই দ্বারপালকে আদেশ করিলেন)। দ্বারপাল অনুসন্ধান করিয়া ফিরিয়া আসিল এবং বলিল— ‘আমি তাঁহাকে পাইলাম না।’ জানশ্রুতি তাহাকে বলিলেন— ‘যেখানে ব্রাহ্মণের অন্বেষণ করিতে হয়, সেখানে (অর্থাৎ অরণ্যে বা নির্জন প্রদেশে) গিয়া তাহাকে অনুসন্ধান কর।’
4.1.8 শকটের নীচে বসিয়া একজন লোক খোস চুলকাইতেছিল। দ্বারপাল তাহার নিকট বসিল। তারপর তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল— ‘ভগবন্, আপনিই কি শকটবান্ রৈক্ব?” তিনি উত্তর করিলেন, “ওহে আমিই সে।’ জানিতে পারিয়াছি, এই মনে করিয়া দ্বারপাল ফিরিয়া আসিল।
দ্বিতীয় খণ্ড – জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ ও রৈত্বের আখ্যায়িকা (২)
4.2.1 তাহার পর জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ ছয়শত গাভী, সোনার হার এবং অশ্বতরীযুক্ত রথ লইয়া সেখানে গেলেন এবং রৈক্বকে বলিলেন—
4.2.2 হে রৈক্ব, আপনার জন্য এই ছয়শত গাভী, এই হার এবং এই রথ আনা হইয়াছে। আপনি যে দেবতার উপাসনা করেন আমাকে সেই দেবতার বিষয়ে উপদেশ দিন।
4.2.3 রৈক্ব তাঁহাকে বলিলেন— ‘ওহে শূদ্র, এই হার, এই রথ, এই সব গাভী তোমারই থাকুক।’ তখন জানশ্রুতি পৌত্রায়ণ এক হাজার গাভী, সোনার হার, অশ্বতরীযুক্ত রথ এবং কন্যাকে নিয়া আবার সেখানে গেলেন।
4.2.4 জানশ্রুতি রৈক্বকে বলিলেন, ‘হে রৈক্ব, এক হাজার গাভী, স্বর্ণময় হার,অশ্বতরীযুক্ত রথ, এই জায়া এবং আপনি যে গ্রামে বাস করেন তাহাও আপনাকে (উপহার দিতেছি)। আপনি আমাকে শিক্ষা দিন।’
4.2.5 (হাত দিয়া) সেই কন্যার মুখ তুলিয়া ধরিয়া রৈক্ব বলিলেন ‘হে শূদ্র, তুমি এই সব আনিয়াছ; (কিন্তু একমাত্র) এই মুখ দিয়াই (অর্থাৎ এই কন্যার মুখ দিয়াই) আমাকে কথা বলাইতেছ।’ মহাবৃষ প্রদেশে রৈক্বপর্ণ নামে গ্রামগুলিতে রৈক্ব জানশ্রুতিকে উপদেশ দিবার জন্য বাস করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন—
তৃতীয় খণ্ড – রৈত্ব কথিত সম্বর্গবিদ্যা—বায়ু ও প্রাণের প্রাধান্য
4.3.1 বায়ুই সর্বগ্রাস (অর্থাৎ সকলকে গ্রাস করে)। যখন অগ্নি নির্বাপিত হয়, তখন তাহা বায়ুতেই লীন হয়। যখন সূর্য অস্তমিত হয়, তখন তাহা বায়ুতেই লীন হয়। যখন চন্দ্র অস্তমিত হয়, তখন বায়ুতেই লীন হয়।
4.3.2 যখন জল শুকাইয়া যায় তখন তাহা বায়ুতেই মিশায়; বায়ু এই সব কিছুকেই গ্রাস করে। ইহাই অধিদৈবত অর্থাৎ দেবতাবিষয়ক উপাসনা।
4.3.3 ইহার পর অধ্যাত্ম (অর্থাৎ দেহবিষয়ক) উপাসনা—প্রাণই সর্বগ্রাস; কারণ যখন পুরুষ নিদ্রিত হয় তখন বাক্, চক্ষু কর্ণ এবং মন, এই সবই প্রাণে প্রবেশ করে। প্রাণই এই সবকে গ্রাস করে।
4.3.4 এই দুই-ই সর্ব গ্রাস—দেবতাদের মধ্যে বায়ু এবং ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে প্ৰাণ।
4.3.5 একদিন কপিপুত্র শৌনক এবং কক্ষসেনের পুত্র অভিপ্রতারী—এই দুইজনকে অন্ন পরিবেশন করা হইতেছিল। এমন সময় একজন ব্রহ্মচারী আসিয়া ভিক্ষা চাহিল। তাহারা তাহাকে ভিক্ষা দিল না।
4.3.6 সেই ব্রহ্মচারী বলিল, ‘এক দেবতা চারিজন মহাত্মাকে গ্রাস করিয়াছেন; তিনি কে? কে ভুবনের রক্ষক? হে কাপেয়, হে অভিপ্রতারী, বহুরূপে বর্তমান সেই দেবতাকে মানুষেরা দেখিতে পায় না। যাঁহার জন্য এই অন্ন তাঁহাকেই ইহা দিলে না।’
4.3.7 শৌনক কাপেয় ইহা মনে মনে আলোচনা করিয়া সেই ব্রহ্মচারীর নিকট গেলেন এবং বলিলেন—যিনি সর্বদেবতার আত্মা, স্থাবর জঙ্গমের জনয়িতা, হিরণ্যদন্তী ভক্ষক এবং মেধাবী, অপরে যাঁহাকে ভক্ষণ করিতে পারে না কিন্তু অনন্নকেও (অর্থাৎ যাহা অন্ন নয় এমন বস্তুকেও) যিনি ভক্ষণ করেন, (জ্ঞানিগণ) তাঁহার মহিমাকে মহান বলিয়াছেন। হে ব্রহ্মচারী, আমরা তাঁহারই উপাসনা করি। (তাহার পর তিনি বলিলেন)— ইঁহাকে ভিক্ষা দাও।
4.3.8 তখন তাঁহাকে ভিক্ষা দেওয়া হইল। সেই প্রথম পাঁচ (বায়ু ও তাহার চারিটি খাদ্য) এবং দ্বিতীয় পাঁচ (প্রাণ ও তাহার চারিটি খাদ্য) মিলিত হইয়া দশ হইলে ‘কৃত’ হয়। এই জন্য সর্বদিকে কৃত ও (তাহার) অন্নের সংখ্যা দশ। ইহাই বিরাট্ ও অন্নভোক্তা। তাহার দ্বারাই এই সব দৃষ্ট হয়। যিনি ইহা জানেন তিনি সর্বদিকে এই সমস্ত দেখিতে পান, তিনি অন্নাদ হন।
চতুর্থ খণ্ড – সত্যকাম জাবালের আখ্যায়িকা
4.4.1 সত্যকাম জাবাল মাতা জবালাকে বলিল—হে পূজনীয়া, আমি ব্ৰহ্মচর্য নিয়া গুরুগৃহে বাস করিব। আমার কি গোত্র?
4.4.2 জবালা তাহাকে বলিল— পুত্র, তোমার কোন্ গোত্র তাহা আমি জানি না। যৌবনে বহু বিচরণ করিয়া পরিচারিণী অবস্থায় (কিংবা যৌবনে পরিচারিণীরূপে বহুলোকের পরিচর্যা করিয়া) তোমাকে পাইয়াছি। আমি জানি না তোমার কোন্ গোত্র। আমি জবালা, তুমি সত্যকাম; তাই বলিও ‘আমি সত্যকাম জাবাল’।
4.4.3 সত্যকাম হারিদ্রুমত গৌতমের নিকট গিয়া বলিল—আমি আপনার নিকট ব্রহ্মচর্য বাস করিব; এই জন্য আসিয়াছি।
4.4.4 গৌতম তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে সোম্য! তুমি কোন্ গোত্রীয়?” সত্যকাম বলিল, “ভগবান্, আমি কোন্ গোত্রীয় তাহা জানি না। আমি মাতাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি প্রত্যুত্তরে বলিয়াছেন—’আমি যৌবনে বহু বিচরণ করিয়া পরিচারিণী অবস্থায় (কিংবা আমি যৌবনে পরিচারিণীরূপে বহু পরিচর্যা করিয়া) তোমাকে পাইয়াছি। এই অবস্থায় আমি জানি না তুমি কোন্ গোত্রীয়। আমি জবালা, তুমি সত্যকাম; সুতরাং বলিও— ভগবান, আমি সত্যকাম জাবাল।”
4.4.5 গৌতম সত্যকামকে বলিলেন, ‘অব্রাহ্মণ কখনও এরকম বলিতে পারে না। তুমি সমিধ কাষ্ঠ আন। আমি তোমাকে উপনীত করিব (অর্থাৎ তোমার উপনয়ন হইবে); তুমি সত্য হইতে বিচলিত হও নাই।’ তাহার উপনয়নের পর তিনি চারি শত দুর্বল ও কৃশ গরু পৃথক করিয়া নিয়া বলিলেন——হে সৌম্য, ইহাদের নিয়া যাও।’ গরু নিয়া যাইবার সময় সত্যকাম বলিল—’সহস্ৰ পূর্ণ না হইলে আমি ফিরিব না।’ এইরূপে সে বহু বৎসর অন্যত্র বাস করিল। গরুর সংখ্যা যখন এক সহস্র হইল—।
পঞ্চম খণ্ড – ব্রহ্মের চতুষ্কল প্রথমপাদ ‘প্রকাশবান্’
4.5.1 তখন একটি বৃষ তাহাকে ডাকিয়া বলিল—’সত্যকাম!” সত্যকাম উত্তর দিল—’ভগবান্!” (বৃষ বলিল)—’সৌম্য, আমরা এক সহস্র হইয়াছি; আমাদের আচার্যের গৃহে নিয়া চল।”
4.5.2 (বৃষ বলিল)—’তোমাকে ব্রহ্মের এক পাদ বলিতেছি।’ (সত্যকাম বলিলেন), (‘ভগবান, বলুন।’ বৃষ বলিল—’পূর্বদিক ব্রহ্মের এক কলা, পশ্চিমদিক এক কলা, দক্ষিণদিক এক কলা এবং উত্তর দিক এক কলা। হে সৌম্য, ইহাই ব্রহ্মের চারি কলাবিশিষ্ট এক পাদ যার নাম প্রকাশবান্। ‘
4.5.3 যিনি এইভাবে জানিয়া ব্রহ্মের চতুষ্কল পাদকে ‘প্রকাশবান্’ রূপে উপাসনা করেন, তিনি এই লোকে প্রতিষ্ঠাবান হন; এবং (মৃত্যুর পর) উজ্জ্বল লোকসমূহ জয় করেন।
ষষ্ঠ খণ্ড – ব্রহ্মের চতুষ্কল দ্বিতীয় পাদ—’অনন্তবান্’
4.6.1 (বৃষ আরও বলিল)—’অগ্নি তোমাকে একপাদ বলিবে।’ পরদিন সত্যকাম গরুগুলিকে নিয়া (গুরুগৃহে) যাত্রা করিল। গরুগুলি সন্ধ্যাকালে যেখানে একত্র হইল সেখানে আগুন জ্বালিয়া তাহাদের আবদ্ধ করিল। তারপর কাঠ সংগ্রহ করিয়া অগ্নির পশ্চাদ্ভাগে পূর্বমুখ হইয়া বসিল।
4.6.2 অগ্নি তাহাকে ডাকিল’সত্যকাম!’ সত্যকাম উত্তর করিল—’ভগবান্’।
4.6.3 অগ্নি বলিল, ‘হে সৌম্য, তোমাকে ব্রহ্মের এক পাদ বলি।’ সত্যকাম বলিল, ‘ভগবান, বলুন।’ অগ্নি তাহাকে বলিল—’পৃথিবী এক কলা; অন্তরিক্ষ এক কলা; দ্যুলোক এক কলা; সমুদ্র এক কলা। হে সৌম্য, ইহাই ব্রহ্মের চারি কলা যুক্ত এক পাদ, ইহার নাম ‘অনন্তবান্’।
4.6.4 যিনি ইহাকে এই ভাবে জানিয়া ব্রহ্মের চতুষ্কল পাদকে ‘অনন্তবান্’ বলিয়া উপাসনা করেন, তিনি ইহলোকে অনন্তবান হন এবং (মৃত্যুর পর) অনন্তবান (অর্থাৎ অক্ষয়) লোকসমূহ জয় করেন।
সপ্তম খণ্ড – ব্রহ্মের চতুষ্কল তৃতীয় পাদ—’জ্যোতিষ্মান্’
4.7.1 (বৃষ আরও বলিল)—’হংস তোমাকে ব্রহ্মের এক পাদ বলিবে।’ পরদিন সত্যকাম গরু লইয়া (আচার্যের গৃহাভিমুখে) যাত্রা করিল। সন্ধ্যায় তাহারা যেখানে এক হইল সেইখানে অগ্নি জ্বালিয়া গরুগুলিকে আবদ্ধ করিল। তারপর কাঠ সংগ্রহ করিয়া অগ্নির পশ্চাদ্ভাগে পূর্বমুখ হইয়া বসিল।
4.7.2 হংস তাহার নিকট উড়িয়া আসিয়া বলিল ‘সত্যকাম!” সত্যকাম প্রত্যুত্তরে বলিল ‘ভগবান্!
4.7.3 হংস বলিল——সৌম্য, আমি তোমাকে ব্রহ্মের একপাদ বলিব। সত্যকাম বলিল—বলুন, ভগবান্। হংস বলিল—অগ্নি এক কলা, সূর্য এক কলা, চন্দ্র এক কলা, বিদ্যুৎ এক কলা। হে সৌম্য, ইহা ব্রহ্মের চারিকলা বিশিষ্ট এক পাদ; ইহার নাম জ্যোতিষ্মান্।।
4.7.4 যিনি ইহাকে এইভাবে জানিয়া ব্রহ্মের এই চতুষ্কল পাদকে জ্যোতিষ্মান রূপে উপাসনা করেন, তিনি এই লোকে জ্যোতিষ্মান হন, এবং (মৃত্যুর পরে) জ্যোতির্ময় লোকসমূহ লাভ করেন।
অষ্টম খণ্ড – ব্রহ্মের চতুষ্কল চতুর্থ পাদ—‘আয়তনবান্’
4.8.1 (হংস আরও বলিল)—’মদ্ তোমাকে (ব্রহ্মের) একপাদ বলিবে’। পরদিন সত্যকাম গরু লইয়া (গুরু-গৃহাভিমুখে) যাত্রা করিল। যেখানে তাহারা সন্ধ্যাকালে একত্র হইল, সেখানে সত্যকাম অগ্নি জ্বালিয়া গরুগুলিকে আবদ্ধ করিয়া তারপর সমিধহস্তে অগ্নির পশ্চাতে পূর্বমুখ হইয়া বসিল।
4.8.2 মগু তাঁহার নিকট উড়িয়া আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিল—‘সত্যকাম!’ উত্তরে সত্যকাম বলিল, ‘ভগবান্!’
4.8.3 মদ্ বলিল ‘হে সৌম্য, তোমাকে ব্রহ্মের এক পাদ বলি।’ (সত্যকাম বলিল)—‘ভগবান, আমাকে বলুন’ মদ্ বলিল, ‘প্রাণ এক কলা, চক্ষু এক কলা, এক কলা, মন এক কলা। হে সৌম্য, ইহাই ব্রহ্মের চতুষ্কল এক পাদ—ইহার নাম আয়তনবান্ (অর্থাৎ আশ্ৰয়বান)।’
4.8.4 যিনি ইহাকে এই রকম ভাবে জানিয়া ব্রহ্মের এই চতুষ্কল পাদকে আয়তনবান বলিয়া উপাসনা করেন, তিনি এই লোকে আয়তনবান (অর্থাৎ আশ্রয়বান, হন এবং (মৃত্যুর পরে) আয়তনযুক্ত লোকসমূহ লাভ করেন।
নবম খণ্ড – সত্যকাম জাবালের প্রকৃতি-লব্ধ ও মানব-লব্ধ শিক্ষা
4.9.1 তারপর সত্যকাম আচার্যের গৃহে উপস্থিত হইল। আচার্য গৌতম তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—‘সত্যকাম!’ প্রত্যুত্তরে সত্যকাম বলিল, ‘ভগবান্!’।
4.9.2 (আচার্য বলিলেন)—’সৌম্য, তুমি ব্রহ্মবিদের মত দীপ্তি পাইতেছ। কে তোমাকে উপদেশ দিয়াছে?’ সত্যকাম বলিল—’মানুষ ভিন্ন অন্যে। এইবার আপনি আমাকে অভীষ্ট বিষয়ে উপদেশ দিন। (কিংবা আমার ইচ্ছা আপনিই আমাকে উপদেশ দিন)।
4.9.3 আপনার মত ব্যক্তিদিগের নিকট শুনিয়াছি যে, আচার্যের কাছে বিদ্যা লাভ করিলেই তাহা সর্বাপেক্ষা কল্যাণকর হয়। তখন আচার্য সত্যকামকে সেই সবই (অর্থাৎ বৃষ, অগ্নি, হংস এবং মদ্ যে সব উপদেশ দিয়াছিল তাহার সমস্তই) বলিলেন, কিছুই বাদ গেল না।
দশম খণ্ড – উপকোসল কামলায়ন-প্রাপ্ত অগ্নিবিদ্যা
4.10.1 উপকোসল কামলায়ন সত্যকাম জাবালের নিকট ব্রহ্মচর্যবাস করিয়া বার বৎসর গুরুর অগ্নি—পরিচর্যা করিয়াছিল। সত্যকাম অন্য শিষ্যদিগকে সমাবর্তন করাইলেন, কিন্তু উপকোসলকে করাইলেন না।
4.10.2 তাঁহার পত্নী তাঁহাকে বলিলেন—’ব্রহ্মচারী তপস্যানিষ্ঠ হইয়া (অথবা ক্লেশ করিয়া) নৈপুণ্যের সহিত অগ্নির পরিচর্যা করিয়াছে। অগ্নি যেন তোমাকে নিন্দা না করে—তুমি ইহাকে উপদেশ দাও।’ কিন্তু তিনি উপদেশ না দিয়াই প্রবাসে চলিয়া গেলেন।
4.10.3 উপকোসল মনোদুঃখে অনশন আরম্ভ করিল। তখন আচার্যজায়া তাঁহাকে বলিলেন—’হে ব্রহ্মচারী, আহার কর; কেন আহার করিতেছ না?’ উপকোসল বলিল— ‘এই পুরুষে (অর্থাৎ আমাতে) নানা পথগামী কামনাসকল রহিয়াছে। আমি নানা ব্যাধিতে (অর্থাৎ মানসিক দুঃখে) পরিপূর্ণ। আমি আহার করিব না।’
4.10.4 তখন অগ্নিগণ (দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্য ও আহবনীয়—এই তিন অগ্নি) পরস্পর বলিতে লাগিল—’এই তপঃক্লিষ্ট ব্রহ্মচারী সহযত্নে আমাদের পরিচর্যা করিয়াছে। আমরা ইহাকে উপদেশ দিই।’ তারপর তাহারা বলিল ‘প্রাণই ব্রহ্ম; ‘ক’ অর্থাৎ সুখই ব্ৰহ্ম, ‘খ’ অর্থাৎ আকাশই ব্ৰহ্ম। ‘
4.10.5 উপকোসল বলিল—”প্রাণ যে ব্রহ্ম তাহা জানি; কিন্তু ‘ক’ এবং ‘খ’ যে ব্ৰহ্ম, তাহা জানি না।” তাহারা বলিল—”যাহা ‘ক’ তাহাই ‘খ’ এবং যাহা ‘খ’ তাহাই ‘ক’।” অগ্নিগণ উপকোশলকে ‘ব্রহ্মই প্রাণ এবং আকাশ’—এই উপদেশ দিয়াছিলেন।
একাদশ খণ্ড – গার্হপত্যাগ্লিবিদ্যা—ব্ৰহ্ম সর্বগত
4.11.1 তারপর গার্হপত্য অগ্নি উপকোসলকে বলিল—পৃথিবী, অগ্নি, অন্ন ও আদিত্য (ইহারাই আমার তনু বা ব্রহ্মের তনু)। আদিত্যমণ্ডলে ঐ যে পুরুষকে দেখা যায় তিনি আমি, তিনিই আমি।
4.11.2 যিনি ইহাকে এইভাবে জানিয়া উপাসনা করেন তাঁহার পাপকর্ম নাশ হয়। তিনি (দক্ষিণাগ্নির) লোক, পূর্ণ আয়ু এবং দীর্ঘজীবন লাভ করেন। তাঁহার সন্তানেরা বিনষ্ট হয় না। ইহলোকে এবং পরলোকেও আমরা তাঁহাকে রক্ষা করিয়া থাকি।
দ্বাদশ খণ্ড – দহ্মিণাগ্নি-বিদ্যা—ব্রহ্ম সর্বগত
4.12.1 তারপর দক্ষিণাগ্নি উপকোসলকে এই উপদেশ দিল—জল, দিকসমূহ, নক্ষত্রসমূহ ও চন্দ্র—(ইহারা আমার বা ব্রহ্মের তনু)। চন্দ্রে যে পুরুষকে দেখা যায় তিনি আমি, তিনিই আমি।
4.12.2 যিনি ইহাকে এইরকম জানিয়া উপাসনা করেন, তাঁহার পাপকর্ম নাশ হয় তিনি (গার্হপত্য অগ্নির) লোক পান, পূর্ণ আয়ু এবং উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবন লাভ করেন। তাঁহার সন্তানগণ ক্ষয় পায়না (অর্থাৎ নষ্ট হয় না)। ইহলোকে এবং পরলোকে আমরা তাঁহাকে রক্ষা করিয়া থাকি।
ত্রয়োদশ খণ্ড – আহবনীয়াগ্নি-বিদ্যা— ব্ৰহ্ম সর্বগত
4.13.1 অনন্তর আহবনীয় অগ্নি তাহাকে এই উপদেশ দিল—প্রাণ, আকাশ, দ্যুলোক এবং বিদ্যুৎ—ইহারা (আমার বা ব্রহ্মের তনু)। ঐ বিদ্যুতে যে পুরুষকে দেখা যায় তিনি আমি, তিনিই আমি।
4.13.2 যিনি ইহাকে এই ভাবে জানিয়া উপাসনা করেন, তাঁহার পাপকর্ম নাশ হয়, তিনি (আহবনীয় অগ্নির) লোক পান আর পূর্ণ আয়ু ও উজ্জ্বল (বা দীর্ঘ) জীবন লাভ করেন। তাঁহার অধস্তন পুরুষেরা অর্থাৎ সন্তানগণ বিনষ্ট হয় না। ইহলোকে এবং পরলোকে আমরা তাঁহাকে রক্ষা করিয়া থাকি।
চতুর্দশ খণ্ড – অগ্নিবিদ্যার ফল
4.14.1 অগ্নিগণ তাহাকে বলিল—উপকোসল, তোমাকে অগ্নিবিদ্যা ও আত্মবিদ্যা বলিলাম। আচার্য তোমাকে পরলোকে যাইবার পথের কথা বলিবেন। এই সময়ে আচাৰ্য প্রবাস হইতে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি তাহাকে বলিলেন—’উপকোসল
4.14.2 উপকোসল উত্তর করিল—’ভগবান্!” আচার্য বলিলেন, “তোমার মুখ ব্রহ্মবিদের মত দীপ্তি পাইতেছে। তোমাকে কে উপদেশ দিয়াছে?’ উপকোসল বলিল— ‘ভগবান্, কে আমাকে উপদেশ দিবে?’ এই বলিয়া বিষয়টি যেন গোপন করিল। তারপর অগ্নিদের দেখাইয়া বলিল—এই যে অগ্নি, পূর্বে ইহা নিশ্চয়ই অন্য প্রকার ছিল। ‘অগ্নিগণ তোমাকে কি উপদেশ দিয়াছে?’
4.14.3 (অগ্নিগণ তাহাকে যে উপদেশ দিয়াছিল, তাহা উল্লেখ করিয়া উপকোসল) বলিল—’এই উপদেশ।’ আচার্য বলিলেন ‘ইহারা তোমাকে লোকসমূহের কথা বলিয়াছে, আমি তোমাকে তাঁহার (অর্থাৎ ব্রহ্মের) কথা বলিব। যেমন পদ্মপত্রে জল লাগিয়া থাকে না, তেমনি যিনি ব্রহ্মকে এই ভাবে জানেন তাঁহাকে পাপকর্ম স্পর্শ করে না।’ উপকোসল বলিল, ‘আপনি আমাকে তাহা বলুন।’ আচার্য বলিলেন—
পঞ্চদশ খণ্ড – অক্ষিপুরুষ ও দেবপথ
4.15.1 আচার্য বলিলেন—চক্ষুতে এই যে পুরুষকে দেখা যায় ইনিই আত্মা। ইনিই অমৃত ও অভয়, এবং ইনিই ব্রহ্ম। এইজন্য যদি কেহ ঘৃত বা জল চক্ষুতে নিক্ষেপ করে, তাহা চক্ষুর দুই প্রান্তে চলিয়া যায়।
4.15.2 ইঁহাকে ‘সংযদ্বাম’ বলা হয়, কারণ ইনি সমুদয় ‘বাম’ অর্থাৎ শোভনীয়, ভজনীয় বস্তুর) আশ্রয়। যিনি এই প্রকার জানেন, সমুদয় কল্যাণ তাঁহাকে আশ্রয় করে।
4.15.3 ইনিই ‘বামনী’, কারণ তিনি নিখিল ‘বাম’ (অর্থাৎ কল্যাণ) সকলকে দান করেন। যিনি ইহা জানেন, তিনি সকল কল্যাণের বাহক হন।
4.15.4 এই পুরুষই ‘ভামনী’, কারণ ইনিই সর্বলোকে প্রতিভাত হন। যিনি এই প্রকার জানেন, তিনি সর্বলোকে দীপ্তি পান।
4.15.5 যিনি ইহা জানেন, মৃত্যুর পর তাঁহার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হউক বা না হউক, তিনি অর্চিতে (জোতিতে) গমন করেন। তারপর তিনি অর্চি হইতে দিবসে, দিবস হইতে শুক্লপক্ষে, শুক্লপক্ষ হইতে উত্তরায়ণের ছয় মাসে, সেই ছয় মাস হইতে সম্বৎসরে, সম্বৎসর হইতে আদিত্যে, আদিত্য হইতে চন্দ্রে, চন্দ্র হইতে বিদ্যুতে যান তখন সেই স্থানের এক অমানুষ পুরুষ তাঁহাদিগকে ব্রহ্মে লইয়া যান। ইহাই দেবযান ইহাই ব্রহ্মযান। ঐ পথে গেলে আর মানুষকে সংসাররূপ আবর্তে ফিরিয়া আসিতে হয় না।
ষোড়শ খণ্ড – যজ্ঞ সফলতার নিয়ম
4.16.1 যিনি পবিত্র করেন তিনিই অর্থাৎ বায়ুই যজ্ঞ। তিনি প্রবাহিত হইয়া পবিত্র করেন। যেহেতু তিনি প্রবাহিত হইয়া সমস্ত কিছু পবিত্র করেন, সেইজন্য তিনি যজ্ঞ। ন এবং বাক্য ঐ যজ্ঞের দুইটি পথ।
4.16.2 ব্রহ্মা নামক ঋত্বিক ইহার একটি পথকে মন দ্বারা (অর্থাৎ চিন্তা দ্বারা, বা মৌনাবলম্বনপূর্বক) সম্পন্ন করেন (বা সংশোধন করেন); এইটি মনোরূপ পথ)। হোতা, অধ্বর্যু ও উদ্গাতা বাক্য দ্বারা অপরটিকে সম্পন্ন করেন; (এইটি বাক্যরূপ পথ)। প্রাতে যে অনুবাক পাঠ করা হয় তাহা আরম্ভ হইবার পর এবং ‘পরিধানীয়’ নামের ঋক্ পাঠ করিবার পূর্বে যদি ‘ব্রহ্মা’ মৌন ত্যাগ করিয়া বাক্য উচ্চারণ করেন—
4.16.3 তবে তিনি একটি পথকেই (অর্থাৎ বাক্যরূপ পথকেই) সংস্কৃত করেন; কিন্তু অন্য পথটি (অর্থাৎ মনোরূপ পথটি) বিনষ্ট হয়। যেমন একপদ বিশিষ্ট মানুষ কিংবা একচক্র বিশিষ্ট রথ চলতে গেলে বিনষ্ট হয়, তেমনি ইহার যজ্ঞ নষ্ট হয়। যজ্ঞ বিনষ্ট হইলে যজমানও বিনষ্ট হয়; সে যজ্ঞ করিয়া আরো অধিক পাপের ভাগী হয়।
4.16.4 আর যে যজ্ঞে প্রাতঃপঠনীয় অনুবাক্ আরম্ভ হইবার পর এবং পরিধানীয় ঋক্ পাঠ করিবার পূর্বে ব্রহ্মা বাক্য উচ্চারণ করেন না, সে যজ্ঞে উভয় পথই সংস্কৃত হয়, কোনটিই নষ্ট হয় না।
4.16.5 যেমন দুই পা-যুক্ত লোক কিংবা দুই চাকাযুক্ত রথ চলিবার সময় প্রতিষ্ঠিত থাকে (অর্থাৎ পড়িয়া যায় না), তেমনি সেই যজমানের যজ্ঞ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যজ্ঞ সুপ্রতিষ্ঠিত হইলে যজমানের প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। যজ্ঞ করিয়া সে শ্রেয়োলাভ করে।
সপ্তদশ খণ্ড – যজ্ঞশোধনে ব্যাহৃতির ব্যবহার
4.17.1 প্রজাপতি লোকসমূহকে উদ্দেশ করিয়া তপস্যা করিলেন। সেইসব লোক হইতে তিনি বিভিন্ন রস নিষ্কাশিত করিলেন—পৃথিবী হইতে অগ্নি, অন্তরিক্ষ হইতে বায়ু এবং দ্যুলোক হইতে আদিত্য।
4.17.2 তিনি এই তিন দেবতাকে উদ্দেশ করিয়া তপস্যা করিলেন। তপ্যমান দেবগণ হইতে তিনি এইসব রস উদ্ধৃত করিলেন—অগ্নি হইতে ঋক্, বায়ু হইতে যজুঃ এবং আদিত্য হইতে সাম।
4.17.3 প্রজাপতি এই ত্রয়ীবিদ্যাকে (লক্ষ্য করিয়া) তপস্যা করিলেন। তপ্যমান ত্রয়ীবিদ্যা হইতে রসসমূহ উদ্ধৃত করিলেন—ঋক্ হইতে ভূঃ, যজুঃ হইতে ভুবঃ এবং সাম হইতে স্বঃ।
4.17.4 সেই জন্য যদি ঋক্ প্রয়োগের দোষে যজ্ঞের কোন অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকে, তবে ‘ভূঃ স্বাহা” বলিয়া গার্হপত্য অগ্নিতে হোম করিবে। তাহা হইলে ঋক্ প্রয়োগের দোষবশত যজ্ঞের যে দোষ হইতে পারিত, ঋক্ সমূহের রসদ্বারা, ঋসমূহের বীর্যদ্বারা তাহার প্রতিবিধান হইবে।
4.17.5 যদি যজুঃপ্রয়োগের দোষে কোন অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকে, তবে ‘ভুবঃ স্বাহা’ এই মন্ত্রে দক্ষিণাগ্নিতে হোম করিবে। তাহা হইলে যজুঃসমূহের রসে ও বীর্যে সেই দোষের প্রতিবিধান হইবে।
4.17.6 যদি সামপ্রয়োগের ত্রুটিবশত কোন অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকে, তবে ‘স্বঃ স্বাহা” এই বলিয়া আহবনীয় অগ্নিতে হোম করিবে। তাহা হইলে সামসমূহের রসে ও বীর্যে সেই ক্ষতির প্রতিবিধান হইবে।
4.17.7-8 যেমন লবণদ্বারা সোনাকে, সোনাদ্বারা রূপাকে, রূপাদ্বারা রাংকে, রাংদ্বারা সীসাকে, সীসাদ্বারা লোহাকে এবং লোহা ও চর্মদ্বারা কাঠকে সংযোজিত করা হয়, তেমনি এই লোকসমূহের, এই দেবগণের এবং এই ত্রয়ীবিদ্যার বীর্য দ্বারা যজ্ঞের অনিষ্টের প্রতিবিধান করা হয়। এইরকম জ্ঞানসম্পন্ন ব্রহ্ম যে যজ্ঞে ঋত্বিক্ হন, সেই যজ্ঞ সুচিকিৎসিত (সংস্কৃত) হয়।
4.17.9 এই রকম জ্ঞানসম্পন্ন ব্রহ্মা যে যজ্ঞের ঋত্বিক্ সেই যজ্ঞ উত্তরায়ণ পথে যাইবার উপায়স্বরূপ। এই প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন ব্রহ্মার বিষয়ে এইরকম একটি গাথা আছে—’যে যে স্থানে ক্ষত হয় ব্রহ্মা সেই সেই স্থানে যান (কিংবা যেখানে যেখানে মন্ত্রের আবৃত্তি হয় সেই সেই স্থানে ব্রহ্মা যান।’
4.17.10 মননশীল (বা মৌনাবলম্বী) ব্রহ্মাই একমাত্র ঋত্বিক্। যেমন ঘোটকী কুরুগণকে (কিংবা যোদ্ধৃগণকে) রক্ষা করিয়া থাকে, তেমনি এইপ্রকার জ্ঞানসম্পন্ন ব্রহ্মা যজ্ঞ, যজমান ও সব ঋত্বিককে রক্ষা করেন। তাই যিনি এই প্রকার জানেন, তাঁহাকেই ব্রহ্মা-ঋত্বিরূপে নিযুক্ত করিবে। যে জানে না তাহাকে নিযুক্ত করিবে না।
পঞ্চম অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – ইন্দ্রিয়গণের বিবাদ — প্রাণের শ্রেষ্ঠত্ব
5.1.1 যিনি জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠকে জানেন তিনি জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠই হন। প্রাণই জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ।
5.1.2 যিনি বসিষ্ঠকে জানেন, তিনি স্বজনের মধ্যে (কিংবা স্বজনের) বসিষ্ঠই হন। বাক্ই বসিষ্ঠ।
5.1.3 যিনি প্রতিষ্ঠাকে জানেন, তিনি ইহলোকে এবং পরলোকে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। চক্ষুই প্রতিষ্ঠা।
5.1.4 যিনি সম্পদকে জানেন, দৈব এবং মানবীয় সমস্ত কাম্যবস্তুই তাঁহার জন্য উপস্থিত হয়। শ্রোত্রই সম্পদ।
5.1.5 যিনি আয়তনকে (অর্থাৎ আশ্রয়কে) জানেন, তিনি স্বজনবর্গের, আয়তনই হন। মনই আয়তন।
5.1.6 এক সময়ে ‘কে শ্রেষ্ঠ’ এই বিষয়ে প্রাণসমূহের মধ্যে কলহ হইয়াছিল। সকলেই বলিল—’আমি শ্রেষ্ঠ, আমি শ্রেষ্ঠ’।
5.1.7 সেই প্রাণিগণ পিতা প্রজাপতির কাছে গিয়া বলিল—ভগবান্, আমাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? তিনি তাহাদিগকে বলিলেন—’তোমাদের মধ্যে যে বাহির হইয়া গেলে শরীর পাপিষ্ঠতর (অর্থাৎ হীন অপেক্ষাও হীনতর) হয়, সেই শ্রেষ্ঠ।’
5.1.8 বাক্ দেহ হইতে বাহির হইয়া গেল। সে এক বৎসর বাহিরে থাকিবার পর ফিরিয়া আসিয়া বলিল—’আমার অভাবে তোমরা কিভাবে বাঁচিয়াছিলে? অন্য ইন্দ্রিয়েরা বলিল—’মূক যেমন কথা বলে না, অথচ নিশ্বাস দ্বারা জীবনধারণা করে, চক্ষু দ্বারা দেখে, কর্ণ দ্বারা শোনে, মন দ্বারা চিন্তা করে, তেমনি (আমরাও জীবিত ছিলাম)। তারপর বাক্ দেহে প্রবেশ করিল।
5.1.9 তখন চক্ষু দেহ হইতে চলিয়া গেল। সে এক বছর প্রবাসে কাটাইয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘আমার অভাবে তোমরা কি করিয়া বাঁচিয়াছিলে?” (অন্য ইন্দ্রিয়েরা বলিল)— ‘অন্ধ যেমন দেখিতে পায় না, অথচ নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়া বাঁচিয়া থাকে, বাগিন্দ্রিয় দ্বারা কথা বলে, কর্ণ দ্বারা শোনে, মন দ্বারা চিন্তা করে, তেমনি (আমরা জীবিত ছিলাম)।’ তখন দর্শনেন্দ্রিয় দেহে প্রবেশ করিল।
5.1.10 তারপর কর্ণ দেহ ছাড়িয়া চলিয়া গেল। সে এক বছর প্রবাসে কাটাইয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘আমার অভাবে তোমরা কিভাবে বাঁচিয়াছিলে?’ (অন্য সব ইন্দ্রিয়েরা বলিল)——’যেমন বধিরেরা শুনিতে পায় না, অথচ নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়া বাঁচিয়া থাকে, বাগিন্দ্রিয় দ্বারা কথা বলে, চক্ষু দ্বারা দেখে, মন দ্বারা চিন্তা করে, তেমনি (আমরাও জীবিত ছিলাম)।’ তখন কর্ণ দেহে প্রবেশ করিল।
5.1.11 তখন মন দেহ ছাড়িয়া গেল। সে এক বছর প্রবাসে কাটাইয়া ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘আমার অভাবে তোমরা কিভাবে বাঁচিয়াছিলে?’ অন্য ইন্দ্রয়েরা বলিল, ‘শিশু যেমন চিন্তা করে না, কিন্তু নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়া বাঁচে, বাক্ দ্বারা কথা বলে, চক্ষু দ্বারা দেখে, কর্ণ দ্বারা শোনে, তেমনি (আমরাও জীবিত ছিলাম)। ‘ তখন মন দেহে প্রবেশ করিল।
5.1.12 যখন প্রাণ দেহ ছাড়িবার ইচ্ছা প্রকাশ করিল, তখন উৎকৃষ্ট অশ্ব যেমন পা বাঁধিয়া রাখিবার খুঁটিসমূহ উৎপাটিত করে, তেমনি প্রাণও অন্য ইন্দ্রিয়গুলিকে উৎপাটিত করিবার উপক্রম করিল। তখন তাহারা প্রাণের নিকট যাইয়া বলিল— ‘ভগবান্, আপনিই আমাদের প্রভু হউন; আপনিই আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আপনি ছাড়িয়া যাইবেন না’।
5.1.13 তখন বাক্ তাহাকে বলিল ‘আমি যদি বসিষ্ঠ হই, তাহা হইলে আপনিও বসিষ্ঠ (কিংবা আপনিও সেই প্রকার বসিষ্ঠ)।’ তাহার পর চক্ষু তাহাকে বলিল—‘আমি যদি প্রতিষ্ঠা হই, তাহা হইলে আপনিও প্রতিষ্ঠা (কিংবা আপনি সেই প্রকার প্রতিষ্ঠা)।’
5.1.14 তারপর কর্ণ বলিল—’আমি যদি সম্পদ হই, তবে আপনিও সম্পদ (কিংবা সেই প্রকার সম্পদ)।’ মন বলিল, ‘আমি যদি আয়তন হই, আপনিও আয়তন (কিংবা সেই প্রকার আয়তন অর্থাৎ আশ্রয়)।’
5.1.15 এইজন্য পণ্ডিতেরা ইন্দ্রিয়বর্গকে বাক বলেন না, চক্ষু বলেন না, কর্ণ বলেন না, মন বলেন না, ইহাদের প্রাণই বলিয়া থাকেন। প্রাণই এই সব হইয়াছেন।
দ্বিতীয় খণ্ড – প্রণোপাসনা
5.2.1 মুখ্য প্রাণ জিজ্ঞাসা করিল, ‘আমার অন্য কি হইবে?” অন্ন ইন্দ্রিয়েরা বলিল, ‘কুকুর ও শকুনি হইতে আরম্ভ করিয়া যাহা কিছু আছে তাহার সমস্তই।’ এই সবই প্রাণের অন্ন। ‘অন’ এই নাম সাক্ষাৎ (প্ৰাণবাচক)। যিনি এই রকম জানেন তাঁহার নিকট কিছুই অভক্ষ্য নয়।
5.2.2 প্রাণ জিজ্ঞাসা করিল— ‘আমার বসন কি হইবে?” তাহারা বলিল ‘জল (আপনার বস্ত্র হইবে)।’ তাই লোকে ভোজনের পূর্বে ও পরে অন্নকে জল দিয়া বেষ্টন করে। (যিনি এইরকম জানেন তিনি) অন্ন-বস্ত্র লাভ করেন, কখনো নগ্ন থাকেন না।
5.2.3 সত্যকাম জাবাল ব্যাঘ্রপদের পুত্র গোশ্রুতিকে এই উপদেশ দিয়া বলিয়াছিলেন—যদি নীরস বৃক্ষকাণ্ডকেও এই উপদেশ দেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহাতেও শাখা উদ্গত এবং পত্ররাশি আবির্ভূত হইতে পারে।
5.2.4 যদি কেহ মহত্ত্ব লাভ করিতে ইচ্ছা করে তবে সে অমাবস্যাতে দীক্ষা নিয়া পূর্ণিমা-রাত্রিতে নানা প্রকার ওষধি মিশাইয়া পেষণ করিবে। সেই মন্থকে দধি ও মধুর সহিত মিলাইয়া ‘জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠের উদ্দেশে স্বাহা’ বলিয়া অগ্নিতে ঘৃত এবং মন্থন—পাত্রে সম্পাৎ (হোমের অবশিষ্টাংশ) নিক্ষেপ করিবে।
5.2.5 বসিষ্ঠের উদ্দেশে স্বাহা—এই বলিয়া অগ্নিতে আহুতি দিয়া মন্থে সম্পাত নিক্ষেপ করিবে। প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে স্বাহা— এই বলিয়া অগ্নিতে আহুতি দিয়া মন্থে সম্পাত নিক্ষেপ করিবে। সম্পদের উদ্দেশে স্বাহা— এই বলিয়া অগ্নিতে আহুতি দিয়া মন্ধে সম্পাত নিক্ষেপ করিবে। আয়তনের উদ্দেশে স্বাহা— এই বলিয়া অগ্নিতে আহুতি দিয়া মন্থে সম্পাত নিক্ষেপ করিবে।
5.2.6 তারপর অগ্নি হইতে কিছু দূরে সরিয়া মন্থ হাতে নিয়া এই মন্ত্র জপ করিবে— হে মন্থ (অর্থাৎ হে প্ৰাণ), তোমার নাম অম; এই সবকিছু তোমাতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি (অর্থাৎ মন্থরূপী প্রাণ) জ্যেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ, দীপ্তিমান এবং অধিপতি। তিনি আমাকে জ্যেষ্ঠত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, দীপ্তি ও আধিপত্য দান করুন। আমি সর্বাত্মক হইতে চাই।
5.2.7 তারপর এই ঋকের প্রত্যেক পদ উচ্চারণ করিয়া (মন্থ) ভোজন করিবে। ‘তৎ সবিতুর্বণীমহে’—এই পদ উচ্চারণ করিয়া এক গ্লাস ‘বয়ম্ দেবস্য ভোজনম্’— এই পদ উচ্চারণ করিয়া এক গ্রাস এবং ‘শ্রেষ্ঠম্ সর্বধাতমম্’—এই পদ উচ্চারণ করিয়া এক গ্রাস ভোজন করিবে। ‘তুরং ভগস্য ধীমহি’—এই পদ উচ্চারণ করিয়া কংস পাত্রই হউক বা চমস পাত্রই হউক, তাহা ধুইয়া সবটুকু পান করিবে। ইহার পর বাক্য ও চিত্তকে সংযত করিয়া অগ্নির পিছন দিকে কিংবা মাটিতে শয়ন করিবে। সে যদি স্বপ্নে স্ত্রীলোক দেখে তবে তাহার কর্ম সফল হইয়াছে মনে করিতে হইবে।
5.2.8 সে বিষয়ে শ্লোক আছে— ফলকামনায় কাজ করিতে গিয়া যদি স্বপ্নে স্ত্রীলোক দর্শন হয় তবে সেই স্বপ্ন-নিদর্শন হইতে জানিবে যে, কর্মে সিদ্ধিলাভ হইয়াছে।
তৃতীয় খণ্ড – শ্বেতকেতু-প্রবাহণ-সংবাদ
5.3.1 একদিন শ্বেতকেতু আরুণেয় পঞ্চালসভাতে গেল। (সেখানে) প্রবাহণ জৈবলি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কুমার, (তোমার) পিতা কি তোমাকে উপদেশ দিয়েছেন?’ শ্বেতকেতু বলিল— ‘ভগবান, তিনি দিয়াছেন।’
5.3.2 প্রবাহণ জিজ্ঞাসা করিলেন—’প্রাণিগণ মৃত্যুর পর ঊর্ধ্বে কোন্ দেশে যায় তাহা কি জান?’ শ্বেতকেতু বলিল—’ভগবান্ জানি না।’ প্রবাহণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘যে ভাবে প্রাণিগণ ফিরিয়া আসে তাহা কি জান?’ শ্বেতকেতু বলিল— ‘ভগবন্, জানি না।’ প্রবাহণ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘দেবযান ও পিতৃযাণ কোথায় পৃথক হইয়াছে, তাহা জান কি?” শ্বেতকেতু বলিল, ‘ভগবান্, জানি না।’
5.3.3 প্রবাহণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কি জান ঐ লোক (অর্থাৎ পিতৃলোক) কেন (জীবদ্বারা) পূর্ণ হয় না?” শ্বেতকেতু বলিল, ‘ভগবান্ জানি না।’ প্রবাহণ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কি জান পঞ্চমী আহুতিতে জলকে কেন পুরুষ বলা হয়? ‘ভগবান্ জানি না।’
5.3.4 তখন প্রবাহণ বলিলেন, ‘তবে কেন বলিলে আমি উপদিষ্ট হইয়াছি? যে এসব বিষয় জানে না, সে কি করিয়া বলে ‘আমি উপদেশ পাইয়াছি?’ শ্বেতকেতু মনের দুঃখে পিতার নিকট ফিরিয়া আসিল এবং তাঁহাকে বলিল—’আপনি আমাকে উপদেশ না দিয়াই বলিয়াছিলেন— তোমাকে শিক্ষা দিয়াছি।’
5.3.5 (শ্বেতকেতু)——সেই রাজন্যবন্ধু আমাকে পাঁচটি প্রশ্ন করিয়াছিল। আমি তাহার একটিরও উত্তর দিতে পারি নাই। পিতা (এই সমুদয় প্রশ্নের বিষয় মনে মনে আলোচনা করিয়া সময়ান্তরে) বলিলেন—’তুমি তখন (অর্থাৎ রাজার নিকট হইতে ফিরিয়া) আমাকে যে সব প্রশ্নের কথা বলিয়াছিলে (সেই বিয়য়ে আমার বক্তব্য আমি বলি, শুন)। যেহেতু আমি ইহার একটিও জানি না (সেইজন্য তোমাকে এ বিষয়ে উপদেশ দিই নাই)। যদি আমি জানিবই তবে কেনই বা তোমাকে না বলিব?”
5.3.6 (তারপর) গৌতম রাজভবনে উপস্থিত হইলেন। রাজা অভ্যাগতকে সমাদর করিলেন প্রাতঃকালে রাজা সভায় উপস্থিত হইলেন, গৌতমও সেখানে গেলেন। রাজা তাঁহাকে বলিলেন—’ভগবান্ গৌতম মনুষ্যসুলভ বিত্তের জন্য বর প্রার্থনা করুন। গৌতম বলিলেন, “হে রাজন, বিত্ত আপনারই থাকুক। আপনি আমার পুত্রকে যাহা বলিয়াছিলেন, আমাকে তাহাই বলুন।’ এই কথা শুনিয়া রাজা বিষণ্ন হইলেন।
5.3.7 রাজা তাঁহাকে আদেশ করিলেন—’দীর্ঘকাল (আমার নিকট ব্রহ্মচারীরূপে) বাস কর।’ (এইরূপ দীর্ঘকাল বাস করিবার পর একদিন রাজা) তাঁহাকে বলিলেন— ‘তুমি যে আমাকে সেই বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে—। তোমার পূর্বে পুরাকালে কোন ব্রাহ্মণই এই বিদ্যা লাভ করে নাই। (ইহা কেবল ক্ষত্রিয়গণই জানিত); এইজন্য সর্বলোকে ক্ষত্রিয়দিগেরই (এ বিষয়ে উপদেশ দিবার) ক্ষমতা ছিল।’ ইহার পর তিনি উপদেশ দিলেন—।
চতুর্থ খণ্ড – (পঞ্চ প্রশ্নের উত্তর) প্রবাহণ-কথিত পঞ্চাগ্লিবিদ্যা (১)
5.4.1 হে গৌতম, দ্যুলোকই (যজ্ঞের) অগ্নি, আদিত্য তাহার কাষ্ঠ, রশ্মিসমূহ ধূম, দিনই শিখা, চন্দ্ৰই অঙ্গার এবং নক্ষত্রগণই স্ফুলিঙ্গ।
5.4.2 দেবগণ সেই অগ্নিতে শ্রদ্ধাকে আহুতি দেন। সেই আহুতি হইতে সোমরাজা চন্দ্র উৎপন্ন হয়।
পঞ্চম খণ্ড – প্রবাহণ-কথিত পঞ্চাগ্নিবিদ্যা (২)
5.5.1 হে গৌতম, পর্জন্যই অগ্নি, বায়ুই তাহার কাষ্ঠ, মেঘ ধূম, বিদ্যুৎ শিখা, বজ্রই অঙ্গার, মেঘগর্জনই স্ফুলিঙ্গ।
5.5.2 সেই অগ্নিতে দেবগণ সোমরাজকে আহুতি দেন। সেই আহুতি হইতে বৃষ্টি উৎপন্ন হয়।
ষষ্ঠ খণ্ড – প্রবাহণ-কথিত পঞ্চাগ্নিবিদ্যা (৩)
5.6.1 হে গৌতম, পৃথিবীই অগ্নি; সম্বৎসর ইহার সমিধ; আকাশই ধূম, রাত্রিই শিখা; (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম) দিকসমূহ অঙ্গার; (ঈশান, নৈর্ঝত প্রভৃতি) অবান্তর কোণসমূহই স্ফুলিঙ্গ।
5.6.2 সেই অগ্নিতে দেবগণ বৃষ্টিকে আহুতি দেন। সেই আহুতি হইতে অন্ন উৎপন্ন হয়।
সপ্তম খণ্ড – প্রবাহণ-কথিত পঞ্চাগ্নিবিদ্যা (8)
5.7.1 হে গৌতম, পুরুষ অগ্নি, বাক্ই তাহার সমিত্, প্রাণ ধূম, জিহ্বা শিখা, চক্ষু অঙ্গার, কর্ণ স্ফুলিঙ্গ।
5.7.2 সেই অগ্নিতে দেবগণ অন্নকে আহুতি দেন, সেই আহুতি হইতে শুক্র উৎপন্ন হয়।
Chapter VIII — The Five Fires (V)
5.8.1 হে গৌতম, নারীই অগ্নি, উপস্থ তারার সমিধ (ইন্ধন), যে সম্ভাষণ করা হয় তাহাই ধূম, জননেন্দ্রিয় অর্চি (শিখা), মৌথুন অঙ্গার এবং স্বল্পসুখই স্ফুলিঙ্গ (অগ্নিকণা)।
5.8.2 সেই শ্রীরূপ অগ্নিতে দেবগণ শুক্র আহুতি দেন। সেই আহুতি হইতে গর্ভসঞ্চার হয়।
নবম খণ্ড – পঞ্চাগ্নিবিদ্যার উপসংহার (১)
5.9.1 এইভাবেই পঞ্চম আহুতিতে জল পুরুষ আখ্যা পায়। জরায়ু দ্বারা আবৃত সেই গর্ভ নয় বা দশ মাস, বা যতদিন আবশ্যক হয়, জঠরে বাস করিবার পর জন্মলাভ করে।
5.9.2 (সন্তান) জন্মগ্রহণ করিয়া যতদিন তাহার আয়ু ততদিন জীবিত থাকে। যথা নির্দিষ্ট রূপে দেহত্যাগ করিবার পর তাহাকে (অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য) সেই অগ্নিতে লইয়া যাওয়া হয়। ঐ অগ্নি হইতেই সে আসিয়াছে, তাহা হইতেই সে উৎপন্ন হইয়াছে।
দশম খণ্ড – পঞ্চাগ্নিবিদ্যার উপসংহার (২) দেবযান, পিতৃযাণ ও পুনরাবর্তন
5.10.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র) যাঁহারা পঞ্চাগ্নিবিদ্যা জানেন এবং যাঁহারা অরণ্যে শ্রদ্ধা ও তপস্যার উপাসনা করেন তাঁহারা (মৃত্যুর পর) অর্চিতে গমন করেন। অর্চি হইতে দিনে, দিন হইতে শুক্লপক্ষে, শুক্লপক্ষ হইতে উত্তরায়ণে ছয় মাসে গমন করেন। মাসসমূহ হইতে সংবৎসরে, সংবৎসর হইতে আদিত্যে, আদিত্য হইতে চন্দ্রে, চন্দ্র হইতে বিদ্যুতে গমন করেন। সেই স্থানে এক অমানব পুরুষ তাহাদিগকে ব্ৰহ্মলাভ করায়। ইহাই দেবযান পথ।
5.10.3 আর যাহারা গ্রামে ইষ্টাপূর্ত, দান ইত্যাদির অনুষ্ঠান করে, তাহারা মৃত্যুর পর ধূমে গমন করে। ধূম হইতে রাত্রিতে, রাত্রি হইতে কৃষ্ণপক্ষে, কৃষ্ণপক্ষ হইতে দক্ষিণায়নের ছয়মাসে গমন করে। ইহারা সংবৎসরে গমন করে না।
5.10.4 মাসসমূহ হইতে পিতৃলোকে, পিতৃলোক হইতে আকাশে, আকাশ হইতে চন্দ্রলোকে গমন করে। এই চন্দ্রই সোমরাজা; ইহা দেবতাদিগের অন্ন; ইহাকেই দেবগণ ভক্ষণ করেন।
5.10.5-6 (৫ম ও ৬ষ্ঠ মঃ) যে পর্যন্ত কর্মক্ষয় না হয়, সে পর্যন্ত চন্দ্ৰমণ্ডলে বাস করিয়া যে পথে গিয়াছিল সেই পথেই ফিরিয়া আসে। (চন্দ্রমণ্ডল হইতে) আকাশে এবং আকাশ হইতে বায়ুতে যায়। বায়ু হইয়া ধূম হয় এবং ধূম হইতে অভ্র হয়। অভ্র হইয়া মেঘ হয়; মেঘ হইয়া বর্ষণ করে। তারপর তাহারা এই পৃথিবীতে ব্রীহি ও যব, ওষধি ও বনস্পতি, তিল ও মাষ— এই সব হইয়া জন্মায়। এই অবস্থা হইতে নিঃসরণ অত্যন্ত কঠিন। যে যে প্রাণী অন্ন ভোজন করে ও সন্তান উৎপন্ন করে ইহাই সেই সব প্রাণিরূপে আবার জন্মগ্রহণ করে। (অর্থাৎ ব্রীহি যবাদিরূপে অবস্থিত আত্মা অন্নরূপে সেই সেই প্রাণীর দেহে প্রবেশ করিয়া রেতোরূপ ধারণ করে)।
5.10.7 তাহাদের মধ্যে যাহারা (পূর্বজন্মে) এই পৃথিবীতে শোভন কর্ম করিয়াছিল, তাহারা শীঘ্রই ব্রাহ্মণযোনি, ক্ষত্রিয়যোনি বা বৈশ্যযোনিতে জন্মলাভ করে। আর যাহারা এই পৃথিবীতে কুৎসিত কর্ম করিয়াছিল, তাহাদের শীঘ্র জন্ম হয় কুকুরযোনি, শূকরযোনি বা চণ্ডালযোনিতে।
5.10.8 যাহারা এই দুইটির কোনটি দ্বারাই যায় না, তাহারা নিত্য আবর্তনশীল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণিরূপে জন্মায়। (ইহাদের বিষয়ে বলা যায়)— জন্মাও আর মর। অর্থাৎ ইহারা এতই ক্ষণস্থায়ী যে জন্মগ্রহণ করা মাত্রই মরিয়া যাইতেছে। সুতরাং জন্মমৃত্যু ছাড়া ইহাদের জীবনের অন্য কোন ঘটনা নাই—ইহাই তৃতীয় স্থান। এই জন্যই ঐ লোক (অর্থাৎ চন্দ্ৰলোক) পূর্ণ হইতেছে না। সুতরাং সংসার-গতিকে ঘৃণা করিবে। এবিষয়ে এই শ্লোক আছে—।
5.10.9 সুবর্ণচোর, সুরাপায়ী, গুরুপত্নীগামী এবং ব্রহ্মঘাতক—এই চারিজন পতিত হয় এবং ইহাদিগের সহিত যে সংসর্গ করে, সেই পঞ্চম ব্যক্তিও পতিত হয়।
5.10.10 কিন্তু যিনি এই পঞ্চাগ্নিবিদ্যা জানেন, তিনি ইহাদিগের সংসর্গ করিয়াও পাপ দ্বারা লিপ্ত হন না। যিনি ইহা জানেন তিনি শুদ্ধ ও পূত; তিনি পুণ্যলোকে যান।
একাদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুবাহ্মণ-সংবাদ — বৈশ্বানর (১)
5.11.1 উপমন্যুর পুত্র প্রাচীনশাল, পুলুষপুত্র সত্যযজ্ঞ, ভাল্লুবিপুত্ৰ ইন্দ্ৰদ্যুম্ন, শর্করাক্ষপুত্র জন এবং অশ্বতরাশ্ব পুত্র বুড়িল— এই কয় মহাগৃহস্থ এবং বেদজ্ঞানী মিলিত হইয়া এই বিচার করিয়াছিলেন—’কে আমাদিগের আত্মা? ব্ৰহ্ম কি?”
5.11.2 তাঁহারা (এ বিষয়ে যাহা) স্থির করিলেন (তাঁহাদিগের মধ্যে একজন অপর সরলকে তাহা বলিলেন) ‘ভগবানগণ, উদ্দালক আরুণি এই বৈশ্বানর আত্মার বিষয় জানেন। চলুন তাঁহার নিকট যাই।’ তারপর তাঁহারা তাঁহার নিকট গেলেন।
5.11.3-4 উদ্দালক (মনে মনে) এই স্থির করিলেন— এই সকল মহাগৃহস্থ মহাশ্রোত্রিয় আমাকে প্রশ্ন করিবেন। সম্ভবত আমি সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিব না। ইহাদিগকে অন্য উপদেষ্টার কথা বলিয়া দি। এই প্রকার স্থির করিয়া তখন তিনি তাহাদিগকে বলিলেন—’হে ভগবানৃগণ, সম্প্রতি কৈকয়পুত্র অশ্বপতি এই বৈশ্বানর আত্মার বিষয় জানেন। চলুন আমরা তাঁহার নিকট যাই।’ তখন তাঁহারা তাঁহার নিকট গেলেন।
5.11.5 অশ্বপতি সেই অভ্যাগতদের প্রত্যেককে পৃথক পৃথক পূজা করাইলেন। (পরদিন) প্রাতে উঠিয়া তিনি তাঁহাদিগকে বলিলেন—’আমার রাজ্যে কোন চোর নাই অবিদ্বান নাই, কদর্য (কৃপণ) ব্যক্তি নাই, আহিতাগ্নি নয় এমন ব্রাহ্মণ নাই, কোন ব্যভিচারীও নাই—ব্যভিচারিণী কোথা হইতে আসিবে? ভগবাগণ, আমি যজ্ঞ করিতেছি; এক একজন ঋত্বিক্কে আমি যত ধন দিব, আপনাদেরও সেই পরিমাণই দিব। আপনারা এখানে বাস করুন। ‘
5.11.6 তাঁহারা তাঁহাকে বলিলেন— মানুষ যে উদ্দেশ্যে আগমন করে তাহাই প্রথমে বলিয়া থাকে। আপনি বৈশ্বানর আত্মার বিষয় জানেন, এখন তাহাই আমাদিগকে বলুন।
5.11.7 তিনি তাহাদিগকে বলিলেন—’প্রাতে আপনাদিগকে উত্তর দিব।’ তাহারা সমিধ হাতে পরদিন পূর্বাহ্নে আবার তাঁহার নিকট গেলেন। তিনি তাঁহাদের ‘উপনীত’ না করিয়াই বলিলেন।
দ্বাদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (২)
5.12.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্ৰ)——হে ঔপমন্যব! তুমি কাহাকে আত্মারূপে উপাসনা কর?’ ঔপমন্যব বলিলেন ‘হে ভগবান রাজা; আমি দ্যুলোককেই আত্মা বলিয়া উপাসনা করি।’ অশ্বপতি বলিলেন—’তুমি যাঁহাকে আত্মা বলিয়া উপাসনা কর, ইনি নিশ্চয়ই অতি তেজোময় বৈশ্বানর আত্মা। এই জন্য তোমার কুলে সুত, প্রসুত ও আসুত দেখা যায়। এই জন্য অন্নভোজন করিতেছ, প্রিয়জন বা প্রিয়বস্তু দেখিতেছ (অর্থাৎ লাভ করিতেছ)। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে উপাসনা করেন, তিনি অন্ন ভোঁজন করেন, প্রিয়জনকে দেখেন এবং তাঁহার কুলে ব্রহ্মতেজ বর্তমান থাকে। কিন্তু এই দ্যুলোক আত্মার মস্তক মাত্র। তুমি যদি আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য আমার নিকটে না আসিতে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িত।
ত্রয়োদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৩)
5.13.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র) তারপর রাজা সত্যযজ্ঞ পৌলুষিকে বলিলেন— ‘প্রাচীনযোগ্য, তুমি কাহাকে আত্মারূপে উপাসনা কর?’ সত্যযজ্ঞ বলিলেন— ‘ভগবান্ রাজা, আদিত্যকেই।’ রাজা বলিলেন— ‘তুমি যাঁহার উপাসনা কর, তিনি বিশ্বরূপ নামে বৈশ্বানর আত্মা। সেই জন্য তোমার কুলে সকল সম্পদ দেখা যায়। অশ্বতরীতে টানা রথ, দাসী, কণ্ঠহার— এই সবই তোমার জন্য প্রস্তুত; তুমি অন্নভোজন করিতেছ ও প্রিয়বস্তু দেখিতেছ। যিনি এইরূপে বৈশ্বানর আত্মাকে উপাসনা করেন, তিনি অন্নভোজী হন, প্রিয়বস্তু দেখেন এবং তাঁহার কুলে ব্রহ্মতেজ বর্তমান থাকে। (কিন্তু) এই (আদিত্য) আত্মার চক্ষুমাত্র। তুমি যদি (আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য) আমার নিকট না আসিতে, তবে তুমি অন্ধ হইয়া যাইতে।’
চতুর্দশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৪)
5.14.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র) অশ্বপতি ইন্দ্রদ্যুম্ন ভাল্লবেয়কে বলিলেন— ‘হে বৈয়াঘ্রপদ্য, তুমি কাহাকে আত্মারূপে উপাসনা কর?” ভাল্লবেয় বলিলেন, “ভগবান্ রাজন, বায়ুকেই।’ অশ্বপতি বলিলেন, ‘তুমি যাঁহার উপাসনা কর, তিনি পৃথক্ত্মা নামক বৈশ্বানর আত্মা। সেই জন্য পৃথক্ পৃথক্ অর্থাৎ নানারকম বলি উপহার তোমার নিকট আসে এবং নানা রথশ্রেণী তোমার অনুগমন করে। (সেই জন্য) তুমি অন্নভোজন করিতেছ। যিনি বৈশ্বানর আত্মাকে এইভাবে উপাসনা করেন তিনি অন্নভোজন করেন, প্রিয়বস্তু দেখেন এবং তাঁহার কুলে ব্রহ্মতেজ বর্তমান থাকে। কিন্তু এই বায়ু আত্মার প্রাণ (অর্থাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাস) মাত্র। যদি তুমি (আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য) আমার নিকট না আসিতে তোমার প্রাণ বাহির হইয়া যাইত। ‘
পঞ্চদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষড়ব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৫)
5.15.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—ইহার পর অশ্বপতি জনকে বলিলেন, “হে শার্করাক্ষ্য, তুমি কাহাকে আত্মা বলিয়া উপাসনা কর?’ জন বলিল, ‘ভগবান্ রাজা, আকাশকেই (আমি আত্মা বলিয়া উপাসনা করি)।’ রাজা বলিলেন—’তুমি যাঁহাকে উপাসনা কর, তিনি বহুল নামে বৈশ্বানর আত্মা; সেইজন্য তুমি সন্ততি ও ধরে বহুল (সমৃদ্ধ) হইয়াছ। (সেইজন্য) অন্ন ভোজন করিতেছ, এবং প্রিয়বস্তু দেখিতেছ। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে উপাসনা করেন, তিনি অন্নভক্ষণ করেন, প্রিয়বস্তু দেখেন; তাঁহার কুলে ব্ৰহ্মতেজ বিদ্যমান থাকে। (কিন্তু) এই আকাশ আত্মার মধ্যদেহ। যদি তুমি (আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য) আমার কিট না আসিতে, তবে তোমার শরীরের মধ্যভাগ বিশীর্ণ হইত।’
ষোড়শ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৬)
5.16.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—তারপর অশ্বপতি বুড়িল অশ্বতরাশ্বিকে বলিলেন— ‘হে বৈয়াঘ্রপদ্য, তুমি কাহাকে আত্মারূপে উপাসনা কর?” বুড়িল বলিলেন— ‘ভগবান্ রাজা, জলকেই (আমি আত্মারূপে উপাসনা করি)।’ রাজা বলিলেন— ‘তুমি যাহাকে উপাসনা কর, তিনি রয়ি নামক বৈশ্বানর আত্মা। সেইজন্য তুমি ধনবান এবং পুষ্টিমান। সেইজন্য অন্নভোজন করিতেছ, প্রিয়বস্তু দেখিতেছ। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে উপাসনা করেন, তিনি অন্ন ভোজন করেন, প্রিয়বস্তু দেখেন, তাঁহার কুলে ব্রহ্মতেজ বর্তমান থাকে। (কিন্তু) এই জল আত্মার বস্তিদেশ (মূত্রাশয়)। তুমি যদি (আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য) আমার নিকট না আসিতে, তবে তোমার মূত্রাশয় বিদীর্ণ হইয়া যাইত। ‘
সপ্তদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষডুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৭)
5.17.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—তখন অশ্বপতি উদ্দালক আরুণিকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’গৌতম, তুমি কাহাকে আত্ম বলিয়া উপাসনা কর?’ উদ্দালক বলিলেন, ‘ভগবান্ রাজা, পৃথিবীকেই (আমি আত্মা বলিয়া উপাসনা করি)।’ রাজা বলিলেন– ‘তুমি যাহাকে উপাসনা কর, তিনি প্রতিষ্ঠা নামক বৈশ্বানর আত্মা। সেইজন্য তুমি সন্ততি ও পশুলাভ করিয়া প্রতিষ্ঠা পাইয়াছ। (সেই জন্য) তুমি অন্ন ভোজন করিতেছ, প্রিয়বস্তু দেখিতেছ। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে উপাসনা করেন, তিনি অন্ন ভোজন করেন, প্রিয়বস্তু লাভ করেন, তাঁহার কুলে ব্রহ্মতেজ বিদ্যমান থাকে। (কিন্তু) ইহা আত্মার দুইটি পা মাত্র। যদি তুমি (আত্মতত্ত্ব শিখিবার জন্য) আমার নিকট না আসিতে, তবে তোমার পা দুটিও শিথিল হইয়া যাইত।’
অষ্টাদশ খণ্ড – অশ্বপতি ও ষড়ুব্রাহ্মণ-সংবাদ—বৈশ্বানর (৮)
5.18.1 অশ্বপতি বলিলেন— (এই বৈশ্বানর আত্মা পৃথক পৃথক নন)। কিন্তু তোমরা ইঁহাকে পৃথক পৃথক কল্পনা করিয়া অন্নভোজন করিতেছ। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে প্রাদেশমাত্র ও অভিবিমান (সর্বত্র ব্যাপ্ত ও অপরিমেয়) রূপে উপাসনা করেন, তিনি সর্বলোকে, সর্বভূতে ও সর্ব আত্মাতে অন্নভোজন করেন।
5.18.2 ‘সুতেজা’ এই বৈশ্বানর আত্মার মস্তক; ‘বিশ্বরূপ’ ইহার চক্ষু; ‘পৃথগ্ বর্থাত্মা” প্রাণ; ‘বহুল’ শরীরের মধ্যভাগ; ‘রয়ি’ বস্তি এবং পৃথিবী ইহার দুই পা; ‘বেদি’ ইহার বক্ষ; কুশ লোম; গার্হপত্য অগ্নি হৃদয়; দক্ষিণাগ্নি মন এবং আহ আহবনীয় অগ্নি ইহার মুখ।
ঊনবিংশ খণ্ড – প্রাণাগ্নিহোত্ৰ (১)
5.19.1 সেই জন্য যে অন্ন প্রথম উপস্থিত হয় তাহা (অর্থাৎ অন্নের প্রথম অংশ) হোমের জন্য। অন্নভোক্তা প্রথমে যে আহুতি অর্পণ করেন তাহা ‘প্রাণায় স্বাহা” বলিয়া অর্পণ করিবে। ইহাতে প্রাণ তৃপ্ত হয়। [এখনও অনেকে অন্নভোজন করিবার সময় কল্পনা করেন যে, প্রথম গ্রাসকে প্রাণের উদ্দেশে, দ্বিতীয় গ্রাসকে ব্যানের উদ্দেশে, তৃতীয় গ্রাসকে অপানের উদ্দেশে, চতুর্থ গ্রাসকে সমানের উদ্দেশে এবং পঞ্চম গ্ৰাসকে উদানের উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হইল।]
5.19.2 প্রাণ তৃপ্ত হইলে চক্ষু, চক্ষু তৃপ্ত হইলে আদিত্য, আদিত্য তৃপ্ত হইলে স্বর্গলোক তৃপ্ত হয়। স্বর্গলোক তৃপ্ত হইলে, দ্যুলোক আদিত্যে যাহা কিছু আছে, সে সবই তৃপ্ত হয়। এই তৃপ্তির ফলস্বরূপ ভোক্তাও সন্ততি, পশুসমূহ, অনাদি, দেহকান্তি ও ব্রহ্মতেজ লাভ করিয়া তৃপ্ত হন।
বিংশ খণ্ড – প্রাণাগ্নিহোত্র (২)
5.20.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র) তাহার পর যাহাকে দ্বিতীয় আহুতিরূপে অৰ্পণ করিবে, তাহাকে ‘ব্যানায় স্বাহা” (ব্যানের উদ্দেশে স্বাহা) এই বলিয়া হোম করিবে। ইহাতে ব্যান তৃপ্ত হয়। ব্যান তৃপ্ত হইলে কর্ণ, কর্ণ তৃপ্ত হইলে চন্দ্র, চন্দ্র তৃপ্ত হইলে দিকসমূহ তৃপ্ত হয়; দিকসমূহ তৃপ্ত হইলে, যাহা কিছু দিক ও চন্দ্র কর্তৃক পরিচালিত, সে সবই তৃপ্ত হয়। ভোক্তা এই তৃপ্তির ফলে সন্ততি, পশু, ভোগ্য অন্ন, দেহকান্তি ও ব্রহ্মতেজজনিত তৃপ্তি লাভ করেন।
একবিংশ খণ্ড – প্রাণাগ্নিহোত্র (৩)
5.21.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র) তাহার পর যাহাকে তৃতীয় আহুতিরূপে দিবে তাহাকে ‘অপানায় স্বাহা’ (অপানের উদ্দেশ্যে স্বাহা) এই বলিয়া দিবে। ইহাতে অপান তৃপ্ত হয়। অপান তৃপ্ত হইলে বাগিন্দ্রিয়, বাক্ তৃপ্ত হইলে অগ্নি, অগ্নি তৃপ্ত হইলে পৃথিবী তৃপ্ত হয়; পৃথিবী তৃপ্ত হইলে যাহা কিছু পৃথিবী ও অগ্নি দ্বারা পরিচালিত সে সমস্তই তৃপ্ত হয়। ভোক্তা এই তৃপ্তির ফলে প্রজা, পশু, ভোগ্য অন্ন, দেহলাবণ্য ও ব্রহ্মতেজ লাভ করিয়া তৃপ্ত হন।
দ্বাবিংশ খণ্ড – প্রাণাগ্নিহোত্র (৪)
5.22.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)— অনন্তর যাহাকে চতুর্থী আহুতিরূপে অর্পণ করিবে তাহাকে ‘সমানায় স্বাহা’ (সমানের উদ্দেশ্যে স্বাহা)— এই বলিয়া হোম করিবে। ইহাতে ‘সমান’ তৃপ্ত হয়। ‘সমান’ তৃপ্ত হইলে মন, মন তৃপ্ত হইলে পর্জন্য, পর্জন্য তৃপ্ত হইলে বিদ্যুৎ তৃপ্ত হয়; বিদ্যুৎ তৃপ্ত হইলে, যাহা কিছু বিদ্যুৎ ও পর্জন্য দ্বারা পরিচালিত, সে সবই তৃপ্ত হয়। অন্নভোক্তা এই তৃপ্তির ফলে প্রজা, পশু, ভোগ্য অন্ন, দেহকান্তি ও ব্রহ্মতেজ লাভ করিয়া তৃপ্ত হন।
ত্রয়োবিংশ খণ্ড – প্ৰাণাগ্নিহোত্ৰ (৫)
5.23.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্ৰ অনন্তর যাহাকে পঞ্চমী আহুতিরূপে অর্পণ করিবে, তাহাকে ‘উদানায় স্বাহা’ (উদানের উদ্দেশে স্বাহা) এই বলিয়া অর্পণ করিবে। ইহাতে উদান তৃপ্ত হয়। উদান তৃপ্ত হইলে ত্বক্, ত্বক্ তৃপ্ত হইলে বায়ু, বায়ু তৃপ্ত হইলে আকাশ তৃপ্ত হয়। আকাশ তৃপ্ত হইলে যাহা কিছু বায়ু ও আকাশ কর্তৃক পরিচালিত সে সবই তৃপ্ত হয়। ভোক্তা এই তৃপ্ত হেতু প্রজা, পশু, ভোগ্য অন্ন, দেহকান্তি ও ব্রহ্মতেজ লাভ করিয়া তৃপ্ত হন।
চতুর্বিংশ খণ্ড – প্রাণাগ্নিহোত্র (৬)
5.24.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্ৰ)— যে লোক ইহা অর্থাৎ এই বৈশ্বানর বিদ্যা না জানিয়া অগ্নিহোত্র হোম করে— জ্বলন্ত অঙ্গার ছাড়িয়া ভস্মে আহুতি দিলে যাহা হয়— ইহারও তাহাই হয়। আর যিনি ইঁহাকে এইরূপ জানিয়া অগ্নিহোত্র হোম করেন, তাঁহার সর্বলোকে, সর্বভূতে ও সকল আত্মাতে হোম করা হয়।
5.24.3-5 (৩য়— ৫ম মন্ত্র) যেমন ইষীকার তুলাকে আগুনে দিলে তাহা সম্পূর্ণ দগ্ধ হইয়া যায়, তেমনি যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া অগ্নিহোত্র হোম করেন, তাঁহার সমস্ত পাপ নিঃশেষে দগ্ধ হইয়া যায়। সেই জন্য এই রকম জ্ঞানবান ব্যক্তি যদি চণ্ডালকেও উচ্ছিষ্ট প্রদান করেন, তাহা হইলে বৈশ্বানর আত্মাতেই তাঁহার হোম করা হয়। এ বিষয়ে এই শ্লোক আছে— যেমন এই পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত শিশুগণ মাতার উপাসনা করে (অর্থাৎ সাগ্রহে তাঁহার কাছে গিয়া জড় হয়) তেমনি সকল চরাচর প্রাণী অগ্নিহোত্রের উপাসনা করিয়া থাকে।
ষষ্ঠ অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – আরুণি-শ্বেতকেতু-সংবাদ (১) – একবিজ্ঞানে সর্ববিজ্ঞান
6.1.1 আরুণির শ্বেতকেতু নামে এক পুত্র ছিল। পিতা তাহাকে বলিলেন— ‘শ্বেতকেতু, তুমি ব্রহ্মচর্য নাও। আমাদিগের বংশে কেহই বেদাধ্যয়ন না করিয়া ব্রহ্মবন্ধুর মত হন নাই।’
6.1.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)— শ্বেতকেতু বার বছর বয়সে গুরুগৃহে গিয়া চব্বিশ বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত বেদ অধ্যয়ন করিল। বেদ অধ্যয়নের পর সে গম্ভীরচিত্ত, পাণ্ডিত্যাভিমানী ও অবিনীত হইয়া গৃহে ফিরিল। পিতা তাহাকে বলিলেন— ‘শ্বেতকেতু, তুমি ত মহামনা, পাণ্ডিত্যাভিমানী, অবিনীত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছ। কিন্তু তুমি কি সেই আদেশের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, যাহাতে অশ্রুতবিষয় শোনা যায়, অচিন্তিত বিষয় চিন্তা করা যায় এবং অজ্ঞাত বিষয় জানা যায়?’ শ্বেতকেতু জিজ্ঞাসা করিলেন—’ভগবান কি সেই উপদেশ?”
6.1.4 পিতা বলিলেন, ‘হে সৌম্য, একটি মৃৎপিণ্ড জানিলেই সমস্ত মৃন্ময় বস্তু জানা যায়; বিকার বাক্যের অবলম্বন মাত্র, কেবল একটি নাম। মৃত্তিকাই সত্য (অর্থাৎ মৃন্ময় বস্তু মৃত্তিকারই বিকার; কিন্তু এই বিকার আর কিছুই নহে, ইহা কেবল শব্দাত্মক)। [ভাষায় বলিতে হয়, এইটা ঘট, এইটা সরা, কিন্তু ভাষা দ্বারা পার্থক্য না করিলে সবই মৃত্তিকা হইয়া যায়; সুতরাং মৃত্তিকাই সত্য।
6.1.5-6 (৫ম ও ষষ্ঠ মন্ত্ৰ)— হে সৌম্য, যেমন একটি সুবর্ণপিণ্ড জানিলেই সব সুবর্ণময় বস্তু জানা যায়; বিকার শব্দমূলক, নামমাত্র, এবং সুবর্ণই সত্য (অর্থাৎ সুবর্ণময় বস্তু সুবর্ণেরই বিকার, এই বিকার কেবল শব্দমূলক, কেবল একটি নামমাত্র; ভাষায় বলিতে হয় এইটি কুণ্ডল, এইটি বলয়; কিন্তু ভাষা দ্বারা পার্থক্য না করিলে সমস্ত সুবর্ণময় বস্তু এক সুবর্ণই হইয়া যায়; সুতরাং সুবর্ণই সত্য পদার্থ)। হে সৌম্য, যেমন একটা নরুণকে জানিলে সব লৌহময় বস্তু জানা যায়, বিকার শব্দাত্মক, নামমাত্র, লৌহই সত্য, তেমনি হে সৌম্য, সেই উপদেশ (অর্থাৎ সেই উপদেশ শ্রবণ করিলে অশ্রুত বস্তু শ্রুত হয়, অচিন্তিত বিষয় চিন্তা করা যায় এবং অজ্ঞাত বিষয় জ্ঞাত হয়)।
6.1.7 পুত্র বলিল ‘পূজনীয় উপাধ্যায়গণ নিশ্চয়ই ইহা জানিতেন না। যদি জানিতেনই তবে বলিলেন না কে? সুতরাং আপনিই আমাকে তাহা বলুন।’ পিতা বলিলেন, ‘সৌম্য, তাহাই হউক’।
দ্বিতীয় খণ্ড – সৎস্বরূপ হইতে তেজ, জল ও অন্নের সৃষ্টি
6.2.1 সৌম্য, প্রথমে এই জগৎ এক অদ্বিতীয় সরূপে বর্তমান ছিল। কেহ কেহ বলেন, প্রথমে এই জগৎ এক অদ্বিতীয় ‘অসৎ’ রূপে বর্তমান ছিল এবং সেই অসৎ হইতে সৎ উৎপন্ন হইয়াছে।
6.2.2 কিন্তু সৌম্য, ইহা কি করিয়া হইতে পারে? কি করিয়া অসৎ হইতে সৎ উৎপন্ন হইতে পারে? এই জগৎ পূর্বে এক অদ্বিতীয় সরূপেই বর্তমান ছিল।
6.2.3 সেই সৎ— স্বরূপ আলোচনা করিলেন (বা সঙ্কল্প করিলেন)— “আমি বহু হই, আমি জন্মগ্রহণ করি।’ তারপর তিনি তেজ সৃষ্টি করিলেন। সেই তেজও সঙ্কল্প করিল, ‘আমি বহু হই, আমি জন্মগ্রহণ করি।’ সেই তেজ জল সৃষ্টি করিল। তাই পুরুষ যখন যেখানে শোকার্ত বা ঘর্মাক্ত হয়, সেখানেই তেজ হইতে জল উৎপন্ন হয়।
6.2.4 সেই জল সঙ্কল্প করিল, ‘বহু হই, জাত হই।’ সেই জল অন্ন সৃষ্টি করিল। এই জন্য যেখানে যখন বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে বহু অন্ন উৎপন্ন হয়।
তৃতীয় খণ্ড – আদি দেবত্রয়ের মিশ্রণে জগতের উৎপত্তি
6.3.1 সেই ভূতগণের উৎপত্তির তিনিটি কারণ ইহারা অণ্ডজ, জীবজ ও উদ্ভিজ্জ।
6.3.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্ৰ সেই সৎস্বরূপ দেবতা সঙ্কল্প করিলেন— ‘আচ্ছা, আমি এই জীবাত্মারূপে এই তিন দেবতাতে (তেজ, জল ও অন্ন নামক দেবতাতে) অনুপ্রবিষ্ট হইয়া নাম ও রূপ ব্যক্ত করি। আমি এই তিন দেবতাকে ত্রিবৃৎ ত্রিবৃৎ করি।’ তারপর তিনি জীবাত্মারূপে এই সব দেবতার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া নাম ও রূপ ব্যক্ত করিলেন।
6.3.4 সেই সৎস্বরূপ দেবতা তাহাদিগের প্রত্যেককে ত্রিবৃৎ ত্রিবৃৎ করিয়াছিলেন। হে সৌম্য, এই তিন দেবতা প্রত্যেকে কি প্রকারে ত্রিবৃৎ হইয়াছিলেন, তাহা আমার নিকট জানিয়া লও।
চতুর্থ খণ্ড – অগ্নি-সূর্যাদি সমুদয় বস্তুতে আদি দেবত্রয়ের অবস্থিতি
6.4.1 অগ্নির যে রক্তবর্ণ তাহা তেজের রূপ; শুক্লবর্ণ জলের রূপ এবং কৃষ্ণবর্ণ অন্নের রূপ। সুতরাং অগ্নি হইতে অগ্নিত্ব চলিয়া গেল। সমস্ত বিকারই শব্দাত্মক নামমাত্র। এই তিনটি রূপই কেবল সত্য।
6.4.2 সূর্যের যে লোহিতবর্ণ তাহা তেজের রূপ, তাহার শুক্লবর্ণ জলের রূপ এবং কৃষ্ণবর্ণ অন্নের রূপ। এইভাবে সূর্য হইতে সূর্যত্ব চলিয়া গেল। সব বিকারই শব্দত্মক, নামমাত্র। এই রূপ তিনটিই সত্য।
6.4.3-4 (৩য় ও ৪র্থ মন্ত্র)— চন্দ্রের যে লোহিতরূপ তাহা তেজের রূপ, তাহার যে শুক্লরূপ তাহা জলের রূপ এবং কৃষ্ণরূপ অন্নের রূপ। সুতরাং চন্দ্র হইতে চন্দ্রত্ব চলিয়া গেল। সব বিকারই শব্দাত্মক, নামমাত্র; এই রূপ তিনটিই সত্য। বিদ্যুতের যে লোহিতরূপ তাহা তেজের, শুক্লরূপ জলের এবং ইহার কৃষ্ণরূপ অন্নের। সুতরাং বিদ্যুৎ হইতে বিদ্যুত্ত্ব চলিয়া গেল। বিকার বাক্যমূলক, কেবল একটি নাম। এই যে তিনটি রূপ ইহাই সত্য।
6.4.5 ইহা জানিয়াই পূর্বে মহাগৃহস্থ ও মহাশ্রোত্রিয়গণ বলিয়াছিলেন— আজ হইতে কোন ব্যক্তি আমাদের এমন কিছু বলিতে পারিবে না যাহা আমরা শুনি নাই, চিন্তা করি করি নাই বা আমাদের জানা নাই।’ তাঁহাদের এই রকম বলার কারণ— এই সব অর্থাৎ লোহিতাদি প্রভা তো জ্ঞান হইতেই তাঁহারা জানিয়াছিলেন [অর্থাৎ লোহিতাদিই সত্য আর সমস্ত লোহিতাদির বিকার; সুতরাং লোহিতাদি জানিলেই আর সব জানা যায়]।
6.4.6 যাহা লোহিতের মত মনে হইত অর্থাৎ লোকে যাহাকে লোহিত বলিয়া মনে করিত তাহা তাঁহারা তেজের রূপ বলিয়া বুঝিয়াছিলেন; যাহা শুক্লের মত মনে হইত, তাহা জলের রূপ ও যাহা কৃষ্ণের মত মনে হইত, তাহাকে অন্নের রূপ বলিয়া বুঝিয়াছিলেন।
6.4.7 যাহা কিছু অজ্ঞাত মনে হইত, তাহাও যে এই দেবতাদেরই (অর্থাৎ তেজ, জল ও অন্নেরই) সমষ্টি— তাহারা সে কথা বুঝিয়াছিলেন। সৌম্য, এই তিন দেবতা পুরুষকে পাইয়া প্রত্যেকে যেরূপ ত্রিবৃৎ ত্রিবৃৎ হইয়া থাকে, তাহা আমার নিকট জানিয়া লও।
পঞ্চম খণ্ড – আদি দেবত্রয় হইতে শরীর, মন, প্রাণ ও বাক্যের উৎপত্তি
6.5.1 অন্ন ভুক্ত হইয়া তিনভাগে বিভক্ত হয়। অন্নের স্থূলতম অংশ হয় পুরীষ, মধ্যম ভাগ মাংস এবং সূক্ষ্মতম অংশ হয় মন।
6.5.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)— জল পীত হইয়া তিনভাগে বিভক্ত হয়। জলের স্থূলতম অংশ হয় মূত্র। ঘৃত প্রভৃতি মধ্যম অংশ রক্ত এবং সূক্ষ্মতম অংশ হয় প্ৰাণ। ঘৃত প্রভৃতি তেজস্কর পদার্থ ভুক্ত হইয়া তিনভাগে বিভক্ত হয়। তাহার স্থূলতম অংশ অস্থি হয়, মধ্যম অংশ মজ্জা এবং সূক্ষ্মতম অংশ বাক্-এ পরিণত হয়।
6.5.4 ‘সৌম্য, মন অন্নময়, প্রাণ জলময় এবং বাক্ তেজোময়।’ শ্বেতকেতু বলিলেন— ‘আপনি পুনরায় আমাকে বুঝাইয়া দিন।’ পিতা বলিলেন— ‘সৌম্য, তাহাই হউক।’
ষষ্ঠ খণ্ড – আদি দেবত্রয় হইতে মন, প্রাণ ও বাক্যের উৎপত্তি (পুনরুক্তি)
6.6.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—দধি মন্থন করার সময় তাহর সূক্ষ্মতম অংশ উপরে উঠিয়া আসে; তাহা ঘৃত হয়। সৌম্য, এইভাবে ভুক্ত অন্নের সূক্ষ্মতম অংশ উপরদিকে উঠিয়া মনরূপে পরিণত হয়।
6.6.3-4 (৩য় ও ৪র্থ মন্ত্র) — সৌম্য, যে জল পান করা হয়, তাহার সূক্ষ্মতম অংশ উপরদিকে উঠিয়া প্রাণরূপে পরিণত হয়। তেজস্কর বস্তু ভুক্ত হইলে তাহার যে সূক্ষ্মতম অংশ, তাহা উপরে উঠে এবং বাপে পরিণত হয়।
6.6.5 ‘সৌম্য, মন অন্নময়, প্রাণ জলময় এবং বাক্ তেজোময়।’ শ্বেতকেতু বলিলেন, ‘আপনি আবার আমাকে বুঝাইয়া দিন।’ পিতা বলিলেন, ‘তাহাই হউক।
সপ্তম খণ্ড – শ্বেতকেতুর অনশন ও পুনর্ভোজন দ্বারা উক্ত তত্ত্বের প্রমাণ
6.7.1 সৌম্য, পুরুষ ষোলকলাযুক্ত। পনের দিন ভোজন করিও না, কিন্তু যতটা ইচ্ছা জল পান করিও; কারণ প্রাণ জলময়। যে জল পান করে তাহার প্রাণ বিয়োগ হয় না।
6.7.2 শ্বেতকেতু পনের দিন ভোজন করিলেন না। তারপর পিতার নিকট যাইয়া বলিলেন—’পিতা, আমি কি বলিব?’ পিতা বলিলেন, ‘ঋক্, যজু ও সাম মন্ত্ৰ উচ্চারণ কর।’ শ্বেতকেতু বলিলেন—’ঐ সব আমার মনে হইতেছে না।
6.7.3 পিতা তাহাকে বলিলেন— ‘সৌম্য, যদি বিরাট ভাবে প্রজ্বলিত অগ্নির ছোট একখণ্ড অঙ্গার মাত্র অবশিষ্ট থাকে, তবে তাহা দ্বারা তাহার অপেক্ষা বড় কোন বস্তু দগ্ধ করা যায় না। তেমনি তোমার ষোলটি কলার একটি মাত্র অবশিষ্ট আছে। তাহাদ্বারা বেদসমূহ বুঝিতে পারিতেছ না। তুমি আহার কর, পরে আমার কথা বুঝিতে পারিবে।’
6.7.4-6 (৪র্থ-৬ষ্ঠ মন্ত্ৰ) শ্বেতকেতু ভোজন করিয়া পিতার নিকট গেলেন। পিতা তাঁহাকে যাহা কিছু বলিলেন সেই সবই তিনি অনায়াসে বুঝিলেন। পিতা বলিলেন— ‘বিশাল প্রজ্বলিত অগ্নির অবশিষ্ট সেই অঙ্গারকে যদি তৃণদ্বারা বাড়ান যায় তবে তাহাদ্বারা তাহার অপেক্ষাও বেশি পরিমাণ বস্তু দগ্ধ করা যায়। তেমনি হে সৌম্য, তোমার ষোড়শ কলার এক কলা মাত্র অবশিষ্ট ছিল; তাহা অনুদ্বারা বর্ধিত হইয়া প্রজ্বলিত হইয়াছে। তাহার সাহায্যেই তুমি বেদ বুঝিতেছ। হে সৌম্য, মন অন্নময়, প্ৰাণ জলময় এবং বাক্ তেজোময়। (তখন শ্বেতকতু) পিতার উপদেশ বুঝিতে পারিলেন।
অষ্টম খণ্ড – সুষুপ্তি ও পান-ভোজনের দৃষ্টান্ত দ্বারা তত্ত্বমসি বাক্যের ব্যাখ্যা
6.8.1 উদ্দালক আরুণি পুত্র শ্বেতকেতুকে বলিলেন— সৌম্য, আমার নিকট সুষুপ্তিতত্ত্ব শোন। যখন পুরুষ নিদ্রিত হয়, তখন সে সৎস্বরূপের সহিত মিলিত হয়। সেই সময়ে সে স্বীয় রূপ (স্বম্ রূপম্) পায় (অপীতঃ)। এই জন্য লোকে ইঁহাকে বলে ‘সুষুপ্তি’ (স্বপতি—নিদ্রা যাইতেছে) — কারণ তখন সে স্ব-রূপ পায়।
6.8.2 সূতায় বাঁধা পাখি যেমন এদিক ওদিক উড়ে, কিন্তু অন্য কোথাও আশ্রয় না পাইয়া শেষে সেই বন্ধন স্থানেই আশ্রয় নেয়, তেমনি এই মন চারিদিকে ঘুরিয়া যখন কোথাও আশ্রয় না পায়, তখন প্রাণকেই অবলম্বন করে। হে সৌম্য, মন প্রাণেই আবদ্ধ হইয়া রহিয়াছে।
6.8.3 সৌম্য, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা আমার নিকট শোন। যখন পুরুষ ক্ষুধার্ত হয় তখনই জলই অনুকে (যথাস্থানে বা যথাকার্যে) চালাইয়া নিয়া যায় (অর্থাৎ ঐ অন্নের নেতা হয়)। যেমন (গো-নেতাকে) ‘গোনায়’, (অশ্ব-নেতাকে) ‘অশ্বনায়’, (পুরুষের নেতাকে) ‘পুরুষনায়” (বলা হয়), তেমনি জলকে ‘অশনায়’ অর্থাৎ অশনের (অন্ন বা খাদ্যের) নেতা বলা হয়। এই ভাবে এই অঙ্কুর (রূপ-শরীর) উৎপন্ন হয়। (এই শরীর) কারণবিহীন নহে।
6.8.4 অন্ন ছাড়া এই দেহের মূল কোথায়? হে সৌম্য অনুরূপ অঙ্কুর দ্বারা ইহার কারণস্বরূপ জলকে জান। এই জলরূপ অঙ্কুর দ্বারা মূলস্বরূপ তেজকে জান। এই অঙ্কুররূপ তেজ দ্বারা সৎস্বরূপ মূলকে জান। সৎস্বরূপই এই চরাচরের মূল, আশ্রয় এবং প্রতিষ্ঠা।
6.8.5 যখন পুরুষ তৃষ্ণার্ত হয়, তখন তেজই পীত জলের নেতা হয় অর্থাৎ জলকে লইয়া যায়। যেমন (গো-নেতাকে) ‘গো-নায়’, (অশ্ব-নেতাকে) ‘অশ্ব-নায়’, (পুরুষনেতাকে) ‘পুরুষনায়’ বলা হয়; তেমনি জলের নেতারূপী সেই তেজকে ‘উদন্যা’ বলা হয়। এইভাবে এই দেহরূপ অঙ্কুর উৎপন্ন হয়। হে সৌম্য, জানিও, ইহা মূলবিহীন নহে।
6.8.6 জল ভিন্ন এই দেহের মূল আর কোথায়? হে সৌম্য, জলরূপ অঙ্কুর দ্বারা কারণরূপ তেজকে অন্বেষণ কর; তেজরূপ অঙ্কুর দ্বারা কারণরূপ সৎ-স্বরূপকে অন্বেষণ কর। চরাচর এই সমস্তই সৎ হইতে উৎপন্ন, সতে আশ্রিত ও সতে বিলীন হয়। এই তিন দেবতা পুরুষকে পাইয়া প্রত্যেকে যে ভাবে ‘ত্রিবৃৎ ত্রিবৃৎ’ হয় তাহা পূৰ্বেই বলা হইয়াছে। মুমূর্ষু পুরুষের বাক্ মনের সহিত মিলিত হয়, মন প্রাণের সহিত, প্ৰাণ তেজের সহিত এবং তেজ পরম দেবতায় মিলিত হয়।
6.8.7 এই যে সূক্ষ্মতম বস্তু ইহাই সমস্ত জগতের আত্মা। তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। শ্বেতকেতু বলিল— “ভগবান, আপনি আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন ‘সোম্য, তাহাই হউক’।
নবম খণ্ড – মধুচক্র ও জীব-বৈচিত্র্যের দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.9.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)— সৌম্য, মৌমাছিরা নানা বৃক্ষের রস আহরণ করিয়া একত্র করিলে যেমন রসসমূহের ‘আমি অমুক বৃক্ষের রস’—এইরকম কোন পৃথক পরিচয় থাকে না, তেমনি প্রাণিগণ (সুষুপ্তি সময়ে) সৎ-স্বরূপকে পাইয়াও ‘আমরা সৎস্বরূপকে পাইয়াছি’ ইহা জানিতে পারে না।
6.9.3 বাঘ, সিংহ, বৃক, বরাহ, কীট, পতঙ্গ, ডাঁস বচা মশক—ইহলোকে (সুষুপ্তির পূর্বে) যে যেভাবে ছিল, সুষুপ্তির পর জাগ্রত হইয়াও সেই সেই ভাবই পায়।
6.9.4 এই যে সূক্ষ্মতম সৎবস্তু, ইহাই সমস্ত জগতের আত্মা; তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। শ্বেতকেতু বলিল—’আপনি আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন-’তাহাই হউক।”
দশম খণ্ড – নদীর উৎপত্তি-বিলয় ও জীব-বৈচিত্র্যের দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.10.1 হে সৌম্য, পূর্বদেশের সব নদী পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়, পশ্চিমদেশের নদী পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। তাহারা সমুদ্র হইতে উৎপন্ন হইয়া আবার সমুদ্রেই যায় এবং সমুদ্রই হইয়া যায়। তখন তাহারা যেমন জানিতে পারে না যে, ‘আমি এই নদী’, ‘আমি এই নদী’— তেমনি হে সৌম্য, জীবগণ সৎস্বরূপ হইতে আসিয়া জানিতে পারে না যে,— ‘আমরা সৎস্বরূপ হইতে আসিয়াছি’।
6.10.2 বাঘ, সিংহ, বৃক, কীট, পতঙ্গ, ডাঁশ বা মশক— ইহারা ইহলোকে সুষুপ্তির পূর্বে যে যে ভাবে ছিল সুষুপ্তির পর জাগ্রত হইলেও সে সেই ভাবই পায়।
6.10.3 এই যে সূক্ষ্মতম সৎবস্তু, ইহাই নিখিল জগতের আত্মা, তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। শ্বেতকেতু বলিল— ‘ভগবান্, আপনি আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন— ‘তাহাই হউক
একাদশ খণ্ড – বৃক্ষের জীবন-মৃত্যুর দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.11.1 হে সোম্য, এই বিশাল বৃক্ষের মূলে যদি কেহ আঘাত করে, তবে সে বাঁচিয়া থাকিয়াই রস ক্ষরণ করে; যদি কেহ তাহার মাঝখানে আঘাত করে, তখনও সে বাঁচিয়া থাকিয়াই রস ক্ষরণ করে; যদি কেহ তাহার মাথার দিকে আঘাত করে, তবেও সে বাঁচিয়া থাকিয়াই রস ক্ষরণ করে। এই বৃক্ষ জীবাত্মা কর্তৃক অনুব্যাপ্ত হইয়া অবিরাম রসপান করিয়া সানন্দে অবস্থান করে।
6.11.2 যদি জীব এই বৃক্ষের এক শাখা পরিত্যাগ করে, তবে সেই শাখা শুকাইয়া যায়; যদি দ্বিতীয় শাখা পরিত্যাগ করে, তবে দ্বিতীয় শাখাও শুকাইয়া যায়, তৃতীয় শাখা পরিত্যাগ করিলে তাহাও শুকায় এবং যদি সমস্ত বৃক্ষকে পরিত্যাগ করে, তবে সমস্তটিই শুকাইয়া যায়।
6.11.3 পিতা বলিলেন, “হে সৌম্য, এইকথা জানিও — জীব কর্তৃক পরিত্যক্ত হইলে এই দেহ মরিয়া যায়, কিন্তু জীব মরে না। এই যে সূক্ষ্মতম বস্তু ইহাই সমস্ত জগতের আত্মা। তিনিই সত্য তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি।’ শ্বেতকেতু বলিল— ‘আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন, ‘তাহাই হউক।’
দ্বাদশ খণ্ড – ন্যগ্রোধ বৃক্ষবীজের দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.12.1 উদ্দালক বলিলেন— ‘এই বটবৃক্ষ হইতে একটি ফল নিয়া আস।’ শ্বেতকেতু বলিল, ‘ভগবান্, আনিয়াছি।’ উ। ‘ইহা ভাঙিয়া ফেল।’ শ্বে। ‘ভাঙিয়াছি। উ। ‘এখানে কি দেখিতেছ?’ শ্বে। ‘অণুর মত সব বীজ’। উ। ‘ইহাদিগের একটি ভাঙ।’ শ্বে। ‘ভগবান্, ভাঙা হইয়াছে।’ উ। ‘কি দেখিতেছ?’ শ্বে। ‘কিছুই না।’
6.12.2 উদ্দালক বলিলেন— হে সৌম্য, বীজের মধ্যে যে সূক্ষ্মতম অংশ আছে, তাহা তুমি দেখিতেছ না। এই সূক্ষ্মতম অংশেই বিরাট বটবৃক্ষ রহিয়াছে। সৌম্য, শ্রদ্ধাযুক্ত হও।
6.12.3 এই যে অণিমা, ইহাই অখিল জগতের আত্মা। তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, ‘তুমিই তিনি।’ শ্বেতকেতু বলিল, ‘ভগবান্, আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন, ‘তাহাই হউক।’
ত্রয়োদশ খণ্ড – লবণাক্ত জলের দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.13.1 উদ্দালক বলিলেন—’এই লবণখণ্ড জলে রাখিয়া পরদিন সকালে আমার নিকট আসিবে।’ শ্বেতকেতু তাহাই করিল। উদ্দালক তাহাকে বলিলেন, ‘রাত্রিতে জলে যে লবণ রাখিয়াছিলে, তাহা আন।’ শ্বেতকেতু লবণ খুঁজিয়া পাইল না, কারণ তাহা জলে বিলীন হইয়া গিয়াছিল।
6.13.2 উদ্দালক বলিলেন—’ইহার উপরের দিক হইতে জলপান কর। ‘ (শ্বেতকেতু জলপান করিলে পর পিতা (জিজ্ঞাসা করিলেন)—’কি রকম?” শ্বেতকেতু বলিল, ‘লবণাক্ত।’ উদ্দালক বলিলেন, ‘ইহার মাঝখান হইতে পান কর। ‘কি রকম?’ ‘লবণাক্ত’। ‘ইহার নীচের দিক হইতে পান কর।” ‘কি রকম?’ ‘লবণাক্ত’। ‘এই জল ফেলিয়া আমার কাছে এস।’ শ্বেতকেতু তাহাই করিল। উদ্দালক বলিলেন, ‘লবণ জলের সর্বত্রই রহিয়াছে। হে সৌম্য, (জলে সর্বদা বিদ্যমান লবণকে যেমন তুমি দেখিতে পাও নাই, তেমনি) এই দেহে সৎস্বরূপ আত্মা নিত্য বর্তমান আছেন, কিন্তু তুমি দেখিতে পাইতেছ না।’
6.13.3 এই যে অণিমা, ইহাই জগতের আত্মা; তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। শ্বেতকেতু বলিল—’ভগবান্, আবার আমাকে উপদেশ দিন’ পিতা বলিলেন—’তাহাই হউক।”
চতুর্দশ খণ্ড – দস্যু কর্তৃক বদ্ধচক্ষু গন্থারদেশীয় পথিকের দৃষ্টান্ত দ্বারা ত্বত্ত্বমসি বাক্যের ব্যাখ্যা
6.14.1 হে সৌম্য, যেমন কোন পুরুষের চোখ বাঁধিয়া তাহাকে গন্ধার দেশ হইতে কোন নির্জন স্থানে আনিয়া ছাড়িয়া দিলে সে যেরূপ (দিগ্ভ্রান্ত হইয়া) কখনও পূর্ব, কখনও দক্ষিণ, কখনও পশ্চিমমুখী হইয়া চীৎকার করিয়া বলিতে থাকে’চোখ বাঁধিয়া আমাকে এখানে আনিয়াছে, চোখ বাঁধিয়া আমাকে এখানে ফেলিয়া দিয়াছে।’
6.14.2 তখন যেমন কেহ তাহার চোখের বন্ধন খুলিয়া দিয়া বলে— এইদিকে গন্ধার, এইদিকে যাও’ সে যেমন তখন গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে জিজ্ঞাসা করিতে করিতে (এবং লোকের উপদেশে পথ বিষয়ে) অভিজ্ঞ ও বিচারসমর্থ হইয়া গন্ধার প্রদেশেই গিয়া পৌঁছায়; সেইরকম যিনি গুরুর উপদেশ পাইয়াছেন তিনি জানেন—’যতদিন দেহ হইতে মুক্ত না হইব তত দিনই দেরী, তাহার পর আমি সৎস্বরূপকে (ব্রহ্মকে) লাভ করিব।’
6.14.3 ‘এই যে অণিমা, ইহাই সমগ্র জগতের আত্মা। তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি।’ শ্বেতকেতু বলিল—’ভগবান্, আবার আমাকে উপদেশ দিন দিন।’ পিতা বলিলেন—”হে সৌম্য, তাহাই হউক।
পঞ্চদশ খণ্ড – মুমূর্ষু ও মৃত ব্যক্তির দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.15.1 সৌম্য, জ্ঞাতিগণ রোগসন্তপ্ত ব্যক্তিকে ঘিরিয়া জিজ্ঞাসা করে—’আমাকে চিনিতে পার কি? আমাকে চিনিতে পার কি?’ যতক্ষণ তাহার বাক্ মনে, মন প্ৰাণে, প্রাণ তেজে এবং তেজ পরম দেবতাতে বিলীন না হয়, ততক্ষণ সে তাহাদিগকে চিনিতে পারে।
6.15.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—পরে যখন বাক্ মনে, মন প্রাণে, প্রাণ তেজে এবং তেজ পরম দেবতাতে লীন হয়, তখন আর সে ব্যক্তি তাহাদিগকে চিনিতে পারে না। এই যে অণিমা ইহাই সমস্ত জগতের আত্মা। তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। শ্বেতকেতু বলিল—’আপনি আবার আমাকে উপদেশ দিন।’ পিতা বলিলেন—’হে সৌম্য, তাহাই হউক।
ষোড়শ খণ্ড – তপ্ত পরশুস্পর্শের দৃষ্টান্ত দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ বাক্যের ব্যাখ্যা
6.16.1 হে সোম্য, যদি কোন ব্যক্তির হাত বাধিয়া আনা হয় এবং বলা হয় ‘এ ব্যক্তি অপহরণ করিয়াছে চুরি করিয়াছে ইহার জন্য কুঠার উত্তপ্ত কর’— সে যদি চুরি করিয়া থাকে তাহা হইলে সে নিজের বিষয়ে সত্য গোপন করিবে। তারপর সেই অসত্যমনা ব্যক্তি নিজেকে মিথ্যায় আবৃত করিয়া তপ্ত কুঠার গ্রহণ করিবে এবং দগ্ধ হইয়া শেষে নিহত হইবে।
6.16.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—যদি সে ব্যক্তি ঐ কাজ না করিয়া থাকে, তবে সে নিজেকে সত্য বলিয়া প্রতিপন্ন করিবে; সেই সত্যাভিসন্ধ পুরুষ নিজেকে সত্যে আবৃত করিবে, দগ্ধ হইবে না এবং অবশেষে মুক্তিলাভ করিবে। সেই ব্যক্তি যেমন দগ্ধ হয় না এবং মুক্ত হয়, তেমনি সত্যপরায়ণ ব্যক্তি পরলোকে পাপদগ্ধ হয় না। সে মুক্তি লাভ করে ও সত্যস্বরূপকে লাভ করে। এই যে অণিমা, ইহাই সমস্ত জগতের আত্মা। তিনিই সত্য, তিনিই আত্মা। হে শ্বেতকেতু, তুমিই তিনি। পিতা আরুণির নিকটে শ্বেতকেতু সেই সন্বরূপকে জানিয়াছিলেন।
সপ্তম অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – নারদ-সনৎকুমার-সংবাদ—ভূমাতত্ত্ব : ঋগ্বেদাদি সকল বিদ্যাই ‘নাম’ মাত্ৰ
7.1.1 নারদ সনৎকুমারের নিকট গিয়া বলিলেন—’ভগবান্, আমাকে শিক্ষা দিন।’ সনৎকুমার বলিলেন, “তুমি যাহা জান, তাহা প্রথমে বল; তার পরে তাহার অতিরিক্ত আমি বলিব।’
7.1.2 নারদ বলিলেন—ভগবান্, ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থস্থানীয় অথর্ববেদ, ইতিহাস-পুরাণ নামক পঞ্চম বেদ, সমস্ত বেদেরও যে বেদ (অর্থাৎ ব্যাকরণ), শ্রাদ্ধতত্ত্ব, গণিতশাস্ত্র, দেব-উৎপাত বিষয়ক বিদ্যা, কালতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র, দেববিদ্যা, ব্রহ্মাবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ধনুর্বেদ, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্প ও দেবজনবিদ্যা—আমি এই সবই জানি।
7.1.3 ‘এত জানিয়াও আমি কেবল মন্ত্রবিৎ আত্মবিৎ নই। আপনার মত ব্যক্তিদের মুখে শুনিয়াছি যে, আত্মবিৎ শোক অতিক্রম করেন। আমি শোকমগ্ন; আপনি আমাকে শোকের পরপারে লইয়া যান।’ সনৎকুমার তাঁহাকে বলিলেন—”তুমি যাহা কিছু অধ্যয়ন করিয়াছ তাহা নাম (বাক্য) মাত্ৰ।’
7.1.4 ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থত অথর্ববেদ, পঞ্চমত ইতিহাস ও পুরাণ, ব্যাকরণ, শ্রাদ্ধতত্ত্ব, গণিতবিদ্যা, দৈব-উৎপাত বিষয়ক বিদ্যা, কালবিদ্যা, বাকোবাক্য, নীতিশাস্ত্র, নিরুক্ত, ব্রহ্মবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ক্ষত্রবিদ্যা, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্প ও দেবজন বিদ্যা—এই সবই নাম। নামের উপাসনা কর।
7.1.5 যিনি নামকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন—নামের গতি যতদূর, ততদূর তিনি ইচ্ছানুযায়ী যাইতে পারেন। নারদ জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভগবান্, নাম অপেক্ষা কি শ্রেষ্ঠ কিছু আছে?’ সনৎকুমার বলিলেন—’নাম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বস্তু নিশ্চয়ই আছে।’ নারদ বলিলেন, “আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
দ্বিতীয় খণ্ড – নাম অপেক্ষা বাক্ শ্রেষ্ঠ
7.2.1 বাক্ অবশ্যই নাম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ঋগ্বেদ, ঋজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থ অথর্ববেদ, পঞ্চম ইতিহাস-পুরাণ, ব্যাকরণ, শ্রাদ্ধতত্ত্ব, গণিতশাস্ত্র, দৈববিদ্যা, নিধিবিদ্যা, বাকোবাক্য, একায়ন, দেববিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ক্ষত্রবিদ্যা, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্প ও দেবজনবিদ্যা, স্বর্গলোক, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল, তেজ, দেবগণ, মনুষ্যগণ, পশুসমূহ, পক্ষিগণ, তৃণ ও বনস্পতিসমূহ, শ্বাপদগণ, কীটপতঙ্গ ও পিপীলিকা পর্যন্ত যাবতীয় প্রাণী, ধর্ম ও অধর্ম, সত্য ও অসত্য, সাধু ও অসাধু, প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর বিষয়—এই সমস্তকেই বাক্ বিজ্ঞাপিত করে। যদি বাক্ না থাকিত, ধর্ম ও অধর্ম, সত্য ও অসত্য, সাধু ও অসাধু, প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর—কিছুই বিজ্ঞাপিত হইত না। বাক্ই এই সবকে বিজ্ঞাপিত করে। বাক্কেই উপাসনা কর।
7.2.2 যিনি বাক্কে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, বাক্যের যতদূর গতি ততদূর পর্যন্ত তিনি যথেচ্ছ যাইতে পারেন। নারদ বলিলেন—’ভগবান্, বাক্ অপেক্ষা কি কিছু শ্রেষ্ঠ আছে?’ সনৎকুমার বলিলেন—’বাক্ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এমন বস্তু নিশ্চয়ই আছে।’ নারদ বলিলেন—’আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
তৃতীয় খণ্ড – বাক্ অপেক্ষা মন শ্ৰেষ্ঠ
7.3.1 মন বাক্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। হাতের মুঠি যেমন দুইটি আমলকী, বদরী (কুল) বা বিভীতক (বহেড়া) ফলকে ধরিয়া রাখে, মন তেমনি বাক্ ও নামকে ধারণ করিয়া থাকে। কারণ মন যখন স্থির করে যে ‘আমি পড়ি’, তখন সে পড়ে; যখন স্থির করে যে ‘আমি কাজ করি,’ তখন সে কাজ করে; যখন স্থির করে যে, ‘আমি পুত্র চাই পশু চাই” তখন সে সেই সবই পায়; যখন স্থির করে যে, ‘আমি ইহলোক ও পরলোক লাভ করিতে চাই’ তখন তাহাই পায় (অর্থাৎ মানুষ প্রথমে ‘মন দ্বারা একটি বিষয় ঠিক করে তাহার পর সেই অনুযায়ী কাজ করে)। মনই আত্মা, মনই লোক, মনই ব্ৰহ্ম। মনকেই উপাসনা কর।
7.3.2 যিনি মনকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, মনের গতি যত দূর, তত দূর পর্যন্ত তিনি স্বচ্ছন্দে যাইতে পারেন। নারদ জিজ্ঞাসা করিলেন—’ভগবান, মন অপেক্ষা কি কিছু শ্রেষ্ঠ আছে?’ সনৎকুমার বলিলেন—’মন অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ কিছু আছে।’ নারদ বলিলেন—’আপনি আমাকে তাহা বলুন।’
চতুর্থ খণ্ড – মন অপেক্ষা সংকল্প শ্ৰেষ্ঠ
7.4.1 সংকল্প মন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। প্রথমে মন সংকল্প করে, পরে চিন্তা করে, পরে বাগিন্দ্রিয়কে পরিচালিত করে, তাহার পর ইহাকে নাম উচ্চারণে প্রবৃত্ত করে। সমস্ত মন্ত্র নামে এবং সমস্ত কর্ম মন্ত্রে একীভূত হয়।
7.4.2 সংকল্পই এই সবকিছুর গতি, সংকল্পই এই সকলের আত্মা, সংকল্পেই এইসব প্রতিষ্ঠিত। দ্যুলোক ও পৃথিবী সংকল্প করিয়াছিল; বায়ু ও আকাশ সংকল্প করিয়াছিল; জল ও তেজ সংকল্প করিয়াছিল। ইহাদের সংকল্পেই বৃষ্টি সংকল্প করে (অর্থাৎ নিজের কাজ করে); বৃষ্টির সংকল্পেই অন্ন সংকল্প করে; অন্নের সংকল্পেই সমস্ত প্রাণ সংকল্প করে। প্রাণের সংকল্পেই মন্ত্র সংকল্প করে; মন্ত্রের সংকল্পেই কর্ম সংকল্প করে; কর্মের সংকল্পেই (স্বর্গাদি) লোক সংকল্প করে; এবং (স্বর্গাদি) লোকের সংকল্পে সমস্ত জগৎ সংকল্প করে। সেই সংকল্প এই রকম। (এই) সংকল্পের উপাসনা কর।
7.4.3 যিনি সংকল্পকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি যে সকল লোক সংকল্প করেন, সেই সকল লোক পান। নিজে ধ্রুব হইয়া ধ্রুবলোক লাভ করেন; নিজে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া সুপ্রতিষ্ঠিত লোক পান এবং নিজে ব্যথাশূন্য হইয়া ব্যথারহিত লোক লাভ করেন। যিনি সংকল্পকে ব্ৰহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, সংকল্পের যত দূর গতি তত দূর তিনি ইচ্ছানুযায়ী যাইতে পারেন। (নারদ)——হে ভগবান, সংকল্প অপেক্ষা কি কিছু শ্রেষ্ঠ আছে?’ (সনৎকুমার)—’সংকল্প অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু অবশ্যই আছে।’ (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
পঞ্চম খণ্ড – সঙ্কল্প অপেক্ষা চিত্ত শ্ৰেষ্ঠ
7.5.1 সংকল্প অপেক্ষা চিত্ত শ্রেষ্ঠ। মানুষ প্রথমে অনুভব করে, তারপর ক্রমে সংকল্প করে,মনন করে, এবং বাগিন্দ্রিয়কে নিযুক্ত করে; তারপর তাহাকে নাম উচ্চারণ করিতে প্রবৃত্ত করে। মন্ত্রসমূহ নামে এবং কর্মসমূহ মন্ত্রে একীভূত হয়।
7.5.2 চিত্তই সঙ্কল্প প্রভৃতির গতি, চিত্তই ইহাদের আত্মা এবং চিত্তেই ইহাদের প্রতিষ্ঠা। কোন মানুষ যতই জানুক না কেন তাহার বিবেচনাশক্তি না থাকিলে লোকে বলে, ‘এ ব্যক্তি (থাকিয়াও) নাই; সে যদি সত্যই বিদ্বান হইত, তবে এমন চিত্তহীন (বুদ্ধিহীন) হইত না।’ আর অল্প জানিয়াও কেহ যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে সকলেই তাহার কথা শুনিতে ইচ্ছা করে। চিত্তই ইহাদের একমাত্র গতি, চিত্তই আত্মা এবং চিত্তেই ইহাদের প্রতিষ্ঠা। চিত্তেরই উপাসনা কর।
7.5.3 যিনি চিত্তকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি যে সব লোকের বিষয় অন্তরে বিবেচনা করেন, সেই সব লোক লাভ করেন। তিনি ধ্রুব হইয়া ধ্রুবলোক সুপ্ৰতিষ্ঠ হইয়া সুপ্রতিষ্ঠ লোক, ব্যথারহিত হইয়া ব্যথারহিত লোক লাভ করেন। যিনি চিত্তকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন—চিত্তের যত দূর গতি, তত দূর তাঁহার ইচ্ছানুরূপ গতি হয়। (নারদ)— ‘ভগবান, চিত্ত অপেক্ষা কি কিছু শ্রেষ্ঠ আছে?’ (সনৎকুমার)’চিত্ত অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে। (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।
ষষ্ঠ খণ্ড – চিত্ত অপেক্ষা ধ্যান শ্ৰেষ্ঠ
7.6.1 ধ্যান চিত্ত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। পৃথিবী যেন ধ্যান করিতেছে; অন্তরিক্ষ, স্বর্গলোক, জল ও পর্বত যেন ধ্যান করিতেছে; দেবতা এবং মনুষ্যগণ যেন ধ্যান নিরত। মানুষের মধ্যে যিনি মহত্ত্ব লাভ করেন, তিনি যেন ধ্যানফলের অংশ লাভ করেন। আর যাহারা ক্ষুদ্র, তাহারা কলহপ্রিয়, ক্রুর এবং কুৎসাপ্রিয়। যাঁহারা শ্রেষ্ঠ, তাঁহারা ধ্যানফলের অংশী হন। এই ধ্যানের উপাসনা কর।
7.6.2 যিনি ধ্যানকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, ধ্যানের যতদূর গতি, ততদূর তিনি যেমন ইচ্ছা যাইতে পারেন। (নারদ)— ‘ভগবান্, ধ্যান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—’ধ্যান অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
সপ্তম খণ্ড – ধ্যান অপেক্ষা বিজ্ঞান শ্ৰেষ্ঠ
7.7.1 ধ্যান অপেক্ষা বিজ্ঞান শ্রেষ্ঠ। বিজ্ঞান দ্বারা ঋগ্বেদ জানা যায় এবং যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থ অথর্ববেদ, পঞ্চম ইতিহাস-পুরাণ, ব্যাকরণ, পিত্র্য, রাশি, দৈব, নিধি, বাকোবাক্য, নীতিশাস্ত্র, দেববিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ক্ষত্রবিদ্যা, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্প ও দেবজনবিদ্যা, দ্যৌ, পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জলসমূহ, তেজ, দেবগণ, মনুষ্যগণ, পক্ষিগণ, তৃণ ও বনপতিসমূহ, শ্বাপদ, কীট-পতঙ্গ-পিপীলিকা পর্যন্ত (সমস্ত প্রাণী), ধর্ম ও অধর্ম, সত্য ও অসত্য, শুভ ও অশুভ, প্রীতিকর ও অপ্রীতিকর, অন্ন ও রস, ইহলোক ও পরলোক—(এই সবই) বিজ্ঞান দ্বারা জানা যায়। এই বিজ্ঞানের উপাসনা কর।
7.7.2 যিনি বিজ্ঞানকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি জ্ঞানময় ও বিজ্ঞানময় জগৎ লাভ করেন। যিনি বিজ্ঞানকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, বিজ্ঞানের যত দূর গতি, তত দূর তাঁহার ইচ্ছানুযায়ী গতি হইয়া থাকে। (নারদ)— ‘ভগবান্, বিজ্ঞান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—’বিজ্ঞান অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)— ‘আপনি আমাকে তাহা বলুন।’
অষ্টম খণ্ড – বিজ্ঞান অপেক্ষা বল শ্ৰেষ্ঠ
7.8.1 বল বিজ্ঞান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। একজন বলবান ব্যক্তি শত বিজ্ঞানবান ব্যক্তিকেও কম্পিত করিতে পারে। মানুষ যদি বলী হয়,তবে সে উদ্যমশীল হইতে পারে, উদ্যমশীল হইয়া (গুরু প্রভৃতির) পরিচর্যা করিতে পারে, পরিচর্যা করিয়া (তাঁহাদিগের) নিকট উপবেশন করিতে পারে, নিকটে উপবেশন করিয়া দেখিতে পারে, শুনিতে পারে, চিন্তা করিতে পারে, বুঝিতে পারে, কাজ করিতে পারে ও বিশিষ্ট জ্ঞানলাভ করিতে পারে। বলের দ্বারাই পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত আছে। বল দ্বারাই অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক, পর্বতসমূহ, দেবমানব, পশুপক্ষী, তৃণ-বনস্পতি, শ্বাপদ, কীটপতঙ্গ, পিপীলিকা পর্যন্ত সমস্তকিছু এবং স্বর্গাদি লোক অবস্থান করে। বলেরই উপাসনা কর।
7.8.2 যিনি বলকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, বলের গতি যত দূর, তত দূর পর্যন্ত তাঁহার যথেচ্ছগিত। (নারদ)— ‘ভগবান, বল অপেক্ষা কি কিছু শ্রেষ্ঠ আছে?’ (সনৎকুমার)—’বল অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে। (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
নবম খণ্ড – বল অপেক্ষা অনু শ্রেষ্ঠ
7.9.1 অন্ন বল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেইজন্য যদি কেহ দশ দিন ও দশ রাত্রি আহার না করে, তবে সে জীবিত থাকিলেও দেখিতে পারে না, শুনিতে পারে না, চিন্তা করিতে পারে না, বুঝিতে পারে না, কাজ করিতে পারে না, জানিতে পারে না। কিন্তু আহার করিলে সে দেখিতে, শুনিতে, চিন্তা করিতে, বুঝিতে পারে, কাজ করিতে পারে, জ্ঞানলাভ করিতে পারে। এই অন্নের উপাসনা কর।
7.9.2 যিনি অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি অন্ন ও পানযুক্ত লোকসমূহ লাভ করেন। যিনি অন্নকে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, অন্নের গতি যত দূর, তত দূর তাঁহার যথেচ্ছগতি হয়। (নারদ)—‘ভগবান্ অন্ন হইতে শ্রেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—‘অন্ন হইতেও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)—‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
দশম খণ্ড – অন্ন অপেক্ষা জল শ্রেষ্ঠ
7.10.1 জল অন্ন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেইজন্য যখন সুবৃষ্টি না হয় তখন অন্ন কম উৎপন্ন হইবে ভাবিয়া প্রাণ দুঃখিত হয়; আর যখন সুবৃষ্টি হয়, তখন বহু অন্ন হইবে ভাবিয়া প্রাণ আনন্দিত হয়। এই যে পৃথিবী, এই যে অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক, পর্বতসমূহ, দেব ও মনুষ্য, পশু-পক্ষী, তৃণ-বনস্পতি, শ্বাপদ এবং কীট-পতঙ্গ—পিপীলিকা পর্যন্ত সমস্ত প্রাণী—এই সব জলেরই রূপ। জলেরই উপাসনা কর।
7.10.2 যিনি জলকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি যাবতীয় কাম্যবস্তু লাভ করিয়া পরিতৃপ্ত হন। যিনি জলকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, জলের গতি যত দূর, তত দূর পর্যন্ত তাঁহার স্বাধীন বিচরণ। (নারদ)— ‘ভগবান্, জল হইতে কি শ্রেষ্ঠ কিছু আছে?” (সনৎকুমার)—’জল হইতে শ্রেষ্ঠ বস্তু নিশ্চয়ই আছে।’ (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।
একাদশ খণ্ড – জল অপেক্ষা তেজ শ্ৰেষ্ঠ
7.11.1 তেজ জল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যখন এই তেজ বায়ুকে আশ্রয় করিয়া আকাশকে উত্তপ্ত করে, তখন লোকে বলে, ‘বড় গরম, গা পোড়াইতেছে, বৃষ্টি হইবে।’ তেজ প্রথমে এই অবস্থা দেখাইয়া পরে জল সৃষ্টি করে। সেইজন্য ঊর্ধ্বগামী ও আঁকাবাঁকা বিদ্যুৎফুরণের সঙ্গে সঙ্গে চলে মেঘের গর্জন। তখন লোকে বলে ‘বিদ্যুৎ চমকাইতেছে, মেঘ ডাকিতেছে, বৃষ্টি হইবে।’ তেজ পূর্বে এইরূপ দেখাইয়া পরে জল সৃষ্টি করে। (এই) তেজেরই উপাসনা কর।
7.11.2 যিনি তেজকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন তিনি তেজস্বী হন। তিনি তেজোময়, দীপ্তিমান এবং তমোহীন লোক লাভ করেন। যিনি তেজকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তেজের গতি যতদূর ততদূর পর্যন্ত তাঁহার যথেচ্ছগতি। (নারদ) ‘তেজ হইতে কি শ্রেষ্ঠ কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—’তেজ হইতে শ্রেষ্ঠ বস্তু অবশ্যই আছে।’ (নারদ)—‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
দ্বাদশ খণ্ড – তেজ অপেক্ষা আকাশ শ্ৰেষ্ঠ
7.12.1 আকাশ তেজ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আকাশেই চন্দ্র ও সূর্য উভয়ে, বিদ্যুৎ, নক্ষত্রসমূহ এবং অগ্নি রহিয়াছে। আকাশের সাহায্যে মানুষ পরস্পরকে আহ্বান করে, শ্রবণ করে, উত্তর প্রত্যুত্তর দেয়। মানুষ আকাশেই আনন্দ লাভ করে, আকাশেই দুঃখ ভোগ করে। আকাশেরই উপাসনা কর।
7.12.2 যিনি আকাশকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি জ্যোতির্ময়, বাধাহীন এবং সুবিস্তীর্ণ লোকসমূহ লাভ করেন। যিনি আকাশকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, আকাশের গতি যত দূর তত দূর তাঁহার স্বাধীন বিচরণ হইয়া থাকে। (নারদ)— ‘আকাশ অপেক্ষা কি শ্রেষ্ঠ কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—‘আকাশ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)—‘আপনি তাহা আমাকে বলুন’।
ত্রয়োদশ খণ্ড – আকাশ অপেক্ষা স্মৃতি শ্ৰেষ্ঠ
7.13.1 স্মৃতি আকাশ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তাই, যদি স্মৃতি না থাকে, তবে বহুলোক একত্র হইলেও তাহারা কোন বিষয় শুনিতে, চিন্তা করিতে বা জানিতে পারে না। আর যদি তাহারা স্মরণ করিতে পারে, তবে তাহারা শুনিতে, চিন্তা করিতে এবং জানিতে পারে। স্মৃতির সাহায্যে পুত্র ও পশুগণকে জানা যায়। স্মৃতিকে উপাসনা কর।
7.13.2 যে ব্যক্তি স্মরণকে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, স্মরণের গতি যত দূর তত দূর তাহার স্বাধীন গতি। (নারদ)— ‘ভগবান্, স্মৃতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—‘স্মরণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)— ‘আপনি তাহা আমাকে বলুন।’
চতুর্দশ খণ্ড – স্মৃতি অপেক্ষা আশা শ্রেষ্ঠ
7.14.1 স্মৃতি অপেক্ষা আশা শ্রেষ্ঠ। আশা দ্বারা উদ্দীপিত হইয়া স্মৃতি (অর্থাৎ স্মৃতিমান পুরুষ) মন্ত্র পাঠ করে, কর্মের অনুষ্ঠান করে, পুত্র ও পশু কামনা করে, ইহলোক ও পরলোক লাভ করিবার ইচ্ছা করে। (এই) আশারই উপাসনা কর।
7.14.2 যিনি আশাকে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, আশা দ্বারাই তাঁহার সব কামনা পূর্ণ এবং প্রার্থনা সফল হয়। যিনি আশাকে ব্রহ্ম বলিয়া উপাসনা করেন, আশার গতি যতদূর, ততদূর তাঁহার যথেচ্ছ গতি হয়। (নারদ)— ‘আশা অপেক্ষা শ্ৰেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ (সনৎকুমার)—’আশা অপেক্ষা নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ বস্তু আছে।’ (নারদ)’আপনি তাহা আমাকে বলুন।
পঞ্চদশ খণ্ড – আশা অপেক্ষা প্ৰাণ শ্ৰেষ্ঠ
7.15.1 প্রাণ আশা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (রথের চাকার) অরসমূহ যেমন (রথের) নাভিতে প্রবিষ্ট থাকে, তেমনি সমস্তই এই প্রাণে প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রাণদ্বারাই প্রাণ কাজ করে, প্রাণই প্রাণকে এবং প্রাণের উদ্দেশ্যে দান করে। প্রাণই পিতা, প্রাণই মাতা, প্রাণই ভ্রাতা, প্রাণই ভগ্নী, প্রাণই আচার্য এবং প্রাণই ব্ৰাহ্মণ।
7.15.2 যদি কেহ পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী, আচার্য বা ব্রাহ্মণকে সম্মান না দেখাইয়া রুক্ষভাবে উত্তর দেয়, তবে লোকে তাহাকে বলে— ‘তোমাকে ধিক্, তুমি পিতৃহন্তা, তুমি মাতৃহন্তা, তুমি ভ্রাতৃহন্তা, তুমি ভগিনীহন্তা, তুমি আচার্যহন্তা, তুমি ব্ৰাহ্মণহন্তা।’
7.15.3 কিন্তু ইহারা বিগতপ্রাণ হইলে যদি কেহ শূলদ্বারা (দেহের অবয়ব- সমূহকে) একত্র করিয়া, বা খণ্ড খণ্ড করিয়া দগ্ধ করে, তাহা হইলেও কেহ বলে না— ‘তুমি পিতৃহন্তা, তুমি মাতৃহন্তা, তুমি ভ্রাতৃহন্তা, তুমি ভগিনীহন্তা, তুমি আচার্যহন্তা, তুমি ব্রাহ্মণহন্তা।’
7.15.4 প্রাণই এই সব কিছু হইয়াছে। যিনি এই ভাবে দেখেন, মনন করেন এবং এই রকমই জ্ঞান লাভ করেন, তিনি ‘অতিবাদী’ হন। যদি কেহ তাঁহাকে বলে ‘তুমি অতিবাদী’, তিনি অস্বীকার না করিয়া বলিবেন, ‘হাঁ, আমি অতিবাদী’।
ষোড়শ খণ্ড – প্রাণবিৎ ও সত্যবিদের প্রভেদ
7.16.1 কিন্তু যিনি সত্যস্বরূপকে জানিয়া অতিবাদী হন, তিনিই (প্রকৃতপক্ষে) অতিবাদী। (নারদ)—ভগবান, আমি সত্যস্বরূপকে জানিয়া অতিবাদী হইতে চাই। (সনৎকুমার)—তবে সত্যস্বরূপকে বিশেষরূপে জানিবার জন্য উৎসুক হইতে হইবে। (নারদ)—ভগবান্, আমি সত্য সত্যস্বরূপকেই বিশেষরূপে জানিতে চাই।
সপ্তদশ খণ্ড – সত্যস্বরূপের বিজ্ঞান
7.17.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যখন মানুষ বিশেষরূপে জানে, তখন সত্য বলে, না জানিয়া বলে না। বিশেষ জানিলেই সত্য বলা চলে। এই বিজ্ঞানকেই জানিবার ইচ্ছা করা উচিত।’ নারদ বলিলেন—’আমি বিজ্ঞানকেই জানিতে ইচ্ছা করি।’
অষ্টাদশ খণ্ড – বিজ্ঞান মননসাপেক্ষ
7.18.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যখন মানুষ মনন করে, তখনই বিশেষরূপে জানে, মনন না করিলে জানিতে পারে না। এই মননকেই বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে।’ নারদ বলিলেন—’আমি মননকেই বিশেষরূপে জানিতে চাই।’
ঊনবিংশ খণ্ড – মনন শ্রদ্ধাসাপেক্ষ
7.19.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যখন মানুষ শ্রদ্ধাবান হয় তখনই মনন করে, শ্রদ্ধাবান না হইলে মনন করিতে পারে না, শ্রদ্ধাবান হইলেই পারে। এই শ্রদ্ধাকেই বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে।’ নারদ বলিলেন—’ভগবান্, আমি শ্রদ্ধাকেই বিশেষরূপে জানিতে চাই।’
বিংশ খণ্ড – শ্রদ্ধা নিষ্ঠাসাপেক্ষ
7.20.1 মানুষ যখন নিষ্ঠাবান হয়, তখনই শ্রদ্ধাবান হইয়া থাকে। নিষ্ঠাবান না হইলে শ্রদ্ধাবান হইতে পারে না, নিষ্ঠাবান হইলেই পারে। এই নিষ্ঠাকেই বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে। নারদ বলিলেন—’আমি নিষ্ঠাকেই বিশেষরূপে জানিতে চাই।’
একবিংশ খণ্ড – নিষ্ঠা কর্মসাপেক্ষ
7.21.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যখন লোকে কর্তব্য কর্ম করে, তখনই নিষ্ঠাবান হয়। কর্ম না করিলে নিষ্ঠাবান হয় না, করিলেই হয়। এই কৃতিকেই (কর্মে একাগ্রতা) বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করা উচিত।’ নারদ বলিলেন—’ভগবান্, আমি এই কৃতিকে বিশেষরূপে জানিতে চাই।
দ্বাবিংশ খণ্ড – কর্ম সুখসাপেক্ষ
7.22.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যদি মানুষ সুখ পায় তবেই কর্ম করে। সুখ না পাইলে কর্ম করে না; সুখ পাইলেই করে। এই সুখকেই বিশেষরূপে জানিতে উৎসুখ হওয়া দরকার।’ নারদ বলিলেন—’ভগবান্, এই সুখকেই বিশেষরূপে জানিতে চাই।’
ত্রয়োবিংশ খণ্ড – ভূমাই সুখস্বরূপ
7.23.1 সনৎকুমার বলিলেন—’যাহা ভূমা, তাহাই সুখ; অল্পে সুখ নাই, ভূমাই সুখ। এই ভূমাকেই বিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা করিবে।’ নারদ বলিলেন—এই ভূমাকেই বিশেষরূপে জানিতে ইচ্ছা করি।’
চতুর্বিংশ খণ্ড – ভূমার লক্ষণ
7.24.1 যাহাতে অন্য কিছু দেখা যায় না, অন্য কিছু শোনা যায় না, অন্য কিছু জানা যায় না, তাহাই ভূমা। আর যাহাতে অন্য কিছু দেখা যায়, শোনা যায়, জানা যায়—তাহাই অল্প। যাহা ভূমা তাহাই অমৃত, আর যাহা অল্প তাহাই মরণশীল। নারদ জিজ্ঞাসা করিলেন—’ভগবান, সেই ভূমা কিসে প্রতিষ্ঠিত?’ সনৎকুমার বলিলেন— ‘(তিনি) স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত, অথবা কোনরূপ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত নন।’
7.24.2 লোকে এই জগতে গরু, ঘোড়া, হাতী, সোনা, ভৃত্য, স্ত্রী, ভূসম্পদ, বাসগৃহ—এই সবকে ‘মহিমা’ বলে। কিন্তু আমি এই জাতীয় মহিমার কথা বলিতেছি না; কারণ ইহারা একে অপর বস্তুতে প্রতিষ্ঠিত।
পঞ্চবিংশ খণ্ড – ভূমা সর্বময়—ভূমাবিদের স্বারাজ্য
7.25.1 সেই ভূমাই নিম্নে, তিনিই ঊর্ধ্বে, তিনিই পশ্চাতে, তিনিই সম্মুখে, তিনিই দক্ষিণে, তিনিই বামে—তিনিই এই সমস্ত কিছু। এখন ‘অহম্’ দৃষ্টিতে উপদেশ—আমিই অধোভাগে, আমিই ঊর্ধ্বে, আমিই পশ্চাতে, আমিই সম্মুখে, আমিই দক্ষিণে, আমিই বামে—আমিই এই সমস্ত।
7.25.2 এইবারে আত্মদৃষ্টিতে উপদেশ—আত্মাই নিম্নে, আত্মাই ঊর্ধ্বে, আত্মাই পশ্চাতে, আত্মাই সম্মুখে, আত্মাই দক্ষিণে, আত্মাই বামে—আত্মাই এই সমস্ত। যিনি এইভাবে দেখেন, মনন করেন, এই রকম বিজ্ঞান লাভ করেন, তিনি আত্মরতি, আত্মক্রীড়, আত্মমিথুন এবং আত্মানন্দ হন এবং তিনিই স্বরাট্ হন। আর যে ইহা ছাড়া অন্যরকম জানে, সে অন্যের অধীন হয়, এবং ক্ষয়শীল লোক লাভ করে। সমস্ত লোকে তাহার গতি সীমিত হয়।
ষড়বিংশ খণ্ড – ভূমাতত্ত্ববিদ সমুদয় জগৎ ব্রহ্মময় দেখেন
7.26.1 এইপ্রকার দ্রষ্টা, মননকারী ও বিজ্ঞাতার নিকটে আত্মা হইতেই প্রাণ, আত্মা হইতেই আশা, আত্মা হইতেই স্মৃতি, আত্মা হইতেই আকাশ, আত্মা হইতেই তেজ, আত্মা হইতেই জল, আত্মা হইতেই আবির্ভাব ও তিরোভাব। আত্মা হইতেই অন্ন, আত্মা হইতেই বল, আত্মা হইতেই বিজ্ঞান, আত্মা হইতে ধ্যান, আত্মা হইতে চিত্ত, আত্মা হইতে সঙ্কল্প, আত্মা হইতে মন, আত্মা হইতে বাক্, আত্মা হইতে নাম, আত্মা হইতে মন্ত্র, আত্মা হইতে কর্ম, আত্মা হইতে এই সবই উৎপন্ন হয়।
7.26.2 এ বিষয়ে এই শ্লোক আছে—তত্ত্বদর্শী মৃত্যুদর্শন করেন না, রোগ দুঃখ দর্শন করেন না। তত্ত্বদর্শী সবই দর্শন করেন, এবং সর্বদা সবই লাভ করেন। তিনি সৃষ্টির পূর্বে এক, তারপরে তিন, পাঁচ, সাত, নয় প্রকার হন; আবার তাঁহাকে একাদশ, একশত দশ এবং একহাজার বিশ বলা হয়। আহারশুদ্ধি হইলে সত্ত্বশুদ্ধি হয়; সত্ত্বশুদ্ধি হইলে স্মৃতি নিশ্চল হয়; স্মৃতি লাভ হইলে সমস্ত গ্রন্থির মোচন হয়। ভগবান্ সনৎকুমার নারদের সকল মলিনতা দূর করিয়া তাঁহাকে অন্ধকারের পার দেখাইয়াছিলেন। পণ্ডিতগণ সনৎকুমারকে পরম জ্ঞানী বলিয়া থাকেন।
অষ্টম অধ্যায়
প্ৰথম খণ্ড – দহরবিদ্যা—বিশ্বাত্মা ও জীবাত্মার একত্বজ্ঞান ও তৎফল
8.1.1 (দেহরূপ) ব্রহ্মপুরে এই যে ক্ষুদ্র পদ্মাকার গৃহ ইহাতে এক ক্ষুদ্র আকাশ আছে। তার মধ্যে যাহা আছে তাহাকে অন্বেষণ করিতে হইবে, তাহাকেই বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে।
8.1.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্ৰ)—ইহা শুনিয়া যদি শিষ্যগণ আচার্যকে জিজ্ঞাসা করেন, এই ব্রহ্মপুরে ক্ষুদ্র পদ্মাকার গৃহের মধ্যে যে ক্ষুদ্র আকাশ—তাহাতে এমন কি আছে যাহা অন্বেষণ করিতে হইবে এবং বিশেষরূপে জিজ্ঞাসা করিতে হইবে? তবে আচার্য বলিবেন—বাহিরের এই আকাশ যতখানি, হৃদয়ের আকাশও ততখানিই। স্বর্গ ও পৃথিবী উভয়েই ইহার মধ্যে নিহিত রহিয়াছে। আরও আছে অগ্নি ও বায়ু, সূর্য ও চন্দ্র, বিদ্যুৎ ও নক্ষত্রসমূহ এবং এই দেহবান্ আত্মার ইহলোকে নিজের বলিতে যাহা আছে বা নাই তাহার সমস্ত কিছুও ইহাতে নিহিত।
8.1.4 শিষ্যগণ যদি আচার্যকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই ব্রহ্মপুরে যদি সর্বভূত, সকল কামনা এই সমস্তই নিহিত থাকে, তবে এই দেহ যখন জরাগ্রস্ত হয় কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তখন কি অবশিষ্ট থাকে?
8.1.5 আচার্য উত্তরে বলিবেন—দেহের জরায় অন্তরস্থ আকাশ জীর্ণ হয় না; দেহ নষ্ট হইলে ইহার নাশ হয় না। ইহাই সত্যস্বরূপ ব্রহ্মপুর। ইহাতে সমস্ত কামনা নিহিত রহিয়াছে। ইনিই আত্মা এবং ইনি পাপ, জরা, মৃত্যু, শোক ও ক্ষুধারহিত— সত্যকাম, সত্যসংকল্প। এই পৃথিবীতে মানুষ যদি রাজার আদেশানুসারে কাজ করে তবে সে যে যে বস্তু কামনা করে—যে যে জনপদ, যে যে ক্ষেত্র লাভ করিতে ইচ্ছা করে—(রাজার অনুগ্রহে) সে সেই সবই লাভ করে।
8.1.6 কিন্তু কর্মলব্ধ এই সব বস্তু অর্থাৎ ভূমি কি জনপদের (ইহলোকে) যেমন ক্ষয় হয় তেমনি পরলোকেও পুণ্যার্জিত ভোগের বিনাশ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি ইহলোকে এই আত্মাকে এবং সত্যকামনাসমূহকে না জানিয়া চলিয়া যায়, সে সর্বলোকে পরাধীন হয়, আর যিনি ইহলোকে এই আত্মাকে এবং সত্যকামনাসমূহকে জানিয়া দেহত্যাগ করেন সর্বলোকে তাঁহার স্বাধীন গতি হইয়া থাকে।
দ্বিতীয় খণ্ড – পরলোকে জ্ঞানীর কামনাপূরণ
8.2.1 তিনি যদি পিতৃলোক কামনা করেন, তবে সঙ্কল্পমাত্রই পিতৃগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি পিতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.2 তিনি যদি মাতৃলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই মাতাগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি মাতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.3 আর তিনি যদি ভ্রাতৃলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই ভ্রাতাগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি ভ্রাতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.4 আর যদি তিনি ভগিনীলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই ভগিনীগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি ভগিনীলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.5 আর যদি তিনি সখিলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই সখিগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি সখিলোক পাইয়া মহীয়ান হন।
8.2.6 আর যদি তিনি গন্ধমাল্যরূপ লোক পাইবার অভিলাষ করেন, সঙ্কল্পমাত্রই গন্ধমাল্যরূপ লোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি গন্ধমাল্যলোক পাইয়া মহীয়ান হন।
8.2.7 আর যদি তিনি অনুপানরূপ-লোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই অনুপানরূপ-লোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি অনুপানলোক পাইয়া মহীয়ান হন।
8.2.8 আর যদি তিনি গীতবাদ্য-লোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই গীতবাদ্যলোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি গীতবাদ্যলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.9 আর যদি তিনি নারীলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই নারীগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি নারীলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।
8.2.10 তিনি যে যে বিষয় (বা প্রদেশ) পাইতে ইচ্ছা করেন, যে কাম্যবস্তু কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই তাহা তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি উহা লাভ করিয়া মহিমান্বিত হন।
তৃতীয় খণ্ড – অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত সত্য কামনা-’সত্য’ ও ‘হৃদয়’ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যা
8.3.1 কিন্তু এই সব সত্যকামনা অসত্যের আবরণে আবৃত। এই সকল সত্যকামনা আত্মাতে থাকিলেও তাহারা অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত। সেইজন্য ইহার (অর্থাৎ অজ্ঞান ব্যক্তির) কোন আত্মীয় যদি ইহলোক হইতে চলিয়া যায়, সে তাহাকে আর পৃথিবীতে দেখিতে পায় না।
8.3.2 আর ইহার যে সব আত্মীয় জীবিত রহিয়াছে ও যাহাদের মৃত্যু হইয়াছে এবং মানুষ ইচ্ছা করিয়াও যে সকল বস্তু লাভ করিতে পারে না—সেই হৃদয়াকাশে যাইয়া এই সমস্তই সে লাভ করে। মানুষের যাবতীয় সত্যকামনাই এইখানে বর্তমান; কিন্তু সে সব অসত্য আবরণে আবৃত। অক্ষেত্রজ্ঞ ব্যক্তি যেমন বারবার বিচরণ করিয়াও ক্ষেত্রে নিহিত সুবর্ণধন লাভ করিতে পারে না, তেমনি প্রাণিগণ অহরহ ব্রহ্মলোকে গেলেও সত্য বস্তু লাভ করিতে পারে না, কারণ তাহারা অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত।
8.3.3 সেই আত্মা হৃদয়ে অবস্থিত। তাহার ব্যাখ্যা এই—অয়ম্ (ইহা) হৃদি (হৃদয়ে) এইজন্য ইহার নাম হৃদয়ম্। যিনি এই কথা জানেন, তিনি প্রতিদিন স্বর্গলোকে যান অর্থাৎ সুষুপ্তির সময়ে হৃদয়াকাশে ব্রহ্মলাভ করেন।
8.3.4 আচার্য বলিলেন, ‘আর এই যে সম্প্রসাদ (প্রসাদগুণ পুরুষ) যিনি শরীর হইতে বাহির হইয়া পরম জ্যোতিঃসম্পন্ন হইয়া নিজরূপে প্রকাশিত হন—ইনিই আত্মা, ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্রহ্ম; এই ব্রহ্মের নামই সত্য।’
8.3.5 (‘সত্যম্’ শব্দে) এই তিনটি অক্ষর সৎ (বা স), তি, যম্। এই যে ‘সৎ’ অক্ষর ইহা অমৃত; আর ‘তি’ অক্ষর মর্ত্য। ‘যম্’ অক্ষর দ্বারা এই উভয়কে (অর্থাৎ ‘সৎ’ ও ‘তি’কে অথবা অমৃত ও মর্ত্যকে) নিয়মিত করা হয়। ইহা দ্বারা স্বর্গ ও মর্ত্য এই উভয়কে নিয়মিত করা হয় বলিয়া ইহার নাম যম্। যিনি ইহা জানেন, তিনি অহরহ স্বৰ্গলোকে যান।
চতুর্থ খণ্ড – ব্রহ্ম সেতুস্বরূপ—ব্রহ্মলোকের বর্ণনা (১)
8.4.1 এই যে আত্মা, ইনি সেতুস্বরূপ। লোকসমূহ যাহাতে বিচ্ছিন্ন না হইয়া যায়, এইজন্য ইনি তাহাদের ধরিয়া রহিয়াছেন। দিন ও রাত্রি এই সেতু পার হইতে পারে না; জরা, মৃত্যু, শোক, সুকৃতি, দুষ্কৃতি—ইহারাও পারে না। সমস্ত পাপ ইহা হইতে ফিরিয়া আসে, কারণ এই ব্রহ্মলোক পাপবিহীন।
8.4.2 এই সেতু পার হইলে অন্ধ চক্ষুষ্মান হয়, শোকক্লিষ্টের ক্লেশ থাকে না, সমস্ত ব্যক্তির সন্তাপ দূর হয়। এই সেতু উত্তীর্ণ হইলে রাত্রিও দিন হয়, কারণ ব্রহ্মলোক চির-জ্যোতির্ময়।
8.4.3 যাঁহারা ব্রহ্মচর্য দ্বারা এই ব্রহ্মলোক লাভ করেন, এই ব্ৰহ্মলোক তাঁহাদেরই। সমস্ত লোকেই তাঁহারা স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন।
পঞ্চম খণ্ড – ব্রহ্মচর্যরূপে নানা যজ্ঞের উল্লেখ—ব্রহ্মলোকের বর্ণনা (২)
8.5.1 যাহাকে ‘যজ্ঞ’ বলা হয় তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ যিনি জ্ঞাতা (যঃ জ্ঞাতা), তিনি ব্রহ্মচর্য দ্বারাই ব্রহ্মলোক লাভ করেন। যাহাকে ‘ইষ্ট’ বলা হয়, তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য সহকারে অনুসন্ধান করিয়াই (ইষ্টা) আত্মাকে লাভ করা হয়।
8.5.2 যাহাকে ‘সন্ত্রায়ণ’ বলা হয়,তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারাই সৎস্বরূপের নিকটে (সতঃ) আত্মার ত্রাণ (আত্মনঃ ত্রাণম্) লাভ হয়। আবার যাহাকে ‘মৌন’ বলা হয় তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারাই লোকে আত্মাকে জানিয়া ‘মনন’ করে।
8.5.3 যাহাকে ‘অনাশকায়ন’ (অনশনব্রত) বলা হয় তাহাও ব্ৰহ্মচর্য, কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারা যে আত্মাকে লাভ করা হয়, তাহার নাশ নাই (ন নশ্যতি)। আবার যাহাকে ‘অরণ্যায়ন’ বলা হয়, তাহাও ব্রহ্মচর্য, কারণ এই পৃথিবী হইতে তৃতীয় স্বর্গে, — ব্রহ্মলোকে—’অর’ ও ‘ণ্য’ নামক দুইটি সমুদ্র আছে। সেখানে ‘ঐরম্মদীয়’ নামে সরোবর, সোমরসস্রাবী অশ্বত্থবৃক্ষ, ‘অপরাজিতা’ নামে ব্রহ্মের পুরী এবং ব্রহ্মা কর্তৃক বিশেষভাবে নির্মিত একটি স্বর্ণমণ্ডপ আছে।
8.5.4 যাঁহারা ব্রহ্মচর্য দ্বারা সেই ব্রহ্মলোকে ‘অর’ ও ণ্য’ নামে দই সমুদ্র লাভ করেন, ব্রহ্মলোক তাঁহাদেরই; সর্বলোকে তাঁহাদের যথেচ্ছ গতি হয়।
ষষ্ঠ খণ্ড – নাড়ী ও সূর্যরশ্মির সংযোগ—হ্মলোকের পথ ও দ্বার
8.6.1 হৃদয়ের এই যে নাড়ীসমূহ—এইগুলি পিঙ্গল, শুক্ল, নীল, পীত ও লোহিত বর্ণের সূক্ষ্মরস পরিপূর্ণ। এই আদিত্যই পিঙ্গল, ইহাই (আদিত্যই) শুক্ল, নীল, পীত এবং লোহিত বর্ণ।
8.6.2 যেমন এক মহাপথ বিস্তৃত হইয়া নিকট এবং দূরের দুই গ্রামেই যায়। তেমনি সূর্যের রশ্মিসমূহও এই লোক এবং ঐ লোক দুই লোকেই যায়। রশ্মিসমূহ ঐ আদিত্য হইতে বিস্তৃত হয় এবং (বিস্তৃত হইয়া) এইসব নাড়ীতে প্রবেশ করে। আবার এই নাড়ী হইতে বিস্তৃত হইয়া তাহারা ঐ সূর্যে প্রবেশ করে।
8.6.3 জীব নিদ্রিত হইলে যখন একীভূত হয় (অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলি ভোগ্য বিষয় ত্যাগ করিয়া একত্র হয়), পরিপূর্ণ প্রসন্নতা লাভ করে এবং স্বপ্নও দেখে না, তখন সে এই সব নাড়ীতে প্রবেশ করে। কোন পাপ (তখন) তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না এবং সে তেজোযুক্ত হয় (অর্থাৎ সূর্যেয় তেজের সহিত সংযুক্ত হয়)।
8.6.4 যখন মানুষ (রোগগ্রস্ত হইয়া) অত্যন্ত দুর্বল হয়, তখন সকলে তাহাকে চারিদিকে ঘিরিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করে—’আমাকে কি চেন?’ যতক্ষণ এই দেহ হইতে সে চলিয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তাহাদিগকে চিনিতে পারে।
8.6.5 যখন পুরুষ এই দেহ হইতে বাহির হয় তখন এই সব রশ্মিদ্বারা সে ঊর্ধ্বে যাইতে থাকে। ‘ওম্’, এই অক্ষরের ধ্যান করিতে করিতেই যদি তাহার মৃত্যু হয়, তবে সে নিশ্চয়ই ঊর্ধ্বে যায়। এক বিষয় হইতে অন্য বিষয়ে যাইতে মনের যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়ের মধ্যেই আদিত্যে চলিয়া যায়। এই আদিত্যই ব্রহ্মলোকের দ্বার। যাহারা বিদ্বান তাহারা এখানে প্রবেশ করে, আর যাহারা বিদ্বান নয় তাহারা প্রবেশ করিতে পারে না।
8.6.6 এই বিষয়ে এই শ্লোক আছে—হৃদয়ের একশত একটি নাড়ী আছে, তাহাদের মধ্যে একটি মূর্ধা পর্যন্ত গিয়াছে। যিনি এই নাড়ীদ্বারা ঊর্ধ্বদিকে যান, তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন। অন্য যে সব নাড়ী বিভিন্নদিকে যায় তাহাদের দ্বারা কেবল দেহত্যাগই হইয়া থাকে।
সপ্তম খণ্ড – প্রজাপতি ও ইন্দ্র-বিরোচন-সংবাদ (১)
8.7.1 প্রজাপতি এক সময়ে বলিয়াছিলেন— ‘যে আত্মা পাপরহিত, জরা-মৃত্যু-শোকরহিত, ভোজনেচ্ছা এবং পিপাসারহিত, যিনি সত্যকাম ও সত্য-সঙ্কল্প, তাঁহাকেই অন্বেষণ করিতে হইবে, তাঁহাকেই বিশেষরূপে জানিতে হইবে। যিনি তাঁহাকে অনুসন্ধান করিয়া জানেন তিনি সমস্ত লোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন।’
8.7.2 দেব ও অসুর উভয়েই লোকপরম্পরায় এই উপদেশের কথা শুনিয়াছিলেন। তাঁহারা বলিলেন, ‘যে আত্মাকে অনুসন্ধান করিলে সর্বলোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করা যায়, আমরা সেই আত্মার অনুসন্ধান করিব।’ এই উদ্দেশ্যে দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র এবং অসুরগণের মধ্যে বিরোচন প্রজাপতির নিকট গেলেন। তাঁহারা পরস্পরকে না জানাইয়া সমিধহস্তে তাঁহার নিকট গেলেন।
8.7.3 তাঁহারা দুইজন বত্রিশ বৎসর ব্রহ্মচর্য পালন করিয়া সেখানে রহিলেন। তখন প্রজাপতি তাঁহাদের জিজ্ঞাসা করিলেন—’তোমরা কেন এখানে আছ?” তাঁহারা বলিলেন—’যে আত্মা নিষ্পাপ, জরারহিত, মৃত্যু-শোক-ক্ষুধা-পিপাসারহিত, যিনি সত্যকাম ও সত্যসঙ্কল্প—তাহাকেই অন্বেষণ করা এবং জানা প্রয়োজন। যিনি এই আত্মাকে জানেন, তিনি সর্বলোক ও কাম্যবস্তু লাভ করেন—ইহাই আপনার বাণী। সেই আত্মাকেই জানিবার ইচ্ছায় আমরা দুইজনে এখানে রহিয়াছি।
8.7.4 প্রজাপতি ঐ দুই জনকে বলিলেন—’চক্ষুতে এই যে পুরুষ দেখা যায় ইনিই আত্মা।’ তিনি আরও বলিলেন—’ইনিই অমৃত, অভয় এবং ব্রহ্ম।’ তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন—”ভগবান, জলে যে পুরুষ দৃষ্ট হয়, আর যে পুরুষ দর্পণে দৃষ্ট হয়, ইহারা কে?’ প্রজাপতি বলিলেন—’এই সমস্ত কিছুতেই আত্মা দৃষ্ট হন।
অষ্টম খণ্ড – প্রজাপতি ও ইন্দ্র-বিরোচন-সংবাদ (২)—আসুরী উপনিষদ
8.8.1 প্রজাপতি বলিলেন—’জলপূর্ণ পাত্রে নিজেকে দেখিয়া আত্মার সম্বন্ধে যাহা বুঝিবে না, তাহা আমাকে জিজ্ঞাসা করিও।’ তাঁহারা জলপূর্ণ পাত্রে নিজেদের দেখিলেন। তখন প্রজাপতি তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’কি দেখিলে?” তাঁহারা বলিলেন, “ভগবান, আমরা সমগ্র আত্মা—লোম ও নখ পর্যন্ত ইহার প্রতিমূর্তি দেখিলাম।
8.8.2 প্রজাপতি তাহাদিগকে বলিলেন—’সুন্দর অলঙ্কার ও বসনে সজ্জিত এবং পরিষ্কৃত হইয়া জলপূর্ণ পাত্রে দেখ।’ তাঁহারা সুন্দর অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া সুন্দর বস্ত্র পরিয়া এবং পরিষ্কৃত হইয়া জলপূর্ণ পাত্রে দেখিলেন। প্রজাপতি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কি দেখিলে?’
8.8.3 তাঁহারা বলিলেন—’ভগবান, এই আমরা যেমন সুন্দর অলঙ্কারে ও বসনে সজ্জিত এবং পরিষ্কৃত, তেমনি জলের মধ্যে দুইজনও সুন্দর অলঙ্কারে ও বসনে ভূষিত এবং পরিষ্কৃত।’ প্রজাপতি বলিলেন—’ইনিই আত্মা; ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্ৰহ্ম।’ তখন দুইজনে শান্তহৃদয়ে ফিরিয়া গেলেন।
8.8.4 তাঁহাদের চলিয়া যাইতে দেখিয়া প্রজাপতি মনে মনে বলিলেন—’ইহারা আত্মাকে উপলব্ধি না করিয়াই, আত্মাকে না জানিয়াই চলিয়া গেল। ইহাদের মধ্যে যে এই জ্ঞানকেই উপনিষৎ অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান বলিয়া গ্রহণ করিবে—সে দেবতাই হউক বা অসুরই হউক—বিনষ্ট হইবে।’ অসুররাজ বিরোচন শান্তচিত্তে অসুরগণের নিকট গিয়া তাঁহাদিগকে এই উপনিষৎ শিক্ষা দিলেন—’এই পৃথিবীতে দেহেরই (অর্থাৎ আত্মারই) পূজা ও পরিচর্যা করিবে। দেহকে মহীয়ান করিলে এবং তারপর পরিচর্যা করিলে ইহলোক পরলোক—উভয় লোকই লাভ করা যায়।’
8.8.5 এইজন্য আজও দানহীন, শ্রদ্ধাহীন ও যজ্ঞহীন ব্যক্তিকে অসুর বলা হয়। ইহাই অসুরদের উপনিষৎ। তাহারা গন্ধমালা, বস্ত্র ও অলঙ্কার দ্বারা মৃত ব্যক্তির দেহকে সাজায়; কারণ তাহারা মনে করে যে ঐ ভাবেই পরলোক জয় করিবে।
নবম খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ— দেহাত্মবোধের ভ্রম
8.9.1 এদিকে দেবতাদের কাছে ফিরিয়া যাইবার পূর্বেই ইন্দ্রের আশঙ্কা হইল যে, এই দেহ সুন্দর অলঙ্কারে সজ্জিত হইলে জলে প্রতিবিম্বিত দেহও অলঙ্কৃত হয়, ইহা সুবসন পরিহিত হইলে ঐ দেহও তাহাই হয়, ইহা পরিষ্কৃত হইলে উহাও পরিষ্কৃত হয়। আবার এই দেহ অন্ধ হইলে প্রতিবিম্বও অন্ধ হয়, ইহা খঞ্জ হইলে উহাও হয়, ইহার হস্তপদাদি ছিন্ন হইলে উহারও তাহাই হয়, ইহার বিনাশ হইলে উহারও বিনাশ হয়। এই বিদ্যাতে আমি মঙ্গল দেখিতেছি না।
8.9.2 ইন্দ্র আবার সমিধ হস্তে ফিরিয়া আসিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন ‘ইন্দ্র, তুমি শান্তহৃদয়ে বিরোচনের সঙ্গে চলিয়া গিয়াছিলে। কি মনে করিয়া আবার ফিরিয়া আসিলে?’ ইন্দ্ৰ বলিলেন—’ভগবান্, এই শরীর উত্তমরূপে অলঙ্কৃত হইলে ছায়াদেহও অলঙ্কৃত হয়, ইহার পরিধানে সুবসন থাকিলে উহারও তাহাই হয়, ইহা পরিষ্কৃত থাকিলে উহাও পরিষ্কৃত থাকে। তেমনি ইহা অন্ধ হইলে উহাও অন্ধ হয়, খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয়, ছিন্নাবয়ব হইলে ছিন্নাবয়ব হয়; শরীর বিনষ্ট হইলে উহাও বিনষ্ট হয়। এই বিদ্যাতে আমি মঙ্গল দেখিতেছি না।’
8.9.3 প্রজাপতি বলিলেন—’ইন্দ্ৰ, ইহা এই রকমই। তোমাদের নিকট এই বিষয়টি আবার ব্যাখ্যা করিব। তুমি আরও বত্রিশ বৎসর এখানে বাস কর।’ ইন্দ্র আরও বত্রিশ বৎসর বাস করিলেন। তারপর (প্রজাপতি) তাঁহাকে বলিলেন—।
দশম খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—স্বপ্নাবস্থার শুভাশুভ
8.10.1-2 (১ম ও ২য় মন্ত্র)—এই যিনি স্বপ্নে পূজিত হইয়া বিচরণ করেন, তিনিই আত্মা, তিনিই অমৃত, অভয়, তিনিই ব্রহ্ম। তখন ইন্দ্ৰ শান্তহৃদয়ে চলিয়া গেলেন, কিন্তু দেবতাদের নিকট উপস্থিত হইবার আগেই তাঁহার মনে এই আশঙ্কা দেখা দিল— ‘যদিও এই শরীর অন্ধ হইলে স্বপ্নপুরুষ অন্ধ হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে সে খঞ্জ হয় না, এই শরীরের দোষে সে দূষিত হয় না, দেহ বিনষ্ট হইলে সে বিনষ্ট হয় না, দেহের অশ্রুপাতেও ইহার অশ্রুপাত হয় না—তবুও (নিদ্রাবস্থায় মনে হয়, এই স্বপ্নপুরুষকে) যেন কেহ বিনাশ করিতেছে, কেহ ইহাকে তাড়া করিতেছে, এই স্বপ্নপুরুষ যেন দুঃখ অনুভব করিতেছে, রোদন করিতেছে। এই উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।
8.10.3-4 (৩য় ও ৪র্থ মন্ত্র)—তিনি সমিধহস্তে আবার ফিরিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’ইন্দ্র, তুমি শান্তচিত্তে চলিয়া গিয়াছিলে, আবার কি মনে করিয়া ফিরিয়া আসিলে?’ ইন্দ্ৰ বলিলেন— ভগবান্, এই শরীর অন্ধ হইলে যদিও স্বপ্নাত্মা অন্ধ হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয় না, শরীরের দোষে ইহা দূষিত হয় না, শরীরকে বিনাশ করিলে বিনষ্ট হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয় না—তবুও (স্বপ্নে দেখা যায়) ইহাকে যেন কেহ বিনাশ করিতেছে, ইহার পশ্চাতে যেন কেহ ধাবিত হইতেছে, ইহা যেন দুঃখ ভোগ করিতেছে এবং ইহা যেন ক্রন্দন করিতেছে। ইহাতে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’ প্রজাপতি বলিলেন—’ইন্দ্র, ইহা এই রকমই। তোমার নিকট ইহা আমি আবার ব্যাখ্যা করিব। তুমি আরও বত্রিশ বৎসর এখানে বাস কর।’ ইন্দ্র আবার বত্রিশ বৎসর বাস করিলেন। তখন প্রজাপতি বলিলেন।
একাদশ খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—সুষুপ্ত অবস্থার শুভাশুভ
8.11.1 প্রজাপতি বলিলেন-’এই যে প্রসুপ্ত জীব (নিদ্রিতাবস্থায়) একীভূত হন, প্রসন্নতা লাভ করেন এবং স্বপ্নদর্শন হইতেও বিরত হন, ইনিই আত্মা, ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্রহ্ম।’ ইন্দ্র তখন শান্তহৃদয়ে ফিরিয়া গেলেন। কিন্তু দেবগণের নিকট উপস্থিত হইবার পূর্বেই তাহার এই আশঙ্কা দেখা দিল—’এই সময়ে ইনি নিজেকে ‘ইহাই আমি’ এইভাবে জানিতে পারেন না, এবং ইনি এইসব প্রাণীদেরও জানিতে পারেন না। সেই সময়ে ইহার যেন বিনাশ হয়। এই উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’
8.11.2 (তখন) সমিধহস্তে ইন্দ্র আবার ফিরিয়া আসিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন—’ইন্দ্ৰ, তুমি শান্তহৃদয়ে চলিয়া গিয়েছিলে, আবার কি মনে করিয়া ফিরিয়া আসিলে?” ইন্দ্ৰ বলিলেন—’ভগবান্, এই সময়ে ইনি নিজের বিষয়েই জানিতে পারেন না যে ‘ইহাই আমি’ এবং ইনি প্রাণীদিগকেও জানিতে পারেন না। ঐ সময়ে ইহার যেন বিনাশ হয়। এ উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’
8.11.3 প্রজাপতি বলিলেন—ইন্দ্ৰ, ইহা এই রকমই। এই আত্মার বিষয়ে আবার তোমাকে উপদেশ দিব, ইহা ছাড়া অন্য কিছু ব্যাখ্যা করিব না। তুমি আরও পাঁচ বৎসর এখানে বাস কর। ইন্দ্র আরও পাঁচ বৎসর বাস করিলেন। সবশুদ্ধ একশ এক বৎসর হইল। এই জন্যই লোকে বলিয়া থাকে, ‘ইন্দ্র প্রজাপতির নিকট একশ এক বৎসর ব্রহ্মচর্য নিয়া বাস করিয়াছিলেন।’ (তখন) প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন—।
দ্বাদশ খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—অশরীরী আত্মা ও ব্রহ্মলোকের বর্ণনা
8.12.1 হে ইন্দ্র, এই শরীর মরণশীল এবং মৃত্যুগ্রস্ত। ইহাই এই অমৃত অশরীর আত্মার অধিষ্ঠান। যাহার শরীর আছে তিনিই সুখদুঃখগ্রস্ত হন, তাঁহার সুখদুঃখের বিরাম নাই। অশরীর আত্মাকে প্রিয় ও অপ্রিয় স্পর্শ করিতে পারে না।
8.12.2-3 (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—বায়ু অশরীর; মেঘ, বিদ্যুৎ, মেঘগর্জন এই সবও তাই। ইহারা যেমন আকাশ হইতে উঠিয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া আপন আপন রূপে প্রকাশিত হয়, সেই রকম সম্প্রসন্ন এই আত্মা শরীর হইতে বাহির হইয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া বিরাজ করে। ইহাই সেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তখন নারী বা জ্ঞাতিগণের সঙ্গে বা যানে আরোহণ করিয়া সে আহারে, ক্রীড়ায় আনন্দ উপভোগ করিয়া বিচরণ করিতে থাকে। যে দেহে তাহার উৎপত্তি, সেই দেহকে তখন সে ভুলিয়া যায়। অশ্ব যেমন রথে সংযুক্ত থাকে, তেমনি প্রাণও এই দেহে সংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে।
8.12.4 এই দর্শনেন্দ্রিয় (চক্ষুর অভ্যন্তরস্থ) আকাশের (অর্থাৎ কৃষ্ণ তারকার যেই জায়গায় অনুপ্রবিষ্ট আছে, সেইখানেই চক্ষুর অধিষ্ঠাতৃ পুরুষ রহিয়াছেন। চক্ষু কেবল দেখিবার জন্য (অর্থাৎ পুরুষই দেখেন, চক্ষু কেবল দেখিবার যন্ত্র মাত্র)। দেহের মধ্যে থাকিয়া যিনি জানেন ‘আমি আঘ্রাণ লইতেছি’ তিনিই আত্মা, নাসিকা কেবল গন্ধ নিবার জন্য। যিনি জানেন ‘আমি বাক্য উচ্চারণ করি’ তিনিই আত্মা; বাগিন্দ্রিয় কেবল বাক্য উচ্চারণ করিবার জন্য। যিনি জানেন ‘আমি শুনিতে পারি’ তিনিই আত্মা, কর্ণ কেবল শুনিবার জন্য।
8.12.5 আর যিনি জানেন যে, ‘আমিই মনন করিতেছি’, তিনিই আত্মা, মন তাঁহার দৈব চক্ষু, তিনি মনোরূপ দৈব চক্ষু দ্বারা সমস্ত কাম্যবস্তু দর্শন করিয়া আনন্দ লাভ করেন।
8.12.6 এই যে ব্রহ্মলোকে দেবতাগণ ইঁহারা সেই আত্মাকেই উপাসনা করেন। সেইজন্য তাঁহারা সর্বলোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন। এইভাবে যিনি সেই আত্মাকে জানিয়া বিশেষরূপে অনুভব করেন, তিনিও সকল লোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন। প্রজাপতি এই কথাই বলিয়াছিলেন।
ত্রয়োদশ খণ্ড – সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম
8.13.1 আমি শ্যামবর্ণ (অর্থাৎ হৃদয়স্থিত ভেদরহিত ব্রহ্ম) হইতে বিচিত্রবর্ণে (বিচিত্রতাপূর্ণ ব্রহ্মে) যাই। আবার বিচিত্র হইতে শ্যামবর্ণে যাই। অশ্ব যেমন লোম কম্পিত করে, তেমনি আমি পাপকে (কম্পিত করিয়া) দূর করি; চন্দ্র যেমন রাহুর মুখ হইতে মুক্ত হয়, আমিও তেমনি শরীর হইতে মুক্তি লাভ করি। তারপর কৃতাত্মা হইয়া অসৃষ্ট (অর্থাৎ শাশ্বত) ব্ৰহ্মলোক লাভ করি, (ব্রহ্মলোকই) লাভ করি।
চতুর্দশ খণ্ড – আকাশরূপ ব্রহ্ম—পুনর্জন্ম অনিচ্ছা
8.14.1 আকাশ নামরূপের প্রকাশক; এই নাম ও রূপ যাঁহার অভ্যন্তরে (কিংবা যিনি এই নামরূপের অভ্যন্তরে), তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই অমৃত, তিনিই আত্মা। আমি প্রজাপতির সভাগৃহে গমন করি। আমি ব্রাহ্মণগণের, রাজগণের ও বৈশ্যগণের যশলাভ করিয়াছি। আমি সমস্ত যশের যশ; আমি যেন রক্তবর্ণ, দন্তহীন অথচ ভক্ষক, পিচ্ছিল ক্লেদময় গৃহে না যাই (অর্থাৎ আমাকে যেন আবার জন্মগ্রহণ করিতে না হয়।
পঞ্চদশ খণ্ড – সাধু জীবনের সংক্ষিপ্ত চিত্র
8.15.1 ব্রহ্মা প্রজাপতিকে, প্রজাপতি মনুকে এবং মনু মানবগণকে এই তত্ত্ব বলিয়াছিলেন। যিনি আচার্যকুলে গুরুসেবা করিয়া অবসর সময়ে যথাবিধি অধ্যয়ন করেন, তারপর গার্হস্থ্য আশ্রমে ফিরিয়া পবিত্র স্থানে বেদ পাঠ করেন, ধার্মিক পুত্রের পিতা হন (কিংবা ধার্মিক পুত্র ও শিষ্যগণকে পালন করেন), সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আত্মাতে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন, তীর্থ ভিন্ন অন্যত্র হিংসা ত্যাগ করেন এবং যাবজ্জীবন এই রকম আচরণ করেন, তিনি (মৃত্যুর পর) ব্রহ্মলোকে যান, তাঁহাকে আর (জন্মলাভের জন্য) ফিরিয়া আসিতে হয় না—আর ফিরিয়া আসিতে হয় না।