মাসেভ্যঃ পিতৃলোকং পিতৃলোকাদাকাশমাকাশাচ্চন্দ্রমসমেঘ সোমো রাজা তদ্দেবানামনুং তং দেবা ভক্ষয়ন্তি ॥ ৪
অন্বয় : মাসেভ্যঃ (মাসসমূহ হইতে) পিতৃলোকম্ পিতৃলোকাৎ (পিতৃলোক হইতে) আকাশম্; আকাশাৎ (আকাশ হইতে) চন্দ্রমসম্ (চন্দ্রকে)। এষঃ (এই) সোমঃ রাজা। তৎ (সেই সোম) দেবানাম্ (দেবগণের) অন্নম্। তম্ (তাহাকে) দেবাঃ ভক্ষয়ন্তি (ভক্ষণ করেন, ভোগ করেন)।
সরলার্থ : মাসসমূহ হইতে পিতৃলোকে, পিতৃলোক হইতে আকাশে, আকাশ হইতে চন্দ্রলোকে গমন করে। এই চন্দ্রই সোমরাজা; ইহা দেবতাদিগের অন্ন; ইহাকেই দেবগণ ভক্ষণ করেন।
মন্তব্য : মন্ত্রে বলা হইয়াছে— ‘সোম অর্থাৎ চন্দ্র দেবতাদিগের অন্ন এবং দেবগণ এই অন্ন ভক্ষণ করেন’। এই অংশের অর্থ লইয়া অনেক বিচার হইয়াছে। কেহ কেহ বলেন— ইষ্টাপূর্ত ও দানকর্মাদির অনুষ্ঠান করিলে যদি সোমরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া দেবতাদিগের অন্ন হইতে হয়, তবে এসমুদয় কর্ম করিয়া লাভ কি? ব্যাখ্যাকারগণ ইহার এই প্রকার উত্তর দিয়াছেন— (ক) অন্ন এবং অন্নভক্ষণ রূপক অর্থে গ্রহণ করিতে হইবে, কারণ দেবগণ ভক্ষণ করেন না, কেবল দর্শন করিয়াই তৃপ্ত হন (ছাঃ ৩।৫-১০)। যখন কোন আত্মা চন্দ্রলোকে উপস্থিত হয়, তখন দেবগণ তাহাকে দেখিয়াই তৃপ্ত হন; ইহাই দেবগণের অন্নভক্ষণ। (খ) দেবগণ যেমন এই আত্মাকে ভোগ করেন, সেই আত্মাও তেমনি দেবগণকে লাভ করিয়া আনন্দিত হন অর্থাৎ দেবগণকে সম্ভোগ করেন। পৃথিবীকেও অনুরূপ দৃষ্টান্ত দেখিতে পাই। স্বামীই যে কেবল স্ত্রীর সঙ্গলাভ করিয়া আনন্দিত হয় তাহা নহে, স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গ লাভ করিয়া আনন্দ লাভ করে। সোমকে যদি দেবগণের অন্ন বলা হয়, সেই সঙ্গে সঙ্গে ইহাও বলিতে হইবে যে, দেবগণও সোমের অন্ন। (গ) মানুষ যখন এই পৃথিবীতে বাস করে, তখন যজ্ঞাদি সম্পন্ন করিয়া দেবগণের সন্তোষ বিধান করে। মৃত্যুর পর সে যখন চন্দ্রলোকে উপস্থিত হয় তখন দেবগণ তো আনন্দিত হইবেনই। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও বলা হইয়াছে দেবোপাসকগণ দেবগণের পশু (১।৪।১০)। ইহলোকে তাহারা যেমন দেবগণের সেবা করে, পরলোকে যাইয়াও তেমনি তাহাদিগের সেবা করিয়া থাকে। অনুগত সেবক নিকটে অবস্থান করিলে কে না আনন্দিত হয়? এই অর্থেই পরলোকগামী আত্মা দেবগণের ভোগ্যবস্তু অর্থাৎ অন্ন। (ঘ) কেহ কেহ বলেন, আত্মাকে ভক্ষণ করার অর্থ আত্মার কর্ম সম্ভোগ করা। অথর্ববেদের মতে দেবগণ ইষ্টাপূর্তের ১/১৬ অংশ ফল গ্রহণ করেন।
বেদান্তদর্শনের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য ও রামানুজ এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। (৩।১।৭ ভাঃ দ্রঃ)। জ্ঞানবাদিগণ এই অংশ হইতে প্রমাণ করিতে চাহেন যে কর্মপথ সর্বথাই পরিত্যাজ্য। চন্দ্রলোকে যাইয়া দেবগণের অন্ন হওয়া কোন ক্রমেই বাঞ্ছনীয় হইতে পারে না।