যথা সোম্যৈকেন লোহমণিনা সর্বং লোহাময়ং বিজ্ঞাতং স্যাদ্বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং লোহমিত্যেব সত্যম্ ॥ ৫
৪৫২. যথা সোম্যৈকেন নখনিকৃন্তনেন সর্বং কাায়সং বিজ্ঞাতং স্যাদ্বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং কৃষ্ণায়মিত্যেব সত্যমেবং সোম্য স আদেশো ভবতীতি ॥ ৬
অন্বয় : যথা সৌম্য! একেন লোহমণিনা (একটি সুবর্ণপিণ্ড দ্বারা) সর্বম্ লোহময়ম্ (সমুদয় স্বর্ণময় বস্তু) বিজ্ঞাতম্ স্যাৎ; বাচা আরম্ভণম্ বিকারঃ (লোহময় বস্তুরূপ বিকার) নামধেয়ম্; লোহম্ ইতি এব সত্যম্ (৪র্থ মঃ দ্রঃ)। যথা সৌম্য একেন নখনিকৃন্তনেন (একটি নরুণ দ্বারা অর্থাৎ একখণ্ড লৌহদ্বারা; নিকৃন্তন—যাহা দ্বারা ছেদন করা যায়, নখনিকৃন্তন—যাহা দ্বারা নখ ছেদন করা যায়) সর্বম্ কাষ্ণায়সম্ (লৌহময় বস্তু) বিজ্ঞাতম্ স্যাৎ, বাচারম্ভণম্ বিকারঃ নামধেয়ম্, কৃষ্ণায়সম্ ইতি এব সত্যম্। এবম্ সোম্য সঃ (সেই) আদেশঃ (উপদেশ) ভবতি (হয়) ইতি (৪র্থ মঃ দ্রঃ)।
সরলার্থ : (৫ম ও ষষ্ঠ মন্ত্ৰ)— হে সৌম্য, যেমন একটি সুবর্ণপিণ্ড জানিলেই সব সুবর্ণময় বস্তু জানা যায়; বিকার শব্দমূলক, নামমাত্র, এবং সুবর্ণই সত্য (অর্থাৎ সুবর্ণময় বস্তু সুবর্ণেরই বিকার, এই বিকার কেবল শব্দমূলক, কেবল একটি নামমাত্র; ভাষায় বলিতে হয় এইটি কুণ্ডল, এইটি বলয়; কিন্তু ভাষা দ্বারা পার্থক্য না করিলে সমস্ত সুবর্ণময় বস্তু এক সুবর্ণই হইয়া যায়; সুতরাং সুবর্ণই সত্য পদার্থ)। হে সৌম্য, যেমন একটা নরুণকে জানিলে সব লৌহময় বস্তু জানা যায়, বিকার শব্দাত্মক, নামমাত্র, লৌহই সত্য, তেমনি হে সৌম্য, সেই উপদেশ (অর্থাৎ সেই উপদেশ শ্রবণ করিলে অশ্রুত বস্তু শ্রুত হয়, অচিন্তিত বিষয় চিন্তা করা যায় এবং অজ্ঞাত বিষয় জ্ঞাত হয়)।
মন্তব্য : ৬।১।৫ লোহমণি — সুবর্ণপিণ্ড (শঙ্কর)। ‘লোহ’ শব্দ হইতেই ‘লোহিত’ শব্দ। এইজন্য কেহ কেহ বলেন ‘লৌহ’ নামক ধাতু লোহিত বর্ণই হইবে, সুতরাং লোহ = তাম্র এবং লোহমণি = তাম্রময় অলঙ্কার। ডয়সন্ ইহার অনুবাদে ‘copper but- ton or ornament’ ব্যবহার করিয়াছেন। (৬ষ্ঠ মন্তব্য দ্রষ্টব্য)।
=
৬।১।৬ (ক) নিকৃন্তন, ব্যাকরণের নিয়মানুসারে ‘নিকৃন্তন’ না হইয়া ‘নিবর্তন’ হওয়া উচিত। কিন্তু প্রচলিত সংস্কৃত সাহিত্যেও এই প্রকার ব্যবহার রহিয়াছে (ভাগবত ৩।৩০।২৭, ৬।২।৪৬)। (খ) ‘কার্ফায়স’ শব্দ ‘কৃষ্ণায়স্ শব্দ হইতে উৎপন্ন। কৃষ্ণায়স্ কৃষ্ণ + অয়স্ —কৃষ্ণবর্ণ, অয়স—লৌহ। ‘অয়স’ একটি ধাতু, কিন্তু ইহা কোন ধাতু তাহা বলা কঠিন। বাজসনেয়ি সংহিতাতে (১৮।১৩) এই ছয়টি ধাতুর নাম করা হইয়াছে— (১) হিরণ্য, (২) অয়স্, (৩) শ্যাম, (৪) লোহ, (৫) সীস, (৬) ত্রপু। ‘হিরণ্য’ অর্থ সুবর্ণ; আমরা বর্তমান সময়ে যাহাকে লৌহ বলি, তাহারই প্রাচীন নাম ‘শ্যাম’। অথর্ববেদে এই অর্থেই ‘শ্যাম’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে (৯।৫।৪, ১১।৩।৭)। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ অনেকে মনে করেন লোহ তাম্র (৬।১।৫ মন্তব্য দ্রষ্টব্য) এবং ‘অয়স্’ bronze নামক রক্তাভ মিশ্র ধাতু। সাধারণত লোকে মনে করে অয়স্ = লৌহ। ঋগ্বেদে (১০।৮৭।২) অগ্নিকে ‘অয়োদ্রংষ্ট’ বলা হইয়াছে। অন্য এক স্থলে (১।৮৮।৫) ‘অয়োদংষ্টান্’ শব্দের ব্যবহার আছে, Macdonell-এর মতে এই শব্দ অগ্নিরই বিশেষণ। অগ্নির জিহ্বাকে লক্ষ্য করিয়াই এই সমুদয় কথা ব্যবহৃত হইয়া থাকে। অগ্নির জিহ্বা বা শিখা অবশ্যই লৌহের মত নহে। একটি মন্ত্রে (৬।৭১।৪) সূর্যকে হিরণ্যপাণি ও অয়োহনু বলা হইয়াছে। ‘অয়স্’ এখানে অবশ্যই লৌহ নহে। ইহা এমন এক ধাতু যাহার বর্ণ সূর্যের মত। সায়ণের মতে আয়োহনুঃ = হিরণ্যহনুঃ। এক স্থলে ‘বান’কে অয়োমুখম্ বলা হইয়াছে (৬।৭৫।১৫), অপর এক স্থলে ব্যবহার করা হইয়াছে (১০।৯৯।৬) ‘অয়ো অগ্রয়া’। এই দুই স্থলে ‘অয়স্’ অর্থ যে ‘লৌহ’ই করিতে হইবে তাহা নহে, ইহার অর্থ তাম্র বা bronze-ও হইতে পারে। শতপথ ব্রাহ্মণে (৫।৪।১২) ‘অয়স্ ও লোহায়স্ এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা হইয়াছে। জৈমিনীয় উপনিষদ্ (৩।১৭।৩) ব্রাহ্মণের মতে লোহায়স্ এবং কার্যায়স্ বিভিন্ন ধাতু। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেও (৩।৬২।৬।৫) কৃষ্ণায়াস্ ও লোহায়কে দুই ধাতু বলা হইয়াছে। এই সমুদয় অংশ হইতে অনুমান করা যাইতে পারে যে, এক সময়ে ‘অয়স্’ শব্দ ‘লৌহ’ অর্থে ব্যবহৃত হইত না।