Chapter I – Agama Prakarana (The Chapter based on Vedic Testimony)
Verse 1: ‘ওম্’ ব্রহ্মের প্রতীক, কার্য ও কারণ উভয়ই ব্রহ্ম। এই দৃশ্যমান জগৎও হচ্ছে ওম্। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, যা কিছু অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এই সবই ওঁকার। এই ত্রিকালের অতীতও যদি আর কিছু থাকে তবে তাও ওঁকার।
Verse 2: সমগ্র জগৎই ব্রহ্ম। এই জীবাত্মাও ব্রহ্ম। আপাতদৃষ্টিতে এই আত্মার চারটি অবস্থা।
Verse 3: জাগ্রত অবস্থায় আমরা বাইরের জগৎ সম্পর্কে সচেতন এবং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই আমরা এই জগৎকে উপলব্ধি করি। যাঁর সাতটি অঙ্গ এবং উনিশটি উপলব্ধির দ্বারা জীব হিসাবে তিনিই এই স্থূলদেহ ভোগ করেন। এটিই আত্মার প্রথম প্রকাশ।
Verse 4: আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমরা যা কিছু করি সেসবের অস্তিত্ব আমাদের মনে। স্বপ্ন বাহ্যবিষয়-বিহীন। এটা পুরোপুরি মনের ব্যাপার। স্বপ্ন হচ্ছে জাগ্রত অবস্থায় আমাদের বাসনা ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ। জাগ্রত অবস্থার মতো স্বপ্নবস্থাতেও আমাদের সাতটি অঙ্গ ও উনিশটি ইন্দ্রিয় অটুট থাকে, কিন্তু তখন আমরা যা কিছু কাজ করি মনের দ্বারা। এ অবস্থায় বাইরের জগতের সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। এই মানস অভিজ্ঞতার অধিপতি হল (ব্রহ্মের) দ্বিতীয় অবস্থা।
Verse 5: যখন তুমি গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাক তখন তোমার মনে কোন কামনা-বাসনা থাকে না এবং তখন তুমি স্বপ্নও দেখ না; মন নিষ্ক্রিয় থাকে। একেই বলে সুষুপ্তি। জাগ্রত অবস্থায় বা স্বপ্নাবস্থায় তুমি বস্তু সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় কোন বিষয় বা কোন দ্বৈত দৃষ্টি থাকে না। তখন শুধুই এক দেখা যায়। কিন্তু এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না। এ যেন সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া, যেখান থেকে আবার স্বপ্ন বা জাগ্রত অবস্থায় তোমাকে ফিরে আসতেই হবে। এটাই প্রাজ্ঞ—আত্মার তৃতীয় অবস্থা।
Verse 6: এই প্রজ্ঞা সকল বস্তুর অধীশ্বর। ইনি সর্বজ্ঞ, ইনিই অন্তর্যামী। সকল বস্তু এঁর থেকে উৎপন্ন হয়ে এঁতেই লীন হয়। ইনিই সবকিছুর কারণ।
Gaudapada Karikas
1.1 যখন তুমি জাগ্রত এবং চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সচেতন তখন তুমি ‘বিশ্ব’ বলে পরিচিত। তখন তুমি তোমার চারপাশের সকল বস্তু দর্শন করতে সক্ষম। তুমি সর্বব্যাপী। এটিই তোমার প্রথম অবস্থা। যখন তুমি স্বপ্ন দেখ তখন তুমি তোমার মনের সম্পর্কে সচেতন। তখন তুমি ‘তৈজস’, এটি তোমার দ্বিতীয় অবস্থা। যখন শুদ্ধ চৈতন্যমাত্র আছে, এমনকি তুমি কোন বিশেষ বস্তু সম্পর্কেও অবহিত নও, সেটাই তোমার তৃতীয় অবস্থা অর্থাৎ প্রাজ্ঞ। একই আত্মা তিনটি বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন।
1.2 জাগ্রত অবস্থায় আত্মা হল বিশ্ব, সেই আত্মা তাঁর ডান চোখ দিয়ে স্থূল-জগৎকে প্রত্যক্ষ-সক্ষম। আত্মা যখন স্বপ্নের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করেন তখন আত্মাকে বলে ‘তৈজস’, আবার হৃদয়ে যখন শুদ্ধ চৈতন্যরূপে বিরাজিত, আত্মার সেই অবস্থাকে বলে প্রাজ্ঞ। আত্মা এক এবং অভিন্ন। একই দেহের তিনটি বিভিন্ন অবস্থার মধ্যেও সেই এক আত্মা বিরাজিত।
1.3 ‘বিশ্ব’ অবস্থায় আত্মা এই স্থূলজগৎকে ভোগ করেন। ‘তৈজস’রূপে নিজকামনা অনুযায়ী আত্মা সূক্ষ্মভাবে এ জগৎকে উপভোগ করেন। প্রাজ্ঞ অবস্থায় আত্মা শুধুমাত্র আনন্দ ভোগ করেন। এই তিন রকমের ভোগের কথা বলা হয়েছে।
1.4 ‘বিশ্ব’ হিসাবে স্থূলবস্তুই আমার উপভোগের বিষয়। কিন্তু যখন আমি ‘তৈজস’, তখন সূক্ষ্মবস্তু পর্যন্ত আমার কাছে তৃপ্তিদায়ক হয়ে থাকে। আর যখন আমি প্রাজ্ঞ তখন আনন্দপ্রদ বস্তু আমাকে তৃপ্তি দেয়। (যদিও এক্ষেত্রে আমি কি উপভোগ করছি সে সম্পর্কে আমি সচেতন নই।) এই তিন রকম ভোগের কথা বলা হয়েছে।
1.5 জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থায় মানুষ যথাক্রমে স্থূলজগৎ, সূক্ষ্মজগৎ ও আনন্দ উপভোগ করে। যিনি এই ভোগ্য বিষয় ও ভোক্তাকে জানেন, তিনি যদি নিজে এসব ভোগও করেন তাতেও এর দ্বারা তিনি লিপ্ত হন না।
1.6 একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় কোন বস্তু থেকে আর এক বস্তুর সৃষ্টি হয় (যেমন, বিশ্ব [স্থূল], তৈজস [সূক্ষ্ম], প্রাজ্ঞ [কারণ])। প্রাণ থেকেই অচেতন বস্তুর সৃষ্টি। সূর্য থেকেই যেমন তার কিরণের উৎপত্তি ঠিক তেমনি পরমাত্মা (পুরুষ) থেকে চেতন বস্তুর সৃষ্টি।
1.7 যাঁরা জগৎ সৃষ্টি হয়েছে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী তাঁরা এই বিশ্বকে ঈশ্বরের মহিমা বলে মনে করেন। কিন্তু যাঁরা আত্মজ্ঞানলাভের প্রয়াসী তাঁদের নিকট এ জগৎ স্বপ্ন অর্থাৎ দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।
1.8 যাঁরা সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসী তাঁরা মনে করেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছামাত্রেই এই জগতের সৃষ্টি। কিন্তু জ্যোতির্বিদগণ মনে করেন কাল থেকেই সর্বভূতের উৎপত্তি হয়েছে।
1.9 কিছু ব্যক্তির মতে ঈশ্বর এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ভোগের জন্য। অপর কিছু ব্যক্তি বলেন, তিনি এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন তাঁর লীলার জন্য। অন্য কিছু ব্যক্তির মতে এই জগৎ সৃষ্টি তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ঈশ্বর আপ্তকাম অর্থাৎ তাঁর সব ইচ্ছাই পরিপূর্ণ। তবে কোন্ প্রয়োজনে তিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন?
Verse 7: অন্তরস্থ ঘটনা সম্পর্কে তুরীয় সচেতন নন (এর থেকে বোঝা যায় তুরীয় তৈজস নন), বাইরের ঘটনা সম্পর্কেও ইনি সচেতন নন (অর্থাৎ তুরীয় বিশ্ব নন)। ইনি জাগ্রত ও স্বপ্নবস্থার মধ্যবর্তী কোন কিছু সম্পর্কেও সচেতন নন। (সুষুপ্তি অবস্থার প্রাজ্ঞও নন। ইনি সর্বজ্ঞও নন, অচৈতন্য নন। ইনি অদৃশ্য—লৌকিক ব্যবহারের অতীত, কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়—এই দুয়েরই ঊর্ধ্বে, মনের অগোচর, এবং কোন শব্দ দ্বারা ইনি নির্দেশিত নন। এই অবস্থায় থাকে শুধু আত্মার চৈতন্য এবং এখানে জগতের কোনও অস্তিত্ব নেই। এখানে শান্তি ও কল্যাণের মূর্ত প্রকাশ, এই চৈতন্য এক ও অদ্বিতীয়। এই চতুর্থ অবস্থাই তুরীয়। প্রাজ্ঞগণ একেই আত্মা বলেন। এই আত্মাকে উপলব্ধি করতে হবে।
1.10 প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা তুরীয়কে এভাবে বর্ণনা করেছেন: এক ও অভিন্ন, সর্বব্যাপী (ঢেউয়ে যেমন জল থাকে), সম্পূর্ণভাবে এই দৃশ্যমান জগৎকে বর্জন, স্বয়ংপ্রকাশ, শুদ্ধ চৈতন্য, পরব্রহ্ম, একমাত্র তিনিই সকল দুঃখমোচনে সক্ষম। (পরব্রহ্মের সঙ্গে নিজ অভিন্নতা উপলব্ধি করতে পারলে সকল দুঃখের অবসান হয়।)
1.11 বিশ্ব এবং তৈজস, উভয়ই কার্য-কারণ নিয়মে নিয়ন্ত্রিত—জ্ঞানী ব্যক্তিমাত্রই একথা স্বীকার করেন। প্রাজ্ঞ কিন্তু শুধুমাত্র জন্মসূত্রেই কারণবদ্ধ। কিন্তু কার্য-কারণের কোনটিই তুরীয় অবস্থায় প্রযোজ্য নয়।
1.12 প্রাজ্ঞ অবস্থায় ব্যক্তি নিজেকে জানে না, অন্য কিছুও জানে না। এ অবস্থায় সৎ-অসৎও জানা যায় না। অর্থাৎ এ অবস্থায় কোন কিছুই জানা যায় না। তুরীয় অবস্থায় ব্যক্তি কিন্তু সর্বদাই সবকিছু জানেন।
1.13 প্রাজ্ঞ এবং তুরীয়ের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, উভয়ই এই দৃশ্যজগৎ সম্পর্কে অবহিত নয়। আবার উভয়ের মধ্যে একটি পার্থক্যও আছে। প্রাজ্ঞ নিদ্রাভিভূত কারণ সে অজ্ঞান, কিন্তু তুরীয় অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত।
1.14 প্রথম দুই অবস্থা—বিশ্ব এবং তৈজস, দৃষ্টিবিভ্রম ও স্বপ্নের দ্বারা বিশেষিত। প্রাজ্ঞ হল স্বপ্নহীন গাঢ় নিদ্রার অবস্থা। যাঁরা ব্রহ্মকে যথার্থভাবে জানেন তাঁরা নিদ্রা ও স্বপ্নবস্থাকে কখনো তুরীয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন না।
1.15 স্বপ্ন এক দৃষ্টিবিভ্রম যেখানে এক বস্তুকে অন্য আর এক বস্তুরূপে দেখা যায়। নিদ্রা (সুষুপ্তি) হল অবিদ্যা যখন আমরা কিছুই জানতে পারি না। আমাদের নিকট এই দুই-ই বন্ধন। আমরা এ দুটিকে অতিক্রম করতে পারব তখনি যখন আমরা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারব।
1.16 অনন্ত কাল ধরে মায়া সক্রিয় এবং তারই প্রভাবে জীবাত্মা নিদ্রিত, যেন সম্মোহিত। জাগ্রত হলে জীবাত্মা নিজের স্বরূপকে উপলব্ধি করে। সে তখন অনুভব করে যে সে অজম্ (জন্মরহিত), অনিদ্র (অর্থাৎ অজ্ঞানতারহিত), এবং স্বপ্নবর্জিত (অর্থাৎ ভ্রমমুক্ত)। জীবাত্মাই পরমাত্মা আর পরমাত্মাই একমাত্র সত্য।
1.17 যদি এই দৃশ্যমান জগতের সত্যিই অস্তিত্ব থাকত তবে কোন এক সময়ে সেটি লুপ্তও হত। কিন্তু এ জগতের অস্তিত্ব নেই। এর অস্তিত্ব একটি ভ্রান্তিমাত্র। আসল কথাটি হল ব্রহ্মই একমাত্র সত্য।
1.18 কেবলমাত্র কোন কারণে যদি বহুর প্রয়োজন হয় যেমন—আচার্য, শিষ্য এবং শিক্ষকতা ইত্যাদির কল্পনা করতে হয়, তবে উদ্দেশ্য সিদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই কল্পনারও সমাপ্তি ঘটে। শিক্ষাদানের ফলে যখন আত্মজ্ঞান লাভ হয়, তখন বহুর অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
Verse 8: ওঁকারের বর্ণমালারূপে (অর্থাৎ অ, উ, ম) এখানেও সেই একই পরমাত্মা। আত্মার পাদসমূহই ওঁকারের মাত্রা। আবার ওঁকারের মাত্রাসমূহই আত্মার পাদ। অকার, উকার, মকার এই তিনটি ওঁকারের মাত্রা।
Verse 9: জাগ্রত অবস্থায় বৈশ্বানররূপী পরমাত্মা ‘অ’ এই বর্ণের দ্বারা চিহ্নিত। বৈশ্বানর এবং ‘অ’ উভয়ই সর্বব্যাপী। যিনি একথা নিশ্চিতভাবে জানেন তাঁর সকল কামনা-বাসনা পূর্ণ হয়ে গেছে। তিনি সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
Verse 10: স্বপ্নাবস্থায় আত্মার তথা তৈজসের অবস্থান ‘অউম’-এর উ-এর তুল্য। কারণ উভয়ই মধ্যবর্তীস্থান অধিকার করে আছেন এবং উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যিনি এই দুই-এর অভিন্নতা জানেন তাঁর বোঝবার ক্ষমতা সকলের চেয়ে বেশি। এবং তিনি সাধু ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাঁর পরিবারের সকলেই ব্রহ্মজ্ঞানী।
Verse 11: সুষুপ্তি অবস্থার আত্মা তথা প্রাজ্ঞকে ‘অউম’-এর তৃতীয় অক্ষর ‘ম’-এর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে অ এবং উ-এর সাথে যথাক্রমে বিশ্ব এবং তৈজসের সমাপ্তি ঘটে সেখানেই প্রাজ্ঞ এবং ম উভয়েরই অবস্থান। প্রাজ্ঞ এবং ম হল একত্বে বিলীন হয়ে যাওয়ার সিংহদ্বার। যিনি একথা জানেন তিনি এ জগৎকে জানেন, এবং জগতের বিশ্রামস্থল হয়ে ওঠেন।
1.19 বিশ্ব হল প্রথম অবস্থা, বর্ণের মধ্যে অ-কারও প্রথম। যেহেতু উভয়েই প্রথম সেহেতু তারা এক এবং অভিন্ন। বিশ্বকে যদি অ (মাত্রা)-রূপে মনে করা হয় তবে এদের মধ্যে ব্যাপকতার সাদৃশ্যটি লক্ষ্য করা যায়।
1.20 যদি তৈজসকে ‘উ’ হিসেবে আমরা দেখি, তাহলে এর শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্টই বুঝতে পারব। (উ-কারের মতোই) তৈজসও দুই অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর দ্বারা তৈজসের গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
1.21 আত্মার তৃতীয় অবস্থা হল প্রাজ্ঞ। অবস্থার দিক থেকে প্রাজ্ঞ (অউম-এর) ম-এর তুল্য। উভয়ের মধ্যে এটিই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেমন ‘অউম’-এর শেষ বর্ণ ম-কার, ঠিক তেমনি প্রাজ্ঞ হল আত্মার চূড়ান্ত অবস্থা। এইখানে উভয়ই সদৃশ।
1.22 অচঞ্চল বিবেকী ব্যক্তি এক ও অভিন্ন আত্মাকে তিনটি বিভিন্ন অবস্থায় দেখেন। এইরূপ ব্যক্তি প্রকৃতই মহর্ষি। তিনি সর্বজন-শ্রদ্ধেয় এবং সকলের ভালোবাসার পাত্র।
1.23 যখন আমরা ‘অ’কারের (প্রথম অবস্থা) ধ্যান করি, তখন নিজেদেরকে ‘বিশ্ব’ বলে মনে হয়। যখন ‘উ’কারের (দ্বিতীয় অবস্থা) ধ্যান করি তখন আমরা ‘তৈজস’ হয়ে যাই। সেইভাবে, যখন ‘ম’-কারের (তৃতীয় অবস্থা) ধ্যান করি, তখন আমরা হই ‘প্রাজ্ঞ’। কিন্তু যখন আমরা তুরীয়ের (চতুর্থ অবস্থা) ধ্যানে মগ্ন হই, তখন আমরা অসীম হয়ে যাই।
Verse 12: (যেমন আগে বলা হয়েছে), ‘ওম্’-এর চতুর্থ অবস্থা হচ্ছে পরমাত্মা। এই আত্মা অনন্ত, বাক্যমনাতীত, অদ্বয় এবং শিবস্বরূপ। দৃশ্যমান জগৎ এঁরই মধ্যে রয়েছে। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা বলেন, জীবাত্মাই হলেন পরমাত্মা। যিনি এই তথ্য জানেন তিনি ব্রহ্মে লীন হয়ে যান। (তিনি নিজেকে আর কখনো জীবাত্মা বলে মনে করেন না।)
End of Mandukya Upanishad
1.24 প্রতিটি অবস্থার মধ্য দিয়ে ওম্-কে জানার চেষ্টা করতে হবে। এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পাদসমূহ (অবস্থাসকল) এবং মাত্ৰাসকল (অক্ষরগুলি) এক ও অভিন্ন। ওম্-কে যদি তার বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে জানা যায় তবে সাধকের আর কোনও চিন্তা থাকে না। সাধক তখন নিজেকে ধন্য মনে করেন।
1.25 মনকে প্রণবে একাগ্র করতে হবে। প্রণবই ব্রহ্ম এবং তিনি সব ভয়ের ঊর্ধ্বে। প্রণবে মন স্থির হলে সাধকের আর কোনও ভয় থাকে না।
1.26 প্রণবই (ওম্) একই সাথে পরব্রহ্ম এবং অপরব্রহ্ম। প্রণবের কোন কারণও নেই, কার্যও নেই। প্রণবের বাইরে আর কিছুই নেই। সবই প্রণবের অন্তর্গত। প্রণবের কোন ক্ষয় নেই। (প্রণব সবসময়ই এক।)
1.27 প্রণবই (ওম্) সবকিছুর শুরু, মধ্য ও শেষ। এইভাবে যদি প্রণবকে জানতে পারি, তবে তক্ষণি আমরা ব্রহ্মকেও সম্পূর্ণভাবে জানতে পারব।
1.28 প্রণবকে সেই ঈশ্বর বলে জানতে হবে যিনি সকলের হৃদয়ে রয়েছেন এবং সকলকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা প্রণবকে সর্বব্যাপী বলে জানেন। এমন মানুষ কখনো দুঃখে কাতর হন না। অর্থাৎ তিনি সুখ-দুঃখের পারে চলে যান।
1.29 অখণ্ড, অসীম, অদ্বৈত এবং মঙ্গলময়রূপে যিনি ওঁকারকে জানেন, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি, অন্য কেউ নয়।
Chapter II – Vaitathya Prakarana (The Chapter on Illusion)
2.1 প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা বলেন, স্বপ্নে দেখা সকল বস্তুই মিথ্যা। তুমি স্বপ্নে নানারকম বস্তু দেখে থাক কিন্তু সেসব বস্তু তোমার মধ্যে থাকতে পারে না। কারণ তোমার দেহ সেইসব বস্তুর তুলনায় ক্ষুদ্র। (দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, তুমি স্বপ্নে পর্বত দেখতে পার। কিন্তু পর্বত কি সত্যিই তোমার দেহের মধ্যে থাকতে পারে? না, তাই স্বপ্নে দেখা পর্বত মিথ্যা।)
2.2 মানুষ স্বপ্নের সময় দেহ থেকে বেরিয়ে স্বপ্নদৃষ্ট স্থানে যায়—একথা ঠিক নয়। এটা অসম্ভব। যদি সে দেহ থেকে বেরিয়ে যায় তবে ঘুম ভাঙার আগে ঐ অল্পসময়ের মধ্যে সে ফিরে আসতে পারত না। আবার জেগে ওঠার পর সে আর নিজেকে স্বপ্নদৃষ্ট স্থানে দেখে না।
2.3 স্বপ্নে দেখা রথ মিথ্যা। এটি যুক্তিযুক্ত এবং শাস্ত্রেও সেকথা বলা হয়েছে। দেহ-মধ্যবর্তী স্থান খুবই সংকীর্ণ (রথ রাখার পক্ষে); এর দ্বারাই রথের অনিত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা বলেন একথা যুক্তিযুক্ত এবং শাস্ত্রও এইকথা বারবার বলে থাকেন।
2.4 যখন আমরা স্বপ্নে নানা বস্তু দেখি তখন আমরা জানি যে ঐসব বস্তু মিথ্যা। কারণ দেহের অভ্যন্তরে ঐসব বস্তু থাকার মতো জায়গা নেই। কিন্তু জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা যা-কিছু দেখি তাও সমভাবে মিথ্যা। দুই-এর মধ্যে পার্থক্য শুধু এইখানে যে জাগ্রত অবস্থাতে বস্তুগুলি থাকার জন্য জায়গার অভাব হয় না। স্বপ্ন বা জাগ্রত উভয় অবস্থাতে বস্তুগুলি কিন্তু এক। স্বপ্নে দেখা বস্তুগুলি যদি মিথ্যা হয় তবে সেগুলি জাগ্রত অবস্থাতেও মিথ্যা।
2.5 একথা সকলেই জানেন, উভয় অবস্থাতেই জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় বস্তুর সম্পর্কটি একই থাকে। এই দুই অবস্থায় যেসব বস্তুর অভিজ্ঞতা হয় সেই বস্তুগুলি অভিন্ন। এই কারণেই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা জাগ্রত ও স্বপ্ন উভয় অবস্থার বস্তুকেই মিথ্যা বলে মনে করেন।
2.6 এমন কোনও বস্তু যদি থাকে যা শুরুর আগেও ছিল না আবার শেষ হবার পরেও থাকবে না তাকে মিথ্যা বলে মনে করতে হবে। বস্তুটি মরীচিকার মতোই মিথ্যা। বস্তুটিকে সত্য বলে মনে হলেও বস্তুটি আসলে সত্য নয়। যা চিরন্তন সত্য তা নিত্য অর্থাৎ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এই তিন কালেই তা সত্য।
2.7 জাগ্রত অবস্থায় আমাদের অনেক বস্তুই কাজে লাগে। স্বপ্নাবস্থায় সেগুলি কাজে নাও আসতে পারে। এর অর্থ হল ঐসকল বস্তুসমূহের আদি ও অন্ত আছে। এইরকম বস্তু অবশ্যই মিথ্যা।
2.8 কথিত আছে, স্বর্গের ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাগণ সহস্র চক্ষু ও বহু অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী। এবং স্বপ্নে আমরা এইসব অলৌকিক বস্তুর দর্শন পেতে পারি। স্বপ্নের প্রকৃতিই এমন। কোন স্থানের রাস্তাঘাট চেনা থাকলে আমরা সেখানে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারি এবং সেখানকার দর্শনীয় জিনিস দেখে চিনতে পারি। একইভাবে স্বপ্নেও আমরা নানা অলৌকিক বস্তু দেখি, যেন এই-সকল বস্তুকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানি। মরীচিকা অথবা রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো এসকল বস্তুও মিথ্যা।
2.9 স্বপ্নাবস্থায় আমরা যেসব জিনিস দেখি তা মনের সৃষ্টি। সে সবই মিথ্যা। আমরা মনে করি জাগ্রত অবস্থায় আমরা যা দেখি তা সত্য। আমরা এই দুই অবস্থার অভিজ্ঞতার মধ্যে যে ভেদ কল্পনা করি তাও ভুল। স্বপ্ন ব্যাপারটিই মিথ্যা হওয়ার দরুন এর মাধ্যমে আমাদের যা কিছু অভিজ্ঞতা হয়, সেগুলিকে সত্য বা মিথ্যা যা বলেই মনে করি না কেন আসলে তা সবই মিথ্যা।
2.10 জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা নানারকম কল্পনা করে থাকি। আমরা জানি এ সবই মিথ্যা। কিন্তু বাহ্যজগতে বস্তুকে দেখতে পাই বলে আমরা সেগুলিকে সত্য বলে মনে করি। কিন্তু এই দুই অভিজ্ঞতাই মিথ্যা। যুক্তি দ্বারা এ সিদ্ধান্তটি সমর্থনযোগ্য।
2.11 যদি জাগ্রত ও স্বপ্ন উভয় অবস্থাই মিথ্যা হয় তবে জ্ঞাতা-জ্ঞেয় সম্পর্ক বলে কিছু থাকতে পারে না। আবার এই দুই অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাসমূহ যদি মিথ্যা হয় তবে সে অভিজ্ঞতার স্রষ্টাই বা কে?
2.12 আত্মা স্বয়ং প্রকাশিত। এই আত্মা নিজেই তাঁর মায়াশক্তির দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি এবং জগৎরূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন। আত্মা শুদ্ধ চৈতন্য ও অদ্বিতীয়, তা সত্ত্বেও মায়ার সাহায্যে বিভিন্নরূপে প্রকাশিত হন। এটাই হল বেদান্তের সিদ্ধান্ত।
2.13 আত্মা মনোমধ্যে স্থিত এবং চিন্তা ও কামনা-বাসনার মধ্য দিয়ে ইনি নিজেকে প্রকাশিত করেন। ক্ষণস্থায়ী (যেমন বিদ্যুৎ), এবং আপেক্ষিক স্থায়ী (যেমন এই জগৎ)—এই উভয় অবস্থার বস্তুসকলের মধ্য দিয়ে আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন।
2.14 মনের মধ্যে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ বস্তুটি আছে বলে আমরা কল্পনা করি। বহির্জগতেও কোন বস্তুর অস্তিত্ব ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ আমরা বস্তুটি সম্পর্কে সচেতন থাকি। এই সবকিছুই মিথ্যা। এ দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনরকম পার্থক্য আছে ভাবাই অযৌক্তিক।
2.15 আমাদের মনে বহু বাসনা থাকে যদিও সেগুলি অস্পষ্ট কল্পনামাত্র। বহির্জগতের বস্তুগুলি খুবই স্পষ্ট হতে পারে। কিন্তু এ সবই কল্পনাপ্রসূত। আমরা যে এই বস্তুগুলিকে বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষ করি তারজন্য ইন্দ্রিয়গুলিই দায়ী।
2.16 প্রথমে জীবাত্মা কল্পনা করে। সে অনুভব করে এবং বলে ‘আমিই কর্তা’ (আমি সুখী, আমি দুঃখী ইত্যাদি)। এরপর সে কল্পনা করে শব্দের মতো বাহ্যবস্তুগুলিকে ও প্রাণের মতো অন্যান্য অভ্যন্তরীণ বস্তুকে। জীবাত্মা তার নিজ কল্পনা অনুযায়ী বস্তুকে উপলব্ধি করে থাকে।
2.17 অন্ধকার জায়গায় কোন দড়ি দেখে আমরা অনেক সময়ই সাপ বা জলধারা বা এই ধরনের কোন বস্তু বলে ভুল করে থাকি। এ সবই আমাদের মনের ভুল। ঠিক একইভাবে, আমরা পরমাত্মাকে (যিনি শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ) কর্তা হিসাবে অথবা আমাদেরই মতো সুখী বা দুঃখী ব্যক্তি বলে মনে করে থাকি। কিন্তু এও আমাদের মনের ভুল।
2.18 সেখানে দড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই, কিন্তু অন্ধকারের জন্য আমরা দড়িকে সাপ বলে মনে করছি। আলো এলেই আমরা বুঝতে পারি ওটা সাপ নয় আসলে দড়ি। ঠিক একইভাবে শাস্ত্রপাঠের দ্বারা নিজ স্বরূপ সম্বন্ধে আমাদের যে অজ্ঞানতা তা দূর হয়। তখন আমরা উপলব্ধি করি আমরাই পরমাত্মা (যা নিত্যমুক্ত, এবং জন্মমৃত্যুরহিত)।
2.19 এই আত্মা অদ্বিতীয়। এই আত্মাকে প্রাণ ইত্যাদি বহু রূপে কিভাবে দেখা যায়? এটি সম্ভব হয় আত্মার নিজ শক্তি অর্থাৎ মায়ার প্রভাবে। বহু বস্তুকে দেখা ঠিক দেখা নয়। এ আমাদের মনের ভুল। এক আত্মাই নিজ শক্তি অর্থাৎ মায়ার প্রভাবে বহু হয়েছেন। বহু এই একের উপরই অর্থাৎ ‘আত্মার’ উপরই আরোপিত। আত্মা যেন নিজ মায়াতে নিজেই মুগ্ধ।
2.20 যাঁরা হিরণ্যগর্ভকে উপাসনা করেন তাঁরা মনে করেন আত্মাই হিরণ্যগর্ভ। বৈশেষিক দার্শনিকরা মনে করেন, ঈশ্বরই আত্মা এবং তিনি এই বিশ্বের স্রষ্টা। জড়বাদী অর্থাৎ লোকায়ত দার্শনিকদের মতে ক্ষিতি, অপ্, তেজ ও বায়ু এই চারটি দ্বারাই এই জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। আবার সাংখ্যের মতে, সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই তিনটি গুণই হল আত্মার উপাদান। আর শৈবরা বিশ্বাস করেন শিব, অবিদ্যা এবং আত্মাই হল জগতের মূল।
2.21 যাঁরা পাদ অর্থাৎ অবস্থায় বিশ্বাসী, তাঁরা পাদকেই সত্য বলে মনে করেন। তাঁরা বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞ এই তিন রূপে আত্মাকে গ্রহণ করেন। আবার আর একদল মানুষ জড়বস্তুকেই সত্য বলে মনে করেন। তাঁরা বাৎসায়ন প্রতিষ্ঠিত দর্শনে বিশ্বাসী। আর এক শ্রেণীর চিন্তাবিদরা বলেন পুরাণই সত্য। তাঁদের মতে ভূ, ভুবঃ এবং স্বঃ এই তিন লোকই সত্য। আরও এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যাঁরা দেবদেবীর পূজা করেন এবং দেবদেবীকেই সত্য বলে মনে করেন।
2.22 যাঁরা বেদপাঠে অনুরাগী ও অভ্যস্ত তাঁরা বেদকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। যাঁরা যাগযজ্ঞ (অর্থাৎ কর্মযজ্ঞ) করেন তাঁরা যাগযজ্ঞকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। আবার সাংখ্যরা বলেন, আত্মা কোন কিছু করেন না। অর্থাৎ আত্মা কর্তা, ভোক্তা নন। (তাঁদের ভাষায় আত্মা পুরুষ এবং পুরুষ সাক্ষীমাত্র।) পাচকরা বলেন খাদ্যবস্তু তো খাওয়ারই জন্য। (পাচকের মতো, অনেক মানুষই মনে করেন জীবন শুধুমাত্র ভোগের জন্য।)
2.23 কিছু মানুষ মনে করেন, আত্মা খুবই সূক্ষ্ম, যেন একটি অণু। আবার অনেকের মতে আত্মা স্থূলস্বভাবের। তাঁদের মতে আমাদের এই শরীরই আত্মা এবং শরীরই পরম সত্য। এঁরা লোকায়ত দার্শনিক বা জড়বাদী। অপর আর এক গোষ্ঠী মনে করেন পরম সত্য হল তাঁদের উপাস্য দেবদেবী, যেমন শিব—যাঁর হাতে ত্রিশূল ও যিনি ষাঁড়ের উপর বসে আছেন। আবার এমন ব্যক্তিও আছেন যাঁরা পরম সত্যকে নিরাকার (দেহহীন), নির্গুণ (গুণ বা উপাধিবিহীন) বলে মনে করেন। তাঁদের কাছে পরম সত্য কিছুই নয়, শূন্যমাত্র।
2.24 জ্যোতির্বিদরা মনে করেন কালই পরম সত্য। আবার এমন সব মানুষও আছেন যাঁরা মানুষের শ্বাসক্রিয়ার ধরন দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। তাঁদের মতে জ্যোতিষই হল শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান। আবার এমন মানুষও আছেন যাঁরা শব্দের শক্তিতে বিশ্বাসী। তাঁরা শব্দকেই বিজ্ঞান হিসাবে পড়াশুনো করেন। এবং তাঁদের মতে এই শব্দ বিজ্ঞানই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। আবার কিছু মানুষ এই চতুর্দশ লোক নিয়ে পড়াশুনো করেন। তাঁরা বলেন, অন্য সব বিদ্যার মধ্যে তাঁদের বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ।
2.25 কিছু মানুষের মতে মনই আত্মা। আবার কারও মতে বুদ্ধিই আত্মা। বৌদ্ধদের মধ্যে এক গোষ্ঠী মনে করেন যে আমাদের মনেই সবকিছু আছে, বাইরে নয়। আর এক গোষ্ঠীর চিন্তাবিদরা মনে করেন যে বেদের শিক্ষাই একমাত্র সত্য। আমাদের কোন্ কাজ করা উচিত আর কোন্টা করা উচিত নয়, এ ব্যাপারে বেদের নির্দেশ মেনে চলাই আমাদের কর্তব্য।
2.26 সাংখ্যমতে, এই দৃশ্যমান জগৎ সত্য এবং এই জগতের পঁচিশটি অংশ। পাতঞ্জলি গোষ্ঠীর মতে এই সংখ্যা ছাব্বিশ। কারও কারও মতে এই সংখ্যা একত্রিশ। আবার কারও মতে এই সংখ্যা গণনার অতীত।
2.27 কিছু মানুষ আছেন যাঁরা অন্যকে আনন্দ দিতেই ব্যস্ত। তাঁদের কাছে এটাই ধর্ম। আবার অন্য কিছু মানুষ বর্ণাশ্রমপ্রথা কঠোরভাবে মেনে চলেন। একেই তাঁরা ধর্ম বলে মনে করেন। আবার যাঁরা ব্যাকরণবিদ তাঁরা লিঙ্গের উপরই বেশি গুরুত্ব দেন। যে সমস্ত শব্দগুলি লিঙ্গের প্রতীক সেগুলি তাঁদের কাছে পবিত্র। আবার এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যাঁরা পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করেন।
2.28 পুরাণ মতে সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় এ সবই সত্য। এইসব এবং এছাড়াও অন্যান্য যা-কিছু মানুষ কল্পনা করে, তা সবই আত্মার উপর আরোপিত।
2.29 আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি, এই সম্পর্কে আচার্য আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন। উদ্দেশ্যটি কোন বস্তু বা ভাব হতে পারে। সেই বস্তুকে বা ভাবটিকে আমি আমার জীবনের উদ্দেশ্যরূপে গ্রহণ করেছি। এর ফলে আমার মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং আমি ক্রমে ঐ ব্যক্তিতে (যা আমার লক্ষ্য) পরিণত হই। এই পরিবর্তনসমূহ আমাকে রক্ষা করে রাখে। আমার লক্ষ্যে আমি তখন এতই মগ্ন যে অন্য আর কিছু আমার মনকে আকর্ষণ করতে পারে না।
2.30 আত্মা হলেন সেই আশ্রয় যাঁর উপর সকল অনিত্য বস্তু অধিষ্ঠিত। আমাদের চারপাশে আমরা প্রাণেরই প্রকাশ দেখতে পাই। অজ্ঞান ব্যক্তি এই প্রাণ ও তার প্রকাশকে পৃথক বলে মনে করেন। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন, প্রাণ আত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে, যা কিছু আছে তা সব আত্মারই বিকার। সবকিছুর মধ্যে এই এক আত্মাই বিরাজ করেন—একথা যিনি জানেন তিনি আত্মায় দৃঢ় বিশ্বাসী এবং ভয়শূন্য। যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তিনি বেদের বাণীসমূহকে উপলব্ধি করেছেন—একথা তিনি দাবি করতে পারেন।
2.31 যখন আমরা স্বপ্নে কোন বস্তুকে দেখি বা এক বস্তুর স্থলে অন্য কোন বস্তুকে দেখি, ভুলবশত সেগুলিকেই আমরা সত্য বলে মনে করি। (কিন্তু পরে বুঝতে পারি যে, এগুলি আদতে সত্য নয়।) গন্ধর্বনগরের মতো এ যেন আকাশকুসুম কল্পনা। বেদান্তবাদীরা এ সত্য জানেন এবং এই জগৎকে মিথ্যা বলে মনে করেন।
2.32 জন্ম বা মৃত্যু বলে কিছু নেই। কেউই সংসারে বদ্ধ নয়। কারও মুক্ত হবার চেষ্টা বা ইচ্ছার অবকাশ নেই, কারণ তুমি তো মুক্ত হয়েই আছ। এই পরম সত্য।
2.33 আত্মা চৈতন্যস্বরূপ। আত্মাই পরম সত্য। কিন্তু অজ্ঞান ব্যক্তি তাঁর প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারেন না। তিনি মনে করেন যে, এ জগতের অন্যান্য বস্তুর মতো আত্মাও একটি বস্তুমাত্র। সমগ্র জগৎ আত্মার উপর আরোপিত। এইভাবেই জগৎ আত্মার চরিত্র অর্থাৎ বৈশিষ্ট্যগুলি লাভ করে। এই কারণের জন্যই আত্মাকে তিনি বস্তু বলে ভুল করেন। আত্মা সত্য, তাই জগৎকেও সত্য বলে মনে হয়। আমরা একথা ভেবে খুবই আনন্দ পাই যে আত্মা ও জগৎ এক ও অভিন্ন। আমরা যে এমনটি ভাবি তার কারণ অদ্বৈততত্ত্ব এক আনন্দদায়ক চিন্তা।
2.34 এই জগৎ বিভিন্ন নাম-রূপের সমষ্টি। আত্মার মতো এ জগৎ স্বয়ংপ্রকাশিত এবং স্বতন্ত্র কোন সত্তা নয়। বস্তুত আত্মা ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। আবার আত্মার সদৃশ কিছু নেই। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা এভাবেই আত্মাকে দেখে থাকেন।
2.35 বেদে পারদর্শী ঋষিরা হলেন (ইন্দ্রিয়-ভোগসুখের প্রতি) নিরাসক্ত এবং ভয় ও রাগ থেকে মুক্ত। তাঁরা বলেন আত্মা অপরিবর্তনীয়। দ্বিতত্ত্বের বোধ তাঁদের নেই। এবং তাঁরা নিজেদেরকে এক ও অভিন্ন সত্তারূপে মনে করেন।
2.36 অদ্বৈতজ্ঞান ভালোভাবে আয়ত্ত করা বড়ই কঠিন। আমাদের যা করণীয় তা আগেই বলা হয়েছে। তা হল: এই তত্ত্বের একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। তারপর মনকে সেই ধারণায় সবসময় যুক্ত রাখতে হবে। শাস্ত্রে অদ্বৈততত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাধককে এই তত্ত্বের সারকথা উপলব্ধি করতে হবে। সাধক সবসময় অদ্বৈততত্ত্বের মনন ও ধ্যানে যুক্ত থেকে পরিণামে আত্মাকে উপলব্ধি করবেন। সাধক কাউকে বুঝতে দেবেন না যে, তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন। বরং তিনি জড়বুদ্ধির মতো আচরণ করবেন।
2.37 যখন কোন ব্যক্তি জানেন তিনি আত্মা ছাড়া আর কিছু নন, তখন তিনি কাউকে তোষামোদ করেন না। এমনকি সাধারণ শিষ্টাচার দেখাবারও প্রয়োজন মনে করেন না। পিতৃপুরুষের সম্মানে তর্পণাদি অনুষ্ঠানও তিনি করেন না। তিনি জানেন যে, এ দেহের নাশ হবেই কিন্তু আত্মা অবিনাশী। এই জ্ঞানে অবিচল থেকে সন্তোষের সাথেই তিনি জীবন কাটান।
2.38 আত্মা (ব্রহ্ম) দেহ এবং সেই সংক্রান্ত সবকিছুর আশ্রয়—একথা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপলব্ধি করেন। তাঁরা আরও উপলব্ধি করেন এই জগৎ আত্মায় প্রতিষ্ঠিত। একথা জেনে তাঁরা আত্মার প্রতি আকৃষ্ট হন। আত্মাকে ধ্যান করতে শুরু করেন এবং কালে তাঁর সাথে এক হয়ে যান। এইভাবে আত্মায় পরিণত হয়ে তিনি আর এই অবস্থা থেকে বিচ্যুত হন না।
Chapter III – Advaita Prakarana – (The Chapter on Non-duality)
3.1 ধরা যাক, কোন এক ব্যক্তি তাঁর অধিকাংশ সময় প্রার্থনা করে কাটান। তিনি মনে করেন তিনি ও এই দৃশ্যমান জগৎ পূর্বে ব্রহ্মা ছিলেন। কোন কারণে সেই অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে তিনি বর্তমান অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন; পূর্ব অবস্থা ফিরে পেতে হলে তাঁকে ব্রহ্মের (সগুণ ব্রহ্মের) উপাসনা করতে হবে। এহেন ব্যক্তি শুধুমাত্র অজ্ঞানই নন, নির্বোধও বটে। ‘আমি স্বরূপত ব্রহ্ম’—এই উপলব্ধি যাঁর একবার হয়েছে তাঁর আর কখনো ভুল হয় না। নিজের স্বরূপ সম্বন্ধে তিনি সবসময় সচেতন থাকেন। তিনি জানেন একমাত্র তিনিই আছেন, তিনি ছাড়া এই জগতের কোনও অস্তিত্ব নেই।
3.2 যেহেতু উপাসক নির্বোধ, তাই আমি ব্রহ্মের স্বরূপ বর্ণনা করব। এই ব্রহ্ম সর্বত্র সমানভাবে বিদ্যমান। এঁর জন্ম নেই। যখন দেখবে কোন কিছুর জন্ম হচ্ছে নিশ্চিত জেনো ভুল দেখছ—যেমন আমরা দড়িকে সাপ বলে ভুল করি এও তেমনি।
3.3 পরমাত্মা (অনন্ত) আকাশের মতো। জীবাত্মা যেন ঘটের মধ্যে সীমাবদ্ধ আকাশ। জীবের দেহ ও জীবাত্মাকে নানাভাবে এই ঘটাকাশের সঙ্গে তুলনা করা চলে। জীবাত্মা কিভাবে এল তা বোঝাবার জন্য এই উদাহরণটি দেওয়া হয়।
3.4 ঘট যখন ভেঙে যায় তখন ঘটের ভিতরের আকাশ বাইরের আকাশে মিশে যায়। সেইভাবে যে দেহের সঙ্গে জীবাত্মা যুক্ত সেই দেহের যখন নাশ হয় তখন জীবাত্মা (চৈতন্য) পরমাত্মাতে (চৈতন্যে) লয় হয়।
3.5 একটি ঘটের অভ্যন্তরস্থ আকাশ ধোঁয়া বা ধুলোর দ্বারা মলিন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার দ্বারা অন্যান্য ঘটের মধ্যে যে আকাশ তা কলুষিত হয় না। একইভাবে একটি জীবাত্মা যখন সুখ-দুঃখ ভোগ করে তখন তা অন্যান্য জীবাত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না।
3.6 যখন আকাশ কোন পাত্র বা স্থানের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন সেই স্থান বা পাত্রের আকার অনুযায়ী আকাশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দেখে মনে হয় নাম, রূপ, কার্য বা অন্যান্য গুণের দ্বারা আকাশকে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু বস্তুত আকাশকে কখনো খণ্ডিত করা যায় না। এইকথা জীবাত্মার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
3.7 ঘটাকাশ অনন্ত আকাশের অংশ বা বিকার নয়। বস্তুত ঘটাকাশ অখণ্ড আকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। একইভাবে, জীবাত্মা পরমাত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়। জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ নয়, আবার বিকারও নয়।
3.8 শিশুরা মনে করে আকাশ ধোঁয়া ধুলো ইত্যাদি দ্বারা আবৃত। সেইরকম অজ্ঞান ব্যক্তিদের কাছেও আত্মা (লোভ, ক্রোধ ইত্যাদির দ্বারা) কলুষিত বলে প্রতিভাত হন। (প্রকৃতপক্ষে আকাশ এবং আত্মা দুই-ই শুদ্ধ ও নির্মল।)
3.9 মৃত্যু, জন্ম, লোক থেকে লোকান্তরে যাতায়াত এবং বিভিন্ন দেহধারণ—এই সব বিষয়ে আত্মা ও ঘটাকাশের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই (তাদের পার্থক্য শুধু উপাধিগত)।
3.10 দেহমাত্রই অবিদ্যার ফসল। দেহগুলি কাল্পনিক, সত্য নয়। এইসব দেহ উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট যাই হোক না কেন, এগুলি সবই গৌণ।
3.11 তৈত্তিরীয় উপনিষদে দেহের বিভিন্ন সার পদার্থগুলিকে কোষরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। পরমাত্মা, যিনি আকাশের মতো, এইসব কোষগুলি দ্বারা বেষ্টিত থাকেন। তখন তাঁকে আমরা বলি জীবাত্মা।
3.12 একই আকাশ মানুষের দেহের অভ্যন্তরেও আছে, আবার পৃথিবীর অভ্যন্তরেও আছে। সেইরকম ব্রহ্মও সর্বত্র এবং সকল যুগল বস্তুর ভিতরে ও বাইরে আছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদের মধু ব্রাহ্মণে জীবাত্মা ও পরমাত্মার একত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
3.13 যেহেতু শাস্ত্রে জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভিন্নতার প্রশংসা এবং দ্বৈতবাদের নিন্দা করা হয়েছে সেহেতু এই একত্ব যুক্তিযুক্ত।
3.14 উপনিষদ থেকে আত্মজ্ঞান লাভের আগে—বেদের কর্মকাণ্ডে জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ দ্বৈত মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই দ্বৈত ক্ষণিক অর্থাৎ যতক্ষণ অজ্ঞানতা আছে। এক ও অদ্বৈতেই এর পরিণতি। এই ভবিষ্যৎকালীন একত্বকে বোঝাবার জন্যেই ক্ষণিক পার্থক্য দেখানো হয়েছে। বস্তুত এই পার্থক্য যথার্থ নয়, কাল্পনিক।
3.15 যদিও শাস্ত্রে মাটি, লোহা, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ইত্যাদি দৃষ্টান্ত দিয়ে নানাভাবে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা শুধু অদ্বৈততত্ত্বের জন্য মনকে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে। বস্তুত এর মধ্যে কিছুমাত্র ভেদ নেই, দুই নেই।
3.16 অধিকারী ভেদে মানুষকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়—হীন, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট। শাস্ত্র করুণাবশত হীন ও মধ্যম অধিকারীদের জন্য নানা উপাসনা-পদ্ধতির নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু উত্তম অধিকারীর জন্য আলাদা কোন উপাসনার বিধান শাস্ত্রে নেই।
3.17 দ্বৈতবাদীরা আপন প্রত্যয়ে দৃঢ়বুদ্ধি, কিন্তু তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। কিন্তু অদ্বৈতবাদীরা কখনো তাঁদের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন না।
3.18 যেহেতু অদ্বৈতই চূড়ান্ত তত্ত্ব, দ্বৈতের বহু দেখা কেবল অদ্বৈতেরই ভেদ, সুতরাং তার কার্যমাত্র। দ্বিতত্ত্বের অস্তিত্ব শুধুমাত্র নামে। কিন্তু দ্বৈতবাদীরা মনে করেন যে দ্বিতত্ত্ব একযোগে নিত্যও বটে আবার আপেক্ষিকও বটে। দ্বিতত্ত্ব যেহেতু অদ্বৈততত্ত্বের উপর নির্ভরশীল, তাই দ্বিতত্ত্ব কখনো অদ্বৈততত্ত্বকে খণ্ডন করতে পারে না।
3.19 ব্রহ্মের জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। নিজ মায়াশক্তির দ্বারা ইনি বহু রূপে প্রতিভাত হন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মের কোন পরিবর্তন হয় না। সত্যিই যদি ব্রহ্ম পরিবর্তিত হতেন তাহলে অবিনাশী হতেন না, মরণশীল হতেন।
3.20 যা জন্মরহিত তারও জন্ম হতে পারে—এজাতীয় তর্ক দ্বৈতবাদীরা করে থাকেন। কিন্তু যে বস্তুর জন্ম নেই, তার মৃত্যুও নেই। সুতরাং এমন বস্তুর (যার জন্ম নেই) মৃত্যু কেমন করে হতে পারে?
3.21 যা স্বভাবতই মৃত্যুহীন, তার কখনো মৃত্যু হতে পারে না। একইভাবে যা স্বভাবতই মরণশীল, তা অমর হতে পারে না। প্রকৃতি যে বস্তুকে যেভাবে তৈরি করেছে, তার থেকে সে অন্যরকম হতে পারে না।
3.22 যদি কেউ বলেন কোন বস্তু স্বভাবত অবিনাশী হয়েও নিজ স্বভাব পরিবর্তন করতে পারে অর্থাৎ বিনাশশীল হতে পারে (তবে আমরা তাঁকে প্রশ্ন করব)—তাহলে কঠোর সাধনায় তুমি যে মোক্ষলাভ করেছ তাও বদলাতে পারে? অর্থাৎ তোমার মোক্ষ চিরস্থায়ী নয়?
3.23 সত্য বা অসত্য—দুই প্রকার সৃষ্টির প্রসঙ্গেই শাস্ত্র সমানভাবে বলে গেছেন। এই অবস্থায় শুধুমাত্র যে সিদ্ধান্ত শাস্ত্রে আছে এবং বিচার-বুদ্ধি দ্বারাও যা সমর্থিত তাকেই গ্রহণ করতে হবে, অন্য কিছু নয়।
3.24 ‘ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়, এবং ঈশ্বর মায়ার সাহায্যে বহু হলেন’—শাস্ত্রে এইসব কথা আছে। তাই আমরা জানি যদিও ঈশ্বর জন্মরহিত, তবু নিজ মায়ার দ্বারা বহুরূপে প্রকাশিত হলেন।
3.25 সর্বভূতের আদি কারণ হিসেবে হিরণ্যগর্ভের উপাসনা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। তাহলে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে এই ধারণা বাতিল হয়ে গেল। সেইক্ষেত্রে একে (জীবাত্মাকে) কে আবার সৃষ্টি করবে? এর দ্বারা জীবাত্মার উৎপত্তির কারণও বাতিল করা হয়েছে।
3.26 ‘আত্মা এই নয় এই নয়’—এই শাস্ত্রবাক্যটি বোঝা কঠিন। সেইজন্য এতক্ষণ যা কিছু কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—তা আসলে দ্বিতত্ত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন এই দ্বৈতবাদ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে। যা থাকল—তা জন্মরহিত আত্মা।
3.27 যা ইতিপূর্বেই আছে, মায়ার সাহায্যে তার আবার জন্ম হয়েছে—সম্ভবত এমন কথা বলা যায়, কিন্তু তা যথার্থ নয়। যাঁরা জন্মকে সত্য বলে মনে করেন—তাঁদের কথার তাৎপর্য—জাত আবার জাত হয়।
3.28 যা মিথ্যা তার কখনো জন্ম হয় না—মায়ার প্রভাবেও না, বাস্তবেও না। মায়াতে বা বাস্তবে কোনভাবেই বন্ধ্যানারী সন্তানের জন্ম দিতে পারে না।
3.29 স্বপ্নে আমি ছাড়া আর কেউ নেই, তবু অজ্ঞানতাবশত মন দুই দেখে ও সেইমতো কর্ম করে। সেইরকম জাগ্রত অবস্থাতেও মন অবিদ্যার প্রভাবে ভেদদর্শন করে ও তদনুরূপ ব্যবহার করে (বস্তুত দুই নেই, এক। অবিদ্যার কারণে এই ভুল হয়)।
3.30 যখন স্বপ্ন দেখি, তখন মন একাই থাকে। তথাপি আমাদের দুয়ের (জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয়র) অভিজ্ঞতা হয়। এবং এ-বিষয়ে আমাদের মনে কোন সংশয়ও থাকে না। সেইরকম জাগ্রত অবস্থাতেও মন দ্বৈত ভূমিকা পালন করে ও জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয়র সৃষ্টি করে। এর ফলে বহুদর্শন হয়। আর এই বহুর অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের কোন সন্দেহ থাকে না। কিন্তু স্বপ্ন ও জাগ্রত—উভয় অবস্থাতেই যা অভিজ্ঞতা হয় তা ভ্ৰমমাত্র।
3.31 এই দ্বৈতজগতে আমরা স্থাবর এবং জঙ্গম দুরকমের বস্তুই দেখি। এ সব বস্তুই মনের সৃষ্টি। মন নিষ্ক্রিয় হলে দুই বোধ আর থাকে না।
3.32 যখন মন আত্মার সত্যস্বরূপ উপলব্ধি করে তখন সে নিস্ক্রিয় হয়; কারণ তখন আর মনের প্রত্যক্ষের বস্তু কিছু থাকে না; এমনকি প্রত্যক্ষ করার আকাঙ্ক্ষাও মনে উদিত হয় না। তখন মানুষ নিষ্কাম ও মনাতীত অবস্থা লাভ করে।
3.33 ব্রহ্মের কখনো জন্ম হয়নি। ইনি নিত্য এবং অভিন্ন। ইনি নির্গুণ, অতএব কল্পনার অতীত। জ্ঞান এবং জ্ঞেয় উভয়ই ব্রহ্ম। এই অজাত এবং অমৃত ব্রহ্ম নিজেকে শাশ্বত জ্ঞানের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
3.34 যাঁর মন ব্রহ্মে স্থির, একমুখী এবং সবসময় নিত্য-অনিত্য বিচার করছে তাঁর আচরণ যোগীদের লক্ষ্য করা উচিত। গভীর নিদ্রামগ্ন ব্যক্তির আচরণ এরকম নয়। তার আচরণ আলাদা কারণ তার মধ্যে এখনও অজ্ঞানতা রয়েছে। সে এই জগতের প্রতি আসক্ত। তার ব্যবহার ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তির মতো হতে পারে না।
3.35 গভীর ঘুমের সময় মন কারণ-অজ্ঞানে লয় হয়। কিন্তু সংযত মনের ক্ষেত্রে এরকম হয় না। সংযত মন ভয়মুক্ত এবং জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মে লীন হতে সক্ষম।
3.36 স্বভাবত ব্রহ্মের জন্ম নেই; তিনি বিনিদ্র স্বপ্নরহিত, নাম-রূপহীন এবং এককালে প্রকাশিত (অর্থাৎ সদা উজ্জ্বল)। ব্রহ্ম জ্ঞানস্বরূপ এবং সর্বব্যাপী চৈতন্য। অতএব তিনি সকল দায়ভারমুক্ত।
3.37 আত্মা অনির্বচনীয় অর্থাৎ ভাষায় তাঁকে প্রকাশ করা যায় না। বস্তুত আত্মা সকল ইন্দ্রিয়ের অতীত। মনও এঁর নাগাল পায় না। ইনি প্রশান্ত এবং সদা জ্যোতির্ময়। একমাত্র সমাধিতে এঁকে উপলব্ধি করা যায়। ইনি সতত স্থির, অচল এবং নির্ভয়।
3.38 ব্রহ্ম চিন্তা করেন না। ইনি কিছু গ্রহণও করেন না, দানও করেন না। যিনি আত্মাকে উপলব্ধি করেছেন তিনি আত্মাতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত। এই অবস্থায় তিনি জন্মরহিত এবং সর্বত্র তাঁর সমদর্শন হয়।
3.39 একরকমের যোগ আছে যার নাম ‘অস্পর্শযোগ’। এই যোগে যোগীকে বাহ্যবস্তুর সঙ্গে সবরকম সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হয়। এই যোগ অভ্যাস করা কঠিন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যদিও এই যোগের দ্বারা সাধক অভয়পদ লাভ করেন তথাপি এই যোগ অনুশীলন করতে তাঁরা ভয় পান (কারণ তাঁরা তাঁদের ‘আমি’কে হারাতে ভয় পান)।
3.40 যাঁদের (অর্থাৎ যে যোগীদের) এখনও আত্মোপলব্ধি হয়নি তাঁরা শুধুমাত্র মনকে নিয়ন্ত্রণ করে ভয় ও দুঃখকে সম্পূর্ণভাবে জয় করতে সক্ষম হন এবং মা আত্মজ্ঞান ও চিরশান্তি (অর্থাৎ মোক্ষ) লাভ করেন।
3.41 ঘাসের ডগা দিয়ে বিন্দু বিন্দু করে জল তুলে যদি মহাসাগরকে শুষ্ক করতে হয়, তাহলে অবিরাম অক্লান্তভাবে এ কাজ করে যেতে হবে। মনকে নিজের বশে আনতে গেলেও ঠিক ঐরকমই পরিশ্রম করতে হয় (অর্থাৎ সমপরিমাণ পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন)।
3.42 যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবে মনকে বাসনা ও ইন্দ্রিয়সুখভোগ থেকে বিরত রাখতে হবে। গভীর নিদ্রায় যখন মন সম্পূর্ণ উদ্বেগশূন্য, তখনও এই অভ্যাস করে যেতে হবে (কারণ বাসনা ও গভীর নিদ্রা একইভাবে মানুষের ক্ষতিসাধন করে)।
3.43 সবরকমের দুই বোধ দুঃখযুক্ত—একথা সবসময় বিচার করে মনকে ইন্দ্রিয়সুখের চিন্তা থেকে বিরত রাখতে হবে। সেইসঙ্গে মনে রাখতে হবে আমরা যে বহু দেখি তা বস্তুত বহু নয়, এক অর্থাৎ ব্রহ্ম। নিরন্তর এই চিন্তা করলে আর দুই দেখা যায় না।
3.44 তুমি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন (যত তাড়াতাড়ি সম্ভব) জেগে ওঠ এবং মনকে আত্মার সঙ্গে যুক্ত কর। মন যদি ইন্দ্রিয়সুখের পিছনে ছোটে, বারবার তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর যতক্ষণ না মন সংযত হয়। যদি মন ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত হতে চায়, মনকে বোঝাও এর থেকে কি অনর্থ ঘটতে পারে। তারপর মনকে আত্মায় স্থির রাখার চেষ্টা করে যাও। আর একবার যদি সফল হও তাহলে মনকে আর ইন্দ্রিয়সুখের পিছনে ছুটতে দিও না।
3.45 ভোগ্যবস্তু থেকে যখন তুমি কিছু সুখও পাও তখনও এর প্রতি আসক্ত হয়ো না; বরং বিবেক-বৈরাগ্যের সাহায্যে এর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখ। এমনকি মন যখন নিজের বশে রয়েছে তখনও সে বহির্মুখী হতে চাইতে পারে। কিন্তু যত কঠিনই হোক না কেন মনের রাশ টেনে ধরে মনকে আত্মায় সমাহিত কর।
3.46 যখন সুষুপ্তিতে মনের লয় হয় না, আবার বিক্ষেপও হয় না বরং স্থির, অচঞ্চল থাকে এবং পারিপার্শ্বিক জগৎ সম্পর্কে (যোগীর) কোন জ্ঞান থাকে না তখন সেই মন ব্রহ্মে লীন হয়ে আছে।
3.47 যাঁরা ব্রহ্মকে জানেন তাঁরা বলেন আত্মজ্ঞান লাভের যে আনন্দ তা আমাদের আত্মাতেই নিহিত রয়েছে। এই আনন্দেই সকল দুঃখের নিবৃত্তি। যখন মানুষ বাইরের কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল নয় তখনি এই আনন্দের উপলব্ধি হয়। একে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই আনন্দ অনাদি এবং সর্বজ্ঞ। সনাতন ব্রহ্ম ও এই আনন্দ এক ও অভেদ—ব্রহ্মই আনন্দস্বরূপ।
3.48 কেউ জন্মায় না, কারও জন্মাবার সম্ভাবনা পর্যন্ত নেই। বস্তুত কোন কিছুই জন্মায় না—এই হল পরম সত্য।
Chapter IV – Alatasanti Prakarana (The Chapter on the Quenching of the Fire-brand)
4.1 যিনি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম, আকাশের মতো ব্যাপক এবং আত্মার সঙ্গে অভেদ তাঁকে প্রণাম করি। তিনি আত্মাকে জানেন। আবার এই আত্মজ্ঞানের দ্বারা একথাও জানেন যে আত্মার (জীবাত্মার) উপাধিসকল আকাশের উপর আরোপিত উপাধির মতোই মিথ্যা।
4.2 যে যোগে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সঙ্গে কোন সংযোগ থাকে না তাকে বলে অস্পর্শযোগ। এই যোগ সকলের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর। বিবাদ বা বৈরিতার কোন অবকাশ এই যোগে নেই। শাস্ত্র এই যোগশিক্ষা দেন। এই যোগকে আমি প্রণাম করি।
4.3 পরস্পর বিবাদরত পণ্ডিতদের মধ্যে কিছু পণ্ডিত (সাংখ্য) মনে করেন যেসব বস্তু ইতিপূর্বেই রয়েছে তাদের জন্ম হওয়া সম্ভব। অন্য পণ্ডিতেরা (ন্যায়-বৈশেষিক) দাবি করেন যে কেবলমাত্র যে বস্তুর অস্তিত্ব নেই কেবল সে বস্তুই জন্মগ্রহণ করতে সক্ষম।
4.4 সাংখ্য, ন্যায় ও অন্যান্য দ্বৈতবাদীরা পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদে রত। তাঁদের মধ্যে কেউ বলেন, যা ইতিপূর্বেই আছে তার জন্মগ্রহণের প্রয়োজন নেই। অপর দল বলেন, যে বস্তুর অস্তিত্বই নেই তার পক্ষে জন্মগ্রহণ সম্ভব নয়। দ্বৈতবাদীরা এভাবে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে অদ্বৈতবাদীর বক্তব্যকেই সমর্থন করেন। অদ্বৈতমতে, কোন কিছুর জন্ম হওয়া যুক্তির দিক থেকে মিথ্যা।
4.5 যাঁরা বলেন সৃষ্টি বলে কিছু নেই আমরা তাঁদের সঙ্গে একমত। কিন্তু অন্যদের সঙ্গেও আমাদের বিবাদ নেই। হে সাধকগণ, মন দিয়ে শোন, যেখানে আত্মার প্রসঙ্গ সেখানে বিবাদের অবকাশ নেই।
4.6-8 যা জন্মরহিত তারও জন্ম হতে পারে—এ জাতীয় তর্ক দ্বৈতবাদীরা করে থাকেন। কিন্তু যার জন্ম নেই তার মৃত্যুও থাকতে পারে না। সুতরাং এমন বস্তুর (যা জন্মরহিত) মৃত্যু কেমন করে হতে পারে?
যা স্বভাবত অবিনাশী তার বিনাশ হতে পারে না। একইভাবে যা মরণশীল তা অবিনাশী হতে পারে না। প্রকৃতি যে বস্তুকে যেমনভাবে সৃষ্টি করেছেন তার থেকে সে অন্যরকম হতে পারে না।
যদি কেউ বলেন কোন বস্তু স্বভাবত অবিনাশী হয়েও নিজ স্বভাব পরিবর্তন করতে পারে অর্থাৎ বিনাশশীল হতে পারে তবে (আমরা তাঁকে প্রশ্ন করব) কঠোর সাধনায় তুমি যে মোক্ষলাভ করেছ তাও বদলাতে পারে? অর্থাৎ তোমার মোক্ষ কি চিরস্থায়ী নয়?
4.9 যা যোগ সাধনার বলে লাভ করা যায়, যা স্বাভাবিক, যা জন্মগত, যা কারও সৃষ্টি নয় বা যা কখনো নিজের স্বভাব পরিবর্তন করে না—তাই প্রকৃতি বলে পরিচিত।
4.10 জীবাত্মা স্বভাবতই জরা-মৃত্যু থেকে মুক্ত। কিন্তু সবসময় এইসব পরিবর্তনের কথা চিন্তা করতে করতে জীবাত্মা তার মুক্তস্বভাব হারিয়ে ফেলে (অর্থাৎ জীবাত্মা নিজের উপর এইসব পরিবর্তন আরোপ করে)।
4.11 কারও (সাংখ্য) মতে কারণই কাৰ্য। তাঁরা আরও বলেন কারণের জন্ম হয়। তাই যদি হয় তাহলে কি করে কারণকে জন্মরহিত বলা যাবে? আর কারণ যদি কার্যে পরিণত হয় তবে তাঁকে কিভাবে অপরিবর্তনীয়ই বা বলা যায়?
4.12 কার্য যদি জন্মহীন কারণ থেকে পৃথক না হয় তাহলে কার্যেরও জন্ম নেই। উপরন্তু (কার্য-কারণ পৃথক না হলে) কারণ কিভাবে অপরিবর্তিত থাকে?
4.13 যে কারণের এখনও জন্মই হয়নি তার থেকেও কার্য হতে পারে—এর স্বপক্ষে সাংখ্য কোনও দৃষ্টান্ত দিতে পারেননি। আবার যদি বলা হয় কারণের উৎপত্তি আছে এবং সেই কারণ থেকে আবার কোন কার্য উৎপন্ন হয়েছে তাহলে যে অবস্থা সৃষ্টি হয় তাকে ন্যায়শাস্ত্রে বলে ‘অনবস্থা’ দোষ।
4.14 দ্বৈতবাদীরা মনে করেন দেহ কর্মের ফল। তাঁরা আরও মনে করেন কর্মও দেহের ফল (অর্থাৎ কারণ কার্যে পরিণত হয়, আবার কার্য কারণে পরিণত হয়)। এই অবস্থায় তাঁরা কি করে দাবি করবেন যে এই প্রক্রিয়া অনাদি?
4.15 দ্বৈতবাদীদের মতে ফলই (অর্থাৎ কার্যই) হেতুর (অর্থাৎ কারণের) কারণ, এবং হেতুও (কারণও) আবার ফলের (অর্থাৎ কার্যের) কারণ। তাঁদের মতে উৎপত্তি অনেকটা পুত্রের থেকে পিতার জন্মের মতো—যা নেহাতই উদ্ভট।
4.16 তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে কার্য-কারণের মধ্যে একটা পরম্পরা আছে (কারণ আগে আসে কার্য পরে)। কারণ যদি উভয়ের উৎপত্তি একইসঙ্গে হয় তা হবে পরস্পর সংযোগহীন দুটো শিংয়ের একসঙ্গে বেরোনোর মতো। অর্থাৎ কার্য-কারণ সম্পর্ক সেখানে সিদ্ধ হয় না।
4.17 দ্বৈতবাদীরা বলেন যে কারণ কার্যে পরিণত হয় এবং কার্যও পরে কারণে পরিণত হয়। একথা যদি সত্য হয়, তবে কারণ আর কারণ থাকে না, যেহেতু কারণ এখানে কার্যের উপর নির্ভরশীল। এইভাবে কারণ যদি কারণরূপে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা কার্য উৎপাদন কিভাবে করতে পারে?
4.18 কারণ যদি কার্য থেকে আসে এবং কার্যও আসে কারণ থেকে তবে কোন্টি আগে এসে অপরটিকে পরে ঘটতে সাহায্য করেছে?
4.19 যদি তোমরা (দ্বৈতবাদীরা) এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পার, তবে তা তোমাদের অজ্ঞতাই প্রমাণ করবে। যদি বল একযোগে কারণ ও কার্যের উৎপত্তি হয়, তার অর্থ হল কার্য-কারণ-পরম্পরা সম্পর্কে তোমাদের মত তোমরা নিজেরাই খণ্ডন করছ। এইভাবে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা সব দিক থেকে বিচার করে উৎপত্তির ধারণাকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছেন।
4.20 বীজ ও চারাগাছের দৃষ্টান্তটি এখনও মতবাদের স্তরে (অর্থাৎ প্রক্রিয়াটির অনাদিত্ব এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি)। যেহেতু দৃষ্টান্তটি এখনও প্রমাণসাপেক্ষ, সেহেতু সেটিকে অন্য মতবাদের সমর্থনে ব্যবহার করা যায় না।
4.21 যদি কারণ ও কার্য না জানা যায়, তবে তাই প্রমাণ করে যে কিছুই জন্মায় না। যদি সত্যিই কিছুর জন্ম হয়, তবে তার কারণ (উৎস) অজ্ঞাত হওয়ার পেছনে কোন যুক্তিই নেই।
4.22 স্বতন্ত্রভাবেই হোক বা কারও মাধ্যমেই হোক, কোন কিছুরই জন্ম হয় না। কোন বস্তুর অস্তিত্ব থাকুক বা নাই থাকুক, অথবা যার অস্তিত্ব আছেও বটে আবার নেইও বটে—যাই হোক না কেন, কোন অবস্থাতেই কোন বস্তুর জন্ম হয় না।
4.23 কোন কিছুর যদি আরম্ভ না থাকে, তাহলে তার কারণও থাকে না। একইভাবে কারণ ছাড়া কার্যও উৎপন্ন হয় না। আবার যদি কারণ ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকে তবে সেই বস্তুর জন্মই হয়নি।
4.24 যখনি আমাদের কোন ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা হয় তখন অবশ্যই তার পেছনে কোন কারণ আছে। একথা স্বীকার না করার অর্থ হল, এ দৃশ্যজগতে যে দুই আছে তা অস্বীকার করছি। কিন্তু যন্ত্রণার অনুভূতি তো সবার হয়। সেক্ষেত্রে বাইরের কোন বস্তু আমাদের আঘাত করলে তবেই সেই অনুভূতি হয়ে থাকে। এই দুয়ের উপস্থিতিই দ্বৈতবাদী শাস্ত্রের বক্তব্য বিষয়।
4.25 (অদ্বৈতবাদী দ্বৈতবাদীকে বলছেন) তুমি বলতে চাইছ যেহেতু যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা আছে সেহেতু সেই যন্ত্রণার কারণও থাকবে। আমাদের বক্তব্য এই—যেহেতু আত্মা সর্বত্র আছেন, সবকিছুর ভিতরেও আছেন বাইরেও আছেন সেহেতু কোন অভিজ্ঞতার জন্য বাইরের বস্তুর প্রয়োজন নেই।
4.26 সুতরাং বাইরের কোন বস্তুর সঙ্গে মনের কোন যোগ ঘটে না। যদি মন ভাবে যোগ ঘটছে, তবে তা তার কল্পনা—যদিও একথা মন জানে না। তাই বাইরে যা দেখছি তার অস্তিত্ব নেই, তা কল্পনা, মনের বাইরের কোন বস্তু নয়।
4.27 অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—কোন কালেই মনের সঙ্গে বাহ্যবস্তুর কোন সংযোগ নেই। যেহেতু মনের বাইরে কোনও বস্তু নেই সেহেতু অস্তিত্বহীন বস্তুর মিথ্যা অনুভবই বা কিভাবে হতে পারে?
4.28 (পূর্বোক্ত কারণে) মনের জন্ম নেই এবং বাহ্যবস্তুরও জন্ম নেই। যাঁরা বিশ্বাস করেন মনের জন্ম আছে, তাঁরা আকাশে পাখীদের পায়ের ছাপও দেখতে পান (অর্থাৎ যা অসম্ভব)।
4.29 ব্রহ্ম, যিনি স্বভাবত জন্মরহিত তাঁর থেকে মনের উৎপত্তি। এর ব্যতিক্রমের প্রশ্নই ওঠে না।
4.30 যাঁরা বলেন জগৎ অনাদি তাঁদের এও স্বীকার করে নিতে হবে জগৎ অন্তহীনও বটে। অনুরূপভাবে যেহেতু মোক্ষ আত্মজ্ঞানের ফল (আর সেই কারণে তার আদি আছে), সুতরাং মোক্ষ চিরস্থায়ী হতে পারে না।
4.31-32 যদি এমন কোন বস্তু বর্তমানে থেকে থাকে, যা শুরুর আগেও ছিল না, আবার শেষ হয়ে গেলেও থাকবে না, তবে তাকে মিথ্যা বলেই ধরে নিতে হবে। মরীচিকার মতোই এও এক দৃষ্টিভ্রম—মনে হয় সত্য, কিন্তু আসলে সত্য নয়। যা সত্য তা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—এই তিনকালেই সত্য।
জাগ্রত অবস্থায় আমরা অনেক বস্তু দেখি যা আমাদের কাজে লাগে। কিন্তু স্বপ্নাবস্থায় সেসব বস্তু হয়তো কোন কাজেই লাগে না। অর্থাৎ ঐসব বস্তুর শুরু ও শেষ দুই-ই আছে। এইসব বস্তু অবশ্যই মিথ্যা।
4.33 যখন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি তখন দেহের অভ্যন্তরে নানা বস্তু দেখতে পাই। পরবর্তীকালে জাগ্রত অবস্থায় সেগুলি মিথ্যা হয়ে যায়, আর দেখা যায় না। এ যদি সম্ভব হয় তাহলে এক ও অভিন্ন ব্রহ্মে (যা শুদ্ধ চৈতন্য) আশ্রিত বস্তুসকলও কেন মিথ্যা হবে না?
4.34 আমরা স্বপ্নে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই এবং সেইসব জায়গায় নানা জিনিস দেখতে পাই। কিন্তু সেই সময়ে আমাদের সেখানে থাকা এবং নানা বস্তু দেখা শুধু সময়ের বিচারেই অসম্ভব বলে বোঝা যায়। এইজন্যই যখন স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠি তখন সেইসব জায়গায় আর নিজেদের দেখা যায় না।
4.35 স্বপ্নে আমরা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছি দেখতে পাই। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলে তা হারিয়ে যায়। আবার স্বপ্নে যা কিছু পাই জাগ্রত অবস্থায় সেগুলি আর দেখতে পাওয়া যায় না (যেমন স্বপ্নে হয়তো অনেক সোনা পেলাম, কিন্তু জেগে উঠে তা আর দেখা যায় না)।
4.36 স্বপ্নে আমরা অনুভব করি যেন আমাদের আর একটি শরীর আছে। সেই শরীর কিন্তু অবস্তু, অলীক। একইভাবে স্বপ্নে দেখা সব বস্তুও অবস্তু অর্থাৎ অলীক।
4.37 আমাদের স্বপ্নের অভিজ্ঞতা জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতার মতোই। এইজন্যই বলা হয় আমাদের জাগ্রত অবস্থার নানা অভিজ্ঞতাই স্বপ্নে দেখা অভিজ্ঞতার কারণ। আমরা স্বপ্নে যা দেখি তা একান্তভাবে আমাদেরই। অন্যে এতে অংশ নিতে পারে না। আবার যেহেতু স্বপ্নের নানা অভিজ্ঞতা জাগ্রত অবস্থারই প্রতিফলন সেহেতু জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতাও একান্তভাবে আমাদেরই। সেখানেও অপর কেউ অংশ নিতে পারে না। জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতা যদি সত্য হয়, তবে তা কেবলমাত্র আমার কাছেই সত্য, অন্যের কাছে নয়।
4.38 বস্তুর উৎপত্তি না থাকায় সমগ্র জগৎকে অনাদি বলা হয়। বস্তুত নিত্য-সত্য (ব্রহ্ম) থেকে মিথ্যা অর্থাৎ যার অস্তিত্ব নেই তার উৎপত্তি হতে পারে না।
4.39 জাগ্রত অবস্থায় মানুষ নানা অসৎ বস্তু দেখতে পারে এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সে সেগুলিকে আবার স্বপ্নেও দেখতে পায়। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলে সেগুলি আর দেখে না।
4.40 যার অস্তিত্ব নেই সেই বস্তু অপর এক অস্তিত্বহীন বা মিথ্যা বস্তু উৎপন্ন করতে পারে না। ঠিক তেমনি অস্তিত্বহীন বস্তু থেকে সৎ বস্তু অর্থাৎ যার অস্তিত্ব আছে তার উৎপত্তি হতে পারে না। অনুরূপভাবে, যার অস্তিত্ব আছে (অর্থাৎ আপেক্ষিক অস্তিত্ব যেমন দড়িতে সাপের অস্তিত্ব) সেইরকম বস্তু থেকে আর একটি অস্তিত্বসম্পন্ন বস্তু (অর্থাৎ আরেকটি সাপ) উৎপন্ন হতে পারে না। সুতরাং কোন সত্য (অর্থাৎ অস্তিত্ববান) বস্তু থেকে কোন মিথ্যা (অর্থাৎ অস্তিত্বহীন) বস্তু কিভাবে হতে পারে?
4.41 জাগ্রত অবস্থায় মানুষ নানা অপরিচিত বস্তু দেখে এবং অজ্ঞানতার হেতু সেগুলিকে সত্য বলে মনে করে। একই কারণে স্বপ্নেও সে বিভিন্ন বস্তু দেখে ও সত্য মনে করে। আসলে কিন্তু দুটির কোনটিই সত্য নয়।
4.42 কিছু মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে ও প্রচলিত বর্ণাশ্রম অনুযায়ী কর্ম করে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব আছে। জন্ম বলে কিছু নেই—একথা চিন্তা করতেও তাঁরা ভয় পান। এঁদের কাছে প্রাজ্ঞ অদ্বৈতবাদীরা জন্মের ব্যাপারে আপোষ করতে রাজি আছেন। কিন্তু বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে তাঁরা সম্পূর্ণ আপোষহীন।
4.43 কোন কিছুই জন্মায় না—এই সত্যের মুখোমুখি হতে যাঁরা (দ্বৈতবাদীরা) ভয় পান তাঁদের মধ্যে অনেকে আছেন যাঁরা অদ্বৈতবাদের বিরোধিতা করেন কারণ তাঁরা সর্বত্র দুই দেখেন। এঁরা দ্বৈত উপাসনাও করে থাকেন। এটি ভুল হতে পারে কিন্তু সাঙ্ঘাতিক ভুল নয় (কারণ তাঁরা সৎ ও অকপট এবং কালে তাঁরা অদ্বৈততত্ত্ব ধারণা করতে সক্ষম হবেন)।
4.44 অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিরা যাদুকরের দেখানো মায়া-হাতিকে সত্য বলে মনে করেন, কারণ এর সঙ্গে তাঁদের দ্বৈতচিন্তা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কোন বিরোধ নেই। একইভাবে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং সেই অনুরূপ ঘটনাবলী থেকে তাঁদের মনে বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কেও কোন সন্দেহ থাকে না।
4.45 শুদ্ধ চৈতন্য হয়েও মনে হয় যেন তাঁর জন্ম হয়েছে। তিনি সক্রিয় এবং জড়বস্তুরূপে প্রতিভাত হন। প্রকৃতপক্ষে চৈতন্য অনাদি, নিষ্ক্রিয় এবং আদৌ জড়বস্তুর মতো নন। তিনি অখণ্ড এবং অদ্বয়।
4.46 এতক্ষণ যা বলা হল তার থেকে বোঝা যাচ্ছে মন (অর্থাৎ মনরূপে অনুভূত শুদ্ধ চৈতন্য) কখনো জন্মগ্রহণ করে না। একইভাবে জীবাত্মারও (বিভিন্ন নাম-রূপে প্রতিভাত শুদ্ধ চৈতন্যের) জন্ম হয় না (আত্মজ্ঞের দৃষ্টিতে)। যাঁরা এই সত্য জেনেছেন তাঁদের আর কখনো ভুল হয় না (অর্থাৎ তাঁরা আর অবিদ্যায় মুগ্ধ হন না)।
4.47 একটি জ্বলন্ত মশালকে ঘোরালে তার আলোর রেখা কখনো সোজা, কখনো বাঁকা আবার কখনো বা অন্য কিছু বলে মনে হয় (যদিও প্রকৃতপক্ষে আলোকরশ্মি সবসময় সোজা)। ঠিক একইভাবে চৈতন্যের পরিবর্তনও প্রতিভাত হয়—একই চৈতন্য কখনো জ্ঞাতা, কখনো জ্ঞেয়, কখনো কারণ, কখনো কার্য (যদিও চৈতন্য সতত অপরিবর্তিত)।
4.48 যদি জ্বলন্ত মশালটি স্থির থাকে এটি কারও নজরে নাও পড়তে পারে (কারণ তখন এ একটি আলোকবিন্দু মাত্র)—মনে হয় যেন এর কোন অস্তিত্বই নেই। সেইভাবে চৈতন্যও যদি কোন না কোন রূপে প্রকাশিত না হন তাহলে তিনি ইন্দ্রিয়ের গোচর হন না। তখন তাঁর অস্তিত্ব নেই বলেই মনে হয়।
4.49 বাতিটি যখন ঘুরছে তখন যে আকৃতিগুলি দেখা যায় (সোজা অথবা বাঁকা) সেগুলি অবশ্যই বাতি ছাড়া অন্য কোনও উৎস থেকে আসেনি। অনুরূপভাবে, যখন বাতিটির ঘোরা থেমে যায়, আকৃতিগুলি অন্যত্র চলে যায় না বা বাতিতেও ফিরে আসে না।
4.50 আলোর আকৃতিগুলি অলীক এবং তার মধ্যে কোন বস্তু নেই। সেগুলি বাতি থেকে উৎপন্ন হতে পারে না। মন-কল্পিত (যেমন জন্ম) বস্তু সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। এই দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আমরা মনে করি তাদের অস্তিত্ব আছে, তাই সেগুলি আছে। তাঁরা সত্য নয়, মনের রচনা।
4.51-52 চৈতন্য যখন প্রকাশ পায় তখন এই জগৎ ও তার কার্যও প্রকাশ পায়। এইগুলির আর কোন উৎস নেই। কিন্তু চৈতন্যের প্রকাশ না হলে এই জগতেরও প্রকাশ থাকে না। কিন্তু এগুলি চৈতন্যে বিলীনও হয় না। কারণ এগুলি অবস্তু, অর্থাৎ অলীক এবং মিথ্যা।
জন্মমৃত্যু ইত্যাদি আপাতদৃশ্য অভিজ্ঞতাগুলির কোন পারমার্থিক সত্তা নেই। সুতরাং সেগুলি অবস্তু। এদের উৎপত্তি চৈতন্য থেকে হতে পারে না কারণ দুয়ের মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে আমরা যা কিছু দেখি তার কোন বাস্তব সত্তা নেই।
4.53 একমাত্র একটি বস্তুই অন্য আর একটি বস্তুর উৎপত্তির কারণ হতে পারে। অনুরূপভাবে কোন অবস্তু (অর্থাৎ অলীক) আর একটি অবস্তুরও কারণ হতে পারে। জীবাত্মা প্রসঙ্গে বলা যায় যে জীবাত্মা বস্তু না অবস্তু তার প্রশ্নই ওঠে না।
4.54 এইভাবে আমরা জানি যে বাহ্যবস্তু চৈতন্য থেকে উৎপন্ন নয় এবং বাহ্যবস্তু থেকেও চৈতন্যের উৎপত্তি হয়নি। সুতরাং প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা কার্য-কারণ সম্পর্কের সূচনাই বাতিল করে দেন।
4.55 যতক্ষণ পর্যন্ত কার্য-কারণ সম্পর্ককে আমরা গুরুত্ব দিই, ততক্ষণ পর্যন্ত এ সম্পর্ক সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু যখন আমরা এই সম্পর্কের প্রতি উদাসীন থাকি, তখন দেখা যায় সম্পর্কটি মিথ্যা।
4.56 যতক্ষণ মানুষ কার্য-কারণ সম্পর্কে আসক্ত থাকে ততক্ষণ তাকে এই (দুঃখের) সংসারে বদ্ধ থেকে নানা যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। কিন্তু এই আসক্তি জয় করতে পারলে মানুষকে আর এই জগতে ফিরে আসতে হয় না (অর্থাৎ সে তখন মুক্ত হয়ে যায়)।
4.57 অবিদ্যার প্রভাবে সকল বস্তুর জন্ম হয়ে থাকে। সেহেতু চিরন্তন বলে কিছু নেই। কিন্তু একইসঙ্গে ব্রহ্মরূপে এই জগতে কোন কিছুরই জন্ম হয়নি। অর্থাৎ জগতে বিনাশ বলেও কিছু নেই।
4.58 মানুষ মনে করে জীবাত্মা (এবং অন্যান্য বস্তু) জন্ম নেয়। কিন্তু আসলে তাদের কখনই জন্ম হয় না। তাদের জন্ম যেন ভোজবাজির খেলা এবং তা সত্য নয়।
4.59 (জাদুকর) মায়াবীজ থেকে মায়াগাছ উৎপন্ন করে। সেই গাছ নিত্য নয়। আবার তাকে বিনাশও করা যায় না। একই কথা আত্মা সম্পর্কেও প্রযোজ্য।
4.60 জীবাত্মার জন্ম হয় না। সুতরাং সেক্ষেত্রে অমর বা মরণশীল এই শব্দগুলি প্রযোজ্য নয়। যা বর্ণনা করা যায় না তাকে শাশ্বত বা অশাশ্বত কিভাবে বলব?
4.61-62 স্বপ্নে আমি ছাড়া অন্য কেউ নেই। তবু মন দুই দেখে ও সেই অনুরূপ কাজ করে। ঠিক তেমনি জাগ্রত অবস্থাতেও মন অবিদ্যার প্রভাবে দুই দেখে ও সেই অনুযায়ী চিন্তা ও কাজ করে। (বস্তুত দুই নেই, এক। অজ্ঞানতার ফলেই এই ভুল হয়।)
স্বপ্নকালে মন নিঃসঙ্গ থাকে, তবু দুয়ের (জ্ঞাতা-জ্ঞেয়) অভিজ্ঞতা হয়। সেইভাবে জাগ্রত অবস্থাতেও মনের দ্বৈতভূমিকা থাকে, এবং জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের ধারণা সৃষ্টি করে। এর ফলে বহু দেখা যায়। আর এই বহুর অস্তিত্ব সম্পর্কে দ্রষ্টার মনে সংশয়মাত্র থাকে না। কিন্তু স্বপ্ন ও জাগ্রত—এই দুই অবস্থার অভিজ্ঞতাই দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।
4.63 স্বপ্নকালে মানুষ চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায় এবং নানা ধরনের প্রাণী দেখতে পায়—কোনটি অণ্ডজাত (যেমন পাখী) কোনটি বা স্বেদজাত (যেমন মশা) প্রভৃতি।
4.64 মানুষ স্বপ্নে যেসব বস্তু দেখে সেগুলি তার মনের সৃষ্টি। বস্তুত তার মনও ঐসব বস্তু থেকে স্বতন্ত্র নয়।
4.65-66 জাগ্রত অবস্থায় একজন ব্যক্তি চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায় এবং অণ্ডজ প্রাণী, স্বেদজ কীট ও অন্যান্য প্রাণী দেখে থাকে। এইসব প্রাণী কেবলমাত্র জাগ্রত ব্যক্তিরই মনের গোচর। এইসব প্রাণী বা বস্তু তার মন থেকে পৃথক হতে পারে না। অনুরূপভাবে, মানুষের নিজের মনও নিজের কাছেই ধরা পড়ে। আর সেইহেতু মনও ব্যক্তির থেকে স্বতন্ত্র নয়।
4.67 মন এবং বস্তু উভয়ই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। (যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন) ‘কোনটির অস্তিত্ব আছে?’ (প্রাজ্ঞজনেরা বলেন) ‘কোনটিরই নেই।’ তাদের অস্তিত্বের কোন প্রমাণ নেই। উভয়ে একত্র হলে তবেই তাদের উপস্থিতি বোঝা যায়।
4.68-70 স্বপ্নে কোন ব্যক্তিকে জন্মাতে বা মারা যেতে দেখা যায়। একইভাবে, জাগ্রত অবস্থাতেও সকল প্রাণীর জন্ম বা মৃত্যু দেখা যায়।
জাদুখেলায় অনেক সময় কাউকে জন্মাতে বা মারা যেতে দেখা যায়। ঠিক তেমনি জাগ্রত অবস্থাতেও এইসব প্রাণীকে জন্মগ্রহণ বা মৃত্যুবরণ করতে দেখা যায়।
ঠিক যেমন, কৃত্রিমভাবে উৎপন্ন বস্তুকে জন্মাতে বা বিনাশপ্রাপ্ত হতে দেখা যায় তেমনি জাগ্রত অবস্থাতেও এইসব প্রাণীর জন্ম বা মৃত্যু হতে দেখা যায়।
4.71 কেউ জন্মায় না, কারও জন্মাবার সম্ভাবনাও নেই; বস্তুত কোন কিছুরই জন্ম হয় না। এই হল পরম সত্য।
4.72 এই দ্বৈতজগৎ, যেখানে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় উভয়কেই দেখা যায় তা মনের সৃষ্টি। মন কিন্তু স্বভাবতই অপরিবর্তনীয়, স্বনির্ভর। এইজন্যই মনকে অদ্বয় বলা হয়।
4.73 ব্যবহারিক জীবনে যেসব বস্তু কাজে লাগে সেগুলিকে সত্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেগুলি যদি মনের সৃষ্টি হয় তবে তাদের কোন বাস্তব সত্তা নেই। একইভাবে, অন্য মতে কোন জিনিসকে সত্য বলা হতে পারে। কিন্তু তার দ্বারাই সেই জিনিসের অস্তিত্ব প্রমাণ হয় না।
4.74 যদি বলা হয় আত্মার জন্ম নেই, তা শুধুমাত্র ব্যবহারিক দৃষ্টিতেই বলা হয়ে থাকে। পারমার্থিক দৃষ্টিতে আত্মাকে জন্মহীনও বলা যায় না। কিন্তু অন্যান্য দার্শনিক গোষ্ঠী অজ্ঞানতাবশত আত্মার জন্ম হয়েছে বলে বর্ণনা করেন।
4.75 কেউ কোন বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে কিন্তু তার দ্বারা দ্বিতত্ত্ব (অর্থাৎ বাইরে কিছু আছে) প্ৰমাণিত হয় না। যেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারে দুইবোধ মিথ্যা, তখন আর কোন কিছুই তাকে আকৃষ্ট করতে পারে না। এমন ব্যক্তির আর পুনর্জন্ম হয় না।
4.76 মন যখন ভালো, মন্দ বা মাঝারি কোন কারণকেই আর স্বীকার করে না, তখন তার আর পুনর্জন্ম হয় না। কারণ যদি না থাকে, তবে কার্য থাকে কি করে? (মন বাসনামুক্ত হলে সে আর কারণ দেখে না। সুতরাং তার আর জন্মও হয় না।)
4.77 মনের জন্ম হওয়ার কোন হেতু নেই। কাজেই তার জন্ম হয় না। আর যেহেতু মনের জন্ম হয় না তাই মন মুক্ত, স্বাধীন। মন অদ্বিতীয় ও অপরিবর্তনীয়। মনের যেমন জন্ম নেই, মন দিয়ে যেসব বস্তু অনুভব করা হয় তাদেরও জন্ম নেই।
4.78 একমাত্র সত্যকে জানলে আর জন্ম হয় না, এছাড়া অন্য কোন পথ নেই—একথা উপলব্ধি করে মানুষ দুঃখের পারে চলে যায়। তখন সে কামনাশূন্য হয়, নির্ভয় হয় এবং ব্রহ্মপদ লাভ করে।
4.79 অসত্য বস্তুর প্রতি আসক্তি থাকলে মন সেসব বস্তুর চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। যে বুঝতে পারে এইসব বস্তুর পারমার্থিক সত্তা নেই সে তৎক্ষণাৎ সেগুলি ত্যাগ করে।
4.80 ইন্দ্রিয়ের বিষয়বস্তু থেকে দূরে থেকে আর কখনো সেগুলি ভোগ না করলে মন শান্ত হয়, ব্রহ্মে একাগ্র হয়। যাঁরা আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তাঁদের সব চিন্তার কেন্দ্রে একমাত্র ব্রহ্ম—যিনি জন্মরহিত, অদ্বিতীয় ও সদা অভিন্ন।
4.81 আত্মা জন্মরহিত, অনিদ্র এবং স্বপ্নহীন। ইনি স্বয়ংপ্রকাশ এবং সদা প্রকাশিত।
4.82 কোন বস্তুতে আমাদের অনুরাগ হলে সেই বস্তু সহজেই আত্মাকে আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু আত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করতে হলে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
4.83 নির্বোধ ব্যক্তি কখনো মনে করে আত্মা আছেন কখনো মনে করে নেই, আবার কখনো মনে করে আত্মা আছেনও বটে নেইও বটে। এইভাবে আত্মাকে কখনো স্থির, কখনো চঞ্চল, কখনো দুই-ই ইত্যাদি ভেবে নির্বোধ ব্যক্তি আত্মাকে আবৃত করে রাখে।
4.84 এই চারটি দার্শনিক মতবাদীদের কাছে আত্মা সর্বদাই নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। এর কারণ নিজ নিজ মতের প্রতি এঁরা মোহমুগ্ধ। কিন্তু এই চার মতবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে যে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি জ্যোতির্ময় আত্মার দর্শন লাভ করেন তিনি প্রকৃতই সর্বজ্ঞ।
4.85 কোন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণভাবে সর্বজ্ঞ হন, তবে তিনি জন্ম, মৃত্যু এবং তাদের মধ্যবর্তী অবস্থাকেও জয় করে থাকেন। তারপর তাঁর আর আকাঙ্ক্ষার কি বা থাকতে পারে?
4.86 এই বিনয় ব্রাহ্মণের স্বাভাবিক আত্মসংযম বলে পরিচিত। ব্রাহ্মণ স্বভাবতই আত্মসংযমে সক্ষম। তাঁরা যা কিছু করেন তাতেই সংযমের পরিচয় পাওয়া যায়। এ সংযম তাঁরা পরিশ্রম করে অথবা শাস্ত্রবিধি অনুশীলন করে লাভ করেননি। যিনি এই আত্মসংযমকে ব্রহ্মেরই মূল স্বরূপ বলে জেনেছেন তিনি নিজে এই সংযম লাভ করেছেন।
4.87 বস্তুর উপস্থিতি ও তার উপলব্ধি—এ দুটি ব্যবহারিক সত্যকে একযোগে বলা হয় জাগ্রত অবস্থা। কিন্তু যদি বস্তু না থাকে, তবুও বস্তু দেখা যাচ্ছে তা হল স্বপ্নাবস্থা (এও সাধারণ স্বাভাবিক অবস্থা। তবে জাগ্রতের তুলনায় সীমিত বস্তুর উপলব্ধি হয়)।
4.88 যেখানে কোন জড়বস্তু নেই, বস্তু যে আছে এর বোধও নেই এবং যখন মানুষ সব ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে—সেই অবস্থাকে পণ্ডিতেরা ‘গভীর নিদ্রা’(সুষুপ্তি) আখ্যা দিয়েছেন। যাঁরা আত্মাকে জানেন তাঁরা শুধু তিনটি উপাদান স্বীকার করেন— জ্ঞান, জ্ঞেয় (জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থা) এবং আত্মা (তুরীয়)।
4.89 ব্যবহারিক জ্ঞান ও (জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তির) ত্রিবিধ জ্ঞান অর্জন করলে মানুষ ক্রমে অসাধারণ মেধার অধিকারী হয়। এবং এই জীবনেই পরাজ্ঞান লাভ করে।
4.90 (মুমুক্ষু ব্যক্তি হিসেবে) সাধককে তিনটি অবস্থা প্রথমেই এড়িয়ে চলতে হবে (জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থা যে তোমার আছে, সেই ধারণাকে মুছে ফেলতে হবে)। আর আত্মজ্ঞান লাভ করতে হবে (অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভের জন্য একাগ্র হতে হবে), শাস্ত্রজ্ঞান লাভ করতে হবে, বালকসুলভ স্বভাব এবং নীরব থাকার অভ্যাস করতে হবে, আর রাগ-দ্বেষ প্রভৃতি স্বাভাবিক দুর্বলতাগুলিকে নিজের বশে আনতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আত্মজ্ঞান ছাড়া এই তিনের (অর্থাৎ বর্জন করতে হবে, অর্জন করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে) কোনও মূল্য নেই। সাধক এগুলির অস্তিত্বকে কেবল অনুভব করতে পারে।
4.91 সকল জীবাত্মা স্বভাবত আকাশের মতো (কারণ জীবাত্মা নিষ্কলঙ্ক) এবং শাশ্বত বলে পরিচিত। এইসব জীবাত্মার মধ্যে দ্বৈতের কোনও স্থান নেই।
4.92 আত্মা স্বরূপত জ্যোতির্ময় এবং সতত অভিন্ন। সাধক এ তত্ত্ব আয়ত্ত করলে মোক্ষলাভ করেন।
4.93 আত্মা স্বভাবতই সদা প্রশান্ত, জন্মরহিত, নিত্যমুক্ত, এবং সতত অভিন্ন। আত্মা যে অনাদি এবং সদাপ্রসন্ন এ-বিষয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই।
4.94 যাদের মন সবসময় দ্বৈতভূমিতে বিচরণ করে তারা কখনো শুদ্ধ আত্মাকে জানতে পারে না। যেহেতু তাঁরা সর্বত্র দুই দেখে এবং এই জগতের প্রতি আসক্ত হয়। এই দ্বৈতবাদীরা সংকীর্ণমনা এবং ভাগ্যহীন (যে হবেন) তাতে আর আশ্চর্য কি।
4.95 এই জগতে যাঁরা জন্মরহিত এবং সতত অভিন্ন আত্মাকে নিশ্চিতরূপে জেনেছেন, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে মহাজ্ঞানী। বিষয়ী লোকেরা কিন্তু তাঁদের এই প্রজ্ঞাকে স্বীকার করেন না।
4.96 আত্মায় নিহিত জ্ঞানও আত্মার মতোই শাশ্বত ও স্বাধীন। যেহেতু অন্য কোনও উৎস থেকে আত্মাকে এই জ্ঞান অর্জন করতে হয় না সেহেতু আত্মাকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বলা হয়েছে।
4.97 অবিবেকী ব্যক্তির মতে, আত্মাতে যদি সামান্যতম পরিবর্তনও সম্ভব হয় তবে আত্মা যে আসক্তিশূন্য এ দাবি টিকতে পারে না। (অর্থাৎ আত্মাও আসক্ত হতে পারে যার তাৎপর্য হল যে অজ্ঞানতার আবরণ আত্মাকে আড়াল করে রাখে।) তবে অজ্ঞানতার আবরণ দূর হবার প্রশ্ন ওঠে কিভাবে?
4.98 আত্মা কখনই অজ্ঞানতার আবরণে আবৃত ছিলেন না। যিনি আত্মাকে জেনেছেন তিনি সতত শুদ্ধ, জ্ঞানস্বরূপ ও মুক্ত। বেদান্তের আচার্যরা আত্মাকে এইভাবেই প্রচার করেন।
4.99 যিনি আত্মাকে জেনেছেন তিনি (ব্রহ্ম চিন্তা ছাড়া) অন্য কোনও চিন্তা করেন না। তাঁর মন সতত অভিন্ন। (কারণ তাঁর মনে আর দুই এর স্থান নেই।) এ জগতের সবকিছুকে (জীবাত্মা ও অন্যান্য সমস্ত বস্তু) তিনি শ্রদ্ধা করেন। কারণ তিনি সর্বভূতে সেই এক আত্মাকে দেখেন। সুতরাং কোন কিছুই তাঁর মনকে ব্রহ্মের চিন্তা থেকে সরিয়ে আনতে পারে না। বুদ্ধদেব এমন কথা কখনো বলেননি।
4.100 অদ্বৈততত্ত্ব ধারণা করা কঠিন। এই তত্ত্ব সুগভীর, অনাদি, সদা অপরিবর্তনীয়, শুদ্ধ এবং অদ্বৈত। আমি এই তত্ত্বকে বোঝার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি। আমি তাঁকে নমস্কার করি।
Aum. Peace! Peace! Peace!
Final Salutation by Sri Sankaracharya
I salute Brahman, the destroyer of the fear of those who take refuge in It-which, though unborn, appears to be associated with birth through Its own majestic powers; which, though motionless, appears to be moving; and which, though non- dual, appears to have assumed many forms to those whose vision is deluded by the perception of diverse objects and their attributes.
I prostrate myself at the feet of the teacher of my teacher, the most adored among the adorable, who-out of sheer compassion for the beings drowned in the deep ocean of the world, infested by the terrible sharks of incessant births and deaths-rescued, for the benefit of all, this nectar, hardly attainable even by the immortals, from the inmost depths of the ocean of the Vedas by churning it with the rod of his illumined wisdom.
I make obeisance with my whole being to those holy feet-the dispellers of the fear of the chain of births and deaths-of my own great teacher, who, through the light of his illumined wisdom, destroyed the darkness of delusion enveloping my mind; who put an end, for ever, to my appearance and disappearance in this terrible ocean of innumerable births and deaths; and who enables all others, too, that take shelter at his feet, to attain unfailing knowledge of the scriptures, peace and the state of perfect non-differentiation.
Aum Tat Sat
Related Articles: