নংভূতেরপবাদাচ্চ সংভবঃ প্রতিষিধ্যতে।
কো ন্বেনং জনয়েদিতি কারণং প্রতিষিধ্যতে॥২৫
অন্বয়: সংভূতেঃ অপবাদাৎ (সংভূতিকে [হিরণ্যগর্ভ, প্রথম সত্তা] খণ্ডন করায়) সংভবঃ প্রতিষিধ্যতে (যে কোনও বস্তুর জন্মের প্রশ্নটি বাতিল হয়ে যাচ্ছে); কঃ নু এনং জনয়েৎ (জীবাত্মাকে কে সৃষ্টি করবে?); ইতি ক্যরণং প্রতিষিধ্যতে (কারও পক্ষে এর কারণ হওয়া অসম্ভব)।
সরলার্থ: সর্বভূতের আদি কারণ হিসেবে হিরণ্যগর্ভের উপাসনা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। তাহলে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে এই ধারণা বাতিল হয়ে গেল। সেইক্ষেত্রে একে (জীবাত্মাকে) কে আবার সৃষ্টি করবে? এর দ্বারা জীবাত্মার উৎপত্তির কারণও বাতিল করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা: যখন বীজ বৃক্ষে পরিণত হয়, তখন সেই বৃক্ষটি বীজের প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। বীজ কারণ, বৃক্ষ কার্য। কার্য স্থায়ী নয়, কারণই স্থায়ী।
সেই একইভাবে ব্রহ্ম প্রথমে নিজেকে হিরণ্যগর্ভ (সম্ভৃতি)-রূপে প্রকাশ করলেন। হিরণ্যগর্ভের ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য, শক্তি ইত্যাদি অনন্ত। যদি কেউ হিরণ্যগর্ভের উপাসনা করে, তবে হিরণ্যগর্ভের মহৎ গুণাবলীর কিছু লাভ করার জন্যই তা সে করে থাকে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কি? এইসব গুণ কি আত্মজ্ঞান লাভের পথ প্রশস্ত করে?—না। এগুলি অর্জন করলে অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে কেউকেটা বলে বোধ হয়—এইমাত্র। কিন্তু এর দ্বারা লক্ষ্যের কাছাকাছিও আসা যায় না। বরং উদ্দেশ্য (আত্মজ্ঞান) থেকে মানুষ ক্রমশ দূরে সরে যায়। এবং আরও বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। ‘সংভূতি’র উপাসনা করে উপাসক সংভূতি হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু কখনো নিজের আত্মার সঙ্গে এক হতে পারেন না। এইজন্য শাস্ত্রে সংভূতির উপাসনার নিন্দা করা হয়েছে।
কর্ম দুই প্রকার—সকাম কর্ম অর্থাৎ কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য যে কর্ম করা হয়। সকাম কর্ম করে মানুষ আরও দুঃখ-বিপদকে ডেকে আনে। আর এই কর্মের দ্বারা কখনো জন্ম-মৃত্যুর চক্রের বাইরে যাওয়া যায় না। আর একরকম কর্ম আছে যেখানে কর্মই সাধনা। যেমন, কেউ যখন পুজো করছেন তখন সেই পুজোর আনুষঙ্গিক বহু কাজ তাঁকে করতে হয়। এর প্রতিদানে তিনি কিছুই চান না। এই প্রকার কর্মের ফল হল চিত্তশুদ্ধি। চিত্তশুদ্ধি হলে—অর্থাৎ ঐহিক বা পারমার্থিক উভয় প্রকার কামনাশূন্য হলে, তবেই মানুষের অজ্ঞানতা দূর হয় এবং সে তার স্বরূপ জানতে পারে। সে তখন জানতে পারে সে-ই পরমাত্মা স্বয়ং।
এখন প্রশ্ন হল একবার স্বরূপজ্ঞান হলে মানুষ কি তা আবার ভুলে যেতে পারে? সে কি আবার ভাবতে পারে যে সে জীবাত্মা মাত্র এবং তার বহু অপূর্ণতা রয়েছে? না, তা আর সম্ভব নয়। একবার যখন ভুল ভেঙে যায় যে ওটা ‘সাপ’ নয়, ‘দড়ি’ তখন আর তার ভুল হয় না। তখন আর কোন উৎস নেই যার থেকে জীবাত্মার উৎপত্তি হতে পারে। আত্মজ্ঞান যে লাভ করেছে তার কাছে আর সম্ভূতির কোন অস্তিত্বই নেই।