বৈতথ্যং সর্বভাবানাং স্বপ্ন আহুর্মনীষিণঃ।
অন্তঃস্থানাত্তু ভাবানাং সংবৃতত্বেন হেতুনা॥১
অন্বয়: মনীষিণঃ (প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি); স্বপ্নে ভাবানাম্ (স্বপ্নে দৃষ্ট বস্তুসকল); অন্তঃ (অভ্যন্তরে); স্থানাৎ সংবৃতত্বেন (স্থানের সংকীর্ণতা); হেতুনা (এই কারণে); সর্বভাবানাম্ ([স্বপ্নে দৃষ্ট] বস্তুসকল); বৈতথ্যম্ (মিথ্যা); আন্থঃ (ঘোষণা করেন)।
সরলার্থ: প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা বলেন, স্বপ্নে দেখা সকল বস্তুই মিথ্যা। তুমি স্বপ্নে নানারকম বস্তু দেখে থাক কিন্তু সেসব বস্তু তোমার মধ্যে থাকতে পারে না। কারণ তোমার দেহ সেইসব বস্তুর তুলনায় ক্ষুদ্র। (দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, তুমি স্বপ্নে পর্বত দেখতে পার। কিন্তু পর্বত কি সত্যিই তোমার দেহের মধ্যে থাকতে পারে? না, তাই স্বপ্নে দেখা পর্বত মিথ্যা।)
ব্যাখ্যা: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু যে সত্যের বিকৃতি এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করতে বর্তমান অধ্যায় সচেষ্ট। ‘তথ্য’ কথাটির অর্থ সত্য। আর ‘বৈতথ্যে’র অর্থ হল ঠিক এর বিপরীত অর্থাৎ মিথ্যা। আমরা যা সত্য বলে মনে করি আসলে তা সত্য নয়, এখানে এই কথাই গৌড়পাদ বলতে চাচ্ছেন। আমরা বলে থাকি এ জগৎ সত্য এবং শুধু তাই নয় আমরা একথা বিশ্বাসও করি। কেন? কারণ এই জগৎকে আমরা দেখতে পাই, স্পর্শ করতে পারি এবং বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে এ জগৎকে আমরা অনুভব করি। আমাদের কাছে এই হল সত্যের মাপকাঠি। গৌড়পাদ দেখাচ্ছেন—এ আমাদের কত বড় ভুল। যেমন স্বপ্নে আমি একটি রথ বা একটি হাতী কিংবা একটি পর্বতও দেখতে পারি, কিন্তু এগুলির অস্তিত্ব কোথায়? ওগুলি আমি স্বপ্নে দেখি বটে কিন্তু এই দেখা কি সত্য? স্বপ্নে দেখা পর্বতটি কোথায়? সেটি কি তবে আমার দেহের মধ্যে? কিন্তু পর্বতের মতো বিশাল এক বস্তু আমার এই দেহের মধ্যে কিভাবে থাকতে পারে? আর ঐ পর্বতটি যদি বাইরে থাকে তবে জেগে উঠে বা সেটিকে দেখতে পাই না কেন? জেগে উঠে যখন চারিদিকে তাকাই তখন কিন্তু ঘরের মধ্যে কোথাও কোন পর্বত দেখি না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত আগেই তো আমি সেটিকে দেখেছি। এইভাবে বোঝা গেল যে স্বপ্ন সত্য নয়। চাক্ষুষ দেখাই সত্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
গৌড়পাদের মতে স্বপ্নে নানা বস্তুকে দেখা যেমন মিথ্যা, জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা যা দেখি তাও ঠিক ততটাই মিথ্যা। স্বপ্ন-অভিজ্ঞতা ও জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই। কেন? কারণ উভয় ক্ষেত্রেই তো অভিজ্ঞতা ক্ষণস্থায়ী। স্বপ্নের অভিজ্ঞতার মতো জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতারও শুরু ও শেষ আছে। আমি ঘুমের মধ্যে কত শত অদ্ভুত বস্তুই না দেখি! ঘুমোবার সময় সেগুলি বিছানাতে ছিল না আবার জেগে ওঠার পরও সেগুলিকে বিছানাতে দেখা যায় না। গৌড়পাদ বলছেন, ঠিক তেমনভাবেই জাগ্রত অবস্থায় আমি এই বিশ্বকে সত্য বলেই মনে করি, কিন্তু যখন আমার বোধে বোধ হয় অর্থাৎ আত্মজ্ঞান তথা পরম সত্যকে উপলব্ধি করি তখন আমি ভাবি : ‘আমি কি ঝামেলার মধ্যেই না পড়েছিলাম! কারণ আমি ভেবেছিলাম এ জগৎ সত্য।’
আমাদেরকে একথা মনে রাখতে হবে যে বেদান্তমতে সত্যের মাপকাঠি হল, যা নিত্য অর্থাৎ অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু কি জাগ্রত অবস্থায় কি স্বপ্নে, আমাদের সকল অভিজ্ঞতাই ক্ষণস্থায়ী। একটি বিশেষ মুহূর্তে হয়তো অভিজ্ঞতাটি আছে আবার পরমুহূর্তেই সেটি নেই। এই কারণেই গৌড়পাদ বৈতথ্য শব্দটি ব্যবহার করেছেন। জাগ্রত অথবা স্বপ্নে আমাদের সকল অভিজ্ঞতাই এই সত্য অর্থাৎ ব্রহ্মকে বিকৃত করে দেখা।
ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ, যার সঙ্গে আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তার অনিত্যতা প্রতিষ্ঠায় গৌড়পাদ উদ্যোগী। এর দ্বারা গৌড়পাদ এই জগৎ থেকে আমাদের মনকে সরিয়ে নিয়ে, মনটিকে চালনা করতে চাইছেন নিত্য-সত্যের দিকে। সেই নিত্য-সত্যটি কি? তা হল আমাদের আত্মা। গৌড়পাদ বলছেন এই বাহ্য জগতের কোন কিছুই সত্য নয়। আমাদের সকলের মধ্যেই এই সত্য নিহিত রয়েছে। অন্তরস্থ আত্মাই একমাত্র সত্য, এই আত্মাই সবকিছুর অধিষ্ঠান। আত্মা আছেন বলেই আমরা দেখি, শুনি, চিন্তা করি, কল্পনা করি অর্থাৎ এ জগৎকে অনুভব করতে পারি। এই আত্মা আছেন বলেই জাগ্রত বা স্বপ্নাবস্থাতে আমাদের নানারকম অভিজ্ঞতা হয়। সুতরাং আত্মাই একমাত্র সত্য। এই সিদ্ধান্তের দিকেই গৌড়পাদ আমাদেরকে ধীরে ধীরে নিয়ে চলেছেন।