অপূর্বং স্থানিধর্মো হি যথা স্বর্গনিবাসিনাম্।
তানয়ং প্রেক্ষতে গত্বা যথৈবেহ সুশিক্ষিতঃ॥৮
অন্বয়: যথা (ঠিক যেমন); স্বর্গনিবাসিনাম্ (যাঁরা স্বর্গবাসী [যেমন ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতা যাঁরা সহস্রচক্ষু এবং নানা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী]); অপূর্বম্ (ঠিক তেমন, স্বপ্নাবস্থায় এইরকম নানা অদ্ভুত বস্তুর দর্শন হয়); হি (নিশ্চিতভাবে); স্থানিধর্মঃ (এইসকল বস্তু যিনি স্বপ্ন দেখছেন তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ); যথা (এ ও তেমন); ইহ (জাগ্রত অবস্থার ব্যক্তি); সুশিক্ষিতঃ (পথঘাট যাঁর সুপরিচিত); গত্বা (ঐসব পথের গন্তব্যসীমায় চলাফেরা করার ফলে এবং সেইসব স্থানের দ্রষ্টব্য বস্তু উপভোগ করার ফলে); অয়ম্ (একইভাবে, সেই ব্যক্তি তাঁর স্বপ্নে); তান্ (ঐসব স্বপ্ন জগতের মনোহর বস্তুসকল); প্রেক্ষতে (দেখে আনন্দ করেন)।
সরলার্থ: কথিত আছে, স্বর্গের ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাগণ সহস্র চক্ষু ও বহু অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী। এবং স্বপ্নে আমরা এইসব অলৌকিক বস্তুর দর্শন পেতে পারি। স্বপ্নের প্রকৃতিই এমন। কোন স্থানের রাস্তাঘাট চেনা থাকলে আমরা সেখানে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারি এবং সেখানকার দর্শনীয় জিনিস দেখে চিনতে পারি। একইভাবে স্বপ্নেও আমরা নানা অলৌকিক বস্তু দেখি, যেন এই-সকল বস্তুকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানি। মরীচিকা অথবা রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো এসকল বস্তুও মিথ্যা।
ব্যাখ্যা: আমরা শুনেছি যে, স্বর্গস্থ ইন্দ্রাদি দেবতা সহস্র চক্ষু ও নানা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এবং আমরা স্বপ্নে এইসকল দেবদেবীকে দর্শন করতে পারি। কিন্তু এইসকল অভিজ্ঞতার স্থায়িত্ব শুধুমাত্র স্বপ্নে। জাগ্রত অবস্থায় এইসব অভিজ্ঞতার কোন স্থান নেই। যেমন—স্বপ্নাবস্থায় নিজেকে চতুর্ভুজা বলেও দেখা যেতে পারে। কিন্তু একি সত্য? এর উত্তরে আমরা হয়তো বলব হ্যাঁ। এগুলি সত্য না হলে মানুষ এসবের স্বপ্নই বা দেখে কি করে? এর স্বপক্ষে আরও যুক্তি হল : ‘স্বপ্নের অভিজ্ঞতা যেহেতু মিথ্যা সেহেতু জাগ্রত অভিজ্ঞতাও মিথ্যা।’ এই হেতুবাক্যটি ভুল। যেমন—স্বপ্নে আমি যে আমার চারটি হাত দেখি সেটি মিথ্যা নয়। কিন্তু এই স্বপ্নটি যদি সত্য হয় তবে দুটি অতিরিক্ত হাত এল কোথা থেকে? ঘুমোতে যাবার আগে তো এ দুটি হাত ছিল না। আবার ঘুম ভাঙার পরেও এ দুটি হাত থাকে না। এর অর্থ—অতিরিক্ত হাত দুটি হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিল এবং নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে তা অন্তর্হিতও হল। এসব কি আপনিই ঘটতে পারে? হাত দুটি কি কখনো নিজ ইচ্ছায় গজিয়ে ওঠে? হাত দুটির কি তবে নিজ ইচ্ছা বলে কিছু আছে? সুতরাং সমস্ত ভাবনাটাই উদ্ভট।
তবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা কি? এর ব্যাখ্যা হল—স্বপ্নের প্রকৃতিই এইরকম। স্বপ্নে অসম্ভবও সম্ভব হয় এবং তা ঘটে ব্যক্তির প্রয়াস ছাড়াই। স্বপ্ন যেন ব্যক্তির সুপরিচিত পথ, আর সেই পথ ধরে ব্যক্তি কোন স্থানে চলে যায়, এবং সেখানে নানা মনোহর বস্তু দেখে। স্বপ্ন এইরকমই।
ভালোই হোক আর মন্দই হোক স্বপ্ন স্বপ্নই। স্বপ্ন মিথ্যা। একইভাবে জাগ্রত অবস্থাও স্বপ্নের মতোই মিথ্যা।