কল্পয়ত্যাত্মনাঽঽত্মানমাত্মা দেবঃ স্বমায়য়া।
স এব বুধ্যতে ভেদানিতি বেদান্তনিশ্চয়ঃ॥১২
অন্বয়: দেবঃ (স্বয়ং প্রকাশিত); আত্মা (আত্মা [যা শুদ্ধ চৈতন্য]); স্বমায়য়া (নিজ শক্তির দ্বারা [যাকে মায়া বলে]); আত্মনা (নিজের থেকেই); আত্মানম্ (নিজেকে); কল্পয়তি (প্রকাশিত করে [স্রষ্টা এবং সৃষ্টিরূপে]); সঃ এব (সেই অভিন্ন আত্মা); ভেদান্ (বিভিন্ন বস্তু); বুধ্যতে (প্রত্যক্ষ করে); ইতি (এই); বেদান্তনিশ্চয়ঃ (বেদান্তের সিদ্ধান্ত)।
সরলার্থ: আত্মা স্বয়ং প্রকাশিত। এই আত্মা নিজেই তাঁর মায়াশক্তির দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি এবং জগৎরূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন। আত্মা শুদ্ধ চৈতন্য ও অদ্বিতীয়, তা সত্ত্বেও মায়ার সাহায্যে বিভিন্নরূপে প্রকাশিত হন। এটাই হল বেদান্তের সিদ্ধান্ত।
ব্যাখ্যা: সমগ্র জগৎই একটি কল্পনামাত্র। কিন্তু কার কল্পনা? তিনি কে যিনি এই কল্পনা করেন? ইনিই স্বয়ং প্রকাশিত আত্মা। ‘দেবঃ’ শব্দটির অর্থ স্বয়ং জ্যোতি। এই আত্মা জ্যোতিস্বরূপ। নিজ শক্তির সাহায্যে (স্বমায়য়া) আত্মা এই জগৎরূপে নিজেকে প্রকাশ করেন। তিনি সবসময়েই আছেন কিন্তু তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন এইমাত্র। এখন আমরা বহু—যেমন নারী, পুরুষ, পশুপাখি, গাছপালা, গ্রহ-নক্ষত্র অর্থাৎ ভেদ দেখি। কিন্তু আত্মা অভেদ অর্থাৎ আত্মা এক ও অভিন্ন। একথা ঠিক নয় যে এ জগতের অন্য কোন কর্তা আছেন। এ জগতের কর্তা একজনই আর তিনিই হলেন আত্মা বা ব্রহ্ম। ব্রহ্মই নিমিত্ত কারণ, তিনিই স্রষ্টা। আবার ব্রহ্ম হলেন উপাদান কারণ, তিনিই সৃষ্টি। স্রষ্টা এবং সৃষ্টি অভেদ। ব্রহ্ম নিজ শক্তির দ্বারা এই বৈচিত্রপূর্ণ জগৎ প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু কে এই জগৎকে প্রত্যক্ষ করে? আর এর অভিজ্ঞতা প্রাপকই বা কে? ‘সঃ এব বুধ্যতে’—আত্মা স্বয়ং। এই বৈচিত্রের প্রকাশকও তিনি। তিনি নিজেই বহু হয়েছেন। এটাই হল ‘বেদান্ত-নিশ্চয়ঃ’ অর্থাৎ বেদান্তের সিদ্ধান্ত। এখানে এই সিদ্ধান্তটিতে যেন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কেউ কি যুক্তির সাহায্যে এই সিদ্ধান্তটিকে খণ্ডন করতে সক্ষম? গৌড়পাদ এখানে বলছেন : এই আমার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তকে খণ্ডন করা যায় না।
মায়াবাদ বেদান্তের এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এই সৃষ্টিই মায়া। একথাটি কোন্ অর্থে বলা হয়? এই অর্থে বলা হয় যে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ যেন এক জাদুমাত্র। এ-সম্বন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন : এ-ব্যাপারে একটি কথাই বলা চলে—এ মায়া। আমি কেমন করে ভাবতে শুরু করলাম আমি এই জগৎ থেকে আলাদা, আমি যেন এই দেহ-মন, রাগ-বিদ্বেষ, সুখ-দুঃখ দ্বারা সীমাবদ্ধ এক ব্যক্তিসত্তা। এইসব ঘটনা কেমন করে যে ঘটল তা আমি নিজেও জানি না। এসবের ব্যাখ্যায় আমি ব্যর্থ। আমরা যে অনুভব করি আমরা বদ্ধ, আমরা পীড়িত, আমরা একে অপরের থেকে আলাদা—স্বামীজীর মতে এ এক অনস্বীকার্য ঘটনা। হতে পারে এটা ভুল কিন্তু যেভাবেই হোক এই উপরোক্ত বোধ আমার মধ্যেই থাকে। বেদান্তের মতে আমরা যেন সম্মোহিত হয়ে আছি। জ্ঞাতা-জ্ঞেয়র ধারণা, তুমি-আমির ধারণা এ সবই সম্মোহনের ফল। একেই বলা হয় মায়া।