প্রভবঃ সর্বভাবানাং সভামিতি বিনিশ্চয়।
সর্বং জনয়তি প্রাণশ্চেতোংশূন্ পুরুষঃ পৃথকৃ॥৬
অন্বয়: প্রভবঃ [ইব] সতাম্ (সৎ বস্তু থেকেই সৎ বস্তুর উৎপত্তি [সৎ অর্থাৎ ‘যা আছে’]); সর্বভাবানাম্ (অস্তিত্ব আছে এমন সকল বস্তু [যথা বিশ্ব, তৈজস, প্রাজ্ঞ]); ইতি বিনিশ্চয়ঃ (একথা সুনিশ্চিত); প্রাণঃ (মায়াযুক্ত ব্রহ্ম); সর্বম্ (বিশ্বের সকল অচেতন বস্তু); জনয়তি (উৎপন্ন করে); পুরুষঃ চেতোংশূন্ (সূর্য থেকেই যেমন তার কিরণের উৎপত্তি তেমনি পরমাত্মা [পুরুষ]); পৃথক্ (পৃথকভাবে চেতন বস্তুর সৃষ্টি করে)।
সরলার্থ: একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় কোন বস্তু থেকে আর এক বস্তুর সৃষ্টি হয় (যেমন, বিশ্ব [স্থূল], তৈজস [সূক্ষ্ম], প্রাজ্ঞ [কারণ])। প্রাণ থেকেই অচেতন বস্তুর সৃষ্টি। সূর্য থেকেই যেমন তার কিরণের উৎপত্তি ঠিক তেমনি পরমাত্মা (পুরুষ) থেকে চেতন বস্তুর সৃষ্টি।
ব্যাখ্যা: গৌড়পাদ এখানে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইছেন যে, ব্রহ্ম সর্বত্র রয়েছেন। অন্যথায় এই পরিবর্তনশীল জগতের কোন অস্তিত্বই থাকত না। আনুমানিকভাবে ব্রহ্ম সম্পর্কে এটি হল পরোক্ষ প্রমাণ। আমরা এরকম কথা শুনে থাকি, ‘পর্বতঃ বহ্নিমান্ ধূমাৎ’—পর্বত থেকে যদি ধোঁয়া নির্গত হয় তবে সেখানে কোথাও নিশ্চয়ই আগুন আছে। একেই বলা হয় অনুমান। সেইজন্য এই শ্লোকে গৌড়পাদের যুক্তি হচ্ছে, কোন বস্তুকে দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এইসব বস্তুর উৎপত্তির নিশ্চয়ই কোন উৎস আছে। শূন্য থেকে কোন কিছুর সৃষ্টি হয় না, এটা অসম্ভব। যা-কিছুর অস্তিত্ব আছে সেই অস্তিত্বের কোথাও না কোথাও উৎসও আছে। কারণ ছাড়া কোন কার্য হতে পারে না, ‘ইতি বিনিশ্চয়ঃ’—একথা সুনিশ্চিত।
দৃষ্টান্ত হিসাবে উপনিষদ আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে বলা হয়েছে, তুমি হয়তো এখন জেগে আছ, একটু পরেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়বে। তারপরে হয়তো গভীর নিদ্রা তথা সুষুপ্তিতে আচ্ছন্ন হবে, অর্থাৎ অবস্থার এইসব পরিবর্তন ঘটে থাকে। কিন্তু এইসব পরিবর্তনের জন্য কোন আশ্রয়ের প্রয়োজন, যার উপর নির্ভর করে এইসব পরিবর্তনগুলি ঘটতে পারে। তাহলে এই আশ্রয়টি কি? আশ্রয়টি ‘তুমি’ অর্থাৎ জীব। জীবকে থাকতেই হবে। একইভাবে সমগ্র সৃষ্টি প্রক্রিয়াটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, কখনই স্থির নয়। কিন্তু যদি এর পেছনে কোন অপরিবর্তিত আশ্রয় না থাকে, তবে এই জগতের কোনও অস্তিত্ব থাকে না। উপনিষদ বলছেন যে—ইতিবাচক কোন সত্তা বা অবলম্বন অথবা আশ্রয় বলে এমন কিছু আছে যার উপর এই দৃশ্যমান জগৎ স্থিত। এই সত্তা নিত্য এবং অপরিবর্তনীয় অর্থাৎ ইনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্মের অস্তিত্ব না থাকলে এই দৃশ্যমান জগতের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। এমনকি দৃষ্টিবিভ্রমের জন্যও কোন অবলম্বনের প্রয়োজন। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, আমি একটা সাপ দেখলাম বলে মনে হল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল ওটা সাপ নয়, আসলে দড়ি। কিন্তু দড়িটি সেখানে না থাকলে আমার এই ভুল হত না। আরও একটি দৃষ্টান্ত হল : আমি মরুভূমিতে রয়েছি। আর তার একটু দূরে একটি জলাশয় দেখতে পাচ্ছি বলে আমার মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলে সেটি জলাশয় নয়, নেহাতই মরীচিকা। মরীচিকা একমাত্র মরুভূমিতেই দেখা যায়। অর্থাৎ মরুভূমি ছাড়া মরীচিকা দেখা সম্ভব নয়। আচার্য শঙ্কর বলছেন—‘তুমি কখনো কি কোন বন্ধ্যা নারীর সন্তানকে দেখেছ? অথবা দেখেছ কি শশশৃঙ্গ? বা আকাশকুসুম?’ এসব অসম্ভব যেহেতু এদের কোন অস্তিত্বই নেই। এমনকি ভুল করেও আমরা এসব দেখতে পাই না। আসল জিনিস না থাকলে তার কোন নকল থাকতে পারে না।
সেজন্য গৌড়পাদ বলছেন, আমাদের একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এই দৃশ্যমান জগতের কোন অবলম্বন বা আশ্রয় আছে। আর সেই আশ্রয় হলেন ব্রহ্ম কারণ ব্রহ্ম নিত্য এবং অপরিবর্তিত। এই দৃশ্যমান জগতের পরিবর্তনসমূহ ব্রহ্মের উপরে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করে না। ব্রহ্ম ব্রহ্মই থাকেন অর্থাৎ ব্রহ্ম নিত্য, সনাতন, নির্বিশেষ এবং নির্গুণ।
এরপর গৌড়পাদ বলছেন যে, এই জগতে দুই রকমের বস্তু আছে—জড় বস্তু ও চেতন বস্তু। এই দুই বস্তুই ব্রহ্মের কাছ থেকে এসেছে, যদিও ব্রহ্ম কোন কিছুরই স্রষ্টা নন। ব্রহ্ম ব্রহ্মই অর্থাৎ ব্রহ্মের কোনও পরিবর্তন হয় না। ব্রহ্ম মায়ার সাথে যুক্ত হয়ে এই জগৎরূপে নিজেকে প্রকাশ করেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেব যেমন বলতেন বিশুদ্ধ সোনা দিয়ে কোন গয়না প্রস্তুত করা যায় না। গয়না বানাতে হলে সোনার সাথে কিছু খাদ মেশাতে হয়। একইভাবে শুদ্ধ চৈতন্যই হচ্ছেন শুদ্ধ ব্রহ্ম। আর এই ব্রহ্মই মায়াযুক্ত হয়ে জড়-অজড়, চেতন-অচেতন অর্থাৎ এই জগৎরূপে প্রকাশিত হন। মায়া ব্রহ্মের মধ্যেই রয়েছেন—কখনো সক্রিয় আবার কখনো নিষ্ক্রিয়। মায়াকে একটা সাপের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে যা কখনো গতিশীল আবার কখনো বা স্থির। মায়া যখন নিষ্ক্রিয় তখন তা হল নির্গুণ ব্রহ্ম অর্থাৎ যা উপাধিবর্জিত বিশুদ্ধ চৈতন্যমাত্র। আর মায়া যখন সক্রিয় তখনি এই জগতের প্রকাশ ঘটে।
কারিকা বলছেন যে, অপ্রাণ বস্তু প্রকাশিত হয় প্রাণ তথা হিরণ্যগর্ভ থেকে। এই হিরণ্যগর্ভই অপরব্রহ্ম। মাকড়সা যেমন তার নিজদেহের ভেতর থেকেই জাল বার করে এ যেন ঠিক তাই। মাকড়সা চেতন, কিন্তু তার জালটি অচেতন, পুরুষ থেকেই চেতন বস্তু বা প্রাণিকুল প্রকাশিত হয়—এই পুরুষই পরব্রহ্ম। ‘অংশু’ কথাটির অর্থ কিরণ। প্রাণিকুল তথা আমরা সচেতন, কারণ আমরা ‘পুরুষ’ থেকেই উৎসারিত। এবং এইজন্যই আমরা সূর্যকিরণের সঙ্গে তুলনীয়। কারণ সূর্যের যা ধর্ম সূর্যকিরণেরও ঠিক একই ধর্ম। আবার মাকড়সা যেমন তার জালকে নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি প্রাণিকুলও জড়জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে। একইভাবে, আত্মাও দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু প্রাণ অপ্রাণ নির্বিশেষে সকল বস্তুই আসে ব্রহ্ম থেকে।