আশ্রমাস্ত্রিবিধা হীনমধ্যমোৎকৃষ্টদৃষ্টয়ঃ।
উপাসনোপদিষ্টেয়ং তদর্থমনুকম্পয়া॥১৬
অন্বয়: আশ্রমাঃ হীন-মধ্যম-উৎকৃষ্ট-দৃষ্টয়ঃ ত্রিবিধাঃ (ধারণা করার ক্ষমতা অনুযায়ী, স্ত্রী ও পুরুষদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায় : হীন, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট); অনুকম্পয়া ([শাস্ত্রাদি] করুণাবশত); তদর্থম্ (তাদের জন্য); ইয়ম্ (এই); উপাসনা (উপাসনা পদ্ধতি); উপদিষ্ট (নির্দেশ করেছেন)।
সরলার্থ: অধিকারী ভেদে মানুষকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়—হীন, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট। শাস্ত্র করুণাবশত হীন ও মধ্যম অধিকারীদের জন্য নানা উপাসনা-পদ্ধতির নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু উত্তম অধিকারীর জন্য আলাদা কোন উপাসনার বিধান শাস্ত্রে নেই।
ব্যাখ্যা: শাস্ত্রে প্রায়ই পরস্পরবিরোধী উক্তি দেখা যায়। কোথাও আছে ‘অগ্নিহোত্র জাতীয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান কর’, ‘তাঁকে নিজ আত্মা জ্ঞানে উপাসনা কর’ ইত্যাদি। এইসব উক্তি স্পষ্টতই দ্বৈতবাদী এবং এর দ্বারা আচার-অনুষ্ঠানকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আবার অন্যত্র শাস্ত্রে আছে যে আত্মা এক এবং অদ্বিতীয় এবং মানুষের জীবনের লক্ষ্য সেই আত্মাকে উপলব্ধি করা। কিভাবে এই বিরোধের সমন্বয় সাধন করা যায়?
এর উত্তর খুব সহজ : আমরা সবাই এক ধাতুতে গড়া নই। বহু দিক থেকেই আমরা পরস্পর স্বতন্ত্র এবং শাস্ত্র এই পার্থক্যের কথা স্বীকার করে। একই জিনিস সকলকেই গলাধঃকরণ করতে হবে—এ কখনই শাস্ত্রের অভিপ্রায় নয়। শাস্ত্রের নীতি হল: যার পেটে যা সয়।
অনেক মানুষ আছেন যাঁরা জীবনকে উপভোগ করতে চান। শাস্ত্র বলে ‘তাঁরা উপভোগ করুন। কিন্তু একথা যেন তাঁরা মনে রাখেন ভোগের ভিতর দিয়ে কখনো সুখী হওয়া যায় না। একমাত্র ত্যাগের মধ্য দিয়েই তাঁরা আনন্দ পেতে পারেন।’ শাস্ত্রে একই গাছে দুটি পাখীর উপমা আছে। একটা পাখী একের পর এক ফল খেয়ে চলেছে—ফলটা মিষ্টি হলেই সে খুশি, আবার টক হলেই দুঃখী। সুতরাং পাখীটি কখনো সুখী, কখনো দুঃখী। অন্য পাখীটি কিন্তু অচল, অটল, স্থির। কিছু করছে না। সে সদাপ্রসন্ন।
এই পাখী দুটি পরস্পর পৃথক নয়, এক এবং অভিন্ন। প্রথম পাখীটি জীবাত্মার উপমা দ্বিতীয়টি পরমাত্মার। যখন আমরা উপলব্ধি করি আমরাই পরমাত্মা—তখন আমরা সুখী। কিন্তু সকলের জন্য তো আর ত্যাগের পথ নয়। শাস্ত্র তাদের জন্য ভোগের পথ অনুমোদন করে। কিন্তু তাঁরা যেন সব কাজ ‘ঈশ্বরের পূজা’ -জ্ঞানে করে—এই শাস্ত্রের নির্দেশ। তাদের জন্য ‘কর্মই উপাসনা’।
শাস্ত্র সবকিছু ব্যবহারিক দৃষ্টিতে দেখে। শাস্ত্র জানে বিভিন্ন মানুষের রুচি ও ক্ষমতাও বিভিন্ন। তাই শাস্ত্র চায় না সকলে একই পথে চলুক। বিভিন্ন মানুষের জন্য শাস্ত্র বিভিন্ন পথের নির্দেশ দিয়ে থাকে। কিছু মানুষ আছে যাঁরা অদ্বৈততত্ত্ব ধারণা করতে সক্ষম। শাস্ত্র তাদের কাছে অদ্বৈতবাদই প্রচার করে এবং তাদের সম্পূর্ণ ত্যাগ-বৈরাগ্যের পথ গ্রহণ করতে নির্দেশ দেয়। অন্যদের জন্য শাস্ত্রের নির্দেশ দ্বৈতবাদ এবং ‘কর্মই উপাসনা’ এই নীতি। এই দুই চরমপন্থীর মাঝে আরও নানা পথ রয়েছে। যার পক্ষে যা সর্বোত্তম—তাকে শাস্ত্র সেই পথই অবলম্বন করতে বলে। কিন্তু সে যেন না মনে করে তার পথই শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র পথ—শাস্ত্র এ-ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়।