আদাবন্তে চ যন্নাস্তি বর্তমানেঽপি তত্তথা।
বিতথৈঃ সদৃশাঃ সন্তোঽবিতথা ইব লক্ষিতাঃ॥৬
অন্বয়: যৎ (বস্তুটি); আদৌ (প্রথম দেখার আগে); অন্তে ন অস্তি (শেষে তা দেখা যাবে না); তৎ (সেই বস্তুটি); বর্তমানে অপি (বর্তমানেও); তথা (সেটি মিথ্যা); বিতথৈঃ সদৃশাঃ (মরীচিকার ন্যায় ভ্রান্ত); সন্তঃ অবিতথা ইব লক্ষিতাঃ (সত্য বলে দৃষ্ট হয়)।
সরলার্থ: এমন কোনও বস্তু যদি থাকে যা শুরুর আগেও ছিল না আবার শেষ হবার পরেও থাকবে না তাকে মিথ্যা বলে মনে করতে হবে। বস্তুটি মরীচিকার মতোই মিথ্যা। বস্তুটিকে সত্য বলে মনে হলেও বস্তুটি আসলে সত্য নয়। যা চিরন্তন সত্য তা নিত্য অর্থাৎ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এই তিন কালেই তা সত্য।
ব্যাখ্যা: ধরা যাক, আমি স্বপ্ন দেখছি আমি ক্রিকেট খেলা দেখতে গেছি। অগণিত দর্শকদের মধ্যে বসে আমি খেলা দেখছি। জেগে ওঠার পরই আমি বুঝতে পারলাম স্বপ্নটি সত্য নয়। পুরো সময়টা আমি বিছানাতেই ছিলাম, এক মুহূর্তের জন্যও আমি বাইরে যাইনি। কিন্তু স্বপ্ন দেখাকালীন অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে এত সত্য বলে মনে হয়েছিল যে কেউ ‘ক্যাচ্’ ধরলে আমি ভারী খুশি হয়ে উঠেছি, আবার যখন কেউ ‘ক্যাচ্’ ফেলে দিয়েছে তখন খুবই দুঃখ পেয়েছি। যতক্ষণ আমি স্বপ্ন দেখছিলাম ততক্ষণ এইসব নানা প্রতিক্রিয়া আমার হচ্ছিল। এখানে গৌড়পাদের বক্তব্য স্বপ্নে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা যদি মিথ্যা হয় তবে জাগ্রত অবস্থায় ক্রিকেট ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতাও সমভাবে মিথ্যা। সত্যের যে বোধ আমার রয়েছে তা ভ্রান্তিমাত্র। এর স্বপক্ষে তাঁর যুক্তি : যখন আমি স্বপ্ন দেখি তখন কি আমি বুঝতে পারি যে আমি স্বপ্ন দেখছি? না, তা পারি না। যখন স্বপ্ন দেখি তখন স্বপ্নের সকল বস্তুই আমার কাছে অতি সত্য বলে মনে হয়। তখন এর সত্যতা নিয়ে আমার কোন সংশয়ও থাকে না। ধরা যাক, স্বপ্নে একটা বাঘ দেখলাম এবং দেখামাত্রই ভয়ে দৌড়ে পালাতে শুরু করলাম। যদি আমি জানতাম যে এটি নেহাতই স্বপ্ন, এখানে প্রকৃতপক্ষে কোনও বাঘ নেই তবে আমি ভয় পেয়েছিলাম কেন? কিন্তু জেগে উঠে আমাকে মানতেই হল যে সত্যিই কোনও বাঘ ছিল না। প্রকৃত জ্ঞানীর দৃষ্টিতে জাগ্রত অবস্থার সব প্রতিক্রিয়া ও আবেগসমূহ স্বপ্নাবস্থার মতোই সমভাবে মিথ্যা। আপাতদৃষ্টিতে সেগুলিকে সত্য বলে মনে হলেও আসলে সেগুলি স্বপ্নের অভিজ্ঞতার মতোই সাময়িক অভিজ্ঞতা মাত্র। অথবা জাগ্রত অবস্থায় রজ্জুতে সর্পভ্ৰমতুল্য। যখন দড়িকে সাপ মনে করি তখন নানারকম প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু পরে বুঝতে পারি দড়িটি কখনই সাপ ছিল না। দড়িই ছিল।
তাই এখানে গৌড়পাদ বলছেন : ‘সান্তঃ অবিতথা ইব লক্ষিতাঃ’—আমাদের অভিজ্ঞতাসমূহকে সত্য বলে মনে হতে পারে কিন্তু আসলে তা সত্য নয়। কারণ এইসব অভিজ্ঞতার শুরু ও শেষ আছে। কিন্তু যা সত্য তা নিত্য। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এই তিন কালেই তা সত্য। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা ক্ষণস্থায়ী, কিছুক্ষণ পরেই তা শেষ হয়ে যায়। যা অতীতেও ছিল না ভবিষ্যতেও থাকবে না তা বর্তমানেই বা আছে কি করে? সত্যই একমাত্র নিত্য। অর্থাৎ তা সবসময়ই বিদ্যমান।