বিভূতিং প্রসবং ত্বন্যে মন্যন্তে সৃষ্টিচিন্তকাঃ।
স্বপ্নমায়াস্বরূপেতি সৃষ্টিরন্যৈর্বিকল্পিতা॥৭
অন্বয়: অন্যে সৃষ্টিচিন্তকাঃ (যাঁরা এ জগৎ সৃষ্টি হয়েছে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী); বিভূতিং প্রসবং মন্যন্তে (এ ঈশ্বরের মহিমা—এমন কথা তাঁরা মনে করেন); অন্যৈঃ (অন্যেরা [যাঁরা আত্মজ্ঞানলাভের প্রয়াসী]); সৃষ্টিঃ স্বপ্ন মায়া-স্বরূপ ইতি বিকল্পিতা ([সে যেমনই হোক] তাঁরা এই সৃষ্টিকে [এই জগৎ] স্বপ্ন তথা দৃষ্টিবিভ্রম ব্যতীত আর কিছুই মনে করেন না)।
সরলার্থ: যাঁরা জগৎ সৃষ্টি হয়েছে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী তাঁরা এই বিশ্বকে ঈশ্বরের মহিমা বলে মনে করেন। কিন্তু যাঁরা আত্মজ্ঞানলাভের প্রয়াসী তাঁদের নিকট এ জগৎ স্বপ্ন অর্থাৎ দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।
ব্যাখ্যা: এই শ্লোকে গৌড়পাদ দুই শ্রেণীর মানুষের কথা বলেছেন। তিনি প্রথম শ্রেণীর নাম দিয়েছেন ‘সৃষ্টিচিন্তকাঃ’—সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসী। এইসব মানুষরা বলেন এই সৃষ্টি ঈশ্বরের অলৌকিক কর্মবিশেষ—‘বিভূতিম্’। ‘বিভূতিম্’ কথাটির আর একটি অর্থ হচ্ছে মহিমা বা শক্তি। এরা দ্বিতত্ত্ববাদী, এঁদের মতে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা হচ্ছে দুটি পৃথক সত্তা। এই ধারণা কিছু হিন্দুশাস্ত্রে এবং বাইবেলেও দেখতে পাওয়া যায়। এঁদের মতে ঈশ্বর বলে একজন আছেন এবং তিনি তাঁর নিজ শক্তির দ্বারা এই জগৎকে সৃষ্টি করেছেন। এটাই তাঁর অলৌকিকত্বের পরিচায়ক।
কিন্তু অন্য আর এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, তাঁদের নিকট—এ জগৎ স্বপ্নবৎ (স্বপ্ন-মায়া)। ‘স্বপ্ন’ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ জগৎ স্বপ্নের মতোই মিথ্যা। স্বপ্ন যে সত্য নয় একথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু যখন আমি স্বপ্ন দেখছি তখন কি আমি বুঝতে পারি যে আমি স্বপ্ন দেখছি? তখন কি আমি জানি যে স্বপ্ন সত্য নয়? হয়তো স্বপ্নে আমি দেখছি আমি কাশী যাচ্ছি। স্বপ্নে দেখলাম আমি টিকিট কাটছি, আমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছি এবং ট্রেনেও উঠেছি। কিন্তু এ সবই মনের কল্পনামাত্র। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি আমার ঘরে নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছি। তাই গৌড়পাদ বলছেন—যে অর্থে স্বপ্ন সত্য শুধুমাত্র সেই অর্থেই এ জগৎও সত্য। একটা বিশেষ মুহূর্তে এটা সত্য। কিন্তু পরমুহূর্তেই তা অন্তর্হিত। যদি তুমি মনে কর যে এ জগতের অস্তিত্ব চিরকাল থাকবে তাহলে তুমি ভুল করবে। এই জগৎকে অনিত্য বলা হচ্ছে এই অর্থে যে এ জগৎ সতত পরিবর্তনশীল।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব একটা সুন্দর উপমার সাহায্যে প্রকৃত জ্ঞানীর অবস্থা বর্ণনা করছেন, যাঁর কাছে এ জগৎ স্বপ্নবৎ। উপমাটি হল: এক চাষীর বেশি বয়সে একটি পুত্র সন্তান জন্মায়। শিশুটি যত বড় হতে থাকে তার প্রতি তার পিতামাতার স্নেহ-ভালোবাসাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। একদিন চাষীটি যখন ক্ষেতে কাজ করছে এমন সময়ে এক প্রতিবেশী এসে তাকে খবর দিল যে তার ছেলেটি ভীষণ অসুস্থ, তার মৃত্যু আসন্ন-প্রায়। চাষী বাড়ি ফিরে যাওয়ার মধ্যেই ছেলেটি মারা যায়। তার স্ত্রী অঝোরে কাঁদতে থাকে কিন্তু চাষীর চোখ একেবারেই শুষ্ক। তখন শোকাতুরা স্ত্রী তার প্রতিবেশীকে বলছে—‘এমন ছেলে চলে গেল আর তার চোখ থেকে এক বিন্দু জলও পড়ল না।’ কিছুক্ষণ বাদে কৃষকটি তার স্ত্রীকে বলছে—‘বলতে পার কেন আমি কাঁদছি না?’ গত রাতে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম যে আমি রাজা হয়েছি এবং আমি সাত-সাতটি রাজপুত্রের পিতা। সেইসব রাজপুত্রেরা যেমন সুদর্শন তেমনি সৎগুণের অধিকারী। বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তারা জ্ঞান অর্জন করে বহু বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠল। এমন সময়ে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাই আমি এখন অবাক হয়ে ভাবছি আমি কার জন্য কাঁদব ঐ সাত পুত্রের জন্য না এই একটি পুত্রের জন্য?’ জ্ঞানীর কাছে জাগ্রত অবস্থাও স্বপ্নের মতো মিথ্যা।
এই জগৎ যে দৃষ্টিবিভ্রমমাত্র তার পক্ষে আচার্য শঙ্কর একটি চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এটি ভারতীয় দড়ির খেলার দৃষ্টান্ত : এক যাদুকর সপরিবারে যাদুর খেলা দেখাতে এসেছে। যাদুকর একটি দড়ি নিয়ে উঁচুতে হাওয়ায় ছুড়ে দিল, কেমন করে যেন দড়িটি গাছের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখন যাদুকরটি বলল—এর উপরে নিশ্চয়ই কোন দুষ্ট প্রেত ভর করেছে। আমি তাকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছি। এই বলে কিছু অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে সে দড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। তার স্ত্রী তাকে এই বলে বাধা দিতে চেষ্টা করল: না যেও না। এ কাজ বিপজ্জনক। কিন্তু যাদুকর এই নিষেধ শুনল না। সে দড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল এবং শেষে শূন্যে মিলিয়ে গেল। কিন্তু একটু পরেই একটি কাটা হাত মাটিতে পড়ল, তারপর যথাক্রমে আর একটি হাত, দুটি পা, মাথা এবং সবশেষে তার দেহটি সশব্দে মাটিতে পড়ল। দর্শকদের বিস্ময়বিমূঢ় অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এবার তার শোকাহত স্ত্রী-পুত্ররা ভূলুণ্ঠিত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল : আমাদের অন্নদাতা চলে গেল। এখন কে আমাদের ভরণপোষণ করবে? তারপর স্ত্রী দর্শকদের কাছে ভিক্ষা চাইতে লাগল। আর দর্শকরা প্রত্যেকেই তাদের সাধ্যমত পয়সা দিয়ে ওদের সাহায্য করলেন। এরপর স্ত্রী তার মৃত স্বামীর দেহাংশগুলিকে একত্রিত করে একটি কাপড় দিয়ে ঢাকা দিল এবং বলল ‘এবার আমি একটা মন্ত্র পড়ে চেষ্টা করে দেখি।’ সে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল এবং হঠাৎ সকলে দেখল যাদুকর জীবিত অবস্থায় তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।
সম্ভবত শ্রীরামকৃষ্ণদেব কারিকার এই শ্লোকটি শুনেছিলেন। আর হয়তো এ-কথা মনে করেই বলতেন: যাদুকর আর তার যাদুর মধ্যে কোন্টি সত্য? যাদু সত্য নয়। যাদুর খেলা মানুষকে মোহগ্রস্ত করে। এই খেলা অনেকক্ষণ ধরে চলে এবং সেখানে অনেক ঘটনাও ঘটে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত ব্যাপারটি দৃষ্টিবিভ্রমের ফল। যাদুকরই একমাত্র সত্য। আচার্য শঙ্করও ঠিক এই কথাই বলেছেন। এ জগৎ যাদুকরের যাদুমাত্র। যখন আমরা এ জগৎকে দেখি তখন তা আমাদের কাছে সত্য বলেই মনে হয়, কিন্তু আসলে তা নয়। অনন্ত সত্তাই এই জগৎকে প্রকাশ করে। অনুরূপভাবে জাগ্রত, স্বপ্ন এবং সুষুপ্তি এই তিন অবস্থাই ভ্রান্ত, যা থেকে আমাদের সব দুঃখ-কষ্টের শুরু। এই পরিবর্তন সত্য নয়। প্রথমে আমি ছিলাম সদ্যোজাত এক শিশু, ক্রমে কিশোর, পরে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং এখন হয়তো আমি বৃদ্ধ। আবার বলছেন, এক সময়ে হয়তো আমি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, আবার পরবর্তীকালেই রোগগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারি। এইসব পরিবর্তন দেহগত। এইসব পরিবর্তন সত্ত্বেও আমি সেই একই ব্যক্তি। উপনিষদ আমাদের বোঝাতে চাইছেন—জাগ্রত ও ঘুমন্ত, পীড়িত ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, শৈশব ও বার্ধক্য এইসব পরিবর্তনশীল অবস্থার কোনটিই সত্য নয়। তাহলে সত্য কি? এইসব পরিবর্তনের পেছনে যে আত্মা রয়েছেন তাই একমাত্র সত্য।
অনুরূপভাবে এই জগৎ এবং সংগ্রাম, আসক্তি, ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ এই যে জীবন এ সবই ভ্রান্ত। এই সবের স্থায়িত্ব স্বল্প এবং এগুলি বিনাশশীল, আমরা এই জীবনকে বড় বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমাদের প্রতিক্রিয়াসমূহ কোন বিশেষ অবস্থার, কোন বিশেষ মুহূর্তের অধীন। যেমন—কিছু অর্থপ্রাপ্তি ঘটলে আমরা উচ্ছ্বসিত হই, আবার অর্থ নাশ হলে আমরা বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। তাই উপনিষদ বলছেন: আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে সৎ কি আর অসৎই বা কি? যতক্ষণ আমি এই দৃশ্যমান জগতের অন্তর্গত ততক্ষণ পর্যন্ত আমার আনন্দ-বিষাদ, সুখ-দুঃখ এবং জীবন-মৃত্যু—এই দ্বৈত দৃষ্টি থাকবে। জীবনের ধর্মই এই, কেউ বলতে পারে না, ‘আমি শুধুই আনন্দে থাকব’। কিন্তু উপনিষদ বলছেন—এই সুখ-দুঃখের পারে যাওয়ার চেষ্টা কর।’ উভয়ই বন্ধনের কারণ। যখন তুমি এ জগৎকে মিথ্যা বলে জানবে তখনি তুমি একথা বলতে পার: ‘হে জগৎ, আমি তোমাকে এখন জেনেছি। তুমি আর আমাকে ঠকাতে পারবে না।’ এ যেন দড়ি খেলার গোপন কৌশলটি আয়ত্ত করা। এবার যাদুকরের খেলা দেখে আমি আর বিস্মিত হই না। দেহের বিভিন্ন খণ্ডিত অংশগুলি মাটিতে পড়ে রয়েছে দেখেও আমি বিচলিত হই না। এখন আমি জানি এ সবই ভ্রান্তিমাত্র। ঠিক তেমনিভাবেই, এ জগৎকে সঠিকভাবে জানলে আর প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। যে কোনও ঘটনার জন্যই আমি তখন প্রস্তুত। অর্থ প্রাপ্তি বা নাশ তখন আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না। তখন সুখ-দুঃখ দুই-ই সমান বলে বোধ হয়।
এখানে গৌড়পাদ আমাদের বোঝাতে চাচ্ছেন, সৃষ্টি আর সৃষ্টির পেছনে যে সত্য রয়েছে—এ দুয়ের মধ্যে কোন্টি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন কিছু ব্যক্তি আছেন যাঁরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়েই মশগুল। অপরদিকে এমন কিছু ব্যক্তিও আছেন—যাঁরা বুদ্ধিমান। অন্তর্নিহিত মূল সত্যকে জানতেই তাঁরা অধিকতর আগ্রহী। শ্রীরামকৃষ্ণদেব এক শ্রেণীর মানুষের কথা বলতেন, যারা মন্দির দর্শন করতে গিয়ে তাদের সবটুকু সময় ব্যয় করে মন্দিরের বাইরে যে ভিখারি আছে তাদের সাহায্য করার জন্য। বলতেন: তারা যে মূল উদ্দেশ্যটা নিয়ে এসেছিল তা তারা ভুলে যায়। প্রথমেই মন্দিরে ঢুকে দেবীকে দর্শন কর। তারপর তোমার সাধ্যমত তুমি গরীবদের সাহায্য কর। সুতরাং প্রথমে ঈশ্বর উপলব্ধি, তারপর তাঁর সৃষ্টির কথা ভাবা।
একটি গানে সাধক রামপ্রসাদ অভিযোগ করেছেন: মা তুমি তোমার এই সুন্দর জগতের সাহায্যে আমাদের বোকা বানাচ্ছ। এই সৃষ্টির পিছনে তুমি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছ। তাই আমরা তোমাকে দেখতে না পেয়ে তোমাকে একেবারে ভুলে আছি। তুমি আমাদের সঙ্গে ছলনা করে চলেছ। তুমি কেমন মা? নিজেকে আড়ালে রেখে সন্তানদের এই অসার জগৎকে দিয়ে ভুলিয়ে রেখে, তুমি তোমার সন্তানদের ঠকাচ্ছ। একইভাবে গৌড়পাদ এই জগতের উৎসটা কোথায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন। এটাই এই শ্লোকের মূল বক্তব্য।