অমাত্ৰশ্চতুর্থোঽব্যবহার্য প্রপঞ্চোপশমঃ শিবোঽদ্বৈত
এবমোঙ্কার আত্মৈব সংবিশত্যাত্মনাঽঽত্মানং য এবং বেদ॥১২
অন্বয়: অমাত্রঃ (অসীম); অব্যবহার্যঃ (ব্যবহারযোগ্য নয় [কারণ ইনি বাক্যমনাতীত]); প্রপঞ্চোপশমঃ (জগৎ তার অস্তিত্ব হারায় [কারণ সেখানে দুই বলে কিছু নেই]); শিবঃ (সদয়); চতুর্থঃ (তুরীয় [চতুর্থ অবস্থা]); এবম্ (যেরূপ বলা হয়েছে [জ্ঞানী ব্যক্তির দ্বারা]); ওঙ্কারঃ অদ্বৈতঃ (ওম্ই অদ্বৈত); আত্মা এব (আত্মা ছাড়া আর কিছু নয়); যঃ (সাধক); এবম্ (এইভাবে); বেদ (জানেন [তিনি]); আত্মনা (তিনি স্বয়ং); আত্মানম্ (পরমাত্মা); সংবিশতি (লীন হয়ে যান [আর কখনো ফিরে আসেন না])।
সরলার্থ: (যেমন আগে বলা হয়েছে), ‘ওম্’-এর চতুর্থ অবস্থা হচ্ছে পরমাত্মা। এই আত্মা অনন্ত, বাক্যমনাতীত, অদ্বয় এবং শিবস্বরূপ। দৃশ্যমান জগৎ এঁরই মধ্যে রয়েছে। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা বলেন, জীবাত্মাই হলেন পরমাত্মা। যিনি এই তথ্য জানেন তিনি ব্রহ্মে লীন হয়ে যান। (তিনি নিজেকে আর কখনো জীবাত্মা বলে মনে করেন না।)
ব্যাখ্যা: অমাত্রঃ—আর কোনও অবস্থা নেই। যখন আমরা অ, উ, ম এই তিন অবস্থার ঊর্ধ্বে যেতে পারি, তখনি আমরা তুরীয় অর্থাৎ চতুর্থ অবস্থা প্রাপ্ত হই। এই অবস্থা হল শুদ্ধ চৈতন্য; ঈশ্বরাতীত। এই অবস্থায় স্থূল জগতের কোনও অস্তিত্ব থাকে না। স্বপ্নের জগৎও তখন থাকে না। সমগ্র জগৎ, এই দুই বোধ (দ্বিতত্ত্ব) তখন লোপ পায়। তুরীয় অবস্থায় আত্মাই একমাত্র থাকেন। সাধক ব্যক্তি তখন মুক্ত হয়ে যান। তাঁর আর পুনর্জন্ম হয় না।
প্রপঞ্চ—কথাটির অর্থ হল পঞ্চভূত বা পাঁচটি উপাদান। এখানে এই দৃশ্যমান জগৎ অর্থাৎ বৈচিত্রের কথা বলা হয়েছে। তুরীয় অবস্থায় সাধক মনে করেন এ জগৎ মিথ্যা। তখন তাঁর কাছে এ জগতের কোনও অস্তিত্বই নেই। তিনি তখন সবকিছুর মধ্যে কেবল ব্রহ্মকেই দেখেন। এই অবস্থায় থাকে শুধু শিব, আনন্দ এবং মঙ্গল। তখন এক বৈ দুই বলে কিছু থাকে না। সাধক তখন সর্বত্র ও সকলের মধ্যে এক ও অভিন্ন আত্মাকেই দেখেন। তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে এই ওম্, আত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়। (এবম্ ওঙ্কার আত্মৈব।)
যঃ এবং বেদ—যিনি এই প্রকার জানেন, অর্থাৎ যিনি সত্যকে জানেন। এই হল প্রকৃত জ্ঞান যা ইন্দ্রিয়াতীত। তখন সাধক জানেন : ‘শুধু তিনিই আছেন।’ এই অবস্থায় সকল দ্বিতত্ত্বের অবসান হয়। সমগ্র জগৎ তখন সাধকের মধ্যে লয় হয়ে যায়। এই অবস্থাই হল চূড়ান্ত অবস্থা। সাধক বাইরে আর কিছুই দেখেন না। তখন সবকিছু তাঁর নিজের মধ্যে।
সংবিশতি—তিনি পুরোপুরি লীন হয়ে যান। সাধক নিজ আত্মাতেই তখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। যেহেতু তাঁর কাছে এ জগতের পৃথক কোনও অস্তিত্ব নেই সেহেতু তিনি নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেন। অর্থাৎ তিনি আত্মতৃপ্ত। ‘আত্মনা আত্মানম্’—আত্মা আত্মাতেই স্থিত। জীবাত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যান। অর্থাৎ জীবাত্মাই পরমাত্মা হয়ে যান।
ইতি মাণ্ডূক্যোপনিষৎ সমাপ্তা।
এখানেই মাণ্ডূক্য উপনিষদ সমাপ্ত।