উপাসনাশ্রিতো ধর্মো জাতে ব্রহ্মণি বৰ্ততে।
প্রাগুৎপত্তেরজং সর্বং তেনাসৌ কৃপণঃ স্মৃতঃ॥১
অন্বয়: উপাসনাশ্রিতঃ (প্রার্থনায় যাঁর নিষ্ঠা); ধর্মঃ (জীবাত্মা); জাতে (জীব ও জগৎ রূপে প্রতিভাত); ব্রহ্মণি বৰ্ততে (ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত); উৎপত্তেঃ প্রাক্ (সৃষ্টির পূর্বে); সর্বং অজম্ (অনাদি এবং অনন্ত ব্রহ্ম); তেন (এরূপ চিন্তার দ্বারা); অসৌ (যে ব্যক্তি এভাবে প্রার্থনা করেন); কৃপণঃ (নির্বোধ); স্মৃতঃ (মনে করা হয়)।
সরলার্থ: ধরা যাক, কোন এক ব্যক্তি তাঁর অধিকাংশ সময় প্রার্থনা করে কাটান। তিনি মনে করেন তিনি ও এই দৃশ্যমান জগৎ পূর্বে ব্রহ্মা ছিলেন। কোন কারণে সেই অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে তিনি বর্তমান অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন; পূর্ব অবস্থা ফিরে পেতে হলে তাঁকে ব্রহ্মের (সগুণ ব্রহ্মের) উপাসনা করতে হবে। এহেন ব্যক্তি শুধুমাত্র অজ্ঞানই নন, নির্বোধও বটে। ‘আমি স্বরূপত ব্রহ্ম’—এই উপলব্ধি যাঁর একবার হয়েছে তাঁর আর কখনো ভুল হয় না। নিজের স্বরূপ সম্বন্ধে তিনি সবসময় সচেতন থাকেন। তিনি জানেন একমাত্র তিনিই আছেন, তিনি ছাড়া এই জগতের কোনও অস্তিত্ব নেই।
ব্যাখ্যা: আগম প্রকরণে ‘ওম্’-এর তাৎপর্য আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে আত্মা এই দৃশ্যমান জগৎ থেকে আলাদা। আত্মা এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনি মঙ্গলময় (শিব)। যিনি আত্মাকে উপলব্ধি করেছেন তাঁর কাছে আর দুই বলে কিছু নেই, সব এক।
কিন্তু এ একটা কথামাত্র। এটাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বৈতথ্য প্রকরণে জগৎকে স্বপ্ন বা মরীচিকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ জগৎ যেন আকাশকুসুম কল্পনা। এর উৎপত্তি এবং বিনাশ আছে। এ জগৎ কার্য-কারণের অধীন এবং বৈচিত্রপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হল: অদ্বৈততত্ত্ব কি কেবলমাত্র শাস্ত্র -প্রমাণের উপর নির্ভরশীল? যুক্তির দ্বারা কি এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করা যায় না? বর্তমান প্রকরণে যুক্তির সাহায্যে অদ্বৈততত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী প্রকরণে দেখানো হয়েছে একমাত্র আত্মাই সত্য। উপাস্য-উপাসকের ধারণাটাই ভুল। দুই বলে কিছু নেই, সব এক। বর্তমান প্রকরণে উপাসকের বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। স্পষ্টতই উপাসক মনে করেন যে একসময় তিনি ব্রহ্ম ছিলেন এবং তাঁকে আবার ব্রহ্ম হতে হবে। আর দেবতাদের উপাসনা করে তিনি আবার ব্রহ্ম হতে পারেন। কিন্তু এই ধারণা ভুল। উপাসনার দ্বারা ব্রহ্ম হওয়া যায় একথা যিনি বিশ্বাস করেন, জ্ঞানীরা তাকে নির্বোধ ও অজ্ঞান বলে মনে করেন। কেনোপনিষদে আছে: ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নন—তাঁকে ‘এই’ ভাবে উপাসনা করা যায় না।