জ্ঞানেনাকাশকল্পেন ধর্মান্যো গগনোপমান্।
জ্ঞেয়াভিন্নেন সংবুদ্ধস্তং বন্দে দ্বিপদাং বরম্॥১
অন্বয়: যঃ (যিনি); আকাশকল্পেন (আকাশের মতো ব্যাপক); জ্ঞেয়াভিন্নেন (আত্মার সঙ্গে অভেদ); জ্ঞানেন ([আত্ম] জ্ঞানের দ্বারা); ধর্মান্ গগনোপমান (আকাশের যেমন কোন গুণ নেই তেমনি আত্মারও); সংবুদ্ধঃ (যিনি আত্মাকে জানেন); তং দ্বিপদাং বরম্ (সেই ব্যক্তি যিনি সর্বোত্তম [অর্থাৎ নারায়ণ]); বন্দে (আমি প্রণাম করি)।
সরলার্থ: যিনি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম, আকাশের মতো ব্যাপক এবং আত্মার সঙ্গে অভেদ তাঁকে প্রণাম করি। তিনি আত্মাকে জানেন। আবার এই আত্মজ্ঞানের দ্বারা একথাও জানেন যে আত্মার (জীবাত্মার) উপাধিসকল আকাশের উপর আরোপিত উপাধির মতোই মিথ্যা।
ব্যাখ্যা: পূর্ববর্তী তিনটি অধ্যায়ের সঙ্গে বর্তমান অধ্যায়ের যোগসূত্রটি কি? আগের তিনটি অধ্যায়েই অদ্বৈততত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়, আগম প্রকরণে তা করা হয়েছে ‘ওম্’-এর তাৎপর্য আলোচনার মাধ্যমে। দ্বিতীয় অধ্যায়, বৈতথ্য প্রকরণে বাহ্যজগতের অসারতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়েই অদ্বৈততত্ত্বের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়, অদ্বৈত প্রকরণ। এই অধ্যায়ে শাস্ত্র ও যুক্তির সাহায্যে অদ্বৈতবাদ প্রমাণিত হয়েছে এবং সবশেষে তাদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা—‘অদ্বৈতই পরম সত্য।’
বৌদ্ধরা শাস্ত্রের সিদ্ধান্তকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেন না। তাঁরা শূন্যবাদী। এই শূন্যবাদী বৌদ্ধরা এবং দ্বৈতবাদীরা অদ্বৈততত্ত্বকে বারবার আক্রমণ করেছেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এই যে দ্বৈতবাদীরা পরস্পর বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে অভ্যস্ত। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় তাঁদের মতবাদ কোন দৃঢ় সিদ্ধান্তের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়।
এই পটভূমিকায় চতুর্থ অধ্যায়, অলাতশান্তি প্রকরণের আলোচনা শুরু। এই প্রকরণে প্রথমে দ্বৈতবাদী, শূন্যবাদী ও অন্যান্য কয়েকটি মতবাদের প্রতি ব্যঙ্গ্যোক্তি করা হয়েছে। পরে যুক্তি ও পূর্বোক্ত প্রমাণের সাহায্যে নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে অদ্বৈতের কোন বিকল্প নেই। স্বাভাবিকভাবেই অদ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই অধ্যায়ের সূচনা। শুভ আরম্ভের সমাপ্তিও শুভই হয়।
কথিত আছে বদরিকাশ্রমে আচার্য গৌড়পাদ গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তখন স্বয়ং নারায়ণ কৃপাপরবশ হয়ে তাঁকে অদ্বৈতের বাণী দান করেন। এই অর্থে নারায়ণকেই অদ্বৈততত্ত্বের আদিগুরু বলা যায়। গৌড়পাদ এই জ্ঞান গোবিন্দপাদকে এবং গোবিন্দপাদ আচার্য শঙ্করকে দিয়ে যান। নারায়ণ নররূপে ভগবান স্বয়ং।
অলাত শব্দটির অর্থ ‘জ্বলন্ত মশাল’। ‘অলাত শান্তি’ মানে এই ‘জ্বলন্ত মশালটি নির্বাপিত করা’। কিন্তু জ্বলন্ত মশালটির তাৎপর্য কি? রূপক অর্থে এর দ্বারা জগৎকে বোঝানো হয়েছে। জগৎ যেন অগ্নিগর্ভ, এখানে কেউ সুখী নয়। এর কারণ কি? অজ্ঞানতা বা অবিদ্যা। এই অবিদ্যার প্রভাবেই আমরা বহু দেখি। আমরা মনে করি আমরা পরস্পরের থেকে আলাদা। সেহেতু সবসময় একে অপরের বিরোধিতা করি। এই প্রকরণ অদ্বৈতজ্ঞানের সাহায্যে এই দুঃখের আগুন নিভিয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়—ব্যষ্টি স্তরেও বটে, সমষ্টি স্তরেও বটে।
অদ্বৈতকে আকাশবৎ বলা হয়। একথা সত্য যে আত্মা আকাশের মতোই ব্যাপক, কিন্তু দুয়ের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে : বাইরের আকাশ জড় এবং তার পেছনে একটি কারণ বস্তু আছে। কিন্তু আত্মা স্বয়ংপ্রকাশ, শুদ্ধ চৈতন্য। আত্মা স্বতন্ত্র—কারণও নয়, কার্যও নয়।
আত্মা এক; কিন্তু নাম-রূপের জন্য বহু বলে প্রতিভাত। এইসব জীবাত্মাও আকাশের মতো। আকাশকে যেমন ভাগ করা যায় না, তেমনি আত্মাকেও কখনো খণ্ডিত করা যায় না। আগুন এবং তার উত্তাপ, সূর্য এবং তার কিরণ, আত্মা এবং জ্ঞান—এরা পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। সেইভাবে পরমাত্মা ও জীবাত্মা পৃথক নয়, এক ও অভেদ। এখানে জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয়—এই তিনকে এক দেখানো হয়েছে; ঠিক যেমন আকাশ বস্তুত এক ও অভিন্ন।
নরোত্তম প্রভু নারায়ণ এই জ্ঞান দান করেছেন। তাঁকে আমরা প্রণাম করি।