ত্রিষু ধামসু যস্তুল্যং সামান্যং বেত্তি নিশ্চিতঃ।
স পূজ্যঃ সর্বভূতানাং বন্দ্যশ্চৈব মহামুনিঃ॥২২
অম্বয়: যঃ (তিনি [বিবেকীপুরুষ যিনি]); নিশ্চিতঃ (স্থির মনে); ত্ৰিষু ধামসু (তিন অবস্থায় [বিশ্ব, তৈজস এবং প্রাজ্ঞ]); সামান্যং তুল্যং বেত্তি (জানেন যে, এক এবং অভিন্ন আত্মাই আছেন); সঃ (তিনি [এইভাবে আত্মদর্শনে যিনি সক্ষম]); মহামুনিঃ (এক মহাঋষি); সর্বভূতানাং পূজ্যঃ (সর্বজন শ্রদ্ধেয়); বন্দ্যঃ (সর্বজনপূজ্য); চ এব (অবশ্যই)।
সরলার্থ: অচঞ্চল বিবেকী ব্যক্তি এক ও অভিন্ন আত্মাকে তিনটি বিভিন্ন অবস্থায় দেখেন। এইরূপ ব্যক্তি প্রকৃতই মহর্ষি। তিনি সর্বজন-শ্রদ্ধেয় এবং সকলের ভালোবাসার পাত্র।
ব্যাখ্যা: ত্রিষু ধামসু—তিনটি অবস্থায়। এই তিন অবস্থা হল স্থূল, সূক্ষ্ম এবং কারণ। ব্যষ্টির ক্ষেত্রে এই তিন অবস্থা হল জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি। আর সমষ্টির ক্ষেত্রে এই তিন অবস্থা হল—বিরাট (সমষ্টি স্থূল দেহ), হিরণ্যগর্ভ (সমষ্টি মন), এবং ঈশ্বর (সমষ্টি কারণ শরীর)। সামান্যং-এর অর্থ হল সাধারণ বা অভিন্ন। আমরা দেখি যে, এই তিন অবস্থার মধ্যে একই ব্রহ্ম অর্থাৎ একই সত্তা রয়েছেন।
বেত্তি নিশ্চিতঃ—তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন। নিশ্চিত কথাটির অর্থ কোন বস্তু নিয়ে কোনও সংশয় না থাকা। কোন বিষয়ে মনে আর কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। ‘ওঃ, ইনিই ব্রহ্ম—এ বিষয়ে আমি আর এখন বিভ্রান্ত নই।’ স্থূল বা সূক্ষ্ম যেরূপেই হোক না কেন, সকলই ব্রহ্ম। রূপের বা আকারের পার্থক্যে কিছু যায় আসে না। আমরা তখন শুধুমাত্র ব্রহ্মকেই দেখি। তখন ভালো-মন্দ, বড়-ছোট, সবই ব্রহ্ম। এ শুধু বুদ্ধি দিয়ে বোঝা নয়। আমরা বুদ্ধি দিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি। কিন্তু ঐ জাতীয় জ্ঞান আমাদের জীবনকে পালটাতে পারে না। কিন্তু আত্মজ্ঞান আসে ইন্দ্রিয়াতীত অভিজ্ঞতা থেকে এবং এই জ্ঞানকে হৃদয়ের গভীরে অনুভব করা যায়। তখন আমরা ব্রহ্মের সাথে একাত্মতা অনুভব করি। মুণ্ডক উপনিষদ বলছেন : ‘ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি’। অর্থাৎ যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান। তখন তিনি মহাঋষিতে পরিণত হন। এ এক অনির্বচনীয় অবস্থা। যেহেতু জাগতিক সবকিছুকে তিনি ত্যাগ করেছেন, সেহেতু এ জগতের পেছনে যে সত্য আছে তা উপলব্ধি করতে তিনি তখন সক্ষম। তাঁর কাছে এ জগৎ ব্রহ্ম বৈ আর কিছু নয়। সুতরাং তিনি এ জগতের সর্বত্র ব্রহ্মকেই দেখেন।
যিনি এই জ্ঞানের অধিকারী তিনি সর্বজন-শ্রদ্ধেয় ও সর্বজনপূজ্য। কেন? কারণ, মানুষের কাম্য যে সর্বোচ্চ অবস্থা, তা তিনি লাভ করেছেন। দ্বৈতবোধই আমাদের সকল দুঃখ-কষ্টের মূল। যখন আমরা ভালো-মন্দ সবকিছুর মধ্যে সেই এক ব্রহ্মকেই দেখতে পারব তখনি আমরা সকল দুঃখ-কষ্টের হাত থেকে রেহাই পাব।