জীবাত্মনোঃ পৃথক্ত্বং যৎপ্রাগুৎপত্তেঃ প্রকীর্তিতম্।
ভবিষ্যদ্বৃত্ত্যা গৌণং তন্মুখ্যত্বং হি ন যুজ্যতে॥১৪
অন্বয়: উৎপত্তেঃ প্রাক্ ([উপনিষদ থেকে] আত্মজ্ঞান লাভের পূর্বে); জীবাত্মনোঃ পৃথক্ত্বম্ (জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে পার্থক্য); যৎ (যা); প্রকীর্তিতম্ ([বেদের কর্মকাণ্ডে] বলা হয়েছে); তৎ (সেই পার্থক্য); ভবিষ্যদ্বৃত্ত্যা (ভবিষ্যতে যে অবস্থা হবে সেই অনুসারে); গৌণম্ (সেহেতু মুখ্য নয়); হি (কারণ); মুখ্যত্বম্ (যা কিছু সত্য); ন যুজ্যতে ([তা] এখানে প্রযোজ্য নয়)।
সরলার্থ: উপনিষদ থেকে আত্মজ্ঞান লাভের আগে—বেদের কর্মকাণ্ডে জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ দ্বৈত মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই দ্বৈত ক্ষণিক অর্থাৎ যতক্ষণ অজ্ঞানতা আছে। এক ও অদ্বৈতেই এর পরিণতি। এই ভবিষ্যৎকালীন একত্বকে বোঝাবার জন্যেই ক্ষণিক পার্থক্য দেখানো হয়েছে। বস্তুত এই পার্থক্য যথার্থ নয়, কাল্পনিক।
ব্যাখ্যা: বেদে অনেক জায়গায় ‘বহু’র উল্লেখ আছে। বেদের এই বিশেষ অংশটিকে বলে কর্মকাণ্ড। কর্মকাণ্ডে ফল কামনা করে যাগযজ্ঞ করার কথা বলা আছে। যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই ব্যক্তি এইটিই কামনা করেছে।’ আবার এমনও আছে ‘ঈশ্বর পৃথিবী ও স্বর্গ উভয়কেই ধারণ করে আছেন।’ অর্থাৎ স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি পৃথক। এই দ্বৈতবোধই কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য।
বেদের অপর অংশ জ্ঞানকাণ্ড—যার আলোচ্য বিষয় আত্মজ্ঞান। কর্মকাণ্ডের চেয়ে জ্ঞানকাণ্ড যে বেশি যুক্তিনির্ভর, একথা সর্বজনস্বীকৃত। কেন?
উত্তর হল, কর্মকাণ্ডে যে দ্বৈতবাদের কথা বলা হয় তা আদপে দ্বৈতবাদ নয়। পটাকাশ ও ঘটাকাশের দৃষ্টান্তে যেমন আকাশকে দুই বলে মনে হয়, কর্মকাণ্ডে দুই জ্ঞানও ঠিক সেইরকম। আসলে একই আকাশ। ঘট আরোপ করাতেই দুই বলে মনে হয়।
একইভাবে কর্মকাণ্ডে যে বাক্যগুলিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে পৃথক বলে দেখানো হয়েছে, সেগুলি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এই (ভেদবোধক) বাক্যগুলির দ্বারা সবসময় (জীবাত্মা ও পরমাত্মার) একত্বকেই বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে যা ঘটবে তাই বোঝানো হয়েছে। যেমন আমরা বলি, ‘আমি ভাত রান্না করছি।’ আসলে আমি ভাত রান্না করছি না, চাল সিদ্ধ করছি। চাল সিদ্ধ হয়ে তবেই ভাত হবে। সুতরাং ভাত এখনও ভবিষ্যতের ঘটনা—একথা বলা যায়। আবার এমনও নয় যে আমি নতুন কিছু তৈরি করছি। ভাত চালেরই রূপান্তর মাত্র। সেইভাবে জীবাত্মা সবসময়ই পরমাত্মা—দেহরূপ উপাধির জন্য এই জীবাত্মাকে পরমাত্মার থেকে পৃথক বলে মনে হয়। এই উপাধি অবিদ্যাপ্রসূত। চাল আর ভাতে যেমন মৌলিক কোন পার্থক্য নেই, তেমনি জীবাত্মা আর পরমাত্মাতেও কোন ভেদ নেই।
জ্ঞানকাণ্ডে এজাতীয় উল্লেখ পাওয়া যায়—‘তুমিই সেই’ (ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬।৮।৭) এবং ‘যিনি বলেন “আমি এক আর সে আর এক” তিনি কিছুই জানেন না’ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১।৪।১০)। এইসব বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদী উক্তির পাশে দ্বৈতবাদী মন্তব্যগুলি অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। যদি এগুলির কোন সার্থকতা থাকেও তা হল অদ্বৈততত্ত্ব ধারণা করার জন্য মনকে প্রস্তুত করা।