প্রণবো হ্যপরং ব্রহ্ম প্রণবশ্চ পরঃ স্মৃতঃ।
অপূর্বোঽন্তরোঽবাহ্যোঽনপরঃ প্রণবোঽব্যয়ঃ॥২৬
অন্বয়: প্রণবঃ হি অপরং ব্রহ্ম (প্রণবই [ওম্] ব্রহ্ম, এমনকি তা যদি কার্যও হয় তবুও); প্রণবঃ পরঃ (প্রণবই ব্রহ্ম, যদি নির্গুণও হয় তবুও); চ স্মৃতঃ (এইরূপ বলা হয়); প্রণবঃ অপূর্বঃ (প্রণবের আগে এমন কিছু নেই যাকে প্রণবের কারণ হিসেবে চেনা যায়); অনন্তরঃ (কিছুই এঁর থেকে আলাদা নয়); অবাহ্যঃ (এঁর [প্রণবের] বাইরে কিছু নেই); অনপরঃ (ইনি একাকী); অব্যয়ঃ (এঁর ক্ষয় নেই)।
সরলার্থ: প্রণবই (ওম্) একই সাথে পরব্রহ্ম এবং অপরব্রহ্ম। প্রণবের কোন কারণও নেই, কার্যও নেই। প্রণবের বাইরে আর কিছুই নেই। সবই প্রণবের অন্তর্গত। প্রণবের কোন ক্ষয় নেই। (প্রণব সবসময়ই এক।)
ব্যাখ্যা: এই প্রণবই পরব্রহ্ম আবার ইনিই অপরব্রহ্ম। পরব্রহ্ম হলেন পরমব্রহ্ম। পরব্রহ্ম নির্গুণ এবং শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ। অপরব্রহ্ম হলেন জগৎরূপে প্রকাশিত ব্রহ্ম। ব্রহ্ম কখনো কখনো এই জগৎরূপে ব্যক্ত আবার কখনো কখনো অব্যক্ত বা অপ্রকাশিত। অব্যক্ত অবস্থায় জগৎ ব্রহ্মে লীন হয়ে যায়। কিন্তু জগৎ প্রকাশিত হোক বা না হোক, এর দ্বারা ব্রহ্ম প্রভাবিত হন না। ব্রহ্ম সবসময়ই ব্রহ্ম। তিনি নিত্য। পরব্রহ্ম এবং অপরব্রহ্ম হচ্ছে সেই এক ও অভিন্ন ব্রহ্ম। ব্রহ্ম কখনো কারণ আবার কখনো বা কার্য, কিন্তু সবসময় সেই একই ব্রহ্ম। ‘পূর্ণস্য পূর্ণম্ আদায় পূর্ণম্ এব অবশিষ্যতে’—যদি ‘এই পূর্ণকে’ (অর্থাৎ নাম-রূপসহ ব্রহ্মকে বা কার্যব্রহ্মকে) ‘ঐ পূর্ণ’ থেকে (অর্থাৎ অদৃশ্য ব্রহ্ম বা কারণব্রহ্ম থেকে আলাদা করা হয়, তবু ‘সেটি’ আগের মতোই পূর্ণ থাকে। ব্রহ্ম সর্বত্র এবং সর্ববস্তুতে রয়েছেন। ব্রহ্ম সকলের মধ্যে রয়েছেন অর্থাৎ তিনি সর্বগত।
ব্রহ্মকে বলা হয় ‘অপূর্ব’—অর্থাৎ এঁর আগে আর কিছু নেই। ব্রহ্মের কোনও কারণ নেই। যেমন, এই টেবিলটা হচ্ছে কার্য। কারণ কেউ এই টেবিলটাকে তৈরি করেছে। কিন্তু ব্রহ্ম স্বয়ম্ভূ। অর্থাৎ কেউ ব্রহ্মকে সৃষ্টি করেননি।
‘অনন্তর’—এখানে কোনও দুই নেই। ব্রহ্মের থেকে পৃথক বা স্বতন্ত্র আর কিছু নেই। ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। এমন কথা আমরা বলতে পারি না যে, এই স্থানে এক ব্রহ্ম রয়েছেন আর অন্য স্থানে অপর এক ব্রহ্ম রয়েছেন। সবসময়ই সেই একই ব্রহ্ম রয়েছেন। সেইভাবেই, ব্রহ্মকে ‘অবাহ্য’ বলা হয়। ‘অবাহ্য’ অর্থাৎ এঁর বাইরে আর কিছু নেই। আবার ইনি ‘অনপর’ অর্থাৎ ব্রহ্ম কার্য নন। আবার ব্রহ্ম নিজে যেমন কারণরহিত তেমনি ইনি অন্য কোন কিছুরও কারণ নন। একমাত্র ব্রহ্মই রয়েছেন। ইনি অব্যয়, অপরিবর্তনীয়। এঁর কোনও ক্ষয় বা বিনাশ নেই। ব্রহ্মই চিরন্তন সত্য।
আচার্য শঙ্কর তাঁর ভাষ্যে বলেছেন যে, একই ব্রহ্ম অন্তরেও আছেন এবং বাইরেও আছেন। তিনি ব্রহ্মকে একটি লবণখণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন। লবণখণ্ডটি বাইরে এবং ভেতরে অর্থাৎ সর্বত্রই একইরকম নোনা স্বাদ-যুক্ত। অর্থাৎ পুরো লবণখণ্ডটিই লবণাক্ত। ঠিক একইভাবে, আমাদের বাইরে এবং ভেতরে একই ব্রহ্ম রয়েছেন। অর্থাৎ ব্রহ্মই একমাত্র রয়েছেন।