এষ সর্বেশ্বর এষ সর্বজ্ঞ এষোঽন্তৰ্যাম্যেষ যোনিঃ
সর্বস্য প্রভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাম্॥৬
অন্বয়: এষঃ (এই [প্রজ্ঞা]); সর্বেশ্বরঃ (সকলের অধিপতি); এষঃ সর্বজ্ঞঃ (তিনি সর্বজ্ঞও); এষঃ (এই [প্রজ্ঞা]); অন্তর্যামী (সকলের অন্তরস্থ আত্মা); হি (সুতরাং); [এষঃ (এই) প্রজ্ঞা]; ভূতানাম্ ([বর্ধনশীল ও বিনাশী] সকল জীবের); প্রভব-অপ্যয়ৌ (জন্ম এবং মৃত্যু); এষঃ (এই [প্রিজ্ঞা]); সর্বস্য যোনিঃ (সবকিছুর কারণ)।
সরলার্থ: এই প্রজ্ঞা সকল বস্তুর অধীশ্বর। ইনি সর্বজ্ঞ, ইনিই অন্তর্যামী। সকল বস্তু এঁর থেকে উৎপন্ন হয়ে এঁতেই লীন হয়। ইনিই সবকিছুর কারণ।
ব্যাখ্যা: এই প্রজ্ঞা অর্থাৎ আত্মাকে সর্বেশ্বর বলা হয়, যিনি সকলের অধীশ্বর এবং নিয়ন্তা। জাগ্রত, স্বপ্ন বা সুষুপ্তি সব অবস্থাতে ‘আমিই’ সবকিছুর অধীশ্বর। আত্মা সকল জ্ঞানের উৎস তাই তিনি সর্বজ্ঞ। তিনিই সকল বস্তুর অন্তর্নিহিত আত্মা বা অন্তর্যামী, সবকিছুর সারস্বরূপ। এই আত্মা আমার তোমার সকলের হৃদয়ে বিরাজিত। ইনি সর্বত্র বিরাজিত এবং সকল বস্তুতে বিদ্যমান। এই আত্মাই ‘সর্বস্য যোনিঃ’ অর্থাৎ সবকিছুর কারণ ও উৎস। পাশ্চাত্য দার্শনিকরা এই আত্মা অর্থাৎ ব্রহ্মকে ‘মহান প্রথম কারণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। ব্রহ্ম ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
‘প্ৰভব-অপ্যয়ৌ’—এই আত্মাই সকল বস্তুর উৎপত্তি (প্রভব) এবং বিনাশের (অপ্যয়) জন্য দায়ী। জন্ম ও মৃত্যুর জন্যও ইনিই দায়ী। মৃত্যুর পর আমরা যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানেই ফিরে যাই অর্থাৎ আত্মাতেই প্রত্যাবর্তন করি। এ অনেকটা জলবুদ্বুদের মতো। একটি বুদ্বুদ, সেটিকে যদি আমরা আঘাত করি তাহলে বুদ্বুদটি কোথায় যায়? বুদ্বুদটি জলেই মিশে যায়। একইভাবে সকল প্রাণী (ভূতানাম্), সকল বস্তু একই উৎস থেকে আসে, আবার সেই উৎসেই ফিরে যায়।
উপনিষদ বলছেন যে, পরম সত্য এক। নাম-রূপের পার্থক্যের দরুন সেই এককেই আমরা বহু দেখি, কিন্তু এই বৈচিত্র ক্ষণস্থায়ী। প্রশ্ন হল, কেমন করে বুঝব যে আমিই সেই পরম সত্য? বেদান্ত বলেন, তুমি কি তোমার নিজের অস্তিত্বে বিশ্বাসী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা প্রত্যেকেই বলব, হ্যাঁ। বেদান্ত বলছেন, যদি তোমার নিজের অস্তিত্ব থাকে এবং পরম সত্য বলতে সেই এক ও অভিন্ন সত্তাকেই বোঝায় তাহলে সেই পরম সত্য থেকে তুমি কখনো নিজেকে তালাদা করতে পার না। তুমি তোমার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি সেই পরম অস্তিত্বের সাথে একাকার হয়ে যাও, তোমার এই অস্তিত্বের বোধ আসে কোথা থেকে? এই মুহূর্তে অবশ্য পরম অস্তিত্ব আছে এবং ‘আমি’ নামক সত্তাটিও আছে। কিন্তু এই পরম সত্য থেকে আমি নিজেকে পৃথক বলে মনে করি। বেদান্তমতে এ থেকেই অজ্ঞানতার শুরু। পরম সত্তা কখনো দুটি হতে পারে না। আমাদের সকলের মধ্যেই সেই একই সত্তা বিরাজমান। আমাদের যাবতীয় দুঃখের কারণ এই ভেদদৃষ্টি। জীবাত্মা ও পরমাত্মা যে এক, একথাই উপনিষদ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন।