যত্র সুপ্তো ন কঞ্চন কামং কাময়তে ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি
তৎ সুষুপ্তম্। সুষুপ্তস্থান একীভূতঃ প্রজ্ঞানঘন এবানন্দময়ো
হ্যানন্দভুক্ চেতোমুখঃ প্রাজ্ঞতৃতীয়ঃ পাদঃ॥৫
অন্বয়: যত্র সুপ্তঃ (যখন তুমি স্বপ্নহীন গভীর নিদ্রায় মগ্ন); ন কঞ্চন কামং কাময়তে (তোমার মনে কোন কামনা-বাসনা থাকে না); ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি (তখন তুমি স্বপ্নও দেখ না, এই অবস্থায় মনের ক্রিয়াও থাকে না); তৎ সুষুপ্তম্ (একেই বলা হয় সুষুপ্তি); সুষুপ্তস্থানঃ (যখন তুমি সুষুপ্তিতে থাক); একীভূতঃ (একাত্ম বোধ, অর্থাৎ মন আত্মার সাথে মিলিত; প্রজ্ঞানঘনঃ এব (এক ঘনীভূত চৈতন্য ছাড়া আর কিছুই থাকে না); আনন্দময়ঃ (আনন্দে পূর্ণ); হি আনন্দভুক্ (আনন্দ উপভোগ কর); চেতোমুখঃ (তুমি তুরীয়ের [জ্ঞানের] নিকটবর্তী); প্রাজ্ঞঃ তৃতীয়ঃ পাদঃ (এই প্রাজ্ঞ, আত্মার তৃতীয় অবস্থা)।
সরলার্থ: যখন তুমি গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাক তখন তোমার মনে কোন কামনা-বাসনা থাকে না এবং তখন তুমি স্বপ্নও দেখ না; মন নিষ্ক্রিয় থাকে। একেই বলে সুষুপ্তি। জাগ্রত অবস্থায় বা স্বপ্নাবস্থায় তুমি বস্তু সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় কোন বিষয় বা কোন দ্বৈত দৃষ্টি থাকে না। তখন শুধুই এক দেখা যায়। কিন্তু এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না। এ যেন সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া, যেখান থেকে আবার স্বপ্ন বা জাগ্রত অবস্থায় তোমাকে ফিরে আসতেই হবে। এটাই প্রাজ্ঞ—আত্মার তৃতীয় অবস্থা।
ব্যাখ্যা: পরবর্তী অবস্থা সুষুপ্তি অর্থাৎ গভীর নিদ্রার অবস্থা। মনও তখন কোন কাজ করে না, সম্পূর্ণভাবে স্থির থাকে। তখন মনে কোন কামনা-বাসনা, কোন স্বপ্ন বা কোন চিন্তা থাকে না। সুষুপ্তি অবস্থায় কি হয়? ‘একীভূতঃ প্রজ্ঞানঘন’—তখন থাকে শুধুমাত্র চৈতন্য, যা অখণ্ড, নির্বিশেষ। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমাদের মধ্যে যে চৈতন্য থাকে তাকে আলাদা করা যায়। স্বপ্নে আমরা মানুষ, জীব, ইত্যাদি বহু জিনিস দেখি। কিন্তু এসবের অস্তিত্ব আমাদের মনে। জাগ্রত অবস্থায় আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে স্থূলজগৎকে অনুভব করি। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় থাকে শুধুই নিরবচ্ছিন্ন চৈতন্য। আমাদের মধ্যে এই চৈতন্য সবসময় বিরাজিত। কখনো এই চৈতন্য নিজেকে প্রকাশ করে জাগ্রত অবস্থায়, কখনো স্বপ্নে, কখনো বা সুষুপ্তিতে। এই চৈতন্য একটি দীপের মতো, যা সবসময় জ্বলছে, তা কারও কাজে লাগুক বা না লাগুক। চৈতন্য সদা বিরাজমান এবং অপরিবর্তিত।
সুষুপ্তি অবস্থাটি ঠিক কেমন তা বোঝাবার জন্য আচার্য শঙ্কর সুষুপ্তিকে অন্ধকার রাত্রির সাথে তুলনা করেছেন। সেখানে চাঁদের আলো নেই, সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আর এই অন্ধকারে এক বস্তু থেকে আর এক বস্তুকে পৃথক করাও সম্ভব নয়। শুধু বোঝা যায় সেখানে কিছু একটা রয়েছে। কিন্তু এই সুষুপ্তি ভাঙার পর আমরা খুব সতেজ বোধ করি।
এখন এই সুষুপ্তি অবস্থায় আমরা স্বপ্ন দেখি না এবং আমাদের মন এবং বহিরিন্দ্রিয় তখন কোন কাজ করে না। তবে চৈতন্য যে তখনও থাকে তা আমরা জানতে পারি কিভাবে? কারণ নিদ্রাভঙ্গে আমরা বলে থাকি ‘আঃ কী গভীর ঘুমিয়েছি?’ অর্থাৎ এই অবস্থায় আমার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমি সচেতন। সুষুপ্তিতে এই চৈতন্য কোথায় ছিল? এই চৈতন্য আমারই মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে ছিল। বাইরে তার স্পষ্ট অস্তিত্ব ছিল না। মূল কথাটি হল, এই সাম্য অবস্থা থেকে স্থূলজগতে ফিরে আসতে হলে সাম্য অবস্থায় বিক্ষেপ সৃষ্টি করতে হবে। কে এই কার্যটি করে? এই কাজের কর্তা হল মায়া বা অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞানতা। এই সুষুপ্তি অবস্থায় আমাদের জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থা চৈতন্যে লীন হয়ে থাকে। তখন আমরা চৈতন্যের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কেন আবার আমরা এই জাগ্রত অবস্থায় ফিরে আসি? কে আমাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে? তা হল অবিদ্যা, অর্থাৎ অজ্ঞানতা।
সুষুপ্তিকে বলা হয় ‘চেতোমুখঃ’, যা আত্মা এবং জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থার মধ্যবর্তী দ্বার। আচার্য শঙ্কর বলেছেন যে, এই ‘চেতোমুখঃ’ যেন দণ্ডায়মান প্রহরী। আমাদের সকলের মধ্যে চৈতন্য রয়েছে। যখন এই মধ্যবর্তী দ্বার খুলে যায় তখন এই চৈতন্য জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে—যেন জাগরণ ও স্বপ্নাবস্থার মধ্য দিয়ে এই চৈতন্য বয়ে চলেছে। সুষুপ্তিতে কোনও দ্বৈতভাব নেই, আছে কেবলমাত্র ‘এক’ অনুভূতি।
উপনিষদ বলছেন সুষুপ্তি অবস্থায় আমরা ‘আনন্দভুক্’ অর্থাৎ আনন্দ ভোগ করি। এই অবস্থায় আমরা পরম শান্তি ও আনন্দ লাভ করে থাকি। কেন? কারণ মন তখন নিষ্ক্রিয়। এই অবস্থায় মন নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে রাখে এবং পূর্ণ বিশ্রামে থাকে। কখনো কখনো ঘুমন্ত অবস্থাতেও আমাদের মন বিক্ষিপ্ত ও চঞ্চল হয়ে ওঠে। যদিও আমরা মনে করি যে আমরা ঘুমিয়ে আছি কিন্তু জেগে উঠে আমরা বিশ্রামের স্নিগ্ধতা অনুভব করি না। নিদ্রাকালে মন ইতস্ততভাবে ঘুরে বেড়ায়—সংকল্প-বিকল্প। মনের স্বভাবই হচ্ছে এই। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় আমরা আনন্দে পরিপূর্ণ থাকি কারণ সেখানে মনের কোনও প্রভাব থাকে না (অনায়াস-রূপ)।
এখানে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আচার্য শঙ্কর আরও দু-একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, সুষুপ্তিকালে আমরা যে আনন্দ ও শান্তি লাভ করি তা আত্যন্তিক আনন্দ নয়। অর্থাৎ তা চিরস্থায়ী আনন্দ নয়। এই আপেক্ষিক আনন্দের অস্তিত্ব সাময়িক। এই অবস্থাতেও মানুষ অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত নয়। ঘুম ভাঙার পর আবার আমরা এই দৃশ্যমান জগতের নানা সংগ্রামের মুখোমুখি হই। তাই আমরা কখনো সুখী আবার কখনো দুঃখী। কিন্তু আত্যন্তিক আনন্দ চিরস্থায়ী যা সদা অপ্রতিহত। যিনি ব্রহ্মজ্ঞানী তিনিই কেবলমাত্র এই আত্যন্তিক আনন্দ লাভ করে থাকেন।