তমেকনেমিং ত্রিবৃতং ষোড়শান্তং শতার্ধারং বিংশতিপ্রত্যরাভিঃ ।
অষ্টকৈঃ ষড়্ভির্বিশ্বরূপৈকপাশং ত্রিমার্গভেদং দ্বিনিমিত্তৈকমোহম্ ॥ ৪ ॥
ব্যাখ্যা—এই মন্ত্রে চক্ররূপে বিশ্বের বর্ণনা করা হয়েছে । এর ভাবার্থ এই যে—পরমদেব পরমেশ্বরের স্বরূপভূতা অচিন্ত্যশক্তির দ্রষ্টা ওই ঋষিগণ বলছেন—আমরা এমন এক চক্রকে দেখলাম যাতে একটি নেমি বিদ্যমান । গোলাকার ঘেরাকে নেমি বলা হয় । নেমি চক্রের অর এবং নাভি ইত্যাদি সমস্ত অবয়বসমূহকে বেষ্টন করে থাকে তথা যথাস্থানেই অবস্থান করে । এখানে অব্যাকৃত প্রকৃতিকেই ‘নেমি’ বলা হয়েছে । কারণ সে-ই এই ব্যক্ত জগতের মূল অথবা আধার । যেরূপ চক্রের রক্ষার জন্য ওই নেমির উপর লৌহনির্মিত বলয় চাপানো থাকে, সেইরূপ এই সংসারচক্রের অব্যাকৃত প্রকৃতিরূপ নেমির উপর সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ—এই ত্রিবিধ গুণই হল তিন বলয় । পূর্বেই বলা হয়েছে যে, পরমাত্মার এই অচিন্ত্যশক্তি তিন গুণে আবৃতা । যেরূপ চক্রনেমি পৃথক পৃথক শিরের সাথে যুক্ত হয়ে প্রস্তুত হয়—সেইরূপ সংসাররূপ চক্রের প্রকৃতিরূপ নেমির মন, বুদ্ধি এবং অহংকার তথা আকাশ, বায়ু, তেজ, জল এবং পৃথ্বী—এই অষ্ট সূক্ষ্মতত্ত্ব এবং এগুলিরই অষ্ট স্থূলরূপ—এইভাবে হল নেমির ষোলো শির । যেরূপ চক্রে অর যুক্ত থাকে, যা একদিকে নেমির খণ্ডগুলিতে যুক্ত এবং অন্যদিকে চক্রের নাভিতে যুক্ত থাকে, সেইরূপ এই সংসাররূপ চক্রেঅন্তঃকরণের বৃত্তিগুলির পঞ্চাশ ভেদ পঞ্চাশ অরের স্থানে এবং পঞ্চ মহাভূতের কার্য—দশ ইন্দ্রিয় পঞ্চ বিষয় এবং পঞ্চ প্রাণ—এই বিংশতি সহায়ক অরের স্থানে রয়েছে । এই চক্রে আট আটটি বস্তুর(১) ছয় সমূহ অঙ্গরূপে বিদ্যমান । এগুলিকে ‘ছয় অষ্টক’ নামে বলা হয়েছে । জীবসমূহকে এই চক্রে বেঁধে রাখার জন্য বহু রূপে আসক্তিরূপ একটি বন্ধন বিদ্যমান । দেবযান, পিতৃযান এবং এই লোকেই এক যোনি থেকে অন্য যোনিতে যাওয়ার পথ—এইভাবে এই ত্রিবিধ মার্গ বিদ্যমান । পুণ্যকর্ম এবং পাপকর্ম—এই দুটি জীবনিচয়কে এই চক্রের সাথে সাথে ঘোরায়, ফলে উভয়েই নিমিত্ত । যাতে অর ঝুলানো থাকে সেই নাভির স্থানে অজ্ঞান বিদ্যমান । যেরূপ নাভিই চক্রের কেন্দ্র, সেইরূপ অজ্ঞান হল জগতের কেন্দ্র ॥ ৪ ॥
(১) এখানে ‘অষ্টক’ শব্দের কী অভিপ্রায় সেটি প্রকৃতরূপে জানা যায় না । চক্রে ‘অষ্টক’ নামে কোনো অঙ্গ হয় কি না এবং যদি হয় তাহলে তার স্বরূপ কী তথা তাকে অষ্টক বলা হয় কেন এসবের কিছুই বোঝা যায় না । শঙ্করভাষ্যেও ‘অষ্টক’ কাকে বলা হয় পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি । অতএব ছয় অষ্টকের ব্যাখ্যা করা যায় না । শঙ্কর ভাষ্যানুসারে ছয় অষ্টকের এইরূপ বর্ণনা রয়েছে—
(ক) গীতা (৭ ।৪) তে উল্লিখিত আটপ্রকার প্রকৃতি অর্থাৎ পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি এবং অহংকার
(খ) শরীরগত অষ্টধাতু অর্থাৎ—ত্বক, চর্ম, মাংস, রক্ত, মেদ, অস্থি, মজ্জা এবং বীর্য ।
(গ) অণিমা, মহিমা, গরিমা, লঘিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিত্ব, বশিত্ব—এই অষ্ট ঐশ্বর্য ।
(ঘ) ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য, অধর্ম, অজ্ঞান, অবৈরাগ্য (আসক্তি) এবং অনৈশ্বর্য—এই অষ্ট ভাব ।
(ঙ) ব্রহ্মা, প্রজাপতি, দেব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, পিতৃগণ, পিশাচ—এই অষ্ট দেবযোনি ।
(চ) সমস্ত প্রাণীর প্রতি দয়া, ক্ষমা, অনসূয়া (নিন্দা না করা), শৌচ (বাহ্যাভ্যন্তরের পবিত্রতা), অনায়াস, মঙ্গল, অকৃপণতা (উদারতা) এবং অস্পৃহা—এগুলি হল আত্মার আটটি গুণ ।