ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থা অর্থেভ্যশ্চ পরং মনঃ ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্বুদ্ধেরাত্মা মহান্ পরঃ ॥ ১০ ॥
ব্যাখ্যা—এই মন্ত্রে ‘পর’ শব্দের প্রয়োগ বলবান অর্থে করা হয়েছে । এ কথা বুঝে নিতে হবে, কেননা কার্যকারণ-রূপে বা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ইন্দ্রিয়সকল অপেক্ষা শব্দাদি বিষয়কে শ্রেষ্ঠ বলা যুক্তিযুক্ত নয় । এইরূপে ‘মহান্’ বিশেষণের সঙ্গে ‘আত্মা’ শব্দও ‘জীবাত্মার’ বাচক, ‘মহত্তত্ত্বের’ নয় । ‘জীবাত্মা’—এই সকলের প্রভু, অতএব তার ক্ষেত্রে ‘মহান্’ বিশেষণ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত । যদি ‘মহত্তত্ত্বের’ অর্থে এর প্রয়োগ হত তাহলে ‘আত্মা’ শব্দের প্রয়োগের কোনো আবশ্যকতাই থাকত না । দ্বিতীয়ত, এ কথা সত্য যে বুদ্ধিতত্ত্বই মহত্তত্ত্ব । তত্ত্ব-বিচারকালে এর মধ্যে কোনো ভেদ মানা হয় না । এছাড়া পরে যেখানে ‘নিরোধ’-এর (এক তত্ত্বের অন্য তত্ত্বে একাকার) প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে, সেখানেও ‘মহান আত্মা’তে বুদ্ধির নিরোধ করার কথা বলা হয়েছে । এই সব কারণে তথা ব্রহ্মসূত্রকারের সাংখ্য মতানুসারে মহত্তত্ত্ব এবং অব্যক্ত প্রকৃতিরূপ অর্থ স্বীকৃত না হওয়া সত্ত্বেও এই কথা মানতে হবে যে এখানে ‘মহান্’ বিশেষণের সঙ্গে ‘আত্মা’ পদের অর্থ ‘জীবাত্মা’-ই(১)হতে পারে । অতএব মন্ত্রের সারার্থ এই যে ইন্দ্রিয় অপেক্ষা বিষয় বলবান । এগুলি সাধকের ইন্দ্রিয়সকলকে বলপূর্বক নিজের দিকে আকর্ষণ করে রাখে, সুতরাং সাধকের উচিত ইন্দ্রিয়সকলকে বিষয় থেকে বলপূর্বক দূরে সরিয়ে রাখা । বিষয়ের থেকে বলবান মন । যদি মনের বিষয়ের প্রতি আসক্তি না থাকে তাহলে ইন্দ্রিয় এবং বিষয়—এই দুইই সাধকের কোনো ক্ষতিই করতে পারে না । আবার মনের থেকেও বুদ্ধি বলবান, অতএব বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে মনকে আসক্তি-দ্বেষশূন্য করে নিজের বশে আনা চাই । বুদ্ধি থেকেও বলবান হলেন সকলের প্রভু মহান আত্মা । তাঁর আদেশ মানতে এরা সবাই বাধ্য । অতএব মানুষকে আত্মশক্তি অনুভব করে তার দ্বারা বুদ্ধি আদি সমস্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে॥ ১০ ॥
মহতঃ পরমব্যক্তমব্যক্তাৎ পুরুষঃ পরঃ ।
পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ ॥ ১১ ॥
ব্যাখ্যা—এই মন্ত্রে ‘অব্যক্ত’ শব্দ ভগবানের ত্রিগুণময়ী দৈবী ‘মায়া’ শক্তি সম্বন্ধে প্রযুক্ত হয়েছে, যাকে গীতায় দুরত্যয় (অতি দুস্তর) বলা হয়েছে (গীতা ৭ ।১৪), যাতে মুগ্ধ হয়ে জীব ভগবানকে ভুলে থাকে (গীতা ৭ ।১৩) । ইনিই জীবাত্মা এবং পরমাত্মার মাঝখানে আবরণস্বরূপ ; যার ফলে জীব সর্বব্যাপী অন্তর্যামী পরমেশ্বর নিত্য কাছে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অনুভব করতে পারে না । এই প্রকরণে এঁকে জীবের থেকেও বলবান বলার উদ্দেশ্য এই যে জীব নিজের শক্তিতে এই ‘মায়া’কে জয় করতে পারে না । ভগবানের শরণ গ্রহণ করলে ভগবানের কৃপা শক্তিতেই সে এই মায়াকে অতিক্রম করতে পারে (গীতা ৭ ।১৪) ।
(এখানে ‘অব্যক্ত’ শব্দের অর্থস্বরূপ সাংখ্য মতাবলম্বীদের ‘প্রধান তত্ত্ব’ গ্রহণ করা যায় না, কেননা তাঁদের মতে ‘প্রধান’ স্বতন্ত্র, আত্মা থেকে শ্রেষ্ঠ নয় তথা আত্মাকে ভোগ এবং মুক্তি— এই উভয়ই দান করে তার প্রয়োজন সিদ্ধ হয় । কিন্তু উপনিষদ্ এবং গীতায় এই ‘অব্যক্ত প্রকৃতিকে’ কোথাও মুক্তিদানে সমর্থ বলা হয়নি) ।
অতএব এই মন্ত্রের তাৎপর্য এই যে, ইন্দ্রিয়সকল, মন এবং বুদ্ধি—এই সকলের উপর রয়েছে আত্মার কর্তৃত্ব । সুতরাং ইনি (আত্মা) তাদের বশীভূত করে ভগবানের দিকে অগ্রসর হতে পারেন । কিন্তু এই আত্মা থেকেও শ্রেষ্ঠ বলবান আর এক তত্ত্ব আছে যার নাম ‘অব্যক্ত’ । তাকে কেউ ‘প্রকৃতি’ বলে আবার কেউ ‘মায়া’ বলে । এর দ্বারাই জীব মুগ্ধ হয়ে তার বশীভূত হয়ে আছে । জীবের তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর । সুতরাং এর থেকেও যিনি বলবান—মায়ার অধিকর্তা পরমপুরুষ পরমেশ্বর, যিনি জ্ঞান, বল, ক্রিয়া আদি সকল শক্তির অবধি, পরম আশ্রয়, তাঁর শরণ গ্রহণ ছাড়া জীবের মুক্তি নেই । যখন তিনি কৃপা করে স্বয়ং এই মায়াকে অপসারিত করে দেবেন তখনই সেই মুহূর্তে জীব সেই পরমেশ্বরের সাক্ষাৎ লাভ করতে সমর্থ হবে । কারণ তিনি সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান॥ ১১ ॥
সম্বন্ধ—এই কথাই পরের মন্ত্রে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—