সম্বন্ধ—প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীতে বলা হয়েছে যে, পরব্রহ্ম পরমেশ্বর প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যেই বর্তমান, তবু সবাই তাঁকে দেখতে পায় না । সামান্য দু-এক জন সূক্ষ্ম বুদ্ধির দ্বারা তাঁকে দেখতে পায় । তাহলে এখন প্রশ— হতে পারে যে, ব্রহ্ম সকলের অন্তরে বর্তমান থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিরূপ চক্ষু দিয়ে কেউ কেউ তাঁকে দেখতে পায়, সকলে কেন দেখতে পায় না ? এর উত্তরে জানাচ্ছেন—
পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূস্তস্মাৎপরাঙ্পশ্যতি নান্তরাত্মন্ ।
কশ্চিদ্ধীরঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষদাবৃত্তচক্ষুরমৃতত্বমিচ্ছন্ ॥ ১ ॥
ব্যাখ্যা—ইন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য সকল স্থূল বিষয়—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ ইত্যাদি সবই বাইরের বস্তু । এইসকল বাহ্য বস্তুর যথার্থ জ্ঞান লাভের জন্য ইন্দ্রিয়সকল সৃষ্টি হয়েছে, কেননা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ওইগুলির যথার্থ জ্ঞান না হলে মানুষ কোনো বস্তুর রূপ অথবা গুণ আদির সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারে না, আর সেগুলিকে বিচার করে কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি ত্যাগের যোগ্য তা পৃথক করতে পারে না । ভগবানের ইন্দ্রিয় সৃষ্টির উদ্দেশ্য হল—শুভ এবং অশুভের পার্থক্য করে, শুভকর্মের অনুষ্ঠান করে মানুষ যাতে নিজের কল্যাণ সাধন করতে পারে এবং ইন্দ্রিয়ের দ্বারা হিতকারী, সুবুদ্ধিদায়ক, বিশুদ্ধ বিষয়গুলিকে গ্রহণ করে নিজের জীবনকে সুখময় করে পরমাত্মার দিকে এগিয়ে যেতে পারে । সেইজন্য স্বয়ম্ভূ ঈশ্বর ইন্দ্রিয়গুলিকে বহির্মুখী করে রচনা করেছেন । কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বিবেক-বিচারকে অনাদর করে বিষয়ে আসক্ত হয়ে সে কথা বুঝতে পারে না । বিষয়াসক্তিবশত উন্মত্তের মতো আপাতরমণীয় কিন্তু পরিণামে দুঃখদায়ী কদর্য বিষয় ভোগে লিপ্ত হয়ে নরকে যাবার পথ প্রশস্ত করে । ঈশ্বরের চিন্তা-ভাবনা করার কথা তার মনে পড়ে না । যৎসামান্য কোনো কোনো বুদ্ধিমান মানুষ—সৎসঙ্গ, স্বাধ্যায়, তথা ঈশ্বরের কৃপায় অপবিত্র, দুঃখদায়ক ভোগসকল ত্যাগ করে শুভ বিষয়কে গ্রহণ করে এবং অমৃতস্বরূপ পরমাত্মাকে লাভ করার ইচ্ছায় ইন্দ্রিয়সকলকে বাহ্য বিষয় থেকে নিবৃত্ত করে নিজেদের ভগবত্বিষয়ক চিন্তায় সংযুক্ত করে অন্তর্যামী পরমাত্মাকে লাভ করে॥ ১ ॥