সম্বন্ধ—দ্বিতীয় বল্লীতে জীবাত্মা এবং পরমাত্মার স্বরূপ পৃথক পৃথক-ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তা জেনে পরব্রহ্মলাভের ফলের কথাও বলা হয়েছে । সংক্ষেপে একথাও বলা হয়েছে যে, পরব্রহ্ম যাঁকে স্বীকার করেন, সেই ভাগ্যবানই তাঁকে জানতে পারেন । কিন্তু পরমাত্মলাভের পথে যে সাধনার দরকার সে সম্বন্ধে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি । অতএব সাধন-পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে তৃতীয় বল্লীর আরম্ভে প্রথম মন্ত্রে যমরাজ জীবাত্মা এবং পরমাত্মার নিত্য সম্বন্ধ এবং অবস্থান বর্ণনা করছেন—
ঋতং পিবন্তৌ সুকৃতস্য লোকে গুহাং প্রবিষ্টৌ পরমে পরার্ধে ।
ছায়াতপৌ ব্রহ্মবিদো বদন্তি পঞ্চাগ্নয়ো যে চ ত্রিণাচিকেতাঃ ॥ ১ ॥
ব্যাখ্যা—যমরাজ এখানে জীবাত্মা এবং পরমাত্মার পরস্পর নিত্য সম্বন্ধের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন— ব্রহ্মবেত্তা জ্ঞানী পুরুষ এবং যজ্ঞাদি শুভ কর্মের অনুষ্ঠানকারী আস্তিক্য বুদ্ধিসম্পন্ন গৃহিগণ সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই মনুষ্য শরীর অতি দুর্লভ । পূর্ব জন্মার্জিত বহু পুণ্যকর্মের ফলে পরম দয়াল পরমাত্মা দয়াপরবশ হয়ে কল্যাণের জন্য এই শ্রেষ্ঠ দেহ প্রদান করেন আর পুনরায় জীবাত্মার সঙ্গেই নিজেও তার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে (পরব্রহ্মের নিবাসস্বরূপ শ্রেষ্ঠ স্থানে) অবস্থান করেন (ছা.উ. ৬ ।৩ ।২) । শুধু তাই নয়, দুজনেই সেখানে একসঙ্গে অবস্থান করে সত্যরূপ অমৃত পান করছেন—শুভ কর্মের অবশ্যম্ভাবী শুভ ফল ভোগ করছেন (গীতা ৫ ।২৯) । অবশ্য তাঁদের ভোগে তারতম্য আছে । (পরমাত্মা অসঙ্গ এবং অভোক্তা) প্রত্যেক জীবের হৃদয়ে বাস করে তার শুভ কর্মের ফল উপভোগ করা বাস্তবে পরমাত্মার লীলা, যেমন অজন্মা হয়েও জন্মগ্রহণ করা তাঁর লীলা । এইজন্য বলা হয় তিনি ভোগ করেও বাস্তবে ভোগ করেন না অথবা এও বলা যায় যে পরমাত্মা সত্যকে পান করান—জীবকে শুভ কর্মের ফল ভোগ করান আর জীবাত্মা তাই পান করে অর্থাৎ ফল ভোগ করে । কিন্তু জীবাত্মা ফলভোগের সময় অনাসক্ত থাকে না, সে অহংযুক্ত হয়ে ‘আমি ভোগ করছি’—এই অভিমান নিয়ে সুখভোগ করে । এইভাবে একসঙ্গে থেকেও জীবাত্মা এবং পরমাত্মা উভয়ে রৌদ্র এবং ছায়ার মতো পরস্পর ভিন্ন থাকেন । জীবাত্মা ছায়ার মতো অল্পপ্রকাশ, অল্পজ্ঞ আর পরমাত্মা রৌদ্রের মতো পূর্ণপ্রকাশ, সর্বজ্ঞ । কিন্তু জীবাত্মার যা কিছু অল্পজ্ঞান আছে তাও পরমাত্মারই । যেমন ছায়ার যে অল্পপ্রকাশ তা পূর্ণপ্রকাশ—সূর্যালোকেরই ।(১)
(১)এই মন্ত্রে জীবাত্মা আর পরমাত্মাকে গুহায় প্রবিষ্ট বলা হয়েছে, ‘বুদ্ধি’ আর ‘জীব’কে নয়—‘গুহাহিতত্বং তু পরমাত্মন এব দৃশ্যতে’ (ব্রন্, সূন্ ১ ।২ ।১১ শাঙ্করভাষ্য দ্রষ্টব্য ।)
এই রহস্য হৃদয়ঙ্গম করে মানুষের নিজ শক্তি-সামর্থ্যের অভিমান করা উচিত নয় এবং সদা-সর্বদা, নিত্য নিজের অন্তরে অন্তর্যামীরূপে স্থিত পরমাত্মীয়, পরম দয়াল পরমাত্মার নিত্য-নিরন্তর চিন্তা করা অবশ্য কর্তব্য॥ ১ ॥
সম্বন্ধ—পরমাত্মাকে জানার এবং লাভ করার যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাধন—‘তাঁকে জানার এবং লাভ করার শক্তি প্রদান করার জন্য তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে হয়’—এই কথা যমরাজ স্বয়ং প্রার্থনা করে দেখিয়ে দিচ্ছেন ্