সম্বন্ধ—এইরকম পরীক্ষা করে যমরাজ যখন বুঝলেন যে নচিকেতা দৃঢ়চেতা, পরম বৈরাগ্যবান এবং নির্ভীক, অতএব ব্রহ্মবিদ্যার উত্তম অধিকারী ; তখন ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ আরম্ভ করার আগে সেটির মহিমা বলছেন—
অন্যচ্ছ্রেয়োঽন্যদুতৈব প্রেয়স্তে উভে নানার্থে পুরুষ ্ঁসিনীতন্ ।
তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি হীয়তেঽর্থাদ্ য উ প্রেয়ো বৃণীতে ॥ ১ ॥
ব্যাখ্যা—অন্যান্য জীবের মতো কেবল কর্মের ফল ভোগ করবার জন্য আমরা মনুষ্য-দেহ লাভ করিনি । এই দেহদ্বারা মানুষ ভবিষ্যৎ সুখদায়ক শুভ কর্মের অনুষ্ঠানও করতে পারে । বেদে সুখ লাভের দুটি প্রকার বলা হয়েছে—(১) শ্রেয় অর্থাৎ চিরকালের জন্য সমস্ত প্রকারের দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দ স্বরূপ পরব্রহ্ম পরমেশ্বরকে প্রাপ্তির উপায়, আর (২) প্রেয় অর্থাৎ স্ত্রী-পুত্র, পরিবার, ধন, গৃহ, সম্মান, যশ ইত্যাদি ইহলোকের এবং স্বর্গলোকের যত কিছু ভোগ্যসামগ্রী আছে, সে সকল প্রাপ্তির জন্য নির্দেশিত সাধন-পথ । এই উভয় প্রকারের সাধন-পথ নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে আবদ্ধ করে রাখে । ‘ভোগের দ্বারা প্রত্যক্ষ এবং তাৎক্ষণিক সুখ পাওয়া যায়’ এই ধারণার বশবর্তী হয়ে মানুষ এর পরিণাম কী হবে, না বুঝে প্রেয়র দিকেই অগ্রসর হয় । কোনো কোনো ভাগ্যবান মানুষ ঈশ্বরের কৃপায় প্রাকৃত ভোগের আপাতমধুর এবং ভবিষ্যৎ-দুঃখের রহস্য বুঝে, সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শ্রেয়ের দিকে এগিয়ে যায় । এই দুই ধরনের মানুষের মধ্যে যে শ্রেয়কে বরণ করে তৎক্ষণাৎ সাধনায় প্রবৃত্ত হয় তার সর্ব প্রকারেই মঙ্গল সাধিত হয় । সে সর্বতোভাবে সব রকম দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে অনন্ত, অসীম আনন্দ স্বরূপ সেই পরমাত্মাকে লাভ করে । কিন্তু যে মানুষ সংসারের সুখ ভোগের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে মানুষ জীবনের পরম লক্ষ অর্থাৎ পরমাত্মার প্রাপ্তি স্বরূপ যথার্থ প্রয়োজনকে সিদ্ধ করতে ব্যর্থ হয় । ফলে সে নিত্য এবং আত্যন্তিক সুখ লাভে ব্যর্থ হয় । সে ভ্রমাত্মক সুখরূপী ওই সকল অনিত্য ভোগ লাভ করে, যা বস্তুত দুঃখস্বরূপ । অতএব সে প্রকৃত সুখ লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যায়॥ ১ ॥