রূপকার্যসমাখ্যাশ্চ ভিদ্যন্তে তত্র তত্র বৈ।
আকাশস্য ন ভেদোঽস্তি তদ্বজ্জীবেষু নির্ণয়ঃ॥৬
অন্বয়: তত্র তত্র (যখনি [আকাশে বিভিন্ন গুণ আরোপিত হয়]); রূপ-কার্য সমাখ্যাঃ চ (রূপ, কার্যকারিতা এবং নাম); ভিদ্যন্তে বৈ (নিঃসন্দেহে ভিন্ন ভিন্ন বোধ হয়); আকাশস্য ভেদঃ ন অস্তি (আকাশ কিন্তু খণ্ডিত হয় না); তদ্বৎ জীবেষু নির্ণয়ঃ (জীবাত্মার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য)।
সরলার্থ: যখন আকাশ কোন পাত্র বা স্থানের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন সেই স্থান বা পাত্রের আকার অনুযায়ী আকাশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দেখে মনে হয় নাম, রূপ, কার্য বা অন্যান্য গুণের দ্বারা আকাশকে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু বস্তুত আকাশকে কখনো খণ্ডিত করা যায় না। এইকথা জীবাত্মার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ব্যাখ্যা: আত্মা এক এবং অভিন্ন। সুতরাং এই এক আত্মা কিভাবে ‘আমি’ ‘তুমি’ ‘তারা’ ইত্যাদির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে? ব্যবহারিক জীবনে আমরা সবসময়ই এই ভেদ দেখতে পাই। তার অর্থ কি এই যে আত্মাকে ভাগ করা যায়? নিঃসন্দেহে এর উত্তর হবে—না। পটাকাশ ও ঘটাকাশের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হচ্ছে এই ভেদ কল্পিত। কিন্তু ব্যবহারিক প্রয়োজনে এই কল্পিত বিভাগকে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। আকাশ সর্বব্যাপী, এক এবং অভিন্ন। কিন্তু ঘটের মধ্যে থাকলে তাকে আমরা বলি ‘ঘটাকাশ’, ঘরের মধ্যে থাকলে বলি ‘ঘরের মধ্যস্থিত আকাশ’। এইভাবে স্থান, ব্যবহার ও অন্যান্য গুণ অনুযায়ী আমরা আকাশকে কৃত্রিমভাবে খণ্ডিত করি। তার অর্থ এই নয় যে আকাশকে সত্যিই ভাগ করা যায়। না, তা কখনই নয়। উপাধিযুক্ত হলে মনে হয় যেন আকাশকে ভাগ করা হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘ধর একটি পুকুরের মাঝ বরাবর তুমি একটি দড়ি ফেলে দিয়েছ। দেখে মনে হবে জলটাকে যেন দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু জলটা কি সত্যিই ভাগ হয়েছে? না। দড়িটা সরিয়ে দিলেই সেই এক জল।
এক আত্মা যে বহু রূপে প্রতিভাত হতে পারে উপরোক্ত দৃষ্টান্তে সেটি দেখানো হয়েছে। আত্মা এক, কিন্তু নাম-রূপের জন্য তাকে বহু দেখায়।
এই বিষয়টিকে পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটি উদাহরণ দিতেন : ধর একটি বালকের অনেকগুলি মুখোশ আছে। খেলার সাথীদের সঙ্গে মজা করার জন্য সে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মুখোশ ব্যবহার করে—কখনো বাঘের মুখোশ, কখনো বাঁদরের আবার কখনো বা কুকুরের। সেই একই বালক—কিন্তু নানারকমের মুখোশ পরে তাকে এক এক সময়ে এক এক রকম দেখায়। মুখোশগুলি সত্য নয়, আরোপিত।