ওমিত্যেতদক্ষরমিদং সর্বং তস্যোপব্যাখ্যানং ভূতং ভবদ্ভবিষ্যদিতি
সর্বমোঙ্কার এব। যচ্চান্যৎ ত্রিকালাতীতং তদপ্যোঙ্কার এব॥১
অন্বয়: ওম্ ইতি এতৎ অক্ষরম্ (ওম্ এই বিশেষ অক্ষরটি); ইদং সর্বম্ (এই সমস্ত); তস্য উপব্যাখ্যানম্ (এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা হল); ভূতম্ (অতীতকাল); ভবৎ (বর্তমানকাল); ভবিষ্যৎ (ভবিষ্যৎকাল); ইতি সর্বম্ ওঙ্কারঃ এব (এই সমস্ত ওঁকার ছাড়া আর কিছু নয়); যৎ চ অন্যৎ ত্রিকালাতীতম্ (যদি এই ত্রিকালের ঊর্ধ্বে কিছু থাকে); তৎ অপি ওঙ্কারঃ এব (সেও ওঁকার)।
সরলার্থ: ‘ওম্’ ব্রহ্মের প্রতীক, কার্য ও কারণ উভয়ই ব্রহ্ম। এই দৃশ্যমান জগৎও হচ্ছে ওম্। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, যা কিছু অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এই সবই ওঁকার। এই ত্রিকালের অতীতও যদি আর কিছু থাকে তবে তাও ওঁকার।
ব্যাখ্যা: উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘এই সবই ওম্’। আমরা অনেকেই ‘ওম্’ প্রতীকটির সঙ্গে পরিচিত। এটি ব্রহ্মের প্রতীক তাই এই প্রতীককে অতি পবিত্র বলে মনে করা হয়। কখনো কখনো ওম্কে বলা হয় নাদব্রহ্ম অর্থাৎ শব্দব্রহ্ম। কারণ সমগ্র ধ্বনিজগৎ এই শব্দটির অন্তর্গত। ওম্ শব্দটি তিনটি বর্ণের সমষ্টি, অ-উ-ম৷ ‘অ’ বর্ণটি প্রধানস্বর। এই ধ্বনিটি গলদেশের পশ্চাদ্ভাগ থেকে নির্গত হয়। ‘ম’ হল অন্তস্বর। এটি ওষ্ঠ্যবর্ণ এবং ঠোঁট বন্ধ অবস্থায় উচ্চারিত হয়। ‘উ’ হল অন্তর্বর্তী স্বর। শব্দ দিয়ে আমরা কোন বস্তুকেই বুঝি। এবং ওম্ হচ্ছে সকল ধ্বনির প্রতীক। সুতরাং এই ও-ই ব্রহ্ম। সবকিছুর অর্থাৎ সমগ্র জগতের প্রতীকই হচ্ছে ওম্।
‘ইদম্’ শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইদম্ কথাটির অর্থ ‘এই’ অর্থাৎ যা কিনা আমাদের সামনেই রয়েছে। ‘এই’ বলতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জড়জগৎকে বোঝায়। এই জগৎকেই আমরা অনুভব ও স্পর্শ করতে পারি। ওঁকারই হচ্ছে ‘ইদম্’ তথা দৃশ্যমান জগতের প্রতীক।
ব্ৰহ্মই অক্ষর, কারণ এতে কোন ক্ষর বা ক্ষয় নেই। ব্রহ্ম অবিনাশী, যার সৃষ্টি আছে তার নাশও আছে, যার জন্য আছে তার মৃত্যুও আছে। কিন্তু যার সৃষ্টি হয়নি তা অবিনাশী। একমাত্র ব্রহ্মই সৃষ্ট নন। ইনি নিরপেক্ষ এবং ইনি সবসময়ই রয়েছেন। এঁর ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই। ইনি অবিনাশী। ব্রহ্ম বিভিন্ন রূপের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন, রূপটা বদলায় কিন্তু ব্রহ্ম ব্রহ্মই থাকেন।
এই ‘ওম্’-এর মধ্যেই অতীত (ভূতম্), বর্তমান (ভবৎ), এবং ভবিষ্যৎ। ওম্-ই অতীত, ওম্-ই বর্তমান আবার ওম্-ই ভবিষ্যৎ। শুধু তাই নয় ত্রিকালাতীত বলেও যদি কিছু থাকে তাও এই ওম্-এর অন্তর্গত। ‘ত্রিকালাতীতং’ বলতে বোঝায় যা তিন কালের ঊর্ধ্বে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এ সবই আপেক্ষিক শব্দমাত্র। ‘ত্রিকালাতীতং’ মানে যা নিত্যসত্য। আমরা দেশ-কালদ্বারা সীমাবদ্ধ। যখন আমরা কোন ব্যক্তির কথা বলি তখন কোন নির্দিষ্ট দেশ-কালের সাপেক্ষে তার উল্লেখ করি। ব্রহ্ম কিন্তু দেশ-কালের ঊর্ধ্বে। ব্ৰহ্ম দেশাতীত ও কালাতীত। আর তিনিই ওম্ (তৎ অপি ওঙ্কারঃ এব)।
ঈশ্বর সর্বত্র এবং তিনি সকলের মধ্যে বিরাজিত। যদিও তিনি সর্বব্যাপী তবুও একটি ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডও তাঁর প্রতীক হতে পারে। শিলাখণ্ডের মধ্য দিয়েও মানুষ স্বয়ং ঈশ্বরকেই উপাসনা করে। একইভাবে, ওম্ ব্রহ্মের প্রতীক। ওম্-কে ব্রহ্মের প্রতীকরূপে ধ্যান করলে তা ব্রহ্মকেই ধ্যান করা হল।