নান্তঃপ্রজ্ঞং ন বহিষ্প্রজ্ঞং নোভয়তঃপ্রজ্ঞং ন প্রজ্ঞানঘনং ন
প্রজ্ঞং নাপ্রজ্ঞম্। অদৃষ্টমব্যবহার্যমগ্রাহ্যমলক্ষণমচিন্ত্যম-
ব্যপদেশ্যমেকাত্মপ্রত্যয়সারং প্রপঞ্চোপশমং শান্তং
শিবমদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে স আত্মা স বিজ্ঞেয়ঃ॥৭
অন্বয়: ন অন্তঃ প্রজ্ঞম্ ([তুরীয়] অন্ত্যস্থ বস্তু [তৈজস] সম্পর্কে সচেতন নয়); ন বহিষ্প্রজ্ঞম্ (বাইরের বস্তু [বিশ্ব] সম্পর্কেও সচেতন নয়); ন উভয়তঃ প্রজ্ঞম্ (উভয়ের কোনটির সম্পর্কেই সচেতন নয়); ন প্রজ্ঞান ঘনম্ (কেবলমাত্র ঘনীভূত চৈতন্যও নয়); ন প্রজ্ঞম্ (একযোগে নকল বস্তু সম্পর্কে সচেতন নয়); অপ্রজ্ঞং [চ] ন (অসচেতনও নয়); অদৃষ্টম্ দৃষ্টির অগোচর); অব্যবহার্যম্ (কোনরূপ ব্যবহারযোগ্যও নয়); অগ্রাহ্যম্ (কোন কর্মেন্দ্রিয়ের অধীন নয়); অলক্ষণম্ (সকল জ্ঞানেন্দ্রিয়ের অতীত); অচিন্ত্যম্ (চিন্তার অতীত); অব্যপদেশ্যম্ (কোন ধ্বনির দ্বারা নির্দেশিত নয়); একাত্মপ্রত্যয়সারম্ (কেবলমাত্র আত্মা সম্পর্কে সচেতন); প্রপঞ্চোপশম্ (এই ভৌতিক জগতের পূর্ণ অবসান হয়); শান্তম্ (শান্তির প্রতীক); শিবম্ (সর্বমঙ্গলময়); অদ্বৈতম্ (দ্বিতীয়রহিত অর্থাৎ এক); চতুর্থম্ (চতুর্থ অবস্থা—তুরীয়); মন্যন্তে সঃ আত্মা ([প্রাজ্ঞ ব্যক্তি] এই তুরীয়কে আত্মা বলে জানেন); স বিজ্ঞেয়ঃ (এই আত্মাকেই উপলব্ধি করতে হবে [এটাই জীবনের উদ্দেশ্য])।
সরলার্থ: অন্তরস্থ ঘটনা সম্পর্কে তুরীয় সচেতন নন (এর থেকে বোঝা যায় তুরীয় তৈজস নন), বাইরের ঘটনা সম্পর্কেও ইনি সচেতন নন (অর্থাৎ তুরীয় বিশ্ব নন)। ইনি জাগ্রত ও স্বপ্নবস্থার মধ্যবর্তী কোন কিছু সম্পর্কেও সচেতন নন। (সুষুপ্তি অবস্থার প্রাজ্ঞও নন। ইনি সর্বজ্ঞও নন, অচৈতন্য নন। ইনি অদৃশ্য—লৌকিক ব্যবহারের অতীত, কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়—এই দুয়েরই ঊর্ধ্বে, মনের অগোচর, এবং কোন শব্দ দ্বারা ইনি নির্দেশিত নন। এই অবস্থায় থাকে শুধু আত্মার চৈতন্য এবং এখানে জগতের কোনও অস্তিত্ব নেই। এখানে শান্তি ও কল্যাণের মূর্ত প্রকাশ, এই চৈতন্য এক ও অদ্বিতীয়। এই চতুর্থ অবস্থাই তুরীয়। প্রাজ্ঞগণ একেই আত্মা বলেন। এই আত্মাকে উপলব্ধি করতে হবে।
ব্যাখ্যা: উপনিষদে পূর্বেই বলা হয়েছে যে, জাগ্রত অবস্থায় আমরা চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সচেতন থাকি (বহিপ্রজ্ঞং)। নিদ্রিত অবস্থায় আমরা অন্তর্জগৎ (অন্তঃপ্রজ্ঞং) সম্পর্কে সচেতন। তখন এই জগৎকে আমরা স্বপ্নে অনুভব করি। আত্মা ‘বহিষ্প্রজ্ঞং’ নন আবার ‘অন্তঃপ্রজ্ঞং’ও নন। আত্মা বহির্জগৎ বা স্বপ্ন-জগৎ কোনটি সম্পর্কেই সচেতন নন। ইনি জাগ্রত ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী জ্ঞান-সম্পন্নও নন (উভয়তঃ প্রজ্ঞং)।
আবার সুষুপ্তি অবস্থায় মানুষ প্রগাঢ় চৈতন্য অর্থাৎ ঘনীভূত চৈতন্যকে (প্রজ্ঞানঘনং) অনুভব করে। তখন তুমি কোন কিছুর সম্পর্কে সচেতন নও এমনকি নিজের সম্বন্ধেও না, আত্মা এরূপ অবস্থারও ঊর্ধ্বে। আত্মা চেতনও নন অচেতনও নন (ন প্রজ্ঞং ন অপ্রজ্ঞং)। এই দুই-এর কোনও অবস্থাই আত্মা তথা ব্রহ্মের সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। আত্মা সকল অবস্থা নিরপেক্ষ অবস্থাসমূহ আত্মায় আরোপিত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আত্মা ঐসকল বিশেষণ থেকে মুক্ত।
আত্মাকে বর্ণনা করা যায় কিভাবে? উপনিষদের মতে আত্মার সম্বন্ধে কিছু বলা যায় না। আত্মাকে কোনও বিশেষণে বিশেষিত করা যায় না। বলা যায় না যে, আত্মা এই প্রকার বা আত্মা ঐ প্রকার। যখন আমরা আত্মার সম্বন্ধে কিছু বলি তখনি আমরা তাঁকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। আত্মায় আরোপিত গুণসমূহ আত্মার বৈশিষ্ট্য নয়। যেমন, কেউ হয়তো বলল পদ্মফুল নীল। নীল একটি গুণমাত্র, পদ্মের কোনও অংশ নয় কারণ পদ্ম সাদা কিংবা লালও হতে পারে। সেভাবেই কেউই বলতে পারে না আত্মা ছোট কিংবা বড় বা আর কিছু। আত্মাকে বর্ণনা করা যায় না, আত্মা যে সঠিক কি তা বলে বোঝানোও যায় না। সেইজন্যই বেদান্ত বলেন, ‘নেতি, নেতি’ অর্থাৎ ‘ন ইতি, ন ইতি’ যার অর্থ আত্মা এটি নয়, এটি নয়।
তাই উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘অদৃষ্টং’—আত্মা দৃষ্টির অগোচর। অর্থাৎ কোনও ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আত্মাকে অনুভব করা যায় না। ‘অব্যবহার্যং’—কোনও ইন্দ্রিয় দ্বারা আত্মা ব্যবহারযোগ্য নন। যেমন আমি এই ‘পেপার ওয়েট’কে অনুভব করতে পারি, এটাকে হাত দিয়ে ধরতে পারি। এটাকে আমি নানা কাজে ব্যবহারও করতে পারি। কিন্তু আত্মাকে এভাবে ব্যবহার করা যায় না। কারণ আত্মার কোনও রূপ নেই। ‘অগ্রাহ্যং’—আত্মাকে বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না। ‘অলক্ষণং’—আত্মা ইন্দ্রিয়াতীত। ‘অচিন্ত্যং’—আত্মা চিন্তার অতীত। এমনকি তাঁকে চিন্তা করাও যায় না। যেমন, সূর্য যে কত বৃহৎ তা বিজ্ঞানীরা আমাদের বলে দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা কি তা ধারণা করতে পারি? কোন কিছুর সঙ্গেই আমরা আত্মাকে তুলনা করতে পারি না। আত্মা ‘অব্যগদেশ্যং’– তাঁকে বর্ণনা করা যায় না।
তবে আত্মা কি? ‘একাত্মপ্রত্যয়সারং’—এ কেবল ‘অহংবোধ’ অর্থাৎ আমাদের আত্মচৈতন্য। এটাই এর একমাত্র বৈশিষ্ট্য। আমাদের সকলেরই এই ‘অহংবোধ’ আছে। এমনকি ক্ষুদ্রতম কীটেরও এই বোধ আছে। কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যে এক ‘সাধারণ অহংবোধ’ আছে। এবং সেটাই ব্রহ্ম। কেমন করে বুঝব যে এই ‘অহংবোধ’ই ব্রহ্ম? আমি মনে করি যে, আমি শ্ৰীযুক্ত অমুক এবং অমুক বংশে আমার জন্ম। তুমি মনে কর, তুমি আর একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি। কিন্তু আমাদের এই ‘অহংবোধ’ আমাদের অহংকার ও দেহ-মনের সঙ্গে অভিন্ন। এই অহংকারের ফলেই আমরা নিজেদের একে অপরের থেকে আলাদা মনে করি। প্রশ্ন ওঠে, তবে ‘আমি’ কে? এই দেহ ও মন চলে গেলে আর কি অবশিষ্ট থাকে? থাকে এক আত্মা, এটিই সাধারণ আশ্রয়, সাধারণ অধিষ্ঠান। ইনিই পরমাত্মা। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, উপনিষদ দক্ষতার সাথে আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করলেন—‘আমরাই ব্রহ্ম’। প্রথমে ‘নেতি নেতি’ করে আমরা সবকিছুকে অস্বীকার করি। শেষে থাকে কেবলমাত্র একটি সত্তা, ‘আত্মপ্রত্যয়’—অহংবোধ, সমগ্র জগৎ চরাচরের এই হল আশ্রয়, আমাদের সকলেরই সত্তাস্বরূপ।
কখন আমরা এই সত্য উপলব্ধি করি? ‘প্রপঞ্চ-উপশমং’, প্রপঞ্চ কথার অর্থ হল দৃশ্যমান জগৎ এবং উপশমং এর অর্থ অস্বীকার করা। এই দৃশ্যমান পঞ্চভূতে গড়া জগৎকে অস্বীকার করতে পারলেই আমরা আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারি। এই জগৎ নাম-রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই নাম-রূপ বর্জিত হলে আর কি অবশিষ্ট থাকে? ‘শান্তং শিবম্ অদ্বৈতম্’ অর্থাৎ শান্তি, আনন্দ ও একত্ববোধ। সাধারণভাবে, আমরা সবসময়েই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু যেখানে কোন দুই নেই, কেবলমাত্র এক রয়েছে সেখানেই শান্তি এবং আনন্দ। এটাই চতুর্থ অবস্থা—‘চতুর্থং’, একেই তুরীয় অবস্থা বলে। এই অবস্থা অর্থাৎ ব্রহ্মই আমাদের প্রকৃত অবস্থা। ‘সঃ বিজ্ঞেয়ঃ’—এই আত্মাকে জানতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন আত্মাকে বিজ্ঞেয় বলা হচ্ছে কেন? কে এই আত্মাকে জানতে পারে? তাহলে কোন জ্ঞাতা থাকা চাই। আমি আমার থেকে পৃথক কোন বস্তুকে জানতে পারি অর্থাৎ সেখানে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এই দুই বোধ আছে। ব্রহ্ম যদি জ্ঞেয় বস্তু হন তবে জ্ঞাতা কে? এর উত্তরে আচার্য শঙ্কর বলেছেন ‘জ্ঞেয়’ শব্দটি এই অর্থে উপনিষদে ব্যবহৃত হয়নি। উপনিষদ বলছেন যে এখানে আমরা নিজেদের আত্মা সম্পর্কে অজ্ঞ। আমাদের এই অজ্ঞানতা দূর করতে হবে। এভাবেই আত্মাকে জানা যাবে।