স্বপ্নস্থানোঽন্তঃপ্রজ্ঞঃ সপ্তাঙ্গ একোনবিংশতিমূখঃ
প্রবিবিক্তভুক্তৈজসো দ্বিতীয়ঃ পাদঃ॥৪
অন্বয়: স্বপ্নস্থানঃ অন্তঃ প্রজ্ঞঃ (যখন তুমি ঘুমিয়ে আছ [স্বপ্ন দেখছ] তখন যা কিছু তুমি দেখছ বা করছ, তা তোমার মনের ব্যাপার); সপ্তাঙ্গঃ (সাতটি অঙ্গ); একোনবিংশতিমুখঃ (উনিশটি মুখ [যখন তুমি জাগ্রত অবস্থায় ছিলে]); প্রবিবিক্তভুক্ ([কিন্তু] যদি তুমি কিছু ভোগ কর, তুমি তা কর মনের দ্বারা [স্থূলবস্তু নেই সেখানে]); তৈজসঃ দ্বিতীয়ঃ পাদঃ (এই মানসিক অভিজ্ঞতার অধিপতিই হচ্ছে [ব্রহ্মের] দ্বিতীয় অবস্থা)।
সরলার্থ: আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমরা যা কিছু করি সেসবের অস্তিত্ব আমাদের মনে। স্বপ্ন বাহ্যবিষয়-বিহীন। এটা পুরোপুরি মনের ব্যাপার। স্বপ্ন হচ্ছে জাগ্রত অবস্থায় আমাদের বাসনা ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ। জাগ্রত অবস্থার মতো স্বপ্নবস্থাতেও আমাদের সাতটি অঙ্গ ও উনিশটি ইন্দ্রিয় অটুট থাকে, কিন্তু তখন আমরা যা কিছু কাজ করি মনের দ্বারা। এ অবস্থায় বাইরের জগতের সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। এই মানস অভিজ্ঞতার অধিপতি হল (ব্রহ্মের) দ্বিতীয় অবস্থা।
ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় অবস্থা হল ‘স্বপ্নস্থানঃ’। সংস্কৃতে ‘স্বপ্ন’ কথাটির অর্থ নিদ্রা। এই অবস্থায় আমাদের জ্ঞান অন্তর্মুখী, অর্থাৎ মনোগত (অন্তঃপ্রজ্ঞ), মনের সৃষ্টি। স্বপ্নে আমরা অনেক কিছু দেখি, অনুভব করি এমনকি শুনতেও পাই, কিন্তু এ সবই মনের কল্পনা। জাগ্রত অবস্থায় আমরা যেসব অভিজ্ঞতা লাভ করি স্বপ্নে আমরা তাই দেখতে পাই। আচার্য শঙ্কর বলেন যে মনের এই সক্রিয়তা কোন বাহ্যবস্তুর দ্বারা প্রভাবিত নয়। তিনি বলছেন মন যেন একটি কাপড়ের টুকরো যাতে ছবি আঁকা হয়েছে। এই একই কথা আমরা পাই ‘গীতা’ এবং স্বামীজীর ‘কর্মযোগে’ও। শারীরিকভাবেই হোক অথবা মানসিকভাবেই হোক আমরা যখন কোন কাজ করি তখন মনের ওপর তার একটা ছাপ পড়ে, যেন মনের ওপর একটা ছবি আঁকা হয়েছে। ধরা যাক আমি কারও ওপর রাগ করেছি এবং তাকে আমি আঘাতও করতে চাই। কিন্তু ব্যক্তিটি আমার চেয়ে শক্তিশালী তাই তাকে আমি আঘাত করতেও সাহস পাচ্ছি না, তখন আমি তাকে মনে-মনেই আঘাত করি। হিন্দুমতে এইরকম মনে-মনে আঘাত করাও সমভাবে নিন্দনীয়। উপনিষদ বলছেন যে, তুমি তোমার দেহ ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই কোন কাজ কর অথবা মনের দ্বারাই কোন কাজ কর, তার ফলে তুমি কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করবে এবং তোমার মনের ওপর তার একটা ছাপও পড়বে। সৎ চিন্তা বা অসৎ চিন্তা যে চিন্তাই কর না কেন মনের ওপর তার একটা ছাপ পড়ে। এই ছাপগুলিই পরে স্বপ্নে প্রকাশিত হয়।
এই উপনিষদের পূর্ববর্তী শ্লোকে বলা হয়েছে, জাগ্রত অবস্থায় আমরা ‘স্থূলভুক্’ অর্থাৎ এই জড়জগতের ভোক্তা। এই শ্লোকে বলা হচ্ছে স্বপ্নাবস্থায় আমরা ‘প্রবিবিক্তভুক্’—সূক্ষ্মবিষয় ভোগ করি অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় আমরা যা কিছু করি সে সমস্ত বাসনা ও স্মৃতি আমাদের মনের ওপরে একটা ছাপ ফেলে, সেগুলিই স্বপ্নে ধরা পড়ে। ‘প্রবিবিক্ত’ বলতে আসলে বোঝায় অনাসক্তি বা স্বতন্ত্রতা। এই অবস্থায় কোন স্থূলদেহের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো স্বপ্নে আমাদের মনের অপূর্ণ কামনা-বাসনার পূর্তি হয়। ‘প্রবিবিক্তভুক্’ কথাটির অর্থ ‘বাসনামাত্রা প্রজ্ঞা ভোজ্য’—আমরা কামনা করি এবং এই কামনার দ্বারাই আমাদের উপভোগ হয়। এই ভোগ মনোগত, শারীরিক নয়। এই মনোগত অভিজ্ঞতার অনুরূপ কোন কিছু বাহ্য জগতে নেই। এই অবস্থায় মনের দ্বারাই ভোগ করা হয়। আমাদের কামনা-বাসনা ও অতীত অভিজ্ঞতার ছাপই হল স্বপ্ন।
‘তৈজস্’ কথাটির অর্থ হল আলো বা চৈতন্য। চৈতন্যকে প্রায়ই আলোর সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। ‘তৈজস্’ বলতে মনোগত চৈতন্যকে বোঝায়। তৈজস্ হল দ্বিতীয় অবস্থা অর্থাৎ দ্বিতীয়ঃ পাদঃ।