সর্বং হ্যেতদ্ ব্ৰহ্মায়মাত্মা ব্রহ্ম সোঽয়মাত্মা চতুষ্পাৎ॥২
অন্বয়: সর্বং হি এতৎ ব্রহ্ম (এই সকলই ব্রহ্ম); অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম (এই আত্মাও ব্রহ্ম); সঃ অয়ম্ আত্মা চতুষ্পাৎ (এই আত্মার চারটি অবস্থা)।
সরলার্থ: সমগ্র জগৎই ব্রহ্ম। এই জীবাত্মাও ব্রহ্ম। আপাতদৃষ্টিতে এই আত্মার চারটি অবস্থা।
ব্যাখ্যা: ‘সর্বং হি এতৎ ব্রহ্ম’—যা কিছুর অস্তিত্ব আছে অর্থাৎ এই সবই ব্রহ্ম। ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নেই। ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেই আমরা এই জড় জগৎকে উপলব্ধি করতে পারি। আবার এমন অনেক জিনিস আছে যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। তবুও তাদের অস্তিত্ব আছে। আবার এমনও জিনিস আছে যা সূক্ষ্মভাবে মনে বিদ্যমান। সেটাও একরকমের অস্তিত্ব। উপনিষদে বলা হয়েছে সকল অস্তিত্ব অর্থাৎ সকল বস্তুই ব্রহ্মের অন্তর্গত। এইজন্যই ব্রহ্মকে বলা হয় ‘সৎ-চিৎ-আনন্দ’। ‘সৎ’ কথার অর্থ হল ‘যা আছে’। ব্রহ্ম স্বয়ং এই অস্তিত্ব।
উপনিষদে বলা হয়েছে জীব ও জগৎ এক। ‘অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম’—জীবাত্মাই ব্রহ্ম। ব্যষ্টি ও সমষ্টি এক এবং অভিন্ন। তৈত্তিরীয় উপনিষদে (2।৮।৫) বলা হয়েছে ‘সঃ যঃ চ অয়ং পুরুষে যঃ চ অসৌ আদিত্যে’—যিনি এই দেহের ভেতরে রয়েছেন তিনিই সূর্যে বর্তমান। এই সেই একই আত্মা, একই ব্রহ্ম সকলের মধ্যে রয়েছেন। এ এক চমৎকার ধারণা, কিন্তু আয়ত্ত করা কঠিন। তবুও একই কথাই উপনিষদ বারবার বলছেন। তুমিই ব্রহ্ম কিন্তু তুমি জান না যে তুমি ব্রহ্ম। তুমি তোমার দেহটাকেই ‘তুমি’ মনে করেছ। ধর, যে জামাটা তুমি পড়ে আছ সেটা কি তুমি? অবশ্যই তা নয়। তুমি তোমার জামাটাকে পালটাতে পার কিন্তু তাতে তোমার কোন পরিবর্তন হয় না। ঠিক একইভাবে দেহের পরিবর্তন হয় মাত্র, কিন্তু আত্মা সবসময়ই অপরিবর্তনীয় ও নিত্যসত্য।
এই আত্মা চতুষ্পাদ্ও বটে। আক্ষরিকভাবে ‘চতুষ্পাদ্’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘চারটি পা যুক্ত’, যেমন গরু। কিন্তু এখানে কথাটির অর্থ ‘চারটি অবস্থা’। একই ব্রহ্মকে চারটি অবস্থায় দেখা যায়। প্রথম অবস্থা হচ্ছে ‘বিশ্ব’—স্থূল জাগতিক অবস্থা। যখন আমরা জেগে থাকি তখন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা এই জগৎকে প্রত্যক্ষ করে থাকি। কিন্তু যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি তখনও আমাদের কাছে এই জগতের অস্তিত্ব থাকে। তখন মনের দ্বারা এই জগৎকে উপলব্ধি করা যায়। ব্রহ্মের এই অবস্থাকে বলা হয় ‘তৈজস’। এই অবস্থায় আমরা স্বপ্ন দেখি যে আমরা কোন কিছু খাচ্ছি বা কোথাও গেছি বা কোন কাজ করছি। এর পরবর্তী অবস্থা হল ‘সুষুপ্তি’ তথা গভীর নিদ্রার অবস্থা। এই অখণ্ড চৈতন্যের অবস্থাকে বলা হয় ‘প্রাজ্ঞ’। ঘন অন্ধকারে যেন তখন মনের সব বৈচিত্র লোপ পায়। তবুও সুষুপ্তি ভাঙার পর আমরা খুব সতেজ বোধ করি। এর পরেও আছে আর এক অবস্থা—‘তুরীয় অবস্থা’। এটিই ব্রহ্মের চতুর্থ অবস্থা। এই অবস্থায় আমরা চৈতন্যের সাথে এক হয়ে যাই। তখন আমরা ব্রহ্মের সাথে একাত্মতা অনুভব করি।
এখন উপনিষদে ব্রহ্মের এই চারটি অবস্থার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবেরও কি পরিবর্তন হয়? না। সেই একই জীব কখনো জেগে আছে, কখনো বা স্বপ্ন দেখছে, কখনো আছে সুষুপ্তিতে, আবার কখনো বা সমাধি অবস্থায় ব্রহ্মের সাথে এক হয়ে আছে। এই জগৎ বৈচিত্রপূর্ণ। এ জগতে আমরা নানারকম পরিবর্তন দেখতে পাই, কিন্তু ব্রহ্মই একমাত্র নিত্যসত্য। ব্রহ্ম সবসময়ই এক ও অভিন্ন, অপরিবর্তিত ও অপরিবর্তনীয়। জীবের যেমন চারটি অবস্থা তেমনি ব্রহ্মেরও এই চারটি অবস্থা। কিন্তু উভয়ই ব্রহ্ম, ব্যষ্টি ও সমষ্টি এক ও অভিন্ন। এ সকল অবস্থাই ব্রহ্মের অন্তর্গত। ব্রহ্মের মধ্যেই এই সমগ্র জগৎ। এর জন্যই উপনিষদ বলছেন, ‘অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম’—এই আত্মাই ব্রহ্ম।