সতো হি মায়য়া জন্ম যুজ্যতে ন তু তত্ত্বতঃ।
তত্ত্বতো জায়তে যস্য জাতং তস্য হি জায়তে॥২৭
অন্বয়: হি (যেহেতু); সতঃ (যা ইতিপূর্বেই আছে [তার]); জন্ম মায়য়া যুজ্যতে (জন্ম মায়াজাত—সম্ভবত একথা বলা যায়); ন তু তত্ত্বতঃ (কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নয়); যস্য (প্রতিপক্ষের [অর্থাৎ দ্বৈতবাদীর] মতে); তত্ত্বতঃ জায়তে (সত্য সত্যই জাত হয়); তস্য হি (তাদের মতে নিশ্চিতভাবে); জাতম্ (যার জন্ম হয়েছে); জায়তে (জন্মায়)।
সরলার্থ: যা ইতিপূর্বেই আছে, মায়ার সাহায্যে তার আবার জন্ম হয়েছে—সম্ভবত এমন কথা বলা যায়, কিন্তু তা যথার্থ নয়। যাঁরা জন্মকে সত্য বলে মনে করেন—তাঁদের কথার তাৎপর্য—জাত আবার জাত হয়।
ব্যাখ্যা: শাস্ত্র বারবার বলছেন—একমাত্র সত্য হল আত্মা, আর এই জগৎ আত্মার উপর নাম-রূপের আরোপ ছাড়া আর কিছু নয়—যেমন আমরা ভুল করে দড়ির উপর সাপ আবোপ করি।
কিন্তু এই আত্মা কোথায় আছেন? এর যে অস্তিত্ব আছে তাই বা কি করে বুঝব? কার্য থাকলে বোঝা যায় কারণও আছে। জাদুর খেলা দেখে তার পিছনে যে জাদুকর আছে তা বুঝতে পারি। শূন্য থেকে কিছুর উৎপত্তি হওয়া অসম্ভব। শূন্য থেকে এই জগতের সৃষ্টি হতে পারে না। জগৎ অবশ্যই কোন কিছুর থেকে হয়েছে—আর তা হল আত্মা। আত্মা এই জগতের নিমিত্ত কারণ। আত্মা নিজ মায়াশক্তির সাহায্যে এই জগৎ উৎপন্ন করেছে। কিন্তু এ জগৎ সত্য নয়—এ যেন জাদুকরের জাদুখেলা।
আত্মা এ জগতের উপাদান কারণও বটে। দড়িই সত্য। দড়ির জায়গায় যে সাপ দেখি তা সত্য নয়। তবু মায়ার প্রভাবে সত্য বলে মনে হয়। সেইভাবে ইন্দ্রিয়-মনের অতীত আত্মা নিজ মায়াশক্তির সাহায্যে এই জগৎরূপে প্রতিভাত হন। রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো এও নেহাতই দেখার ভুল।
দ্বৈতবাদীরা বলেন আত্মা জগৎরূপে জন্ম নিয়েছেন। যা জন্মমৃত্যুরহিত তারও জন্ম হয়—একথাই তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু এ তো নেহাতই হাস্যকর। জন্মরহিত যে, তার জন্ম কি করে হয়? এ যে স্ববিরোধী কথা। এরকম প্রস্তাবে দ্বৈতবাদীদের স্বীকার করে নিতেই হয় যে—যে বস্তু ইতিপূর্বেই জন্মগ্রহণ করেছে, তার আবারও জন্ম হতে পারে। কিন্তু যদি তাঁরা যুক্তি দেখান যে একটি বস্তু থেকে আর একটি বস্তুর জন্ম হতে পারে, তবে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে প্রথম বস্তুটির জন্য আবার আরেকটি বস্তু থেকে হয়েছে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে। মোক্ষলাভের আর কোন সম্ভাবনাই থাকবে না।
সুতরাং সিদ্ধান্ত এই যে—আত্মাই একমাত্র সত্য, আত্মা জন্মমৃত্যুরহিত।