সপ্রয়োজনতা তেষাং স্বপ্নে বিপ্ৰতিপদ্যতে।
তস্মাদাদ্যন্তবত্ত্বেন মিথ্যৈব খলু তে স্মৃতাঃ॥৭
অন্বয়: তেষাম্ (জাগ্রত অবস্থায় দৃষ্ট বস্তুসকল); সপ্রয়োজনতা (সেই অবস্থায় কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারে); স্বপ্নে বিপ্ৰতিপদ্যতে (স্বপ্নাবস্থায় ঐ উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে নাও পারে); তস্মাৎ (সুতরাং); তে (জাগ্রত অবস্থার দৃষ্ট বস্তুসকল); আদ্যন্তবত্ত্বেন (যার শুরু এবং শেষ আছে); মিথ্যৈব খলু [তে] স্মৃতাঃ (এইসব বস্তু অবশ্যই মিথ্যা)।
সরলার্থ: জাগ্রত অবস্থায় আমাদের অনেক বস্তুই কাজে লাগে। স্বপ্নাবস্থায় সেগুলি কাজে নাও আসতে পারে। এর অর্থ হল ঐসকল বস্তুসমূহের আদি ও অন্ত আছে। এইরকম বস্তু অবশ্যই মিথ্যা।
ব্যাখ্যা: উপযোগিতার দিক থেকে একটি আপত্তি ওঠে : তুমি বলছ যে জাগ্রত অবস্থায় আমি যে খাবার খাচ্ছি তা সত্য নয় এবং খাবার গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও সত্য নয়। আবার খাবার খাওয়ার ফলে আমি যে তৃপ্তি পাচ্ছি তাও সত্য নয়। কিন্তু এখানে খাদ্যবস্তু এবং খাবার খাওয়ার উপযোগিতা রয়েছে। কারণ জাগ্রত অবস্থায় ক্ষুধার্ত ব্যক্তি মনে করেন যদি তিনি কিছু খাবার খান তবেই তাঁর ক্ষুধা নিবৃত্তি হবে। কিন্তু কেউ যদি স্বপ্নে খাবার খায় তবে নিদ্রাভঙ্গে তার ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় না। এই দুই অবস্থাই এক। কিন্তু স্বপ্নে তিনি যে খাবার খাচ্ছিলেন তা দিয়ে জাগ্রত অবস্থার ক্ষুধার উপশম হয় না।
এর উত্তরে গৌড়পাদ বলছেন : ধরা যাক, জাগ্রত অবস্থায় তুমি ভূরিভোজন করেছ। তারপর স্বপ্ন দেখছ যে তুমি ভারী ক্ষুধার্ত। আবার তুমি স্বপ্ন দেখছ যে তুমি পর্যাপ্ত পরিমাণে খেয়েছ কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তুমি বুঝতে পার যে তুমি ক্ষুধার্ত। জাগ্রত অবস্থায় তুমি তোমার স্বপ্নাবস্থার অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার কর, আবার স্বপ্নাবস্থায় জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার কর। নিদ্রাভঙ্গে স্বপ্নের যাবতীয় অভিজ্ঞতাকে তুমি মিথ্যা বলে বাতিল করে দাও। একইভাবে স্বপ্নাবস্থায় তুমি জাগ্রত অবস্থার সকল অভিজ্ঞতাকেই মিথ্যা বলে বাতিল করে দাও। কিন্তু তুমি সেই একই ব্যক্তিসত্তা, এক অবস্থায় তুমি এক ধরনের অভিজ্ঞতাকে বাতিল করছ আর এক অবস্থায় তুমি আর এক ধরনের অভিজ্ঞতাকে খণ্ডন করছ।
গৌড়পাদ বলছেন যে, যতক্ষণ তুমি স্বপ্ন দেখছ ততক্ষণ স্বপ্নের সবকিছু তোমার নিকট সত্য। স্বপ্ন চলাকালীন খাবার গ্রহণের অভিজ্ঞতাটি যে আদতে সত্য নয় তা কি তোমার কখনো মনে হয়েছে? না, তা হয়নি। কারণ স্বপ্নের সময় যে খাবার আমরা খাই তা আমাদের স্বপ্নের ক্ষুধাকে চরিতার্থ করে। ঠিক তেমনিই, জাগ্রত অবস্থায় যে খাবার আমরা খাই তাতে জাগ্রত অবস্থার ক্ষুধার উপশম হয়। কিন্তু সেই অবস্থার পরিবর্তন হলে প্রাসঙ্গিক সবকিছুর লোপ পায়। আমাদের অভিজ্ঞতা ক্ষণস্থায়ী। জাগ্রত এবং স্বপ্ন উভয় অভিজ্ঞতারই আদি এবং অন্ত আছে। আর যার শুরু এবং শেষ আছে তাই সীমিত। আমাদের অভিজ্ঞতা দেশ-কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ, সুতরাং তা সত্য হতে পারে না। আদি-অন্ত আছে কিনা তাই হল বিচারের মাপকাঠি। যা সত্য তার আরম্ভও নেই, শেষও নেই অর্থাৎ তা শাশ্বত ও সনাতন।
তবে সত্য কি? গৌড়পাদ বলেন যে, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। এইসব অভিজ্ঞতা পর্দায় ফেলা চলমান ছবির মতো যায় আসে। পর্দার উপর কতশত ঘটনাই ঘটে চলে, কিন্তু পর্দাটির কোনও পরিবর্তন হয় না। পর্দার উপর চলচ্চিত্রটি আরোপিত হয়েছে মাত্র। একইভাবে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা ইত্যাদি গুণাবলী আত্মার উপর আরোপিত। একমাত্র আত্মাই সত্য।