অন্তঃস্থানাত্তু ভেদানাং তস্মাজ্জাগরিতে স্মৃতম্।
যথা তত্র তথা স্বপ্নে সংবৃতত্বেন ভিদ্যতে॥৪
অন্বয়: [স্বপ্নে] ভেদানাম্ (পার্থক্য); অন্তঃস্থানাৎ (দেহাভ্যন্তরে [স্বল্পস্থান, অতএব মিথ্যা]); তস্মাৎ এব (তার [প্রত্যক্ষের] দ্বারা); জাগরিতে [অপি] স্মৃতম্ (একই কথা [অনিত্যতা] জাগ্রত অবস্থাতেও প্রযোজ্য); তত্র (সেখানে [জাগ্রত অবস্থায়]); যথা (যেমন); স্বপ্নে (স্বপ্নাবস্থায়); তথা (একই [অনুভূতি]); সংবৃতত্বেন ভিদ্যতে ([কেবলমাত্র] স্থানগত বৈষম্য)।
সরলার্থ: যখন আমরা স্বপ্নে নানা বস্তু দেখি তখন আমরা জানি যে ঐসব বস্তু মিথ্যা। কারণ দেহের অভ্যন্তরে ঐসব বস্তু থাকার মতো জায়গা নেই। কিন্তু জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা যা-কিছু দেখি তাও সমভাবে মিথ্যা। দুই-এর মধ্যে পার্থক্য শুধু এইখানে যে জাগ্রত অবস্থাতে বস্তুগুলি থাকার জন্য জায়গার অভাব হয় না। স্বপ্ন বা জাগ্রত উভয় অবস্থাতে বস্তুগুলি কিন্তু এক। স্বপ্নে দেখা বস্তুগুলি যদি মিথ্যা হয় তবে সেগুলি জাগ্রত অবস্থাতেও মিথ্যা।
ব্যাখ্যা: এখানে কথাটা এই স্বপ্ন বা জাগ্রত উভয় অবস্থার অভিজ্ঞতাই মিথ্যা। উভয়ের মধ্যে পার্থক্যটা শুধু এইখানে যে, স্বপ্নের সময় বস্তুগুলিকে আমি আমার মধ্যে দেখি এবং এইসব বস্তু আমার অভ্যন্তরে থাকার মতো যথেষ্ট জায়গা যে আমার নেই তাও আমি জানি। কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় এইসব বস্তুগুলিকে আমি বাইরে দেখি এবং সেখানে সেগুলি থাকার মতো যথেষ্ট জায়গাও আছে। গৌড়পাদ বলছেন দুটি অভিজ্ঞতাই এক। বস্তু ও বস্তুর প্রকৃতি দুই-ই প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা।
জ্ঞাতা-জ্ঞেয় সম্পর্ক জাগ্রত ও স্বপ্ন এই দুই অবস্থাতেই থাকে। এখানে দ্রষ্টা এবং দৃশ্য উভয়েই বর্তমান। এই অবস্থাতে দুই বোধ থাকে। গৌড়পাদের মতে এই দুই ধরনের অভিজ্ঞতা শর্তসাপেক্ষ। বৌদ্ধদর্শনে একেই বলা হয় ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’। যেমন, তুমি হয়তো আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছ। কিন্তু আমি হয়তো তোমাকে দেখতে পাইনি। তাহলে কি আমার সামনে তুমি নেই? এখানে তোমার অস্তিত্ব আমার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং প্রত্যক্ষের ভূমিকা এখানে থেকেই যাচ্ছে। বস্তুটিকে থাকতে হবে আবার একই সঙ্গে দ্রষ্টাকেও থাকতে হবে। যেহেতু আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা ত্রুটিপূর্ণ, সেহেতু বস্তুর স্বভাবের সঠিক পরিচয় আমরা পাই না। যখন কোন বস্তুকে আমরা দেখি তখন তার কিছু বৈশিষ্ট্য হয়তো আমরা লক্ষ্য করে থাকি কিন্তু বস্তুর এমন অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। যেরূপে বস্তুটি প্রকাশিত সেইরূপেই আমরা বস্তুটিকে দেখি কিন্তু তার প্রকৃত স্বরূপকে আমরা দেখি না। বস্তুটি আমাদের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের এই অনুভূতি ত্রুটিহীন না হওয়ায় বস্তুর যথার্থ স্বরূপও আমরা কখনো জানতে পারি না। সুতরাং আমরা যা দেখি তা সত্য নয়। পরম সত্য সর্বদা এক ও অভিন্ন। এর কোন পরিবর্তন হয় না। এ তত্ত্ব কারও দ্বারা প্রভাবিতও নয়, এমনকি কোন কিছুর উপর নির্ভরশীলও নয়। পরম সত্য স্বতন্ত্র। সেইজন্যই গৌড়পাদ বলছেন এ বিশ্বকে সত্য বলে গ্রহণ করলে তাকে ব্যাখ্যা করব কি করে? কেউ কেউ বলেন যে এই বিশ্ব সত্য—এই কথাটির সঠিক অর্থ কি? কোন্ অর্থে এই জগৎ সত্য? গৌড়পাদ বলছেন—না, এ জগৎ সত্য নয়। এ এক দৃষ্টিবিভ্রম। দৃষ্টিবিভ্রম এই অর্থে যে আমরা বিশ্বকে যা মনে করি বিশ্ব কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা সবসময়ই নিজেদেরকে বঞ্চিত করি।