বিকরোত্যপরান্ভাবানন্তশ্চিত্তে ব্যবস্থিতান্।
নিয়তাংশ্চ বহিশ্চিত্ত এবং কল্পয়তে প্রভুঃ॥১৩
অন্বয়: প্রভুঃ (অন্তরস্থ ঈশ্বর); অন্তঃ (দেহের অভ্যন্তরে); চিত্তে (মনে); ব্যবস্থিতান্ (বিদ্যমান কামনাসমূহ); অপরান্ (অন্য); ভাবান্ (বস্তুসকল); বিকরোতি (নানারূপে প্রকাশিত); এবং (আবার); বহিশ্চিত্তঃ (বাইরে দৃষ্টিপাত করে [বাইরে নিজেকে প্রকাশ করে]); নিয়তান্ (আপেক্ষিকভাবে স্থায়ী বস্তু [যেমন জগৎ]); চ (এবং বস্তুসমূহ যা অস্থায়ী [যেমন—প্রত্যক্ষ অনুভূতি]); কল্পয়তে (প্রকাশ করেন)।
সরলার্থ: আত্মা মনোমধ্যে স্থিত এবং চিন্তা ও কামনা-বাসনার মধ্য দিয়ে ইনি নিজেকে প্রকাশিত করেন। ক্ষণস্থায়ী (যেমন বিদ্যুৎ), এবং আপেক্ষিক স্থায়ী (যেমন এই জগৎ)—এই উভয় অবস্থার বস্তুসকলের মধ্য দিয়ে আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মা নিজেই বহু হয়েছেন। নিজেকে তিনি নানাভাবে প্রকাশ করেন। ‘বি’ অর্থ বহু বা বিচিত্র। এই জগতে দৃশ্যবস্তু দুই প্রকারের—বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ, ব্যক্ত ও অব্যক্ত বস্তু। ‘নিয়তান্’ হল প্রকাশিত বস্তু আর ‘অনিয়তান্’ হল অপ্রকাশিত বস্তু যা অব্যক্ত। আমাদের অন্তর্জগৎই নানা চিন্তা নানা কল্পনার উৎস। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সমগ্র জগৎ অব্যক্তরূপে আছে। সবকিছুকে আমরা প্রকাশ করতে পারি না। হিমবাহের যেমন শুধুমাত্র উপরিভাগ দেখা যায় ঠিক তেমনি যখন কোন মানুষকে দেখি তখন তার স্বরূপকে আমরা দেখতে পাই না কারণ তার প্রকৃত স্বরূপ তার নিজের মধ্যে লুক্কায়িত। শুধুমাত্র তার দেহ ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেই দেখতে পাই।
কিন্তু ব্যক্ত এবং অব্যক্ত এই উভয়ই ব্রহ্ম, ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই নেই। এ জগৎ দৃষ্টিবিভ্রমমাত্র। একেই বলে মায়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দুই অর্থাৎ বৈচিত্রপূর্ণ জগৎকে দেখি ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অজ্ঞানতার শিকার। কিন্তু জ্ঞানীব্যক্তিরা এ জগৎকে ব্রহ্মরূপে দেখেন। এটাই হল প্রকৃত জ্ঞান।
আমাদের যা-কিছু অভিজ্ঞতা তা জ্ঞাতা বা জ্ঞেয় যা সম্পর্কিতই হোক না কেন এ সবেরই উৎস ব্রহ্ম। আমাদের সমস্ত ধারণা ও কল্পনারও উৎস এই ব্রহ্ম। এইভাবেই সবকিছুর মধ্য দিয়ে ব্রহ্ম নিজেকে প্রকাশ করেন। আমি হয়তো কোন শব্দ শুনলাম বা এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকে প্রত্যক্ষ করলাম। এখানেও আমার মাধ্যমে আত্মাই অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হন। আমাদের সবকিছুর পেছনে এই ব্রহ্ম রয়েছেন। আমাদের চারপাশের বস্তুর রদবদল তিনিই ঘটাচ্ছেন। এই দৃশ্যমান জগতের পরিকল্পনাও তাঁর। আর সেভাবেই তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন। কুম্ভকার প্রথমে মনে মনে ঘটটিকে তৈরি করেন তারপরে তাকে বাস্তবে রূপ দান করেন। এইভাবে আত্মা মনের ভেতরে এবং বাইরে নিজেকে প্রকাশ করেন।