ভোগাৰ্থং সৃষ্টিরিত্যন্যে ক্রীড়ার্থমিতি চাপরে।
দেবস্যৈষ স্বভাবোঽয়মাপ্তকামস্য কা স্পৃহা॥৯
অন্বয়: সৃষ্টিঃ ভোগার্থম্ ইতি (এ জগৎ শুধুমাত্র ভোগের জন্য); অন্যে (কিছু ব্যক্তি [মনে করেন]); ক্রীড়ার্থম্ ইতি চ অপরে (কারোর মতে এই জগৎ ক্রীড়ার জন্য); দেবস্য অয়ম্ এষঃ স্বভাবঃ (এই ঈশ্বরের প্রকৃতি); আপ্তকামস্য স্পৃহা কা (তাঁর কোনও ইচ্ছাই অপূর্ণ নেই, [সুতরাং জগৎ সৃষ্টিতে] তাঁর কি প্রয়োজন)?
সরলার্থ: কিছু ব্যক্তির মতে ঈশ্বর এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ভোগের জন্য। অপর কিছু ব্যক্তি বলেন, তিনি এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন তাঁর লীলার জন্য। অন্য কিছু ব্যক্তির মতে এই জগৎ সৃষ্টি তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ঈশ্বর আপ্তকাম অর্থাৎ তাঁর সব ইচ্ছাই পরিপূর্ণ। তবে কোন্ প্রয়োজনে তিনি এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন?
ব্যাখ্যা: ঈশ্বর যদি জগৎ সৃষ্টি করে থাকেন তবে কেন তিনি এ সৃষ্টি করেছেন? কেউ কেউ বলেন ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করেছেন নিজের ভোগের জন্যে। কিন্তু যদি তাই হয় তবে ঈশ্বর বড় নিষ্ঠুর এবং খেয়ালী। কারণ তিনি তাঁর ভোগের জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন এই সৃষ্টি তাঁর খেলামাত্র (ক্রীড়ার্থং)। যেমন শিশুরা খেলার সময় মাটির বাড়ি তৈরি করে। কিন্তু মা যখন তাদের খেতে ডাকে তখন সব ভেঙে ফেলে তারা বাড়িতে ছুটে যায়। ঈশ্বরের খেলাও (সৃষ্টি) কতকটা এইরকম। এটা তাঁর কেবলই মজা।
রামপ্রসাদ একটা গানে বলছেন: মা কালী যেন একটা ঘুড়ি উড়াচ্ছেন। ঘুড়ির সুতোটা তিনি ধরে আছেন এবং ঘুড়ি অনেক উঁচুতে উড়ছে। ঘুড়িটা আকাশের একপ্রান্ত থেকে আর একপ্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুড়ি নিজেকে স্বাধীন বলে মনে করছে কিন্তু আসলে তা নয়। কারণ ঘুড়ির সুতো যে মায়ের হাতে। একইভাবে আমরাও নিজেদের স্বাধীন মনে করি এবং ভাবি আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো যে-কোন কাজ করতে পারি। কিন্তু কোন এক সময় সুতো ছিঁড়ে ঘুড়ি কেটে যায়। তা দেখে মা খুশি হয়ে আনন্দে হাততালি দেয়া এবং হাসতে থাকেন। সুতরাং মা এ জগৎকে সৃষ্টি করেছেন কেবলমাত্র কৌতুকের জন্য।
আবার কেউ কেউ বলেন এই সৃষ্টি ঈশ্বরের স্বভাব (দেবস্য অয়ম্ এষঃ সূভাবঃ)। একথা সহজেই বুঝতে পারতাম যদি ঈশ্বর আমাদেরই মতো একজন সাধারণ মানুষ হতেন। আমরা বাসনার দ্বারা তাড়িত। কিন্তু ঈশ্বর ‘আপ্তকাম’ অর্থাৎ তাঁর কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ নয়, বস্তুত তাঁর কামনা-বাসনা বলে আদৌ কিছু নেই। কোন কিছু করবার তাগিদ আমি তখনি বোধ করি যখন আমার মধ্যে কোন অভাববোধ থাকে। আর এই অভাব দূর করার জন্যই আমি কাজ করি। কুম্ভকার এই ভেবে ঘট নির্মাণ করেন যে সেটিকে বিক্রি করে তিনি অর্থ উপার্জন করবেন। এই পূর্বোক্ত ব্যাখ্যায় ঈশ্বরকে কুম্ভকারের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে মনে হয়। আর এইসব অপব্যাখ্যার মূল কারণ হল ঈশ্বর ও তাঁর সৃষ্টিকে পৃথক বলে মনে করা। কিন্তু বেদান্তেব মতে এদের পৃথক বলে মনে করা হচ্ছে বটে কিন্তু আসলে এরা পৃথক নয়। জলবুদ্বুদগুলিকে আমরা যেমন সমুদ্র থেকে পৃথক বলে মনে করি এও যেন ঠিক তাই। এরা এক ও অভিন্ন। ব্রহ্ম স্বয়ং এই জগৎরূপে প্রতিভাত। তাই গৌড়পাদ বলছেন ব্রহ্ম সৃষ্টি করবেনই বা কেন? যিনি আপ্তকাম (আপ্তকামস্য স্পৃহা কা) তাঁর আবার কিসের স্পৃহা? সুতরাং উল্লিখিত ব্যাখ্যা যুক্তিযুক্ত নয়।
কে এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন আর কেনই বা করেছেন—ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে তর্ক করে আমরা অহেতুক সময়ের অপচয় করি। আমি ভুল করে একটি দড়িকে সাপ বলে মনে করলাম। কেন আমি এই ভুল করলাম, এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। ভ্রম ভ্রমই এবং তাকে শোধরাতে হবে। আমাদের সকল সমস্যার মূলে হচ্ছে এই অজ্ঞানতা। বেদান্তের দৃষ্টিভঙ্গি হল—এই অজ্ঞানতাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূর করতে হবে।
বুদ্ধদেব একসময়ে বলেছিলেন, ধরা যাক, তুমি তীরবিদ্ধ হয়েছ এবং তোমাকে সাহায্য করতে মানুষ এগিয়ে এসেছে। তখন কি তুমি বলবে ‘দাঁড়াও, প্রথমেই আমাকে বল, যে ব্যক্তি আমাকে তীরবিদ্ধ করেছেন তিনি জাতিতে কি এবং তিনি কোথা থেকে এসেছেন’,—তা তুমি অবশ্যই বলবে না। এইসব প্রশ্ন অবান্তর। তোমার যা আশু প্রয়োজন তা হল তীরটিকে ক্ষতস্থান থেকে বার করে তোমার যন্ত্রণার উপশম ঘটানো। একইভাবে বলা যায় আমাদের সকল দুঃখের কারণ হল অজ্ঞানতা। সুতরাং এই অজ্ঞানতাকে দূর করতে হবে। কেন আমাদের এই অজ্ঞানতা কিংবা কিভাবে এই অজ্ঞানতা এল—এ জাতীয় প্রশ্ন একান্তই অবান্তর।