বিশ্বো হি স্থূলভুঙ্নিত্যং তৈজসঃ প্রবিবিক্তভুক্।
আনন্দভুক্তথা প্রাজ্ঞস্ত্রিধা ভোগং নিবোধত॥৩
অন্বয়: বিশ্বঃ (বিশ্ব [আত্মার প্রথম অবস্থা]); হি (সুনিশ্চিত); নিত্যম্ (সর্বদা); স্থূলভুক্ (স্থূলবিষয় ভোগ করে [জাগ্রত অবস্থায়]); তৈজসঃ (তৈজস আত্মার দ্বিতীয় অবস্থা); প্রবিবিক্তভুক্ (সূক্ষ্মভাবে সব বস্তুকে মনের দ্বারা উপভোগ করে [বস্তুর উপর নির্ভরশীল নয়]); তথা (সেইভাবে); প্রাজ্ঞঃ (প্রাজ্ঞ তৃতীয় অবস্থার আত্মা); আনন্দভুক্ (আনন্দ ভোগ করে [এইভাবে]); ভোগম্ (উপভোগ); ত্রিধা (তিনরূপে); নিবোধত (লক্ষ্য কর)।
সরলার্থ: ‘বিশ্ব’ অবস্থায় আত্মা এই স্থূলজগৎকে ভোগ করেন। ‘তৈজস’রূপে নিজকামনা অনুযায়ী আত্মা সূক্ষ্মভাবে এ জগৎকে উপভোগ করেন। প্রাজ্ঞ অবস্থায় আত্মা শুধুমাত্র আনন্দ ভোগ করেন। এই তিন রকমের ভোগের কথা বলা হয়েছে।
ব্যাখ্যা: উপনিষদ পূর্ববর্তী এক শ্লোকে বলেছেন যে, ‘স্থূলভুক্’ হল স্থূলভাবে এই জগৎকে ভোগ করা। এ অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলি সক্রিয় থাকে। ধরা যাক আমি সন্দেশ খাচ্ছি। ‘প্রবিবিক্তভুক্’ হল স্মৃতি এবং ধারণার মাধ্যমে মনে-মনে ভোগ করা। যেমন আমি স্বপ্ন দেখছি যে আমি সন্দেশ খাচ্ছি। এরপর ‘আনন্দভুক্’—যখন মন স্থির। এ অবস্থায় আমরা স্বপ্ন পর্যন্ত দেখি না। এখানে ‘আনন্দ’ শব্দটি আপেক্ষিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এ পরমানন্দ নয়। এই শ্লোকের মর্মার্থ হল তিন রকমের ভোগ (ত্রিধা ভোগম্) আছে। কিন্তু সেই এক ও অভিন্ন আত্মাই এই তিন অবস্থাতে বিদ্যমান। এই আত্মাকে বিশ্ব, তৈজস, প্রাজ্ঞ বা অন্য যে-কোন নামে অভিহিত করা যাক না কেন, এ সবই আত্মার উপর আরোপিত গুণ বা উপাধিমাত্র।
আমরা আমাদেরকে দেহ বলে মনে করে থাকি। আমাদের শরীরে কোথাও কোন যন্ত্রণা থাকলে আমরা বলি ‘আমি যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছি’। কিন্তু বেদান্তমতে—তুমি দেহ নও, তুমি দেহ নিরপেক্ষ। দেহের পরিবর্তন আছে। কখনো তুমি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, আবার কখনো তুমি হয়তো অসুস্থ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘তুমি’ এসবের ঊর্ধ্বে। আমরা যে দেহ থেকে আলাদা এ কথাটি ধারণা করা খুবই কঠিন। বেদান্ত বলেন : ‘হ্যাঁ, এখন কঠিন ঠিকই কারণ এখন তুমি অজ্ঞ। তুমি নিজেকে দেহ বলে মনে কর। কিন্তু যখন তুমি তোমার প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারবে তখন তুমি পরমানন্দ লাভ করবে।’
এখানে একটি গল্প বলা হয়েছে। একদা বিষ্ণু বরাহরূপে জন্ম নেন। এই বরাহশরীরে তিনি বহু শাবকের জন্ম দেন। শাবকগুলিকে লালনপালন করে ও অপরিষ্কার স্থানে জীবনযাপনে বরাহের সুখের অন্ত ছিল না। একদিন নারদ তাঁর কাছে এসে বললেন : ‘প্রভু! এ আপনি কি করছেন? আপনি এই জীবন ভোগ করছেন?’ কিন্তু বরাহমাতা উত্তর দিলেন : ‘আঃ! কে তোমার প্রভু? আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। আমি এখানে অত্যন্ত সুখী।’ তখন শিব এসে ত্রিশূল দিয়ে বরাহমাতাকে বধ করলেন। তৎক্ষণাৎ বিষ্ণু তাঁর বরাহ-শরীরের মধ্য থেকে সহাস্যে বেরিয়ে এলেন। ঠিক তেমনিভাবে আমারও দেহের পরিবর্তন হতে পারে। আমি বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারি। কিন্তু তার দ্বারা আমি প্রভাবিত হতে যাব কেন? মূল কথাটি এই—আত্মার কোনও পরিবর্তন হয় না, পরিবর্তন দেহের হতে পারে।