অকারো নয়তে বিশ্বমুকারশ্চাপি তৈজসম্।
মকারশ্চ পুনঃ প্রাজ্ঞং নামাত্রে বিদ্যতে গতিঃ॥২৩
অন্বয়: অকারঃ বিশ্বং নয়তে (যদি আমরা ‘অ’কারের উপর গভীরভাবে ধ্যান করি, তখন অনুভব করি আমরাই বিশ্ব [যে আত্মা বিশ্বচরাচরকে আচ্ছন্ন করে আছেন—বিরাট]); উকারঃ অপি চ তৈজসম্ (‘উ’ অক্ষরটিকে ধ্যান করলে আমরা দ্রুত তৈজস অবস্থা প্রাপ্ত হই [যে আত্মা সকল মনের সমষ্টি—হিরণ্যগর্ভ]); মকারঃ চ প্রাজ্ঞম্ (‘ম’ অক্ষরটির উপর গভীরভাবে ধ্যান করলে, আমরা হয়ে উঠি প্রাজ্ঞ [মায়াযুক্ত চৈতন্য—ঈশ্বর]); অমাত্রে (তুরীয় অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্যের ধ্যান করলে); পুনঃ গতিঃ ন বিদ্যতে (তারপর আর কোনও গন্তব্যস্থান থাকে না)।
সরলার্থ: যখন আমরা ‘অ’কারের (প্রথম অবস্থা) ধ্যান করি, তখন নিজেদেরকে ‘বিশ্ব’ বলে মনে হয়। যখন ‘উ’কারের (দ্বিতীয় অবস্থা) ধ্যান করি তখন আমরা ‘তৈজস’ হয়ে যাই। সেইভাবে, যখন ‘ম’-কারের (তৃতীয় অবস্থা) ধ্যান করি, তখন আমরা হই ‘প্রাজ্ঞ’। কিন্তু যখন আমরা তুরীয়ের (চতুর্থ অবস্থা) ধ্যানে মগ্ন হই, তখন আমরা অসীম হয়ে যাই।
ব্যাখ্যা: ব্রহ্ম অনন্ত ও বুদ্ধির অগম্য। তাই উপনিষদ আমাদের ‘ওম্’ এই প্রতীকের সাহায্য নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। উপনিষদ অনেক যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছেন কেন ‘ওম্’ ব্রহ্মের সব থেকে উপযুক্ত প্রতীক। উপনিষদ বলছেন যে, ‘ওম্’ বহু ধ্বনির সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। একথা স্পষ্ট যে ‘ওম্’ তিনটি ভিন্ন ধ্বনি অর্থাৎ অ, উ, ম-এর সমষ্টি। সব শব্দ এই তিনটি ধ্বনির অন্তর্গত। তাই ‘ওম্’কে বলা হয় নাদব্রহ্ম বা শব্দব্রহ্ম।
‘অ’ হচ্ছে এই স্থূল জগৎ অর্থাৎ বিরাটের প্রতীক। ‘অ’-কে ধ্যান করলে এই স্থূল জগৎকেই ধ্যান করা হয়। এর দ্বারা ব্যষ্টির ক্ষেত্রে বিশ্বে এবং সমষ্টির ক্ষেত্রে বিরাটে পৌঁছনো যায়। আবার ‘উ’কারকে ধ্যান করলে সূক্ষ্ম জগৎকেই ধ্যান করা হয়। এই উ-কার ব্যষ্টিকে তৈজস এবং সমষ্টিকে হিরণ্যগর্ভে নিয়ে যায়। একইভাবে ‘ম’কারকে ধ্যান করলে আমরা কারণ-অবস্থা প্রাপ্ত হই, ব্যষ্টির ক্ষেত্রে যা প্রাজ্ঞ এবং সমষ্টির ক্ষেত্রে যা ঈশ্বর।
কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে যে, একই ব্রহ্ম একদিকে বিরাট, হিরণ্যগর্ভ ও ঈশ্বর এবং অন্যদিকে বিশ্ব, তৈজস ও প্রাজ্ঞ—এই তিন অবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন। উপনিষদ যে কথাটি আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে দিতে চাচ্ছেন তা হল, ব্রহ্ম কোনও অবস্থার অধীন নন। এইসব অবস্থার অনবরত পরিবর্তন ঘটে থাকে। বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে ব্রহ্ম নিজেকে নানাভাবে প্রকাশ করেন। কিন্তু ব্রহ্ম সবসময়ই অপরিবর্তনীয়। এই অবস্থাগুলিকে আমাদের সত্য বলে মনে করা উচিত নয়। ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থাতে মানুষটির যেমন কোনও পরিবর্তন হয় না, ঠিক তেমনি স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ অবস্থার পেছনেও সেই একই ব্রহ্ম রয়েছেন। ‘ওম্’-কে ধ্যান করলে এই তিন অবস্থায় স্থিত সেই ব্রহ্মকেই ধ্যান করা হয়। ‘ওম্’ থেকেই তুরীয় অবস্থায় পৌঁছনো যায়। এই তুরীয় অবস্থা উপরোক্ত তিন অবস্থার ঊর্ধ্বে।
তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হলে, ‘পুনঃ গতিঃ ন বিদ্যতে’—তখন আর যাওয়া-আসা কিছু থাকে না। তখন গন্তব্য বলে আর কিছু থাকে না। অনেক জায়গায় জীবনকে ভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। আমরা সবসময়ই বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছি। এই গতি বলতে কি বোঝায়? স্থান পরিবর্তন, পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং অবস্থার পরিবর্তন। বস্তুর অনিত্যতা বোঝাতে গিয়ে বুদ্ধদেব প্রায়ই বলতেন : ‘তুমি কখনই সেই এক ব্যক্তি নও। প্রতি মূহুর্তে তোমার পরিবর্তন হয়ে চলেছে। এই পরিবর্তন হয় শারীরিক না হয় মানসিক অথবা দুই-ই।’ এ জগৎ সর্বদা পরিবর্তনশীল। আমরা যখন আমাদের জীবনের চরম লক্ষ্য অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারব তখন আমাদের আর কোনও আসা-যাওয়া থাকবে না। আমরা তখন আমাদের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারব। এই স্থূলদেহের পরিবর্তন হতে পারে। জড় বস্তুর ধর্মই এই, কারণ জড় বস্তু কখনো অপরিবর্তনীয় হতে পারে না। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে তিনি জড় অর্থাৎ এই দেহ নন। দেহের পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু তার প্রভাব দেহেই সীমাবদ্ধ। তার দ্বারা ‘তিনি’ প্রভাবিত হন না। ‘তিনি’ সবসময়ই এক, কারণ তিনি জানেন তিনি ব্রহ্ম। যিনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন কোন পরিবর্তনই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
অনেক শাস্ত্রেই জ্ঞানকে আগুনের সাথে তুলনা করা হয়েছে—জ্ঞানাগ্নি। এই জ্ঞানাগ্নিতে আমাদের কর্মবীজ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে অজ্ঞানতা থাকে ততক্ষণ আমাদের কামনা-বাসনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইত্যাদিও থাকে। এর ফলে আমরা সুখ-দুঃখ ইত্যাদি সকলপ্রকার কর্মের ঘূর্ণাবর্তে আবদ্ধ হই। কিন্তু ‘আমরাই স্বয়ং ব্রহ্ম’—এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে তখন কর্ম বলে আমাদের আর কিছু থাকে না। এই আগুনে কর্মবীজ পুড়ে যায়। বীজই যদি পুড়ে যায় তাহলে তার থেকে আর নতুন চারাগাছ জন্মাতে পারে না। কর্মের ক্ষেত্রেও এই একই কথা খাটে। কিন্তু প্রারব্ধ কর্ম থাকতে পারে অর্থাৎ যে কর্ম এখনি ফল দিতে শুরু করেছে। জীবন্মুক্ত পুরুষেরও এই প্রারব্ধ কর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্ম চলতে থাকে। কিন্তু এই কর্ম জীবন্মুক্ত পুরুষকে বাঁধতে পারে না। তিনি এই কর্মের দ্বারা প্রভাবিত হন না। কারণ তিনি তখন নিজেকে দেহ থেকে পৃথক বলে মনে করেন। কুমোরের চাক ঘোরানো বন্ধ করার পরও চাকটি যেমন আপন গতিতেই খানিকক্ষণ ঘোরে, ঠিক তেমনি প্রারব্ধ কর্মের জন্য জীবন্মুক্ত পুরুষের দেহও কিছুদিন থাকে। কিছুসময় পরে চাকটি যেমন আপনিই থেমে যায় তেমনি প্রারব্ধ কর্ম ক্ষয় হলে জীবন্মুক্ত পুরুষেরও আর জন্মমৃত্যু হয় না।