অত্রৈতস্মিন্ যথোক্তেঽর্থ এতে শ্লোকা ভবন্তি॥
পূর্বে যা বলা হয়েছে তারই ব্যাখ্যা হিসাবে এখানে কতকগুলি শ্লোক পাওয়া যাচ্ছে।
(এখানেই গৌড়পাদের কারিকার সূচনা।)
বহিষ্প্রজ্ঞো বিভুর্বিশ্বো হ্যন্তঃপ্রজ্ঞস্তু তৈজসঃ।
ঘনপ্রজ্ঞস্তথা প্রাজ্ঞ এক এব ত্রিধা স্মৃতঃ॥১
অন্বয়: বহিঃ প্রজ্ঞঃ (জাগ্রত অবস্থায় যখন মানুষ বাহ্যজগৎ সম্পর্কে সচেতন [প্রথম অবস্থা]); বিভুঃ (সর্বব্যাপী); বিশ্বঃ (বিশ্ব বলে পরিচিত); হি (নিশ্চিতরূপে); অন্তঃ প্রজ্ঞঃ (যখন মানুষ নিদ্রিত এবং সবকিছুর অস্তিত্ব মনে [দ্বিতীয় অবস্থা]); তৈজসঃ (তৈজস বলে পরিচিত); তথা (অনুরূপভাবে); ঘনপ্রজ্ঞঃ (ঘনীভূত চৈতন্য এবং চৈতন্য ছাড়া আর কিছু নয়); প্রাজ্ঞঃ (এই সেই তৃতীয় স্তর যা প্রাজ্ঞ বলে পরিচিত); একঃ এব (সেই একই [আত্মা]); ত্রিধা স্মৃতঃ (তিনটি অবস্থায়)।
সরলার্থ: যখন তুমি জাগ্রত এবং চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সচেতন তখন তুমি ‘বিশ্ব’ বলে পরিচিত। তখন তুমি তোমার চারপাশের সকল বস্তু দর্শন করতে সক্ষম। তুমি সর্বব্যাপী। এটিই তোমার প্রথম অবস্থা। যখন তুমি স্বপ্ন দেখ তখন তুমি তোমার মনের সম্পর্কে সচেতন। তখন তুমি ‘তৈজস’, এটি তোমার দ্বিতীয় অবস্থা। যখন শুদ্ধ চৈতন্যমাত্র আছে, এমনকি তুমি কোন বিশেষ বস্তু সম্পর্কেও অবহিত নও, সেটাই তোমার তৃতীয় অবস্থা অর্থাৎ প্রাজ্ঞ। একই আত্মা তিনটি বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন।
ব্যাখ্যা: মানুষ জাগ্রত অবস্থায় এই বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন। তখন তাকে বলা হয় ‘বিশ্ব’। গৌড়পাদ তাকে বিভু তথা সর্বব্যাপী বলে বর্ণনা করেছেন। এই অবস্থায় মানুষ নিজের চারপাশের নানা জিনিস দেখে এবং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তা অনুভব করে থাকে। সুতরাং এই অবস্থায় মানুষের চেতনা বহির্মুখী (বহিঃ প্রজ্ঞঃ)। স্বপ্নাবস্থায় মানুষের চেতনা অন্তর্মুখী (অন্তঃ প্রজ্ঞঃ)। তখন তাকে বলা হয় ‘তৈজস’। এই অবস্থায় জীবের শারীরিক ক্রিয়া বন্ধ থাকে। কেবলমাত্র মন সক্রিয় থাকে। তখন মানুষ যা-কিছু দেখে তা দেখে মনে অর্থাৎ স্বপ্নে। আবার মানুষ যখন সুষুপ্তিতে থাকে তখন সে ‘প্রাজ্ঞ’। এ অবস্থায় থাকে শুধু ঘনীভূত চৈতন্য, শুদ্ধ চৈতন্য (ঘনপ্রজ্ঞঃ)। এই অবস্থায় দেহ-মন নিস্ক্রিয়; শুধু চৈতন্য থাকে।
গৌড়পাদ বলছেন যে তুমি সেই একই আত্মা (একঃ এব)। সংস্কৃতে ‘এব’ শব্দটি কোন কিছুকে জোর দিয়ে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তিনটি বিভিন্ন অবস্থাতেও তোমার মধ্যে এক আত্মা বিরাজিত। জাগ্রত অবস্থায় অথবা নিদ্রায় কিংবা সুষুপ্তিতে তুমি সেই একই জীব। এই বিভিন্ন অবস্থাসকল তোমার ওপর আরোপিত মাত্র। জামা পরিবর্তন করলে যেমন ব্যক্তির কোনও পরিবর্তন হয় না, তেমনি বিভিন্ন অবস্থার পরিবর্তনে মানুষটির কোনও পরিবর্তন হয় না। আচার্য শঙ্কর ব্যাখ্যা করেছেন যে, আত্মা ‘স্থানত্রয় ব্যতিরিক্তম্’ অর্থাৎ আত্মা কোনও অবস্থার অধীন নয়। তুমি হয়তো এখন একটি ঘরে রয়েছ, কিছু সময় পরেই আবার অন্য ঘরে চলে যাবে। এর অর্থ হল তুমি ঐসব ঘরের ওপর নির্ভরশীল নও। অনুরূপভাবে জাগ্রত, স্বপ্ন বা সুষুপ্তি এই তিন অবস্থাতেই তুমি সেই অভিন্ন আত্মা। তুমি শুদ্ধ এবং অনাসক্ত। শঙ্করের মতে, এইসব বিভিন্ন অবস্থার মধ্যেও ‘অহংবোধ’ বর্তমান। এই অহংবোধই যোগসূত্র। শঙ্করাচার্য এক বৃহৎ মৎস্যের উদাহরণ দিয়েছেন। নদীতে সন্তরণশীল বড় মাছটি নদীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ঘুরেফিরে বেড়াতে পারে। তার এই সন্তরণ হচ্ছে ‘যদৃচ্ছা’—অর্থাৎ মাছটি স্বাধীনভাবে একবার এপারে, আর একবার ওপারে, একবার নদীর তলদেশে, একবার উপরিভাগে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ছোট মাছকে খুব সাবধানে চলতে হয়। সে অন্যান্য বড় মাছের ভয়ে ভীত। তার গতি অবাধ নয়। কিন্তু বড় মাছটি স্বয়ংপ্রভু এবং স্বাধীন, অকুতোভয়। একইভাবে আত্মা সবকিছুর পূর্ণ পরিণতি। আত্মা কোন কিছুর অধীন নন। এটাই তাঁর প্রকৃত স্বরূপ।