বিকল্পো বিনিবৰ্তেত কল্পিতো যদি কেনচিৎ।
উপদেশাদয়ং বাদো জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে॥১৮
অন্বয়: বিকল্পঃ (বহু [যেমন আচার্য, শিষ্য, শিক্ষকতা ইত্যাদি]); বিনিবর্তেত (ধ্বংস হতে বাধ্য); যদি (যদি); কেনচিৎ (কোনও কারণে); কল্পিতঃ (কল্পিত [শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে]); উপদেশাৎ (উপদেশের শেষে); অয়ং বাদঃ (এই বহুর প্রশ্নটি [লোপ পায়]); জ্ঞাতে (যখন আত্মজ্ঞান লাভ হয়েছে); দ্বৈতং ন বিদ্যতে (‘দুই’ বলতে আর কিছু থাকে না)।
সরলার্থ: কেবলমাত্র কোন কারণে যদি বহুর প্রয়োজন হয় যেমন—আচার্য, শিষ্য এবং শিক্ষকতা ইত্যাদির কল্পনা করতে হয়, তবে উদ্দেশ্য সিদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই কল্পনারও সমাপ্তি ঘটে। শিক্ষাদানের ফলে যখন আত্মজ্ঞান লাভ হয়, তখন বহুর অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
ব্যাখ্যা: এখানে আরও একটি আপত্তি ওঠে : যদি দুই-এর কোনও অস্তিত্ব না থাকে তবে গুরু-শিষ্যই বা এলেন কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তরে গৌড়পাদ বলছেন : ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। অজ্ঞানতা দূর করবার জন্য, সত্য কি তা মানুষকে শেখাবার জন্য সাময়িকভাবে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ককে মেনে নিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে গুরুও কেউ নেই, শিষ্যও কেউ নেই। আমরা একথা যখন উপলব্ধি করতে পারব তখনি বুঝতে পারব।’ যখন যীশুখ্রীষ্টের কাছে লোকজন এসে বলল তাঁর মা তাঁকে দেখতে চাচ্ছেন, তখন যীশুখ্রীষ্ট বলছেন : ‘(আমার মা) কে?’ অর্থাৎ মা ছেলের এই সম্পর্কটি কি? এও তো মায়া। মায়ার লক্ষণই হল ‘অহংতা’ (আমি) আর ‘মমতা’ (আমার)। অর্থাৎ আমার মা, আমার বাবা, আমার সন্তান ইত্যাদি। এ সবকিছুই ‘অহং’কে কেন্দ্র করে।
কিন্তু এই ‘আমি-আমার বোধ’ থাকলে দোষেরই বা কি? দোষ হল এই যে এর দ্বারা আমরা নিজেদের বড় সীমাবদ্ধ করে ফেলি। তখন আমাদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে আমরা একে অপরের থেকে আলাদা। এই দেহ, পরিবার, দেশ, ধর্ম এসবের দ্বারা আমরা নিজেদের আবদ্ধ করে রাখি। এসবই বন্ধন। এইসব ধারণার অবসান ঘটলে আমরা মুক্তিলাভ করে থাকি। যিনি নিজের মধ্যে সকলকে আর সকলের মধ্যে নিজেকে দেখেন তিনিই পরম সত্যকে জেনেছেন। তাঁর কাছে দুই বলে কিছু নেই। তিনি সর্বভূতে এবং সর্বত্র এক আত্মাকেই দেখেন। এরই নাম জ্ঞান, এরই নাম মুক্তি।