অন্যথা গৃহ্নতঃ স্বপ্নে নিদ্রা তত্ত্বমজানতঃ।
বিপর্যাসে তয়োঃ ক্ষীণে তুরীয়ং পদমশ্নুতে॥১৫
অন্বয়: অন্যথা গৃহ্নতঃ স্বপ্নঃ (স্বপ্নে [দৃষ্টিবিভ্রম] এক বস্তুর স্থানে অন্য বস্তু দেখা যায়); তত্ত্বং অজানতঃ নিদ্রা (নিদ্রিত অবস্থায় [অজ্ঞানতা] কোনও বস্তুকে যথার্থভাবে জানা যায় না); তয়োঃ বিপর্যাসে ক্ষীণে (এ দুটি ভ্রান্তির উপশম হলে); তুরীয়ং পদম্ অশ্নুতে (তুমি ব্রহ্মজ্ঞান লাভের মর্যাদা অর্জন কর)।
সরলার্থ: স্বপ্ন এক দৃষ্টিবিভ্রম যেখানে এক বস্তুকে অন্য আর এক বস্তুরূপে দেখা যায়। নিদ্রা (সুষুপ্তি) হল অবিদ্যা যখন আমরা কিছুই জানতে পারি না। আমাদের নিকট এই দুই-ই বন্ধন। আমরা এ দুটিকে অতিক্রম করতে পারব তখনি যখন আমরা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারব।
ব্যাখ্যা: আমাদের জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে এই তুরীয় অবস্থা লাভ করা। কিন্তু কিভাবে এই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছনো যায়? আর এ পথের অন্তরায়ই বা কি?
এ পথের প্রতিবন্ধক হল মায়া। মায়ার প্রভাবে আমরা সত্যের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারি না। অর্থাৎ আমরা অজ্ঞান। যেমন আকাশে সূর্য রয়েছে কিন্তু তা মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। তা দেখে আমাদের মনে হতে পারে যে সেখানে সূর্য আদৌ নেই। এটাই অজ্ঞানতা। এই অজ্ঞানতা তথা অবিদ্যার জন্যই আমরা আমাদের যে প্রকৃত পরিচয় তুরীয় বা আত্মা তাঁকে জানতে পারি না।
মায়ার প্রভাবের আর এক লক্ষণ হল, আমরা এক বস্তুর স্থলে অন্য বস্তুকে দেখি। এ ক্ষেত্রে একটি অতি পরিচিত দৃষ্টান্ত হল : রজ্জুতে সর্পভ্রম। এই ভ্রান্তির ফলে আমরা আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি না। বিনাশশীল অস্থিমাংসের দেহকেই আমরা আত্মা বলে মনে করি। কিন্তু আত্মা অবিনাশী। সাপ যেমন দড়ির উপর আরোপিত, ঠিক তেমনি দেহও আত্মায় ন্যস্ত।
যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এই আত্মজ্ঞান লাভ করতে না পারে ততক্ষণ সে এই তিন অবস্থা—বিশ্ব, তৈজস এবং প্রাজ্ঞের অধীন। এখানে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা নিদ্রারূপে বর্ণিত। এই অজ্ঞানতাই আমার ভাগ্যের নিয়ামক। বিশ্ব এবং তৈজস—এই প্রথম দুই অবস্থা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে। কিন্তু প্রাজ্ঞ অবস্থায় এই বিভ্রান্তি আর থাকে না কিন্তু অজ্ঞানতা থাকে। এই অবস্থায় আমাদের মন নিষ্ক্রিয় এবং আমরা কোন বস্তু সম্পর্কে সচেতন নই। এই অবস্থার ঊর্ধ্বে হল তুরীয় অবস্থা, এই তুরীয়ই আমাদের প্রকৃত আত্মা। অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা যা আত্মজ্ঞান লাভের অন্তরায় এবং নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে তাকে অতিক্রম করতে হবে। তবেই আমরা এই তুরীয় অবস্থা লাভ করতে পারব। অজ্ঞানতা আমাদের বিভ্রান্ত করে এবং সত্যকে জানার পথে বাধার সৃষ্টি করে। সত্যকে জানতে হলে এই অজ্ঞানতাকে দূর করতে হবে।