অশরীরো বায়ুরভ্রং বিদ্যুৎ স্তনয়িতুরশরীরাণ্যেতানি তদ্যথৈতান্য- মুম্মাদা-কাশাৎ সমুথায় পরং জ্যোতিরুপসম্পদ্য স্বেন রূপেণাভি— নিষ্পদ্যন্তে ॥ ২
৬২২. এবমেবৈষ সম্প্রসাদোহ স্মাচ্ছরীরাৎ সমুথায় পরং জ্যোতিরূপসম্পদ্য স্বেন রূপেণাভিনিষ্পদ্যতে স উত্তমঃ পুরুষঃ। স তত্র পর্যেতি জক্ষৎ ক্রীড়ন্ রমমাণঃ স্ত্রীভির্বা যানৈর্বা জ্ঞাতিভির্বা নোপজনং স্মরনিন্দং শরীরং স যথা প্রয়োগ্য আচরণে যুক্ত এবমেবায়মস্মিঞ্জুরীরে প্রাণো যুক্তঃ ॥ ৩
অন্বয় : অশরীরঃ (শরীরবিহীন) বায়ুঃ, অভ্রম্ (মেঘ; মেঘের প্রথমাবস্থা) বিদ্যুৎ, স্তনয়িত্বঃ (মেঘগর্জন) অশরীরাণি এতানি (এ সমুদয় অশরীর)। তৎ যথা (যেমন) এতানি (এ সমুদয়) অমুম্মাৎ আকাশাৎ (ঐ আকাশ হইতে) সমুথায় (উত্থিত হইয়া) পরম্ জ্যোতিঃ (পরম জ্যোতিকে) উপসম্পদ্য (প্রাপ্ত হইয়া) স্বেন রূপেণ (স্বীয় রূপে) অভিনিষ্পদ্যন্তে (প্রকাশিত হয়)। এবম্ এব (তেমনি) এষঃ সম্প্রসাদঃ (প্রসন্নতাপ্রাপ্ত এই আত্মা) অস্মাৎ শরীরাৎ সমুথায় পরম্ জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য স্কেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে (৮।৩।৪ টীকা)। সঃ (সেই আত্মা) উত্তমঃ পুরুষঃ (শ্রেষ্ঠ পুরুষ)। সঃ তত্র (সেই অবস্থাতে) পর্যেতি (সর্বত্র বিচরণ করে) জক্ষৎ (ভোজন করিয়া, বা হাস্য করিয়া) ক্রীড়ন্ (ক্রীড়া করিয়া) রমমাণঃ (আনন্দ লাভ করিয়া), স্ত্রীভিঃ বা (স্ত্রীলোকের সহিত) যানৈঃ বা (যানের সহিত, যানে আরোহণ করিয়া), জ্ঞাতিভিঃ বা (জ্ঞাতিগণের সহিত) ন (না উপজনম্ (শরীরকে) স্মরন্ (স্মরণ করিয়া) ইদম্ শরীরম্ (এই শরীরকে)।—সঃ যথা (যেমন, ৪।১৬।৩ মন্তব্য দ্রঃ) প্রযোগ্যঃ (রথাদিতে যাহাদিগকে যুক্ত করা হয়; অশ্ব বা বলীবর্দ) আচরণে (রথে; যাহাতে লোকে বিচরণ করিতে পারে) যুক্তঃ এবম্ এব (এই প্রকার) অয়ম্ প্রাণঃ (এই প্রাণ) অস্মিন্ শরীরে যুক্তঃ।
সরলার্থ : (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—বায়ু অশরীর; মেঘ, বিদ্যুৎ, মেঘগর্জন এই সবও তাই। ইহারা যেমন আকাশ হইতে উঠিয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া আপন আপন রূপে প্রকাশিত হয়, সেই রকম সম্প্রসন্ন এই আত্মা শরীর হইতে বাহির হইয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া বিরাজ করে। ইহাই সেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তখন নারী বা জ্ঞাতিগণের সঙ্গে বা যানে আরোহণ করিয়া সে আহারে, ক্রীড়ায় আনন্দ উপভোগ করিয়া বিচরণ করিতে থাকে। যে দেহে তাহার উৎপত্তি, সেই দেহকে তখন সে ভুলিয়া যায়। অশ্ব যেমন রথে সংযুক্ত থাকে, তেমনি প্রাণও এই দেহে সংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে।
মন্তব্য : ৮।১২।৩, দেহে আত্মার জন্ম হয় বা উপজন্ম হয়, এই জন্য দেহের নাম ‘উপজন’। শঙ্কর ইহার দুইটি অর্থ দিয়াছেন, (ক) স্ত্রীপুংসয়োঃ অন্যোন্যোপগমেন জায়তে ইতি উপজনম্; (খ) আত্মভাবেন বা আত্মসামীপ্যেন জায়তে ইতি উপজনম্ অর্থাৎ আত্মভাবে—আত্মার সমীপস্থরূপে উৎপন্ন হয়, এইজন্য শরীরকে উপজন বলা যাইতে পারে।
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মন্ত্রে যাহা বলা হইয়াছে, তাহার অর্থ এই—বায়ু, মেঘ, বিদ্যুৎগর্জন প্রভৃতির হস্তপদাদি অবয়ব নাই, সুতরাং ইহারা অশরীর। এই অশরীরের বায়ু প্রভৃতির ন্যায় আত্মাও অশরীর। কিন্তু বায়ু, অভ্রাদি কখন কখন স্বীয় রূপ পরিত্যাগ করিয়া আকাশে বিলীন হইয়া যায়, তখন যেন ইহারা আকাশত্বই প্রাপ্ত হয়। এই অবস্থায় ইহাদের স্বতন্ত্র সত্তা উপলব্ধি করা যায় না; লোকে মনে করে কেবল আকাশই রহিয়াছে। তেমনি আত্মাও যখন শরীরে মগ্ন হইয়া থাকে, তখন ইহার স্বতন্ত্র সত্তা অনুভব করা যায় না, লোকে কেবল দেহই দেখে; ইহার অতিরিক্ত যে আত্মা নামে এক বস্তু আছে, তাহা বুঝিতে পারে না। শীতকালে বায়ু ইত্যাদি আকাশে বিলীন হইয়া থাকে। শীতের অবসানে ইহারা আকাশ হইতে উত্থিত হয় এবং সূর্যের কিরণ লাভ করিয়া নিজ নিজ প্রকৃতি লাভ করে। তখন ইহারা বায়ু, মেঘ প্রভৃতি রূপে প্রকাশিত হয় এবং ইহা ইহাদিগের স্বরূপ। ইহারা যেমন আকাশ হইতে উত্থিত হইয়া সূর্যের উত্তাপ লাভ করিয়া স্ব স্ব রূপ লাভ করে, আত্মাও তেমনি দেহ হইতে উত্থিত হইয়া ব্ৰহ্মজ্যোতি লাভ করিয়া স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। এই আত্মাকেই সম্প্রসাদ বলা হইয়াছে এবং ইহাই আত্মার স্বরূপ।