তান্ হোবাচৈতে বৈ খলু যূয়ং পৃথগিবেমমাত্মানং বৈশ্বানরং বিদ্বাং- সোহনু মথ; যত্ত্বেতমেবং প্রাদেশমাত্রমভিবিমানমাত্মানং বৈশ্বানরমুপাস্তে স সর্বেষু লোকেষু সর্বেষু ভূতেষু সর্বেষ্বাত্মস্বন্নমত্তি ॥১
অন্বয় : তান্ (তাহাদিগকে) হ উবাচ— এতে [যূয়ম্] (এই তোমরা) বৈ খলু যূয়ম্ পৃথক্ ইব (যেন পৃথক্ এইরূপে) ইমম্ আত্মানম্ বৈশ্বানরম্ (এই বৈশ্বানর আত্মাকে বিদ্বাংসঃ (জানিয়া) অন্নম্ অথ (ভোজন করিতেছ)। যঃ (যিনি) তু (কিন্তু) এতম্ (ইহাকে) এবম্ (এই প্রকারে) প্রাদেশমাত্রম্ (দ্যুলোকাদি সমুদয় প্রদেশ যাহার পরিমাণ) অভিবিমানম্ (অভিব্যাপ্ত এবং অপরিমেয়) আত্মানম্ বৈশ্বানরম্ (বৈশ্বানর আত্মাকে উপাস্তে, সঃ সর্বেষু লোকেষু (সর্বেলোকে) সর্বেষু ভূতেষু (সর্বভূতে) সর্বেষু আত্মসু (সমুদয় আত্মাতে) অন্নম্ অত্তি (ভোজন করে)।
সরলার্থ : অশ্বপতি বলিলেন— (এই বৈশ্বানর আত্মা পৃথক পৃথক নন)। কিন্তু তোমরা ইঁহাকে পৃথক পৃথক কল্পনা করিয়া অন্নভোজন করিতেছ। যিনি এইরূপে এই বৈশ্বানর আত্মাকে প্রাদেশমাত্র ও অভিবিমান (সর্বত্র ব্যাপ্ত ও অপরিমেয়) রূপে উপাসনা করেন, তিনি সর্বলোকে, সর্বভূতে ও সর্ব আত্মাতে অন্নভোজন করেন।
মন্তব্য : অষ্টাদশ খণ্ডে সর্বলোকে, সর্বভূতে এবং সর্ব আত্মাকে প্রাদেশমাত্র এবং অভিবিমান বলা হইয়াছে। প্রাচীনশালাদি ছয় জন সর্বলোক ও সর্বভূতকেই বৈশ্বানররূপে উপাসনা করিতেন; মানবাত্মাও যে বৈশ্বানর ইহা কেহই জানিতেন না। অশ্বপতি উপদেশ দিলেন— কেবল দ্যুলোকাদিই যে বৈশ্বানরের অন্তর্ভূত তাহা নহে, সৰ্ব আত্মাও ইহারই অন্তর্গত; মানবদেহও বৈশ্বানর, অন্নভোজনও অগ্নিহোত্র যজ্ঞ। মানুষ যখন অন্নভোজন করে, তখন সেই অন্ন বৈশ্বানরকেই আহুতিরূপে অর্পণ করা হয়।
‘প্রাদেশমাত্রম্’ ও ‘অভিবিমানম্’ এই দুইটি শব্দের প্রকৃত অর্থ কি সে বিষয়ে অতি প্রাচীন কাল হইতেই মতভেদ চলিয়া আসিতেছে। বিভিন্ন ভাষ্যকার নিজ নিজ মত অনুযায়ী শব্দ দুইটির অর্থ করিতেছেন। আমাদের মনে হয়, যে অর্থ গ্রহণ করিলে পূর্বাপর সামঞ্জস্য থাকে, সেই অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে। দেখা যাউক এই অংশের পূর্বে ও পরে এবিষয়ে কি বলা হইয়াছে। ইহার পূর্ববর্তী ছয় খণ্ডে বৈশ্বানর আত্মার বিষয়ে বলা হইয়াছে— যিনি দ্যৌ অর্থাৎ সুতেজা নামক বশ্বানর উপাসনা করেন, তাঁহার কুলে সুত, প্রসুত ও আসুত দৃষ্ট হয় (৫।১২।১)। সুতেজা শব্দেও ‘সুত’ এবং সুত, প্রসুত ও আসুত শব্দেও ‘সুত’, এইজন্যই বোধ হয় সুতেজার সহিত সুত প্রসুতাদির সম্বন্ধ দেখান হইয়াছে। শতপথ ব্রাহ্মণে অনুরূপ স্থলে ‘সুততেজা’ ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহার পরে বলা হইয়াছে—যিনি আদিত্য অর্থাৎ বিশ্বরূপ বৈশ্বানরের উপাসনা করেন, তাহার কুলে ‘বহুবিশ্বরূপ’ বস্তু দৃষ্ট হয় (৫।১৩।১)। যিনি বায়ু অর্থাৎ পুথগত্মাত্মা বৈশ্বানরের উপাসনা করেন, তাঁহার কুলে ‘পৃথক’ বলি আগমন করে (৫।১৪।১)। যিনি আকাশ অর্থাৎ বহুল নামক বৈশ্বানরের উপাসনা করেন, তিনি প্রজা ও ধনে ‘বহুল’ হন (৫।১৫।১)। যিনি আপ্ অর্থাৎ রয়ি নামক বৈশ্বানরের উপাসনা করেন, তিনি ‘রয়িমান’ হন (৫।১৬।১)। যিনি পৃথিবী অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা নামক বৈশ্বানরের উপাসনা করেন, তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। (৫।১৭।১)। ইহা হইতে বুঝা যাইতেছে যে, প্রতিষ্ঠার উপাসনার ফল প্রতিষ্ঠা, রয়ির উপাসনার ফল রয়ি, বহুলের উপাসনার ফল বহুল ইত্যাদি।
উপাস্য বস্তু যাহা, উপাসনার ফলও তদনুরূপ। পূর্বোক্ত ছয় বৈশ্বানরের উপাসনার কথা বলিয়া অশ্বপতি বলিতেছেন— যে বৈশ্বানর প্রাদেশমাত্র এবং অভিবিমান; তাঁহার উপাসনার ফল সর্বলোকে, সর্বভূতে এবং সর্ব আত্মার অন্নভোজন। উপাস্য যাহা, উপাসনার ফলও যখন তাহাই তখন ইহাই সিদ্ধান্ত করিতে হয় যে, প্রাদেশমাত্র এবং অভিবিমান যাহা, সর্বলোক, সর্বভূত এবং সর্ব আত্মা তাহাই। এস্থলে যদি কেবল ‘প্রাদেশমাত্র’ শব্দটি থাকিত তাহা হইলে অতি সহজেই ইহার অর্থ নির্ণয় করা যাইত। ‘প্রাদেশমাত্র’ এবং ‘অভিবিমান’ এই দুইটি শব্দ থাকাতে অর্থ কিঞ্চিৎ জটিল হইয়াছে। এস্থলে দুই প্রকার অর্থ হইতে পারে— (ক) সর্বলোক ও সর্বভূতের সহিত প্রাদেশমাত্রের সম্বন্ধ এবং সর্ব আত্মার সহিত অভিবিমানের সম্বন্ধ। সর্বলোক ও সর্বভূত অর্থাৎ দ্যুলোক হইতে ভূলোক পর্যন্ত সমুদয় প্রদেশ ইঁহার মাত্রা এই জন্য ইঁহার নাম প্রাদেশমাত্র (শঙ্কর)। সর্ব আত্মারূপে ইনি অভিবিমিত হন অর্থাৎ জ্ঞাত হন, এইজন্য ইঁহার নাম অভিবিমান। প্রাদেশমাত্র নাম দ্বারা সমুদয় অনাত্মবস্তুকে বৈশ্বানরের অন্তর্ভূত করা হইল। ‘অভিবিমান’ নাম দ্বারা বলা হইল সমুদয় আত্মবস্তুও তিনি। (খ) দ্বিতীয় অর্থ এই— প্রাদেশমাত্র বলিলে সর্বলোক, সর্বভূত ও সর্ব আত্মা এই তিনটিকেই বুঝিতে হইবে। ‘সর্ব আত্মা’ প্রদেশের বাহিরে, এপ্রকার আশঙ্কা করিবার কোন কারণ নাই। এস্থলে ‘আত্মা’ অর্থ অবশ্যই অশরীর ‘আত্মা’ নহে—যখন অন্নভোজনের কথা বলা হইয়াছে তখন বুঝিতে হইবে এই আত্মা সশরীর ‘আত্মা’। আর উপনিষদের বহুস্থলে ‘দেহ’ অর্থে ‘আত্মা’ ব্যবহৃত হইয়াছে। সুতরাং সর্বলোক, সর্বভূত এবং সর্বআত্মা—এই তিনটি দ্বারাই প্রাদেশমাত্র বুঝাইতে পারে।
অভিবিমান—অভিবি-মা + অনট্, ‘মা’ ধাতুর অর্থ ‘পরিমাণ করা’। যাহার পরিমাণ নাই তাহার নাম ‘বিমান’ বা অতিবিমান বা অভিবিমান (শঙ্কর)। রামানুজ ‘অবিব্যাপ্ত’ অর্থে ‘অভি’ এবং ‘অপরিমেয়’ অর্থে ‘বিমান’ গ্রহণ করিয়াছেন। ‘প্রাদেশমাত্র’ বলিলে বৈশ্বানরকে দেশ-পরিচ্ছিন্ন করা হয়; এইজন্য প্রাদেশমাত্র বলিয়াই সেই সঙ্গে সঙ্গে বলা হইল ইনি ‘অভিবিমান’ অর্থাৎ অপরিমেয় (কিংবা সর্বব্যাপী ও অপরীমেয়)। ‘প্রদেশমাত্র’ দ্বারা বলা হইল বৈশ্বানর আত্মা জগদুপে প্রকাশিত; অভিবিমান দ্বারা বলা হইল জগৎ দ্বারা তাঁহার পরিমাণ করা যায় না। তিনি জগতের অতীত।
সঃ সর্বেষু লোকেষু সর্বেষু ভূতেষু সর্বেষু আত্মসু আন্নম্ অত্তি— তিনি সর্বলোকে সর্বভূতে এবং সমুদয় আত্মাতে অন্নভোজন করেন অর্থাৎ তিনি সকলের সহিত একত্ব অনুভব করেন; সুতরাং তাঁহার ভোগে সকলের ভোগ এবং সকলের ভোগে তাঁহার ভোগ হইয়া থাকে। যতদিন মানুষ এই একত্ব অনুভব করিতে না পারে, ততদিন কেবল ক্ষুদ্র আমিত্বেই আবদ্ধ হইয়া থাকে।
দ্যৌ, আদিত্য, বায়ু, আকাশ, জল ও পৃথিবী—এই ছয়টির কোনটিই পূর্ণ বৈশ্বানর আত্মা নহে; ইহারা বৈশ্বানর আত্মার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাত্র। ইহাই আরও স্পষ্ট করিয়া বুঝাইবার জন্য ইহার পরে বলা হইয়াছে দ্যৌ ইহার মস্তক, আদিত্য চক্ষু, বায়ু প্ৰাণ, আকাশ মধ্যদেহ, জল এবং পৃথিবী ইহার পাদ। এইভাবে মাথা হইতে পা পর্যন্ত সবকিছুই বর্ণনা করা হইল। এই স্থলে মন্ত্র শেষ হইলে উপমার কোন হানি হইত না। শতপথ ব্রাহ্মণেও আর নূতন কোন উপমা দেওয়া হয় নাই। ছান্দোগ্য উপনিষদে অতিরিক্ত যাহা কিছু বলা হইয়াছে, তাহার সহিত উপরের অংশের বিশেষ কোন সঙ্গতি দেখা যায় না। দ্যৌ যাহার মস্তক, আদিত্য চক্ষু, বায়ু প্রাণ, আকাশ মধ্যদেহ, জল বস্তি, এবং পৃথিবী পদ—তাহার উরু, লোম, হৃদয়, মন ও মুখের সহিত বেদি, কুশ, গার্হপত্য অগ্নি, অন্বাহাৰ্যপচন অগ্নি এবং আহবনীয় অগ্নির তুলনা দেওয়া সুসঙ্গত বলিয়া মনে হয় না।
শঙ্কর এই শেষ অংশকে পরবর্তী খণ্ডের সহিত সংযুক্ত করিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ঊনবিংশ খণ্ড হইতে ত্রয়োবিংশ খণ্ড পর্যন্ত অংশে প্রাণাগ্নিহোত্রের বিষয় বলা হইয়াছে। অগ্নিহোত্র যজ্ঞে বেদি কুশ প্রভৃতির আবশ্যক হয়। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গকে এই সমুদয় বস্তুরূপে কল্পনা করিয়া লওয়া হইয়াছে, যেমন ভোক্তার বক্ষঃস্থলই যজ্ঞের বেদি, বক্ষঃস্থলের লোমসমূহই কুশ, হৃদয়ই গার্হপত্য অগ্নি, মনই অন্বাহার্যপচন এবং মুখই আহবনীয় অগ্নি। প্রতিদিন যে ভোজন করা হয় তাহাই অগ্নিহোত্র যজ্ঞ মুখে যে অন্ন নিক্ষেপ করা হয় তাহাই এই যজ্ঞের আহুতি।