অথৈতয়োঃ পথোর্ন কতরেণ চ ন তানীমানি ক্ষুদ্রাণ্যসকৃদাবর্তীনি ভূতানি ভবন্তি জায়স্ব ম্রিয়ম্বেত্যেতস্তৃতীয়ং স্থানং তেনাসৌ লোকো ন সম্পূর্যতে তমাজ্জুগুপ্সেত। তদেষ শ্লোকঃ ॥ ৮
অন্বয় : অথ এতয়োঃ পথোঃ (এই দুই পথের; ১। অর্চির পথ অর্থাৎ দেবযান; ২। ধূমের পথ অর্থাৎ পিতৃযাণ) ন (না) কতরেণ চ ন (কোন পথ দ্বারাই) তানি ইমানি (সেই এই সমুদয়) ক্ষুদ্রাণি [ভূতানি] (ক্ষুদ্র জন্তুসমূহ) অসকৃৎ আবর্তিনী (পুনঃ পুনঃ আবর্তনশীল; সকৃৎ — একবার; অসকৃৎ—বহুবার; আবর্তিনী—যাহারা বারবার যাতায়াত করে) ভূতানি (ভূতসমূহ) ভবন্তি (হয়)। জায়স্ব (জন্মগ্রহণ কর) ম্রিয়স্ব (মরিয়া যাও) ইতি এতৎ (এই) তৃতীয়ম্ স্থানম্। তেন (সেইজন্য) অসৌ (ঐ) লোকঃ ন সম্পূর্যতে (পূর্ণ হয়)। তস্মাৎ (সেইজন্য) জুগুপ্সেত (সংসারগতিকে ঘৃণা করিবে)। তৎ (এ বিষয়ে) এষঃ (এই) শ্লোকঃ।
সরলার্থ : যাহারা এই দুইটির কোনটি দ্বারাই যায় না, তাহারা নিত্য আবর্তনশীল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণিরূপে জন্মায়। (ইহাদের বিষয়ে বলা যায়)— জন্মাও আর মর। অর্থাৎ ইহারা এতই ক্ষণস্থায়ী যে জন্মগ্রহণ করা মাত্রই মরিয়া যাইতেছে। সুতরাং জন্মমৃত্যু ছাড়া ইহাদের জীবনের অন্য কোন ঘটনা নাই—ইহাই তৃতীয় স্থান। এই জন্যই ঐ লোক (অর্থাৎ চন্দ্ৰলোক) পূর্ণ হইতেছে না। সুতরাং সংসার-গতিকে ঘৃণা করিবে। এবিষয়ে এই শ্লোক আছে—।
মন্তব্য : (ক) এই অষ্টম মন্ত্রের স্থলে বৃহদারণ্যক (৬।২।১৬) এইরূপ আছে— ‘অথ যে এতৌ পন্থানৌ ন বিদুঃ, তে কীটাঃ পতঙ্গাঃ যৎ ইদম্ দন্দশুকম্’ অর্থাৎ আর যাহারা এই দুইটি পথের বিষয় জানে না (কিংবা এই দুইটি পথের কোন পথেই গমন করে না) তাহারা কীট-পতঙ্গ এবং দন্দশূকরূপে জন্মগ্রহণ করে। ‘ন কতরেণ চন’ অংশের দুই প্রকার পাদপাঠ হইতে পারে। (১) ন, কতরেণ, চন; অনিশ্চয়ার্থে ‘চন’ প্রত্যয়। (২) ন, কতরেণ, চ, ন—না, কোন পথ দ্বারাই নয়। ‘ন’ পদের দ্বিরুক্তি। শঙ্কর অষ্টম মন্ত্রের প্রথমাংশের এইরূপ অন্বয় ও অর্থ করিয়াছেন— (১) অথ এতয়োঃ পথোঃ ন কতরেণ চ ন— (যাহারা বিদ্যা বা ইষ্টাপূর্তাদি কর্মের সেবা করে না, তাহারা দুই পথের কোন পথেই (গমন করে) না। (২) তানি ইমানি ক্ষুদ্রাণি অসকৃৎ আবর্তিনী ভূতানি ভবন্তি—(তাহারা) এই সমুদয় পুনঃ পুনঃ জন্মমরণশীল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীরূপে জন্মগ্রহণ করে। মোক্ষমূলার ও গঙ্গানাথ ঝা এই প্রকার অনুবাদ করিয়াছেন—’পুনঃ— পুনঃ জন্মমরণশীল এই সমুদয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী এতদুভয়ের কোন পথ দ্বারাই গমন করে না।’ এ অর্থে সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। এই দুইটি পথ কেবল মানবাত্মার জন্যই; অন্য কোন প্রাণীই এই দুইটি পথে গমনাগমন করে না। সুতরাং পুনঃপুনঃ জন্ম- মরণশীল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী এই দুই পথে গমনাগমন করে না—এরূপ বলিবার সার্থকতা কোথায়? আর মানবাত্মার পরলোকতত্ত্বই এস্থলের বক্তব্য বিষয়; অন্য প্রাণীর পরলোকতত্ত্ব আলোচনা করা ঋষির উদ্দেশ্য নহে। উক্ত অংশ হইতে বুঝা যাইতেছে যে,—(১) যাহারা পঞ্চাগ্নিবিদ্যার বিষয় অবগত আছে কিংবা যাহারা অরণ্যে শ্রদ্ধা ও তপস্যার সেবা করে, তাহারা দেবযান পথে গমন করিয়া ব্রহ্মলাভ করে। (২) যাহারা সংসারে থাকিয়া যাগাদি কর্মের অনুষ্ঠান করে, তাহারা ধূমের পথে গমন করে, তাহার পর নানাভাবে ভ্রমণ করিয়া পুনর্বার পৃথিবীতেই ফিরিয়া আসে। (৩) আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যাহারা এতদুভয়ের কোন পথেই যাতায়াত করে না। ইহারা ক্ষণস্থায়ী কীটপতঙ্গাদিরূপে জন্মগ্রহণ করে। ইহাদিগের জন্য তৃতীয় স্থান। কাহারা এই সমুদয় ক্ষুদ্র প্রাণিরূপে জন্মগ্রহণ করে, তাহা এই মন্ত্রে বলা হয় নাই।
(খ) ‘তস্মাৎ জুগুপ্সতে’ হইতে এই খণ্ডের শেষ পর্যন্ত অংশ কেবল ছান্দোগ্য উপনিষদেই আছে। প্রবাহণ জৈবলি শ্বেতকেতুকে পাঁচটি প্রশ্ন (৫।৩।২ ও ৩ মন্ত্রে করিয়াছিলেন। উক্ত প্রশ্নগুলি ও তাহাদের উত্তর নিম্নে বর্ণিত হইল : (১) মৃত্যুর পর প্রাণিগণ কোথায় যায়? ইহার উত্তর এই খণ্ডের ১ম-৪র্থ মন্ত্রে দ্রষ্টব্য। (২) কি প্রকারে প্রাণিগণ পুনরাবর্তন করে? উত্তর— যাহারা ধূমাদির পথে গমন করে, তাহাদিগকে চন্দ্রলোক হইতে প্রত্যাবর্তন করিতে হয়। কি প্রণালীতে তাহারা প্রত্যাবর্তন করে, তাহা ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম মন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে। (৩) পিতৃযাণ ও দেবযান কোথায় পৃথক হইয়াছে? উত্তর মৃত্যুর পর সকলকেই অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়। ইহার পর কেহ অর্চির পথে যায়, কেহ ধূমের পথে যায়। অর্চির পথই দেবযান এবং ধূমের পথই পিতৃযাণ। দেবযানের উত্তরায়ণের ছয় মাসের পর সংবৎসর, তাহার পর আদিত্য, তাহার পর চন্দ্রলোক প্রাপ্তি। পিতৃযাণে দক্ষিণায়ণের ছয়মাস পরই চন্দ্রলোক প্রাপ্তি। জ্ঞানিগণ অর্থাৎ দেবযানযাত্রিগণ চন্দ্ৰলোক হইতে ব্রহ্মে গমন করেন; কর্মিগণ আবার পৃথিবীতে আগমন করে (১ম-৭ম মন্ত্র দ্রঃ)। (৪) চন্দ্রলোক কেন পূর্ণ হয় না? উত্তর — চন্দ্রলোক হইতে কেহ ব্রহ্মে গমন করে, কেহ পৃথিবীতে পুনরাগমন করে। এই জন্য চন্দ্রলোক পূৰ্ণ হয় না (৮ম মন্ত্র দ্রঃ)। (৫) পঞ্চমী আহুতিতে জলকে কেন মানুষ বলা হয়? উত্তর ৫।৮।২ মন্ত্রের মন্তব্য দ্রষ্টব্য।