স হ হারিদ্রুমতং গৌতমমেত্যোবাচ ব্রহ্মচর্যং ভগবতি বৎস্যাম্যুপেয়াং ভগবন্তমিতি ॥ ৩
অন্বয় : সঃ হ হারিদ্রুমতম্ (হরিদ্রুমানের পুত্র গৌতমের নিকটে) এত্য (গমন করিয়া) উবাচ (বলিল)—ব্রহ্মচর্যম্ ভগবতি (ভগবানের নিকটে অর্থাৎ আপনার নিকটে), বৎস্যামি (বাস করিব), উপেয়াম্ (শিষ্যরূপে আসিয়াছি) ভগবন্তম্ (আপনার নিকটে) ইতি।
সরলার্থ : সত্যকাম হারিদ্রুমত গৌতমের নিকট গিয়া বলিল—আমি আপনার নিকট ব্রহ্মচর্য বাস করিব; এই জন্য আসিয়াছি।
মন্তব্য : সত্যকামের জননী; অথচ তিনি জানেন না—তাঁহার জনকের নামগোত্রাদি কি। ইহার অর্থ কি? শঙ্কর প্রমুখ পণ্ডিতগণ বলেন—সময়াভাবে ও লজ্জাবশত জবালা স্বামীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করিতে পারেন নাই; এবং স্বামীর মৃত্যুর পরে লজ্জা ও দুঃখবশত এ বিষয়ে অপর কাহাকেও জিজ্ঞাসা করেন নাই। কিন্তু এ প্রকার ব্যাখ্যা নিতান্তই অসঙ্গত। জবালার যৌবনাবস্থায় সত্যকামের জন্ম হয়। বর্তমান ঘটনার সময়ে জবালা এই যৌবনাবস্থাকে অতীত কাল বলিয়া বর্ণনা করিতেছেন। সুতরাং বলিতে হয় এই সময়ে জবালার প্রৌঢ়াবস্থা। প্রৌঢ় বয়সেও একজন নারী স্বামীর নাম গোত্রাদি জানে না ইহা অসম্ভব কল্পনা। বিবাহের পূর্ব হইতেই স্ত্রীলোক স্বামীর নামাদি শুনিতে আরম্ভ করে। তাহার পরে পিতৃকুল, শ্বশুরকুল, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, দাস-দাসী প্রবিবেশী, গ্রামবাসী, অতিথি অভ্যাগত সকলেই নানা ঘটনায় ইহার নাম উচ্চারণ করিয়া থাকে; বিনা চেষ্টায়ই স্বামীর নাম কানে আসে। তবে জবালা প্রৌঢ়বয়সেও সত্যকামের পিতার নাম জানিতেন না কেন? আলোচনা করিয়া দেখা যাউক ইহার কারণ কি।
পাণিনির মতে গোত্র অর্থ পৌত্র বা অন্য কোন অধস্তন অপত্য। উপনিষৎ পড়িলে জানা যায় যে, ঐ যুগে সাধারণত প্রত্যেক নামেরই দুইটি অঙ্গ ছিল। যেমন উদ্দালক আরুণি, প্রাচীনশাল ঔপমন্যব ইত্যাদি। আরুণি অর্থ অরুণের পুত্র; ঔপমন্যব অর্থ উপমন্যুর পুত্র। অনেক স্থলে পিতার নাম জানিলে প্রপিতামহ এবং তাহা অপেক্ষাও ঊর্ধ্বতন পুরুষের নাম জানা যাইত। যেমন শ্বেতকেতু আরুণেয় (আরুণেয়—অরুণের পৌত্র) ইত্যাদি। সুতরাং পিতার নাম জানিলেই অন্তত পিতামহের নামও জানা যায় অর্থাৎ পিতার নামের সঙ্গে সঙ্গেই গোত্রের পরিচয় হয়। জবালা সত্যকামের গোত্ৰাদি জানিতেন না—ইহার অর্থ তিনি সন্তানের জনকের নামও জানিতেন না। কেন জানিতেন না তাহার উত্তর ৪।৪।২ মন্ত্রে তিনি নিজেই দিয়াছেন।
উক্ত মন্ত্রের দুইটি অর্থ হইতে পারে—(১) যৌবনে বহুস্থলে বিচরণ করিয়া (বহু-চরন্তী) পরিচারিণী অবস্থায় তোমাকে লাভ করিয়াছিলাম। (সুতরাং) জানিনা তোমার কোন্ গোত্র। (২) যৌবনে পরিচারিণীরূপে বহুলোকের পরিচর্যা করিয়া (বহু-চরন্তী) তোমাকে লাভ করিয়াছিলাম। (সুতরাং) জানিনা তোমার কোন্ গোত্র। যে অর্থই গ্রহণ করা যাউক না কেন, সিদ্ধান্ত এই— এক স্থলে বাস করিয়াই হউক, বা বহুস্থলে বিচরণ করিয়াই হউক, জবালা যৌবনকালে বনিতারূপে বহু পুরুষের পরিচর্যা করিয়াছিলেন। ইহাদিগের মধ্যে কে সত্যকামের জনক ইহা নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। এই জন্যই জবালা সত্যকামের গোত্রাদি বলিতে পারেন নাই! হারিদ্রুমত গেতমও ইহাই বুঝিয়াছিলেন। তাহা না হইলে তিনি বলিবেন কেন— ‘অব্ৰাহ্মণ কখনও এ-প্রকার বলিতে পারে না। …তুমি সত্য হইতে বিচলিত হও নাই।’
সত্যকাম এমন কি বলিয়াছিলেন যাহা অব্রাহ্মণ বলিতে পারে না? তাহা নিশ্চয়ই কোন কলঙ্কের কথা এবং সেই কলঙ্ক মাতৃ-কলঙ্ক। গৌতম যখন দেখিলেন যে, সত্যকাম সত্যের অনুরোধে সরলভাবে মাতৃ-কলঙ্কের কথাও প্রকাশ করিলেন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত করিলেন যে, ব্রাহ্মণ ভিন্ন কেহ এ প্রকার সরল ও সত্যবাদী হইতে পারে না। এইরূপে তিনি স্বীকার করিয়া লইলেন যে, সত্যকাম ব্রাহ্মণ। কিন্তু তাঁহার সিদ্ধান্ত সত্য কিনা তাহা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।