নান্যস্মৈ কস্মৈচন যদ্যপ্যমা ইমামদ্ভিঃ পরিগৃহীতাং ধনস্য পূর্ণাং দদ্যাদেতদেব ততো ভূয় ইত্যেতদেব ততো ভূয় ইতি ॥ ৬
অন্বয় : ন (না) অন্যস্মৈ কস্মৈচন (অন কাহাকেও), যদ্যপি অস্মৈ (ইঁহাকে) ইমাম্ (এই পৃথিবী) অদ্ভিঃ (জলদ্বারা) পরিগৃহীতাম্ (বেষ্টিতা) ধনস্য পূর্ণাম্ (ধনপূর্ণা দদ্যাৎ (দান করে); এতৎ (এই মধুবিদ্যা) এব ততঃ (ইহা অপেক্ষা) ভূয়ঃ (অধিক) ইতি— এতৎ এব ততঃ ভূষঃ ইতি (দ্বিরুক্তি সমাপ্তি-সূচক কিংবা গুরুত্ব-প্রকাশক)।
সরলার্থ : অন্য কাহাকেও এই বিদ্যা বলিবে না; যদি ইঁহাকে (অর্থাৎ গুরুকে) কেহ সমুদ্রবেষ্টিত ধনপূর্ণ পৃথিবীও দান করে তাহা হইলেও নয়। কারণ এই বিদ্যা সমস্ত কিছু হইতেই শ্রেষ্ঠ।
মন্তব্য : এই অধ্যায়ের ষষ্ঠ খণ্ড হইতে আরম্ভ করিয়া একাদশ খণ্ড পর্যন্ত সূর্যের নানাদিকে উদয়ের কথা বলা হইয়াছে, যথা :
সূর্য পূর্বদিকে উদিত হইবেন এবং পশ্চিমদিকে অস্ত যাইবেন—এই সময়ে বসুগণের আধিপত্য (৩।৬)। ঐ সময়ের দ্বিগুণ পরিমিতকাল সূর্য দক্ষিণ দিকে উদিত হইবেন এবং উত্তর দিকে অস্ত যাইবেন। সেই সময়ে রুদ্রগণের আধিপত্য (৩।৭)। তাহার দ্বিগুণ পরিমিতকাল সূর্য পশ্চিমদিকে উদিত হইবেন এবং পূর্বদিকে অস্ত যাইবেন। তখন আদিত্যগণের আধিপত্য (৩।৮)। আবার তাহার দ্বিগুণ পরিমিতকাল সূর্য উত্তরদিকে উদিত হইবেন এবং দক্ষিণদিকে অস্ত যাইবেন। ঐ সময়ে মরুরুগণের আধিপত্য (৩।৯)। তাহারও দ্বিগুণ পরিমিতকাল সূর্য ঊর্ধ্বদিকে উদিত হইবেন এবং অধোদিকে অস্ত যাইবেন। তখন হইবে সাধ্যগণের আধিপত্য (৩।১০)। তারপর সূর্যের উদয়ও নাই, অস্তও নাই। উদয়াস্ত-বিহীন হইয়া তিনি চিরকাল মধ্যস্থলে থাকিবেন। ইহাই প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞানই ব্রহ্মলাভের অবস্থা। ব্রহ্মজ্ঞ আত্মা অনুভব করেন যে, সূর্যের উদয়াস্ত নাই, তাই তাঁহাদের কাছে সর্বদাই দিন (৩।১১)।
ঋষি যাহা বলিয়াছেন, তাহার এই প্রকার অর্থ হইতে পারে :
(১) বর্তমান যুগ ‘বসুযুগ’। এই যুগে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হইয়া পশ্চিমদিকে অস্ত যাইতেছেন। সমস্ত বসুযুগের পরিমাণকে আমরা এক যুগ ধরিয়া লইব। (২) বসুযুগ অনন্তকাল স্থায়ী হইবে না। নির্দিষ্ট সময়ে ইহার প্রলয় হইবে। এই প্রলয়ের পর ‘রুদ্রযুগ’ আরম্ভ হইবে। রুদ্রযুগের পরিমাণ বসুযুগের দ্বিগুণ, সংক্ষেপে বলা যাইতে পারে ইহার পরিমাণ দুই। এই যুগে সূর্য দক্ষিণদিকে উদিত হইয়া উত্তরদিকে অস্তগত হইবেন। নূতন কল্পে সবই নূতন হইতে পারে। তখন সূর্যও যে নূতন দিকে উদিত হইবেন, ইহাতে আশ্চর্যের কিছুই নাই। বর্তমানে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হইয়া পশ্চিমদিকে অস্ত যাইতেছেন। আমরা কি এমন কল্পনা করিতে পারি না যে, এক সময়ে সূর্য পৃথিবীর দক্ষিণদিকে উদিত হইয়া উত্তরদিকে অস্ত যাইবেন? অবশ্য সূর্যোদয়ের দিককেই যদি পূর্বদিক বলিতে হয়, তাহা হইলে তখনও সেই দক্ষিণ দিককেই পূর্ব বলিতে হইবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, এখন আমরা যাহাকে দক্ষিণ দিক বলিতেছি, রুদ্রযুগে সেই দিকই সূর্যোদয়ের দিক হইবে। (৩) রুদ্রযুগের প্রলয়ের পর আদিত্য-যুগ আসিবে। ঐ যুগে সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হইয়া পূর্বদিকে অস্তগত হইবেন। উহার স্থায়িত্বকাল রুদ্রযুগের দ্বিগুণ অর্থাৎ বসুযুগের চতুর্গুণ। সুতরাং ঐ যুগের পরিমাণ চার। (৪) আদিত্যযুগের পর ‘মরুৎযুগ’। ঐ যুগে সূর্য উত্তর দিকে উদিত হইয়া দক্ষিণ দিকে অস্ত যাইবেন। আদিত্যযুগের দ্বিগুণ অর্থাৎ বসুযুগের আট গুণ কাল স্থায়ী হইবে— সংক্ষেপে উহার পরিমাণ আট। (৫) মরুতযুগের পর ‘সাধ্যযুগ’। ঐ যুগে সূর্য ঊর্ধ্বদিকে উদিত হইয়া অধোদিকে অস্তগত হইবেন। তাহার স্থায়িত্বকাল মরুৎযুগের দ্বিগুণ অর্থাৎ বসুযুগের ষোলগুণ—সংক্ষেপে উহার পরিমাণ ষোল। (৬) পূর্বোক্ত পাঁচটি কল্পের মোট পরিমাণ ১ + ২ + ৪ + ৮ + ১৬ = ৩১ অর্থাৎ একত্রিশ বসুযুগ। সাধ্যযুগই যুগগুলির মধ্যে শেষ যুগ। সাধ্যযুগের পর কালসাপেক্ষ আর কোন যুগের আবির্ভাব হইবে না। তখন দিবারাত্রি, সংবৎসরাদি বলিলে যাহা বুঝি, সেই সমস্ত কিছুই থাকিবে না, কারণ তখন সূর্যের উদয় বা অস্ত কিছুই থাকিবে না। ঐ কাল- নিরপেক্ষ লোকই ব্রহ্মলোক; ঐ লোক চির-জ্যোর্তিময়; সূর্য অনন্তকাল সেখানে জ্যোতি দিবেন। যিনি ব্রহ্মোপনিষৎ জানেন, তিনি সেই ব্রহ্মলোকই লাভ করেন।
এই উপনিষদের মতে বসু, রদ্রু, আদিত্য, মরুৎ, সাধ্য— এই পাঁচটি লোকে সূর্যের উদয়াস্ত আছে। কিন্তু তাহা অনন্তকালের জন্য নয়। বসুলোকে নির্দিষ্টকাল সূর্যের উদয়াস্ত হইবে, তাহার পর সূর্য আর সেখানে প্রকাশিত হইবেন না। রুদ্রলোক, আদিত্যলোক এবং অন্যান্য লোকেও তারাই। কিন্তু পৌরাণিক মত অন্য রকম। পুরাণে আছে—সুমেরু পর্বতের চতুর্দিকে সূর্য প্রদক্ষিণ করিতেছেন। ঐ পর্বতের পূর্বদিকে ইন্দ্রের অমরাবতী, দক্ষিণদিকে যমের সংযমনী পুরী, পশ্চিমদিকে বরুণের সুখাপুরী এবং উত্তরদিকে সোমের বিভাপুরী। এই জন্য ভিন্ন ভিন্ন পুরীতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দিবা- রাত্রি হইতেছে। যখন অমরাবতীতে মধ্যাহ্ন, তখন সোমপুরীতে সূর্যাস্ত, ঈশান—কোণে অপরাহ্ন, অগ্নিকোণে পূর্বাহ্ন, সংযমনীতে সূর্যোদয়, নৈঋত কোণে অপররাত্র, বরুণপুরীতে মধ্যরাত্র, এবং বায়ুকোণে পূর্বরাত্র। এইরূপ যখন সংযমনীতে মধ্যাহ্নকাল, তখন অমরাবতীতে সূর্যাস্ত, অগ্নিকোণে অপরাহ্ন, নৈঋতে পূর্বাহ্ন, সুখাতে সূর্যোদয়, বায়ুতে অপররাত্র, বিভাতে মধ্যরাত্র এবং ঈশানে পূর্বরাত্র। সূর্য যখন সমান গতিতে মেরুর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করিতেছেন, তখন সব পুরীতেই সূর্য সমান সময় থাকিবেন। কোনটিতে উদয় ও অস্ত কিছু আগে, কোনটিতে পরে, এইটুকু যাহা পার্থক্য। কোন জায়গায় একগুণ, কোথাও দ্বিগুণ, কোথাও চতুর্গুণ কাল থাকিবেন ইহা হইতে পারে না। সুতরাং উপনিষদের মতের সহিত পুরাণের মতের কিছু পার্থক্য রহিয়াছে।
দ্রাবিড়াচার্য প্রমুখ ব্যাখ্যাকারগণ ঐ দুই মতের সামঞ্জস্য করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। শঙ্করাচার্যও ইঁহাদের অনুসরণ করিয়াছেন। ইঁহারা বলেন ‘উদয়’ অর্থ ‘দৃষ্টিগোচর হওয়া’, ‘অস্ত’ অর্থ ‘দৃষ্টির অতীত হওয়া’। দ্রষ্টা নাই অথচ সূর্য দৃষ্টিগোচর হইল ইহা অর্থশূন্য কথা। ‘অমরাবতীতে সূর্যের উদয় হইল’ ইহার অর্থ ‘অমরাবতীর লোক সূর্য দর্শন করিল। আমরাবতীতে যদি লোক না থাকে তাহা হইলে আমরা বলিতে পারি না যে, ‘আমরাবতীর লোক সূর্য দর্শন করিল’। সুতরাং যেখানে প্রাণী আছে, সেখানেই উদয়াস্তের কথা বলা যায়; যেখানে প্রাণী নাই সেখানে উদয়াস্তের অর্থ নাই। এই যে অমরাবতী প্রভৃতি পুরীর কথা বলা হইয়াছে, তাদের কোনটিই অনন্তকাল স্থায়ী নয়। নির্দিষ্টকাল হইতে প্রাণী বাস করিবে, তাহার পর ইহা জনশূন্য হইবে। যত দিন লোকের বাস ততদিনই এই সকল স্থানে সূর্যের উদয়াস্ত যখন লোক থাকিবে না তখন ওই সব পুরীতে উদয়াস্তও হইবে না। তাই অমরাবতী যদি এক যুগ স্থায়ী হয়, তবে সেখানে সূর্য একযুগ উদিত ও অস্তমিত হইবেন। সংযমনপুরী যদি ইহার দ্বিগুণকাল স্থায়ী হয়, তাহা হইলে সূর্য ঐ পুরীতে দুই যুগকাল উদিত ও অস্তমিত হইবেন। উপনিষদে এই অর্থেই বলা হইয়াছে যে, বসুরাজ্যে সূর্য যতকাল প্রকাশিত থাকিবেন, রুদ্ররাজ্যে প্রকাশিত থাকিবেন তাহার দ্বিগুণকাল।
উপনিষদে আরও বলা হইয়াছে যে, সূর্য এক রাজ্যে পূর্বদিকে উদিত হইয়া পশ্চিমদিকে অস্ত যাইবেন, অন্য রাজ্যে দক্ষিণদিকে উদিত হইয়া উত্তরদিকে অস্তগত হইবেন ইত্যাদি। শঙ্করাচার্য ইহার এইরূপ ব্যাখ্যা দিয়াছেন- সূর্য যেদিকে উদিত হন, সেই দিকের নামই পূর্ব এবং যে দিকে অস্তগত হন সেই দিকের নাম পশ্চিম। সুতরাং সর্ব দেশেই সূর্য পূর্বদিকে উদিত হইয়া পশ্চিমদিকেই অস্তগত হন। সংযমনী পুরীতেও সূর্য পূর্বদিকেই উদিত হন এবং পশ্চিমদিকে অস্তমিত হন। কিন্তু আমরা সংযমনী পুরীর অধিবাসী নহি; আমরা অন্যত্র বাস করিতেছি। আমাদের মনে হইতেছে যে, সূর্য যেন ঐ পুরীতে দক্ষিণদিকেই উদিত হইতেছেন এবং উত্তরদিকেই অস্ত যাইতেছেন।
সূর্য কি ভাবে ঊর্ধ্বদিকে উদিত হইয়া অধোদিকে অস্তগত হন, শঙ্করাচার্যের মতে তাহার ব্যাখ্যা এই— ইলাবৃত দেশ পর্বতাকীর্ণ; ঐ সব পর্বতের জন্য সেখানকার লোক সহজে সূর্যকে দেখিতে পায় না। কেবল পর্বতের উপরের দিকে ছিদ্রপথে সূর্যরশ্মি ইলাবৃত প্রদেশে প্রবেশ করে। এই জন্যই মনে হয় সূর্য সেই দেশে যেন উর্ধ্বদিকেই উদিত হন এবং অধোদিকে অস্তগমন করেন।
পৌরাণিকগণ সূর্যের গতি ও ইন্দ্রপুরী প্রভৃতির যে বর্ণনা দিয়াছেন। শঙ্করাচার্য প্রভৃতি সেই মতই গ্রহণ করিয়া উপনিষদের এই অংশ ব্যাখ্যা করিয়াছেন। কিন্তু উপনিষদের যুগে এই পৌরাণিক মত প্রচলিত ছিল কিনা, তাহা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। আর ইঁহারা যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন তাহাও কষ্টকল্পনা বলিয়া মনে হইবে।