পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি ।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ ॥২৬॥
যোগী বেমনের জীবনের এই বিখ্যাত কাহিনীটি নিচে বাংলায় বর্ণনা করা হলো। এই গল্পটি আমাদের শেখায় যে ভক্তি ও ভালোবাসা কোনো জাতি বা সম্পদের তোয়াক্কা করে না।
অহংকারের অন্ন ও প্রেমের অমৃত – যোগী বেমনের কাহিনী
মহান তেলুগু সাধক ও কবি যোগী বেমন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি ছিলেন আজন্ম সমাজ সংস্কারক, যিনি জাত-পাত এবং মানুষের ভণ্ডামির তীব্র বিরোধিতা করতেন। একবার প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ভ্রমণ করতে করতে তিনি একটি গ্রামে এসে পৌঁছান।
যোগী বেমন গ্রামে এসেছেন শুনেই চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। গ্রামের জমিদার এবং ধনী ব্যক্তিরা পুণ্যের আশায় তাঁর জন্য দামী দামী খাবার নিয়ে ভিড় জমালেন।
ধনীর দম্ভ
গ্রামের এক ধনী ব্যবসায়ী রেশমি পোশাক পরে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি রুপোর থালা, যাতে সাজানো ছিল ঘি-মাখানো অন্ন, পায়েস এবং নানারকম সুস্বাদু ব্যঞ্জন। তাঁর মনে ভক্তির চেয়ে নিজের বড়লোকিপনা দেখানোর জেদই ছিল বেশি।
তিনি করজোড়ে বললেন, “স্বামীজি, দয়া করে আমার দেওয়া এই অন্ন গ্রহণ করুন। এটি আমাদের পবিত্র রান্নাঘরে সব নিয়ম মেনে তৈরি করা শ্রেষ্ঠ খাবার।”
বেমন সেই রুপোর থালার দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, “এসব সরিয়ে নিয়ে যাও। এই খাবার থেকে দুর্গন্ধ আসছে।”
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেল! এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুস্বাদু খাবারকে বেমন ‘অশুচি’ বা ‘দুর্গন্ধযুক্ত’ বলছেন কেন? আসলে বেমন সেই খাবারের পেছনের অহংকার দেখতে পেয়েছিলেন।
দরিদ্র বৃদ্ধার মমতা
সেই ভিড়ের একদম পেছনে এক বৃদ্ধা ভিখারিণী দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেঁড়া কাপড় পরা সেই মহিলার হাতে ছিল একটি পুরনো মাটির পাত্র। তাতে সামান্য একটু ‘আম্বালি’ (রাগির জাউ) ছিল, যা তিনি সারা সকাল চেয়ে-চিন্তে জোগাড় করেছিলেন।
বেমনকে রোদে বসে থাকতে দেখে বৃদ্ধার মনে মায়া হলো। তিনি ভাবলেন, “আহা! সন্ন্যাসী মানুষটা নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধার্ত।” কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে ভয় হলো—যিনি ধনীর রুপোর থালা ফিরিয়ে দিলেন, তিনি কি আমার এই সামান্য জাউ খাবেন?
কিন্তু যোগী বেমন সরাসরি সেই বৃদ্ধার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক মায়ের মমতা দেখতে পেলেন। বেমন নিজে থেকেই তাঁকে ডাকলেন— “মা! আমার খুব খিদে পেয়েছে। তোমার ওই পাত্রে যা আছে, আমাকে একটু দেবে?”
সবাই থমকে গেল। বৃদ্ধা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে নিজের মাটির পাত্র থেকে সেই সামান্য জাউ বেমনের হাতে ঢেলে দিলেন। বেমন পরম তৃপ্তিতে তা পান করলেন, যেন তিনি স্বর্গের অমৃত আস্বাদন করছেন।
বেমনের শিক্ষা
জমিদার রেগে গিয়ে বললেন, “স্বামীজি! আমার দেওয়া শুদ্ধ পঞ্চব্যঞ্জন আপনি ফিরিয়ে দিলেন, আর এক ভিখারিণীর হাতের ছোঁয়া জাউ খেলেন? এ কেমন বিচার?”
বেমন শান্তভাবে উত্তর দিলেন:
“তোমার খাবারে ঘি আর মশলা থাকতে পারে, কিন্তু তাতে মেশানো ছিল তোমার অহংকার। তুমি আমার খিদে মেটানোর চেয়ে নিজের মহিমা প্রচার করতেই বেশি আগ্রহী ছিলে। তাই সেই খাবার ছিল অশুচি।”
বৃদ্ধার দিকে ইশারা করে তিনি বললেন:
“এই মায়ের কাছে নিজের খাওয়ার মতো কিছু নেই, তবুও তিনি নিজের খাবারের মায়া ত্যাগ করে অত্যন্ত মমতা নিয়ে আমাকে খাইয়েছেন। পাত্রটি মাটির হতে পারে, কিন্তু ওঁর মনটি সোনার। অহংকারের সাথে দেওয়া অমৃতের চেয়ে, ভালোবাসা দিয়ে দেওয়া সামান্য জলও অনেক বেশি পবিত্র।“
গল্পের সারমর্ম
ঈশ্বর বা জ্ঞানী ব্যক্তি খাবারের স্বাদ বা পাত্রের দাম দেখেন না; তাঁরা দেখেন কেবল দেওয়ার পেছনের ভক্তি ও আন্তরিকতা।