তস্মিন্ যাবৎ সম্পাতমুষিত্বাথৈতমেবাধ্বানং পুনর্নিবর্তন্তে যথেতামা-কাশমাকাশাদ্বায়ুং বায়ুর্ভূত্বা ধূমো ভবতি ধূমো ভূত্বাভ্রং ভবতি ॥ ৫
৪০৬. অভ্রং ভূত্বা মেঘো ভবতি মেঘো ভূত্বা প্ৰবৰ্ষতি ত ইহ ব্রীহিয়বা ওষধি-বনস্পতয়স্তিলমাষা ইতি জায়ন্তেহতো বৈ খলু দুর্নিষ্প্রপতরং যো যো হান্নমত্তি যো রেতঃ সিঞ্চতি তত্ত্বয় এব ভবতি ॥ ৬
অন্বয় : তস্মিন্ (সেই চন্দ্রমাতে) যাবৎস্পাতম্ (কর্মক্ষয় পর্যন্ত) উষিত্বা (বাস করিয়া) অথ (অনন্তর) এতম্ এব অধ্বানম্ (এইপথে) পুনঃ নিবর্তন্তে (প্রত্যাগমন করে) যথা ইতম্ (যেভাবে গমন করিয়াছিল) আকাশম্। আকাশাৎ (আকাশ হইতে) বায়ুম্। বায়ুঃ ভূত্বা (হইয়া) ধূমঃ ভবতি (হয়)। ধূমঃ ভূত্বা (হইয়া) অভ্রং (মেঘের প্রথমাবস্থা— যে অবস্থায় ইহা জল ধারণ করে; ২।১৫। ১ মঃ দ্রঃ) ভবতি। অভ্রম্ ভূত্বা মেঘঃ ভবতি, মেঘঃ ভূত্বা প্রবর্ষতি (বর্ষণ করে)। তে (তাহারা) ইহ (এই পৃথিবীতে) ব্রীহিয়বাঃ (ব্রীহি ও যবসমূহ) ওষধি-বনস্পতয়ঃ (ওষধি ও বনস্পতিসমূহ) তিলমাষাঃ (তিল ও মাষাসমূহ) ইতি (এইরূপে) জায়ন্তে (জন্মগ্রহণ করে)। অতঃ (এই অবস্থা হইতে) বৈ খলু (নিশ্চয়ই) দুর্নিষ্প্রপতরম্ (দূরতিক্রমণীয়, সহজে অতিক্রম করা যায় না)। যঃ যঃ (যে যে প্রাণী) হি অন্নম্ (অন্নকে) অত্তি (ভোজন করে) যঃ রেতঃ সিঞ্চতি (সন্তান উৎপন্ন করে) তৎ ভূয়ঃ এব ভবতি (সেই প্রকারই হয়, কিংবা তাহা পুনর্বার জন্মগ্রহণ করে)।
সরলার্থ : (৫ম ও ৬ষ্ঠ মঃ) যে পর্যন্ত কর্মক্ষয় না হয়, সে পর্যন্ত চন্দ্ৰমণ্ডলে বাস করিয়া যে পথে গিয়াছিল সেই পথেই ফিরিয়া আসে। (চন্দ্রমণ্ডল হইতে) আকাশে এবং আকাশ হইতে বায়ুতে যায়। বায়ু হইয়া ধূম হয় এবং ধূম হইতে অভ্র হয়। অভ্র হইয়া মেঘ হয়; মেঘ হইয়া বর্ষণ করে। তারপর তাহারা এই পৃথিবীতে ব্রীহি ও যব, ওষধি ও বনস্পতি, তিল ও মাষ— এই সব হইয়া জন্মায়। এই অবস্থা হইতে নিঃসরণ অত্যন্ত কঠিন। যে যে প্রাণী অন্ন ভোজন করে ও সন্তান উৎপন্ন করে ইহাই সেই সব প্রাণিরূপে আবার জন্মগ্রহণ করে। (অর্থাৎ ব্রীহি যবাদিরূপে অবস্থিত আত্মা অন্নরূপে সেই সেই প্রাণীর দেহে প্রবেশ করিয়া রেতোরূপ ধারণ করে)।
মন্তব্য : ৫।১০।৫, ‘যাবৎ সম্পাতম্’ কে ক্রিয়াবিশেষণরূপে গ্রহণ করা হইয়াছে। সম্পাত সম্ + পৎ + ঘ; ‘পৎ’ ধাতুর অর্থ গমন করা, উড়িয়া যাওয়া, পতিত হওয়া ইত্যাদি। শঙ্করাচার্যের মতে সম্পাতঃ— কর্মের ক্ষয়; কর্মক্ষয়ে মানুষের স্বর্গাদি লোক হইতে পতন হয়, এই জন্য কর্মক্ষয়ের নাম ‘সম্পাত’। রামানুজের মতে সম্পাত কর্ম; কর্মদ্বারা স্বর্গাদি লোকে যাওয়া যায়, এইজন্য কর্মের নাম ‘সম্পাত’। ‘যথেতম্’ ইত্যাদির অর্থ— যে ভাবে গমন করে, সেই ভাবেই প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু উভয় পথ যে ঠিক একই, তাহা নহে। চন্দ্রলোকে গমন করিবার ক্রম এই—ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ, দক্ষিণায়নের ছয়মাস, পিতৃলোক, আকাশ এবং চন্দ্রলোক। প্রত্যাগমন করিবার পথ চন্দ্রলোক, আকাশ, বায়ু, ধূম, অভ্র, মেঘ, ব্রীহিয়বাদি। (গীতা, ৮।১৫-২৬)।
‘বায়ুঃ ভূত্বা’ ইত্যাদি (৫।১০।৫) মন্ত্রের ‘বায়ুঃ ভূত্বা’ হইতে আরম্ভ করিয়া (৫।১০।৭) মন্ত্রের শেষ পর্যন্ত অংশ বৃহদারণ্যকে নাই। ইহার পরিবর্তে (৬।২।১৬) মন্ত্রে যাহা আছে তাহার অর্থ হইল—বায়ু হইতে বৃষ্টিতে এবং বৃষ্টি হইতে পৃথিবীতে গমন করে। পৃথিবীতে গমন করিলে পুরুষরূপ অগ্নিতে আহুত হয় এবং তৎপরে যোষারূপ অগ্নিতে জন্মগ্রহণ করে। এইরূপে তাহারা লোকসমূহের অভিমুখে উত্থান করে এবং বিবর্তমান হয়। আর যাহারা এই দুই পথের বিষয় জানে না (কিংবা এই দুইটি পথের কোন পথেই গমন করে না) তাহারা কীট-পতঙ্গ এবং দন্দশূকরূপে জন্মগ্রহণ করে।
‘তে ইহ’ ইত্যাদি — ‘তে’ শব্দ বহুবচন। পূর্বে যাহাদের বিষয়ে এক এক করিয়া বলা হইয়াছিল, এ স্থলে তাহাদিগের বিষয়েই সমগ্রভাবে বলা হইল; এইজন্য এস্থলে বহুবচন প্রয়োগ।