ঋগ্বেদং ভগবোহধ্যেমি যজুর্বেদং সামবেদমাথবণং চতুর্থমিতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং বেদং পিত্র্যং রাশিং দৈবং নিধিং বাকোবাক্যমেকায়নং দেববিদ্যাং ব্ৰহ্মবিদ্যাং ভূতবিদ্যাং ক্ষত্রবিদ্যাং সর্পদেবজনবিদ্যামেতদ্ভগবোহধ্যেমি ॥ ২
অন্বয় : ঋগ্বেদম্ ভগবঃ (ভগবন্) অধ্যেমি [জানি] যজুর্বেদম্ সামবেদম্ আথর্বণম্ চতুর্থম্ (চতুর্থস্থানীয় অথর্ববেদ), ইতিহাসপুরাণম্ পঞ্চমম্ (ইতিহাস-পুরাণ নামক পঞ্চম বেদকে) বেদানাম্ বেদম্ (বেদসমূহের বেদকে, ব্যাকরণকে) পিত্র্যম্ (পিতৃপুরুষদিগের শ্রাদ্ধ-বিষয়ক তত্ত্বকে), রাশিম্ (গণিতশাস্ত্রকে) দৈবম্ (দৈব উৎপাতসমূহের বিদ্যাকে), নিধিম্ (কালতত্ত্বকে বা ধনতত্ত্বকে) বাকোবাক্যম্, একায়নম্, দেববিদ্যাম্, ব্রহ্মবিদ্যাম্, ভূতবিদ্যাম্ (ভূতযোনি-সংক্রান্ত বিদ্যা) ক্ষত্রবিদ্যাম্ (ধনুর্বেদকে), নক্ষত্রবিদ্যাম্ (জ্যোতির্বিদ্যাকে) সর্প-দেবজন-বিদ্যাম্ (সর্পবিদ্যা ও দেবজনবিদ্যাকে)–এতৎ (এই সমুদয়কে) ভগবঃ অধ্যেমি।
সরলার্থ : নারদ বলিলেন—ভগবান্, ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, চতুর্থস্থানীয় অথর্ববেদ, ইতিহাস-পুরাণ নামক পঞ্চম বেদ, সমস্ত বেদেরও যে বেদ (অর্থাৎ ব্যাকরণ), শ্রাদ্ধতত্ত্ব, গণিতশাস্ত্র, দেব-উৎপাত বিষয়ক বিদ্যা, কালতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র, দেববিদ্যা, ব্রহ্মাবিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ধনুর্বেদ, নক্ষত্রবিদ্যা, সর্প ও দেবজনবিদ্যা—আমি এই সবই জানি।
মন্তব্য : পাণিনির মতে ‘অথবর্ণম্’ শব্দ হইতে আথর্বণিক হইয়াছে। অথবা একজন ঋষি; অথর্বদৃষ্ট মন্ত্রে যাঁহারা পারদর্শী, তাঁহাদিগের নাম আথর্বণিক। যাহা আথর্বণিকদিগের তাহাই আথর্বণ। ইহা অথর্ববেদেরই একটি প্রাচীন নাম ‘অথর্বাঙ্গিরস’ নামেও ইহা অভিহিত হইত। (৩।৪।১ মন্ত্রের মন্তব্য দ্রষ্টব্য)।
‘ইতিহাস-পুরাণম্’—ইতিহাস = ইতি + হ আস। ইতি—এই প্রকার; ‘হ’ নিশ্চয়াৰ্থক অব্যয়। ‘ইতিহ’ = এই প্রকারই। আস—প্রাচীন প্রয়োগ; ছিল। ইতি + হ + আস = এই প্রকার ছিল, এই প্রকার ঘটিয়াছিল। এই প্রকার অর্থ হইতেই বর্তমান ইতিহাস অর্থ হইয়াছে। ইতিহাস একটি বাক্য, কিন্তু কালক্রমে ‘ইতি’ বিশেষ্যপদ রূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। ভাষায় ‘ইতিহ’ শব্দেরও প্রয়োগ আছে। ‘ঐতিহ্য’ শব্দ ‘ইতিহ’ শব্দ হইতেই উৎপন্ন। ‘পুরা’ শব্দ হইতে ‘পুরাণ’ শব্দের উৎপত্তি। পুরাণ—পুরাকালের কথা। ছান্দোগ্য উপনিষদে (৩।৪।১, ২; ৭।১।২; ৪; ৭।২।১; ৭।৭।১) এবং শতপথ ব্রাহ্মণে (১১।৫।৬।৮) ‘ইতিহাস পুরাণ’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। ইতিহাস এবং পুরাণ এতদুভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য থাকিলেও ইহারা যে এক বিষয় নহে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত—এই পঞ্চ লক্ষণ-যুক্ত গ্রন্থকে যে পুরাণ বলা হয়, ইহা আধুনিক মত। দৈবম্—দৈব উৎপাতসমূহের জ্ঞান (শঙ্কর ও মোক্ষমুলার)। কেহ কেহ ‘দৈবম্’ পদকে নিধিম্’ পদের বিশেষণ বলিয়া মনে করেন।
নিধিম্—মহাকালাদি নিধিশাস্ত্র (শঙ্কর); the science of time (মোক্ষমূলার)। ‘নিধি’ শব্দের মৌলিক অর্থ ‘সম্পত্তির আধার’; পরে ইহা ‘সম্পত্তি’ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। এইস্থলে ‘নিধি’ ধন অর্থেও ব্যবহৃত হইতে পারে।
বাকোবাক্য—তর্কশাস্ত্র (শঙ্কর ও মোক্ষলার); Macdonell এবং Keith বলেন এ অর্থ নিতান্তই অসঙ্গত। ইঁহাদিগের মতে, বেদের যে অংশ কথোপকথনচ্ছলে লিখিত তাহাই ‘বাকোবাক্য’। Monier Williams-এর অভিধানে ইহার দুইটি অর্থ দেওয়া হইয়াছে—(১) কথোপকথন, (২) বেদের নির্দিষ্ট কোন অংশ।
একায়নম্—এক+অয়ন; অয়ন—পথ, গতি। ভিন্ন ভিন্ন লোক ইহার এই প্রকার অর্থ করিয়াছেন : (ক) নীতিশাস্ত্র (শঙ্কর), Ethics (মোক্ষঃ), (খ) The only way or. manner of conduct অর্থাৎ আচরণের একমাত্র পথ; worldly wisdom, সাংসারিক জ্ঞান (Mon, Will. অভিধান)। (গ) The doctrine (অয়ন) of unity (এক) অর্থাৎ একত্ববাদ; monotheism অর্থাৎ একেশ্বরবাদ।
দেববিদ্যা—নিরুক্ত (শঙ্কর), Etymology (Maxmuller); কেহ কেহ অর্থ করেন ‘দেবতা-সংক্রান্ত-বিদ্যা’। ব্রহ্মবিদ্যা—শিক্ষা কল্পাদি বিদ্যা (শঙ্কর ও মোক্ষমূলার); Knowledge of the Absolute অর্থাৎ পরব্রহ্মের জ্ঞান (Vedic Index) সর্প-দেবজন-বিদ্যা=সর্পবিদ্যা ও দেবজন-বিদ্যা। সর্পবিদ্যা—সৰ্প ও সর্পবিষ-সংক্রান্ত বিদ্যা। দেবজন—গন্ধর্ব; দেবজনবিদ্যা=গন্ধর্বদিগের বিদ্যা অর্থাৎ গন্ধদ্রব্য প্রস্তুত প্রণালী ও নৃত্য-গীতাদি বিদ্যা (শঙ্কর)। কেহ কেহ বলেন ইহার অর্থ ‘দেব-পুরুষগণের বিদ্যা’।