অনাদিমায়য়া সুপ্তো যদা জীবঃ প্রবুধ্যতে।
অজমনিদ্রমস্বপ্নমদ্বৈতং বুধ্যতে তদা॥১৬
অন্বয়: অনাদি মায়য়া (অনাদি মায়ার প্রভাবে); সুপ্তঃ জীবঃ যদা প্রবুধ্যতে (যখন জীবাত্মা আত্মজ্ঞান লাভ করে); অজম্ (জন্ম [মৃত্যু]-রহিত); অনিদ্রম্ (অজ্ঞানতাবর্জিত); অস্বপ্নম্ (দৃষ্টিবিভ্রমরহিত); অদ্বৈতং বুধ্যতে তদা (তখন সে সব বস্তুর একত্ব বুঝতে সক্ষম)।
সরলার্থ: অনন্ত কাল ধরে মায়া সক্রিয় এবং তারই প্রভাবে জীবাত্মা নিদ্রিত, যেন সম্মোহিত। জাগ্রত হলে জীবাত্মা নিজের স্বরূপকে উপলব্ধি করে। সে তখন অনুভব করে যে সে অজম্ (জন্মরহিত), অনিদ্র (অর্থাৎ অজ্ঞানতারহিত), এবং স্বপ্নবর্জিত (অর্থাৎ ভ্রমমুক্ত)। জীবাত্মাই পরমাত্মা আর পরমাত্মাই একমাত্র সত্য।
ব্যাখ্যা: এখানে গৌড়পাদ বলছেন, আমরা সকলেই বিভ্রম তথা মায়ার অধীন। আমরা যেন সম্মোহিত হয়ে আছি। আমরা নিজেদেরকে পরস্পরের থেকে এবং এই জগৎ থেকে পৃথক বলে মনে করি। নিজেদের অধিকার, নিজেদের সুযোগসুবিধা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আমরা অকারণ ব্যতিব্যস্ত হই। অধিকারের দাবিতে আমরা পরস্পরের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হই। ভুলে যাই যে অন্যেরও অধিকার আছে। যদি আমরা বিষয়টিকে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখি তাহলে সমগ্র ব্যাপারটিকেই এক বিরাট কৌতুক বলে মনে হয়। এই দ্বিতত্ত্ব অর্থাৎ ‘আমি’ এবং ‘তুমি’র এই যে দুইবোধ এর সবটাই একটা বিরাট কৌতুকের বিষয়। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে এই জগৎকে কৌতুক বলে মনে হয় না। বরং এই জগৎকে অতীব সত্য এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়। গৌড়পাদ বলছেন এই মায়া অনাদি, অর্থাৎ এর কোন শুরু নেই।
আচার্য শঙ্কর মায়ার দুটি দিক তথা দুই প্রকার বিভ্রমের কথা বলছেন। এই দুটি, দিক হল ‘অন্যথা গ্রহণম্’ আর ‘অগ্রহণম্’। ‘অন্যথা গ্রহণম্’ এর অর্থ ভুল দেখা। সত্য এখানে বিকৃতরূপে প্রতিভাত। যে ধরনের বিকৃতি স্বপ্নে ধরা পড়ে। যেমন, আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছি আমি হাওয়ায় উড়ে চলেছি। ‘অগ্রহণম্’ হল, না দেখা। যেমন, আমি ঘুমিয়ে আছি, সে সময়ে কেউ আমার ঘরে প্রবেশ করলেও তাকে আমি দেখতে পাই না। এমনকি সে যে এসেছিল তাও আমি জানতে পারি না। সব অবস্থাতেই আমরা এই অজ্ঞানতার দ্বারা তাড়িত। কিভাবে? প্রথমত এই অজ্ঞানতার ফলেই আত্মার প্রকৃত স্বরূপটি আমাদের কাছে ধরা পড়ে না। আমরা যে কে তা আমরা জানতেও পারি না। এই হল ‘অগ্রহণম্’ বা না দেখা। আর এই না দেখার জন্যই আমরা নিজেদেরকে পরস্পরের থেকে আলাদা বলে মনে করি। একেই বলে ‘অন্যথা গ্রহণম্’ বা ভুল দেখা। আমরা এই দেহকেই ‘আমি’ বলে মনে করি। আমার শরীর এক ধরনের, তোমার হয়তো আর এক ধরনের। এই দেহগত বিভিন্নতার জন্য আমরা নিজেদেরকে একে অপরের থেকে পৃথক বলে মনে করি। শুধু তাই নয়, শরীর নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনারও অন্ত নেই। শরীর অসুস্থ হলেই আমরা নিজেদের অসুস্থ বলে মনে করি। আমরা এই কথাটি কিছুতেই মনে রাখি না যে, এই দেহ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু দেহের মধ্যে যে দেহী আছেন তিনিই চিরন্তন অর্থাৎ চিরস্থায়ী। আবার আমরা দেখতে পাই না যে একই আত্মা আমাদের সকলের মধ্যে রয়েছেন। আর তিনিই হলেন পরমাত্মা। এই দুই প্রকার ভুলই আমাদের অবিদ্যার মূল কারণ।
প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? গৌড়পাদ বলছেন: ‘যদা জীবঃ প্রবুধ্যতে’—যখন জীবাত্মা জাগে। তিনি বলছেন, আমরা যেন এখন এই মায়ানিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। আবার সুষুপ্তি অবস্থায় আমাদের কাছে এই জগৎ বা অন্য কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু যখন আমরা জেগে উঠি তখন আবার আমরা সবকিছু সম্পর্কে সচেতন হই। ঠিক একইভাবে মায়ানিদ্রা ভঙ্গ হলে আমরা আত্মজ্ঞান লাভ করি এবং উপলব্ধি করি যে আমাদের সকলের মধ্যে এক সত্তা বিদ্যমান। তখন আমরা ভাবি : ‘কি নির্বোধই না আমি ছিলাম! আমি ভাবতাম, এই জগৎ থেকে আমি আলাদা। কিন্তু আসলে আমি তা নই।’ যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তাঁর প্রকৃত স্বরূপ হল : তিনি ‘অজম্’—জন্মরহিত, অনিদ্রম্—অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত, অস্বপ্নম্—ভুলত্রুটিবিহীন, এবং অদ্বৈতম্—দ্বিতত্ত্ববর্জিত।
অজম্—জন্মরহিত। তোমার জন্মও হয়নি, তোমার মৃত্যুও হবে না। তোমার কখনো জন্ম হতে পারে না কারণ তুমি সকলের আত্মা। দেহের জন্ম-মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তা তোমার প্রকৃত স্বরূপকে প্রভাবিত করতে পারে না। ‘তুমি’ সবসময়ই এক। হিন্দুদর্শনে ‘অজম্’-এর ধারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুমতে এই হল সারকথা—দেই এবং আত্মা আলাদা। দেহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আত্মা শাশ্বত ও নিত্য। এটাই আমাদের প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু আমরা তা জানি না। এটা এমন নয় যে আত্মোপলব্ধির পূর্বে তুমি একরকমের ছিলে এবং আত্মজ্ঞান লাভ করার ফলে তোমার পরিবর্তন হয়েছে, এবং তুমি ‘অজম্’ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছ। না, তুমি সবসময়ই জন্মরহিত। ব্রহ্মাস্বরূপ তুমি। মায়ানিদ্রা দূর হলে একথা জানা যায়।
আচার্য শঙ্কর বলেছেন আত্মা ‘অজম্’। কারণ আত্মা অবিকৃত, অপরিবর্তনীয়, স্বাধীন। হিন্দুদর্শনের সকল শাখা এইকথা স্বীকার করেন যে সৃষ্টি থাকলে তার বিনাশও থাকবে। যৌগিক বস্তু বলে যদি কিছু থাকে যা বহু বস্তুর সমষ্টি, তবে তার পরিবর্তন হবেই। সেইজন্যই উপনিষদ আত্মার সম্বন্ধে ‘নিষ্কলম্’ এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। ‘নিষ্কলম্’ কথাটির অর্থ অবিভাজ্য। যদি কোন বস্তু বিভিন্ন অংশের সমষ্টি হয় তবে কোন-না-কোন দিন এই অংশগুলি বিচ্ছিন্ন হবেই। যেমন আমাদের এই দেহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমষ্টি। আমার একটি পা, হাত বা চোখ বা যে কোনও একটি অঙ্গের হানি হতে পারে। কিন্তু তবুও আমি বেঁচে থাকি। তার কারণ ‘আমি’ পা বা হাত বা চোখ কোনটিই নই। কিন্তু দেহের সকল অংশ যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তবে দেহটি আর জীবিত থাকতে পারে না। কিন্তু আত্মা অবিভাজ্য, অখণ্ড এক সত্তা। বৌদ্ধধর্মেও একথা আলোচনা করা হয়েছে। বৌদ্ধরা বলেন: ‘তোমরা রথের কথা বল। কিন্তু রথটি কোথায়? আমায় রথটিকে একবার দেখাও দেখি।’ যদি তুমি রথের কোন একটি অংশ স্পর্শ করে দেখাও, তখন তাঁরা বলবেন : ও! এটি তো রথের চাকা। যদি তুমি রথের অন্য অংশ স্পর্শ করে দেখাও তখন তাঁরা বলবেন : এটি তো রথের পাটাতন। যদি বলা হয় রথ এ সব অংশেরই সমষ্টি তখন তাঁরা বলবেন, কিন্তু রথটি কোথায়? যদি এটি বিভিন্ন অংশের সমষ্টি হয় তবে এর মধ্যে রথ বলে তো আর কিছু নেই।
আচার্য শঙ্করের মতে এ জগতে সকল বস্তুই ষড়্বিকার বা ছয় প্রকারের পরিবর্তনের অধীন। জন্ম, কিছুকাল স্থিতি, বৃদ্ধি, পরিণতি বা সুপক্ক অবস্থা, ক্ষয় বা হ্রাস ও বিনাশ—এই ছয় অবস্থাভেদ বা বিকার। যেহেতু বস্তুমাত্রই কার্য-কারণের অধীন, তাই সকল বস্তুই এই ষড়্বিকারের শিকার। বৌদ্ধদর্শনে এই কার্য-কারণ সম্পর্ককে বলা হয়েছে ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’। একটি বস্তু অন্য আর একটি বস্তুর উপর নির্ভরশীল। এই জগৎ বিভিন্ন বস্তুর সমষ্টিমাত্র। এইসব বস্তুসকল একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। এ এক কার্য-কারণের শৃঙ্খলের মতো এবং জগৎ এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ। কিন্তু আত্মা কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল নন। আত্মা স্বাধীন, স্বয়ম্ভূ। আত্মা অবিকৃত। তিনি কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নন। তাই আত্মা ‘অজম্’ অর্থৎ জন্মরহিত, নিত্য এবং শাশ্বত।
‘অনিদ্রম্’ অর্থ হল নিদ্রাহীন। নিদ্রাবস্থায় কি ঘটে? চতুর্দিক তখন অন্ধকার। অজ্ঞানতাকে ‘তমস্’ বা অন্ধকার বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্ধকার ঘরে আমি কাউকে দেখতে পাই না। এমনকি কেউ যদি আমার সামনে দাঁড়িয়েও থাকেন তাহলে ও তাঁকে দেখতে পাই না। ঠিক তেমনিভাবে অজ্ঞানতাজনিত অন্ধকারের প্রভাবে আমি আত্মাকে দেখতে পাই না। কিন্তু আত্মা সবসময়ই রয়েছেন। তাই গৌড়পাদ জ্ঞানকে নিদ্রাহীন অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যখন আমি আমার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারব তখন জানব আমিই সেই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম। মানুষ সমাধি বা অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির দ্বারা তুরীয় অবস্থা বা আত্মার ‘চতুর্থ’ অবস্থা প্রাপ্ত হয়। সুষুপ্তি অবস্থাতেও আমরা আনন্দ লাভ করে থাকি। কিন্তু তখন আমাদের কোনও দেহবোধ থাকে না। এমনকি এ জগতের কোনও অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরে আমরা আবার সেই পূর্বাবস্থায় ফিরে আসি। সুষুপ্তির অভিজ্ঞতা অজ্ঞানতাকে নাশ করতে পারে না। সমাধির মাধ্যমে তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হলে তখনি অজ্ঞানতার সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে। আমরা তখন ‘অনিদ্রম্’ অর্থাৎ অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত। আবার ‘অস্বপ্নম্’ও বটে অর্থাৎ ভ্রান্তিবিহীন। এখানে স্বপ্ন বলতে ভুল দেখা বোঝাচ্ছে, যেমন দড়িকে সাপ দেখা। তুরীয় অবস্থায় কোন দুই বোধ থাকে না। থাকেন কেবলমাত্র এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। তুরীয় অবস্থার পর মন স্বাভাবিক ভূমিতে ফিরে এলেও দ্বিতত্ত্বের দ্বারা আর বিভ্রান্ত হয় না। তখন সব বৈচিত্রের মাঝে আমরা কেবল ঐক্যই দেখে থাকি।