জাগরিতস্থানো বহিষ্প্রজ্ঞঃ সপ্তাঙ্গ একোনবিংশতিমুখঃ
স্থূলভুগ্বৈশ্বানরঃ প্রথমঃ পাদঃ॥৩
অন্বয়: জাগরিতস্থানঃ বহিঃ প্রজ্ঞঃ (যখন জাগ্রত ও বাহ্যজগৎ সম্পর্কে সচেতন); সপ্তাঙ্গঃ (সাতটি অঙ্গবিশিষ্ট); একোনবিংশতিমুখঃ (উনিশটি মুখযুক্ত); স্থূলভুক্ ([শব্দাদি] স্থূলবিষয়ের ভোক্তা [উপভোগকারী]); বৈশ্বানরঃ (বিশ্বরূপ-পুরুষ); প্রথমঃ পাদঃ ([এটি তাঁর] প্রথম প্রকাশ)।
সরলার্থ: জাগ্রত অবস্থায় আমরা বাইরের জগৎ সম্পর্কে সচেতন এবং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই আমরা এই জগৎকে উপলব্ধি করি। যাঁর সাতটি অঙ্গ এবং উনিশটি উপলব্ধির দ্বারা জীব হিসাবে তিনিই এই স্থূলদেহ ভোগ করেন। এটিই আত্মার প্রথম প্রকাশ।
ব্যাখ্যা: আমাদের প্রথম অবস্থা হচ্ছে জাগ্রত। এই অবস্থায় আমরা বাহ্যজগৎ (বহিষ্প্রজ্ঞ) সম্পর্কে সচেতন এবং এই স্থূলজগৎকে (স্থূলভুক্) উপভোগ করি। বৈশ্বানর কথাটির অর্থ হল বিশ্ব এবং নর, অর্থাৎ সমগ্র জীবজগৎ। সকল জীবেরই জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতা আছে। জাগ্রত অবস্থায় আমরা এই জগৎকে অনুভব করি এবং উপভোগ করি। কিভাবে? আমাদের দেহ ও ইন্দ্রিয়ের দ্বারা। উপনিষদে বর্ণিত সপ্তাঙ্গগুলি হল—মস্তক, চক্ষুদ্বয়, নাসিকা, দেহ, মূত্রাশয় ও পদযুগল। এরপর আছে উনিশটি অঙ্গ—একোনবিংশতি। ‘এক’ কথার অর্থ এক, ‘ঊন’ শব্দটির অর্থ কম, ‘বিংশতি’ অর্থ কুড়ি। কুড়ি থেকে এক কম অর্থাৎ উনিশ। প্রথম হচ্ছে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক), তারপর পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, উপস্থ, পায়ু), এরপর হচ্ছে পঞ্চ প্রাণ—অর্থাৎ পাঁচটি প্রাণ (প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান, সমান) এবং সবশেষে আসছে অন্তঃকরণের চারটি অবস্থা (মনঃ, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার)। এই বিষয়গুলি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। উপনিষদ শুধু এটাই বোঝাতে চাচ্ছেন যে এই জগৎকে আমরা দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই ভোগ করে থাকি। জাগ্রত অবস্থায় আমরা স্থূলভুক্ অর্থাৎ স্থূলজগৎকে ভোগ করি। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি লক্ষণীয়।
জীব হিসাবে আমরা ‘বিশ্ব’, কিন্তু সমষ্টি জীবকে বলা হয় ‘বিরাট’। জীবাত্মা হল ব্যষ্টি আর পরমাত্মা হল সমষ্টি। বিরাট হল সমষ্টিগত স্থূলশরীর, অর্থাৎ স্থূলদেহের সমষ্টি। এই ব্যষ্টি আর সমষ্টি হচ্ছে এক এবং অভিন্ন—এটাই হল বেদান্তের মূল কথা। সমগ্র জগতে একটিমাত্র সত্তাই বিরাজিত। এই জগতে আমরা যে পার্থক্য দেখি তা আপেক্ষিক মাত্র। আমরা সমগ্র জগতের সাথে এক, এ তত্ত্ব আমাদের পক্ষে ধারণা করা কঠিন। জীবাত্মা হিসাবে আমি সচেতন। আমি জানি যে আমার একটি মাথা, দুটি চোখ, দুটি কান, দুটি পা ইত্যাদি আছে। কিন্তু উপনিষদ বলছেন যে, তুমি জীবাত্মা নও, পরমাত্মা। এটিই উপলব্ধি করার চেষ্টা কর। ছান্দোগ্য উপনিষদ থেকে আচার্য শঙ্কর এক উদ্ধৃতি দিয়ে পরমাত্মার সম্বন্ধে বলছেন : দ্যুলোক তাঁর মস্তক, সূর্য তার চোখ, বায়ু তাঁর প্রাণ, সমগ্র আকাশ তাঁর দেহ, জগতের জলরাশি তাঁর মূত্রাশয়, পৃথিবী তাঁর পদযুগল, অগ্নি তাঁর মুখ। অগ্নিকে মুখ বলা হয়েছে তার কারণ আগুন সবকিছুকে নাশ করে। মূল কথাটি হল—এই জগৎও সেই এক অখণ্ড সত্তা ছাড়া আর কিছু নয়। একথা কখনই ভাববে না যে এ জগৎ থেকে তুমি আলাদা। যখন তুমি জেগে আছ তখন এই জগৎকে দেখতে পাচ্ছ এবং তুমি তোমাকেও দেখতে পাচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে তুমি স্থূলরূপে ব্রহ্মকেই দেখছ। উপনিষদে বলা হয়েছে এটিই ‘প্রথমঃ পাদঃ’ অর্থাৎ ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ।
আচার্য শঙ্কর বলছেন, আমরা এই বাইরের জগৎকে দেখতে পাই এবং এই জগৎ থেকে নিজেদের পৃথক বলে মনে করি। কেন? শঙ্করের মতে এটি অবিদ্যাকৃত অর্থাৎ এ অবিদ্যার ফলস্বরূপ। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, আমরা যে জগৎকে দেখি তার কোন পৃথক অস্তিত্ব নেই। যদি বলা হয় এই টেবিলটির পৃথক অস্তিত্ব আছে তবে ভুল করা হবে। ব্রহ্ম আছেন বলেই টেবিলটি আছে। সমস্ত বেদান্ত শাস্ত্রের এটাই হল সারকথা। যে কোন কারণেই হোক এই একত্ববোধ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। শঙ্কর বলছেন সমগ্র বিশ্বজুড়ে এক আত্মা বিরাজমান। পুরুষ, নারী, শিশু, পশু, উদ্ভিদ এ সবই সেই এক আত্মা। এই জগৎ-প্রপঞ্চ হচ্ছে বিভিন্ন পরিমাণে পঞ্চভূতের (আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী) সমাবেশমাত্র। যখন এই পঞ্চভূত অর্থাৎ উপাদানগুলিকে তাদের মূল অবস্থায় (উপশম) ফিরিয়ে দেওয়া যায় তখনি একাত্মতা (অদ্বৈতসিদ্ধি) অনুভূত হয়। বর্তমান উপনিষদ আমাদেরকে ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবেন। সমস্ত উপনিষদগুলির বিচার-বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যই হচ্ছে এই একত্ব অনুভূতি।
বৈদান্তিক দৃষ্টিভঙ্গি হল, এই জগৎ ব্রহ্মে আরোপিত। আমরা বিভিন্ন নাম-রূপের এই জগৎকে দেখি। কিন্তু এই নাম-রূপ সরিয়ে নিলে আর কি অবশিষ্ট থাকে? একমাত্র ব্রহ্ম। অজ্ঞানতার ফলে আমাদের কাছে এই নাম-রূপ সত্য বলে মনে হয়, কিন্তু আসলে এগুলি সত্য নয়। বেদান্তমতে নির্গুণ ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, গুণবর্জিত ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম নিরপেক্ষ এবং উপাধিবর্জিত (নিরুপাধিক)। উপাধিমাত্রই গুণ। যেমন অনেকেই বলেন ঈশ্বর দয়ালু কিন্তু একথা বলে তাঁকে যেন সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। কোন্ অর্থে? ঈশ্বর দয়ালু বললে বোঝানো হয় তিনি নির্দয় নন। ব্রহ্ম নির্বিশেষ, অখণ্ড। দৈর্ঘ্য, বয়স ইত্যাদির সাহায্যে আমরা এক ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি থেকে আলাদা করতে পারি। কিন্তু ব্রহ্ম হচ্ছেন সবকিছুর আধার। ব্রহ্ম আছেন বলেই সবকিছু আছে। তাই ব্রহ্মকে কোন কিছুর থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।
নির্গুণ ব্রহ্মে মায়া প্রকাশিত হলে তখন তা হল ঈশ্বর। কোথা থেকে আসে মায়া? মায়া ব্রহ্মের ভেতরেই আছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন যে ব্রহ্ম আর মায়া যেন অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তি। আমরা কি অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তিকে আলাদা করতে পারি? না। সেইরকম ব্রহ্ম আর মায়াকেও পৃথক করা যায় না। ব্রহ্মে মায়া প্রকাশিত হলে ব্রহ্মই হন ঈশ্বর। শ্রীরামকৃষ্ণদেব কথিত সাপের উপমা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। একটি সাপ মাটিতে ঘুমিয়ে আছে, তখন সাপটি নিষ্ক্রিয়। ঘুম ভাঙার পর যখন সাপটি ফণা তুলল তখন সাপটি সক্রিয়। কিন্তু দুটি অবস্থাতেই একই সাপ বিদ্যমান। একইভাবে ঈশ্বরই মায়া। সক্রিয় ব্রহ্মই হচ্ছেন ঈশ্বর। এখানে ঈশ্বর শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ঐশ্বর্য শব্দটি ঈশ্বর থেকেই এসেছে। ঐশ্বর্য কথার অর্থ হল সম্পদ, শক্তি। যাঁর ঐশ্বর্য আছে তিনিই ঈশ্বর। ব্রহ্ম এবং ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্যটি লক্ষণীয়। ব্রহ্মকে কেউই বর্ণনা করতে পারে না। ব্রহ্ম সম্পর্কে আমরা কোন কিছুই বলতে পারি না যে ‘ব্রহ্ম এই বা ব্রহ্ম সেই’। কিন্তু মায়াযুক্ত ব্রহ্ম অর্থাৎ সক্রিয় ব্রহ্মই হলেন ঈশ্বর। সৃষ্টির আদিতে ছিল হিরণ্যগর্ভ। এই জগৎ হিরণ্যগর্ভে সূক্ষ্ম অবস্থায় ছিল। তখন আমরাও সূক্ষ্ম অবস্থায় ছিলাম। এই হিরণ্যগর্ভেরই প্রথম স্থূল প্রকাশ হচ্ছে বিরাট।
এখানে উপনিষদও একই বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু ক্রমবিন্যাসটি বিপরীত, স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে। জীবাত্মা উত্তরোত্তর ব্রহ্মের নিকটবর্তী হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মে লীন হয়ে যায়। ব্রহ্মের প্রথম অবস্থাই হচ্ছে ‘বিরাট’ অর্থাৎ এই জড়জগৎ, ব্যষ্টির কাছে যা বিশ্ব। অর্থাৎ যে অবস্থায় আমরা জেগে আছি। বিরাটকে আমাদের জাগ্রত অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কেন? জেগে না থাকলে আমরা এই জগৎকে দেখতে পাই না। আমাদের কাছে এ জগতের অস্তিত্ব যখন আমরা জেগে থাকি। পরবর্তী অবস্থা হল হিরণ্যগর্ভ, ব্যষ্টির নিকট যা ‘তৈজস’। এই অবস্থায় আমরা স্বপ্ন দেখি। যখন আমরা স্বপ্ন দেখি তখন এই জগৎ অতি সূক্ষ্মরূপে আমাদের মনে অবস্থান করে। এরপর হচ্ছে গভীর নিদ্রার অবস্থা (সুষুপ্তি)। তখন মানুষের দেহ-মন কোন কাজ করে না, এমনকি মানুষ তখন স্বপ্নও দেখে না। এই অবস্থায় মানুষ শান্তি লাভ করে এবং সুষুপ্তি ভাঙার পর খুব সতেজ বোধ করে। ব্যষ্টির ক্ষেত্রে এটাই ‘প্রাজ্ঞ’ এবং সমষ্টির ক্ষেত্রে এটাই ‘ঈশ্বর’। সমাধি অবস্থায় জীব ব্রহ্মের সাথে এক হয়ে যায়, তখন জীবই ব্রহ্ম। ‘যঃ ব্রহ্ম বেদ সঃ ব্রহ্মৈব ভবতি’—যিনি ব্রহ্মকে জেনেছেন তিনি ব্রহ্মই হয়ে গেছেন। এই অবস্থায় জীব পরম শান্তি ও আনন্দ লাভ করে। তাই উপনিষদ বলছেন যে ব্যষ্টি ও সমষ্টি এক ও অভিন্ন। ‘জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ’—জীবাত্মা ব্রহ্ম থেকে আলাদা নয়। জীব যদি প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম না হয় তবে সে কোন দিন ব্রহ্ম হতে পারবে না। আমাদের প্রকৃত স্বরূপই হচ্ছে ব্রহ্ম। এই কথাটিই উপনিষদ আমাদের বোঝাতে চাচ্ছেন। উপনিষদ এখানে ব্রহ্মের এই চারটি অবস্থার সাথে জীবের এই চারটি অবস্থা যুক্তির দ্বারা তুলনা করে বোঝাতে চাচ্ছেন।